আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কান্তজিউ মন্দির-দিনাজপুরঃ স্থাপত্য শৈলী ও পোড়ামাটির ফলকে উৎকীর্ণ পৌরানিক কাহিনী (পর্ব-০৫)

কান্তজিউ মন্দিরঃ নির্মাণ ও স্থাপত্যিক গঠন শৈলী দিনাজপুর রাজ পরিবার বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যে এক অনবদ্য অবদান রাখে। কান্তজিউ মন্দিরের পাশাপাশি তারা দিনাজপুর ও এর আশেপাশে অসংখ্য স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে। এগুলির মধ্যে দিনাজপুরের রাজবাড়ি এবং গোপালগঞ্জের যুগল মন্দির অগ্রগণ্য। ২০ যুগল মন্দির দিনাজপুর শহরের ৬ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। রাজা রামনাথ ১৭৬৪ সালে এই মন্দির নির্মাণ করে তা প্রভু কৃষ্ণ ও রাধার নামে উৎসর্গ করে।

এই মন্দির অসংখ্য টেরাকোটার মাধ্যমে অলংকৃত করা হয়েছে। তবে কান্তজিউ মন্দিরের মত বিপুল কাহিনীর সমাবেশ এখানে ঘটানো হয়নি। যুগল মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনো মানুষের বিস্ময়ের উদ্রেক করে। তবে দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির নির্মাণ ও গঠন শৈলীর দিক থেকে সর্বোৎকৃষ্ট একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এ মন্দির হলো ১৮ শতকে নির্মিত অশেষ সৌন্দর্য মণ্ডিত একটি হিন্দু মন্দির।

মূলত: এ মন্দিরটি হলো নয়টি শিখরযুক্ত যাকে নবরত্ন মন্দির বলা হয়। কিন্তু বর্তমানে এর চূড়া বা রত্নগুলি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই মন্দিরের পরিকল্পনা, নির্মাণ ও অলংকরণের ক্ষেত্রে বাংলার মধ্য যুগের শেষ দিকের মন্দির নির্মাণ রীতি অনুসরণ করা হয়। M. Martin (১৯৭৬) এবং R, B. Hamilton (১৮৩৩) এ দুজন গবেষক উনিশ শতকের প্রথমার্ধে এ মনুমেন্ট পরিদর্শন করেন এবং মন্তব্য করেন “... the temple was by fan the finest that they had seen in Bengal”.২১ আঠার শতক এবং উনিশ শতকের প্রথম দিকে পুরো দিনাজপুর অঞ্চলে রাজবাড়ি ব্যতিত ইট নির্মিত কোন আবাস স্থল নির্মিত হয়নি। কান্তনগর মন্দির হিন্দুদের একমাত্র পূজার স্থান, যা মহাভারতের পৌরাণিক রাজা বিরত রাজা পোড়া মাটির মাধ্যমে নির্মাণ শুরু করেন।

বলা হয়ে থাকে যে, বিরত রাজা দূর্গের পাশে তাঁর অধীনে থাকা গবাদি পশু পালকদের থাকার ব্যবস্থা করেন। ঢেপা নদীর পূর্ব দিকে প্রায় ১.৬ কি.মি ব্যপী এই দূর্গের অবস্থান ছিল। এ দূর্গের মাটির তৈরি দেওয়াল ছিল অনেক উচ্চ, যা বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত। এ দেওয়াল বিভিন্ন গাছপালা, লতা-পাতা ও নল-খাগড়াদিতে ছাওয়া থাকত। মাটির তৈরি এই দেয়াল ছাড়া সমসাময়িক সময় এবং বিরত রাজার সাংস্কৃতিক ইতিহাস জানার অন্য কোন প্রতœতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।

বিরত রাজা কেন এই মাটির দূর্গ তৈরি করেন তা অজানা। মনে করা হয় প্রথমত, নিকটতম শত্র“ ভোগদত্ত থেকে প্রতিরার জন্য এটি নিমিত হয়ে থাকতে পারে এবং দ্বিতীয়ত, অনেক বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ভারতের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল বন জঙ্গলে পরিপূর্ণ। গবাদি পশু ছিল প্রধান সম্পদ। ভারতীয় রাজা বা প্রিন্সরা অসংখ্য পশু পালক রাখতেন এবং তাদের বসবাসের ব্যবস্থা করতেন। ২২ এই প্রাচীন ঐতিহ্য ১৮ শতকে ধর্মীয় ভাবে দিনাজপুর রাজ পরিবারে অনুসরণ করা হয়।

দিনাজপুর রাজপরিবারে গবাদি পশু পালনের ব্যাপারে Professor N. Ahmed একটি বিবরণ দেন। তার মতে, মহারাজা প্রচুর পরিমাণে দুগ্ধবতী গাভী এবং এগুলোর রণাবেণের জন্য রাখাল রাখতেন, যাকে বলা হয় “গোপালের ধেনু”। গোপাল বলা হত রাখালকে এবং ধেনু অর্থ গরু। প্রতিদিন কৃষ্ণের সমীপে দুগ্ধ, মাখন ও ক্রিম উৎসর্গ করা হত। প্রথম দিকে প্রায় ৩০০০ দুগ্ধবতী গাভী উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

কিন্তু লর্ড কার্জন এ সংখ্যা ৭৫ এ সীমিত করেন। কিন্তু ধর্মপ্রাণ মানুষ ও মহারাজার প্রতিবাদের জের ধরে ব্রিটিশ সরকার এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে এবং এ সংখ্যা ৭৫থেকে ৩০০ তে উন্নীত করার বৈধতা দান করে। ২৩ রাজা প্রাণনাথ (১৬৮২-১৭২২) দিল্লী থেকে কান্তের (কৃষ্ণ দেবতার ভক্তিমিশ্রিত নাম) মূর্তি নিয়ে আসেন এবং ১৭০৪ সালে প্রথম কাদামাটির মাধ্যমে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন। কান্তনগর মন্দির নির্মাণের ব্যাপারে একটি জনপ্রিয় মিথ প্রচলিত আছে, যা Professor N. Ahmed এর বর্ণনায় স্পষ্ট হয়ে উঠে। রাজা প্রাণনাথ তার পার্শ্ববর্তী ঘোড়াঘাটের জমিদার রঘবেন্দ্র রয়ের প থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন।

ঘোড়াঘাটের জমিদার কতগুলি বিষয় যেমন, তাঁর দুই ভাইকে হত্যার তথাকথিত অভিযোগ, দুর্নীতি ও বিদ্রোহী মনোভাবের প্রশ্নে রাজা প্রাণনাথের বিরুদ্ধে মুঘল কোর্টে অভিযোগ দায়ের করেন। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব প্রাণনাথকে দিল্লীর আদালতে উপস্থিত হয়ে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ব্যাখ্যা করতে নির্দেশ দেন। প্রাণনাথ সম্রাটের আদালতে মূল্যবান উপহার সামগ্রী নিয়ে উপস্থিত হন এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কর্তৃক আনীত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণে সমর্থ হন। মুঘল সম্রাট তাকে যাবতীয় অভিযোগ থেকে মুক্ত ঘোষণা করেন এবং তাকে “রাজা” উপাধি প্রদানের মাধ্যমে সম্মানিত করেন। তখন প্রাণনাথ খুশি হয়ে তার প্রিয় ঈশ্বর কৃষ্ণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ল্েয বৃন্দাবন যাত্রা করেন।

কথিত আছে যে, স্বপ্নে ঈশ্বর তাকে যমুনা নদীর তীরে সকালের প্রথম ভাগে কৃষ্ণ মূর্তি প্রাপ্তির দিক নির্দেশনা দেন। রাজা প্রাণনাথ অতি ভক্তির সাথে এই মূর্তি সংগ্রহ করেন এবং পদ্মা, মহানন্দা এবং পুনর্ভবা নদীর ভেতর দিয়ে একটি বৃহৎ সুসজ্জিত নৌকায় করে তা নিয়ে আসেন। এই নৌকাটি তাঁর প্রাসাদ নগরী শ্যামগড়ের যা পরে কান্তনগর নামে পরিচিত লাভ করে, ১৮ কি.মি উত্তরে এসে থেকে যায। যৌক্তিকভাবে এই পৌরাণিক কাহিনী কান্তজিউ মন্দিরের নির্মাণ ঘটনাকে পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না। তথাপি, এ কথা বলা প্রয়োজন যে, গুপ্ত পরবর্তী যুগ থেকে বাংলায় বৈষ্ণব মতাদর্শ ব্যাপকভাবে উন্নতি লাভ করতে থাকে।

এই অঞ্চলের হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিলেন দেবতা কৃষ্ণের প্রতি চরম অনুরক্ত। দিনাজপুর রাজ্যের অধিকাংশ প্রজা ছিল হিন্দু, বিশেষত বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী। এ অবস্থায় রাজা প্রাণনাথ জনকল্যাণমুলক নীতির আওতায় তাঁর রাজ্যে শ্রী কৃষ্ণের স্মরণে মন্দির নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সমসাময়িক সময়ে দণি এশিয়ার সর্বত্র জনপ্রিয় শাসনের েেত্র এ ধরণের কার্যক্রম ছিল অতি সাধারণ ব্যাপার। প্রাণনাথের মন্দির নির্মাণের এই নীতি জনগণকে নিজ এস্টেটের ভেতরে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনের অধিকার এনে দেয়।

ফলে জনসাধারণকে এই সিদ্ধান্ত সুখের সন্ধান দেয়। অন্য দিকে শাসন কর্তৃপরে সম্মান ও প্রতিপত্তি সৃষ্টিতে এ কার্যক্রম সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কেননা রাজা পুরোহিত পণ্ডিতশ্রেণীর অকুণ্ঠ সমর্থন আদায়ে সামর্থ্য হন। পাশাপাশি কান্তনগরসহ রাজ্যের উত্তরাঞ্চল ছিল খুবই উর্বর দোয়াব অঞ্চল। পুনর্ভবা ও ঢেপা নদীর মাঝামাঝি এর অবস্থান।

এ অঞ্চল থেকেই দিনাজপুর রাজ পরিবারের অনুকূলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রাজস্ব আসত। ব্যবসা বাণিজ্যের সিংহভাগ এখানেই পরিচালিত হত বিপুল পরিমাণে রাজস্ব সংগ্রহ, হিন্দু অধিবাসীদের তৃপ্তি, ঢেপা নদীর মাধ্যমে ব্যবসা বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি কারণে রাজা প্রাণনাথ তার সেবামূলক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে একটি মন্দির নির্মাণের উপযুক্ত স্থান হিসেবে এ অঞ্চলকে নির্বাচন করেন। রাজা প্রাণনাথ তাঁর জীবদ্দশায় মন্দিরের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করতে পারেননি। ১৭১৩ সালে মন্দিরের মূল অবয়ব নির্মাণ এবং ১৭২২ সালে অলংকরণের কাজ শুরু হয়। প্রাণনাথ ১৭২২ সালে মারা যান।

তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পালক পুত্র রামনাথ মন্দির নির্মাণের কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন এবং ১৭৫২ সালের মধ্যে এর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। কতিপয় সূত্র থেকে জানা যায় যে, প্রাণনাথের স্ত্রী রুকমিনির আদেশে পিতার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য মহারাজের দত্তক পুত্র মহারাজা প্রাণনাথ ১৬৭৪ শকে (১৭৫২ সালে) মন্দিরটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। মন্দিরটি ছিল অতি সৌন্দর্যমণ্ডিত ও আকর্ষণীয়। মূলগতভাবে এটি নয়টি শিখরযুক্ত মন্দির। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে মন্দিরের অংশবিশেষ বিশেষত শিখরগুলি ধ্বংস হয়।

চির দিনের জন্য নয়টি টাওয়ার হারিয়ে যায়। মহারাজা গিরিজা নাথ মন্দিরের পুনর্গঠনের মাধ্যমে কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনলেও এর মূল আকৃতিতে পুন:প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হন। দুটি রেফারেনেÍস মাধ্যমে মন্দির নির্মাণের প্রাথমিক বিবরণ পাওয়া যায়। শিল্প ঐতিহাসিক J. Fergusson (১৯৭২) উনিশ শতকের শেষ দিকে মন্দির পরিদর্শনে যান। তিনি বলেন যে, নবরতœ মন্দির হলো কান্তনগর মন্দিরের প্রধান রূপ।

কান্তনগর হলো দিনাজপুর স্টেশন থেকে ১৮ কি.মি দূরে অবস্থিত। এই মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৭০৪ সালে এবং শেষ হয় ১৭২২ সালে। এটি হলো নয়টি টাওয়ার যুক্ত ও বর্গাকৃতির প্যাভিলিয়নযুক্ত মন্দির। মূলত কান্তনগর একটি দূর্গ মন্দির। এ মন্দিরের দূর্গের গঠন কাঠামোর সাথে যুগল কিশোর মন্দির এবং বৃন্দাবনের মদন মোহন মন্দিরের সাদৃশ্য বিদ্যমান।

J. Fergusson এর মতে, মন্দির নির্মাণে পাথর ব্যবহৃত হয়নি। এর উপরিভাগের বিভিন্ন টেরাকোটায় ১৮ শতকের প্রথম দিকের বাংলার মানুষের সামাজিক জীবন যাপনের নানা চিত্র নান্দনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। F. W. Strong ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের ১৫ বছর পরে তাঁর রচনা কর্ম প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, কান্তনগর হলো দিনাজপুর -ঠাকুরগাঁও রাস্তার পার্শ্বে অবস্থিত একটি ছোটগ্রাম। দিনাজপুরের ১৮ কি.মি দেিণ ঢেপা নদীর তীরে এর অবস্থান।

পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন সমৃদ্ধ এ মন্দিরটি প্রাচীন দূর্গের ধ্বংসাবশেষের উপর দাঁড়িয়ে আছে। বিরত রাজা ছিলেন একজন শক্তিশালী প্রাচীন শাসক। তিনি এ জায়গাটি গবাদি পশু পালনকারী রাখালদের বসবাসের জন্য নির্ধারণ করেন। এ দুর্গটি ১.৫ কি.মি ব্যাপী বি¯তৃত ছিল। দূর্গ প্রাচীরকে দুর্ভেদ্যকরনের ল্েয শক্ত পোড়ামাটির ব্যবহার করা হয়, যা প্রাচীন প্রাসাদের উপকরণ ছিল।

তবে এখানে কোন ইট বা পাথরের ব্যবহার করা হয়নি। ১৭০৪ সালে দিনাজপুরের রাজা প্রাণনাথ মন্দিরের নির্মাণ শুরু করেন। প্রাণনাথ কান্তজিউ মূর্তি (কৃষ্ণ) মন্দিরে স্থাপনের জন্য তা সংগ্রহ করেন। ভিত্তিগত দিক থেকে মন্দিরটি ছোট। মন্দিরের কাজ সম্পূর্ণরূপে সমাধা করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

জেলা কালেক্টর Mr. Hatch মন্দির নির্মাণের একশত বছর পরে সামগ্রিকভাবে তা সংরণের ব্যবস্থা করেন। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে মন্দিরটি ব্যাপক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তৎকালীন মহারাজা হিন্দু স্থাপত্যের এ অপূর্ব নিদর্শনকে বাঁচিয়ে রাখতে এর ব্যাপক পুনগর্ঠন করেন। এ মন্দিরের ভিত্তিগত গঠনের দিকে ইংগিত করে গবেষক M. M. Haque বলেছেন যে, “A square share of two storied brick structure rests on a massive plirth made of sandstone blocks.”২৪ মন্দির নির্মাণে ব্যবহৃত পাথরের ব্লকগুলি গঙ্গারামপুরের নিকটবর্তী প্রাচীন শহর বনগড়ের ধ্বংসাবশেষ থেকে সংগ্রহ করা হয়। পুরো মন্দিরের উপরিভাগ পোড়ামাটির অসংখ্য খণ্ডে উপরিতল হতে অভিপ্তিভাবে প্রতিমাদি ও অন্যান্য চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে।

উৎকৃষ্ট নির্মাণশৈলীর এ মন্দিরকে চারদিকে দূর্গ প্রাচীরের মাধ্যমে সমুজ্জিত করা হয়, যা ভূমিকম্পের সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। কতিপয় ব্যক্তি মনে করেন রাধা ও কৃষ্ণ বিভিন্নভাবে এ মন্দিরে আর্শিবাদ বয়ে আনে। বার্ষিক ধর্মীয় মেলা উপল্েয আয়োজিত রাসযাত্রায় এখানে অসংখ্য ধর্মানুরাগীর সমাবেশ ঘটে। বাংলায় বেশ কয়েকটি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মন্দির চোখে পড়ে। মধ্যযুগীয় মন্দিরসমূহের নানা প্রকার ও স্টাইল পরিলতি হয়।

বিষ্ণু, শিব এবং শক্তিকে বিভিন্ন রূপে এসব মন্দিরে স্থান দেয়া হয়েছে। এসব মন্দির থেকে জানা যায় যে, এ অঞ্চলে বৈষ্ণববাদ, শিববাদ ও শক্তিবাদের উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে। এসব মন্দিরের অধিকাংশই বিষ্ণুর প্রতি উৎসর্গিত। এ ধরণের সকল মন্দির ইটের নির্মিত এবং টেরাকোটার ফলকে সুসজ্জিত। এ সমস্ত টেরাকোটা আমাদেরকে সামাজিক জীবনাচরণ, প্রাণী, উদ্ভিদ এবং বিভিন্ন হিন্দু এপিকের ধারণা প্রদান করে।

মধ্যযুগের শেষ দিকে নির্মিত কতিপয় মন্দির আজো বহাল রয়েছে। নান্দনিক ও টেরাকোটা সমৃদ্ধ কান্তজিউ মন্দির এ সকল মন্দিরের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। অষ্টাদশ শতকের এই মন্দির কৃষ্ণ ও তাঁর স্ত্রী রুকমিনির নামে উৎসর্গ করাহয়েছে। বলা হয়ে থাকে যে, এ মন্দিরের নবরতœ স্থাপত্যিক রীতিতে “ইন্দো-ইসলামিক স্টাইলের” অপূর্ব প্রয়োগ ঘটেছে। কারণ এটি রেখা ডিজাইনের নবম কোণী রীতিতে নির্মাণ করা হয়েছে।

এ অসাধারণ মন্দির নির্মাণে বিভিন্ন রকমের মন্দির নির্মাণের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। ইট ও পাথর মন্দির নির্মাণের প্রধান উপকরণ। মন্দির নির্মাণ কার্যে ব্যবহৃত ইটগুলো গ্রাম্য শিল্পী ও কুমোরদের দ্বারা স্থানীয় কাদামাটি দিয়ে তৈরি করিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু এ মন্দিরে ব্যবহৃত পাথরের ব্যবহার বিস্ময়ের উদ্রেক করে। কেননা সূদুর অতীতে বাংলাদেশে বা উত্তরবঙ্গের কোথাও কোন প্রকার পাথর পাওয়া যেত না।

আর কৃষ্ণপাথরের েেত্র তো কথায় ছিল না। মনে করা হয় যে, এখানে ব্যবহৃত পাথর দূরের কোন অঞ্চল থেকে আমদানী করা হয়েছে। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, পশ্চিম দেশের বিদ্যাচল অথবা রাজমহল এলাকা থেকে পাথর আমদানি করা হয়। তবে রাজবংশের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, কান্তমন্দিরের নির্মাণে ব্যবহৃত বৃহৎ পাথরগুলি বিন্ধ্যাচল বা রাজমহল পাহাড় থেকে আনা হয়নি। বরং এগুলি প্রাচীন নগরী বানগড়ের ধ্বংস¯তূপত থেকে সংগ্রহ করা হয়।

এটি দিনাজপুরের রাজধানী হতে ১৬ মাইল দেিণ পুনর্ভবা নদীর তীরে অবস্থিত। মনে করা হয় যে, নৌকার মাধ্যমে এসব উপকরণ বানগড় থেকে কান্তনগরে আনা হত। এ জমকালো পিরামিড আকৃতির মন্দিরটি তিনটি ধাপে উপরে উঠে গিয়েছে এবং তিন ধাপের কোণগুলির উপরে মোট নয়টি অলংকৃত শিখর বা রতœ রয়েছে, যা দেখে মনে হয় যেন একটি উঁচু ভিত্তির উপর প্রকাণ্ড অলংকৃত রথ দাঁড়িয়ে আছে। মন্দিরের চারদিকে খোলা খিলান পথ রয়েছে যাতে যে কোন দিক থেকেই পূজারীরা ভেতরের পবিত্র স্থানে রাখা দেবমূর্তিকে দেখতে পায়। আয়তনে ৫২/০ বর্গকৃতির মন্দিরটি একটি আয়তাকার প্রাঙ্গনের (২৪০/১২০) উপর স্থাপিত।

এর চারদিকে রয়েছে পূজারীদের বসার স্থান। যা ঢেউটিন দ্বারা আচ্ছাদিত। বর্গাকার প্রধান প্রকোস্টটিকে যার প্রান্তের পরিমাণ ১০/৩ , কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ ইমরারত নির্মিত হয়েছে। ৩/৩ পাথরের ভিত্তির উপর দাঁড়ানো মন্দিরটির উচ্চতা ৫০ ফুটেরও বেশি। বাইরের দিকে উচুঁ করে তৈরি তিনটি চতুষ্কোনাকার প্রকোষ্ট এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে।

এ ধরণের নকশা কেন্দ্রীয় প্রকোষ্টটিকে শক্তিশালী করেছে। তাই উপরের বিরাট চূড়াটিকে এ প্রকোষ্টটির পে ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাকি আটটি অলংকৃত চূড়া নিচের দোতলার ছাদের আটটি কোণে সংযোজন করা হয়েছিল। নিচতলার বাঁকা কার্নিস কোণগুলিতে এসে ঝুলে আছে, এর মধ্যভাগ কিছুটা উচুঁ হওয়ায় ভিত্তি থেকে এর উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ২৫ ফুট যার দ্বিতীয় তলার উচ্চতা ১৫ ফুট এবং তৃতীয় তলার উচ্চতা ৬/৬। নিচের চারকোণের প্রত্যেকটির সঙ্গে একটি করে ছোট প্রকোষ্ঠ রয়েছে এবং এগুলি দ্বিতীয় তলার উপরে স্থাপিত কারুকার্য খচিত অষ্টাকোণাকৃতির কোণের বুরুজগুলোর ভার বহন করছে।

নিচতলার প্রার্থনা ঘরের চারদিকে মন্দিরে মোট চারটি আয়তারকার বারান্দা রয়েছে। এগুলির পরিমাণ ৩০/৮*৫/০ এবং ১৫/৬*৪/৪। ভূমি নকশা ১, ২ ও ৩ এ মন্দিরের তিনতলার ভূমি পরিকল্পনা পাওয়া যায়। গবেষক F. Fergusson (১৯৭২) দেখিয়েছেন যে, এ মন্দিরে বাংলার স্থাপত্যিক রীতি গর্ভগৃহ ও রেখা দেউল পদ্ধতির অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছে। এ মন্দিরের নিচতলার প্রত্যেক দিকের প্রবেশ পথে বহু খাঁজযুক্ত খিলান রয়েছে।

সমৃদ্ধ অলংকরণ যুক্ত দুটি ইটের স্তম্ভ দ্বারা প্রতিটি খিলানকে পৃথক করা হযেছে। নিচতলার চার প্রকোষ্টের বাইরে মোট ২১টি খিলান দরজা আছে, আর দ্বিতীয় তলার এ খিলান দরজার সংখ্যা ২৭টি। ছোট হয়ে আসা তৃতীয় তলার মাত্র তিনটি প্রবেশ দরজা এবং তিনটি জানালা রয়েছে। পশ্চিম দিকের দ্বিতীয় বারান্দার থেকে ২/৩ প্রশস্থ সংকীর্ণ সিঁড়ি পথ উপরে উঠে গেছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন এ প্রবেশ পথ এঁকে বেঁকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় উঠে গিয়েছে।

পূজারীদের চালার বাইরে প্রধান মন্দিরের প্রায় একশত গজ দূরৈ আগাছায় ছাওয়া একটি এক চূড়া বিশিষ্ট ছোট ধ্বংসাপ্রাপ্ত মন্দির রয়েছে। প্রচলিত ধারণা মতে মহারাজ প্রাণনাথ ১৭০৪ সালে এ মন্দিরটি নির্মাণ করে এখানে কৃষ্ণের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি সাময়িকভাবে বৃন্দাবন থেকে আনা হয়েছিল। নবরতœ মন্দির তৈরি সমাপ্ত হলে এ মূর্তিটি এখানে স্থানান্তর করা হয়। এটি এখন একটি পরিত্যাক্ত দেবালয়।

এ মন্দিরটি ছিল ১৬ পার্শ্ব সম্বলিত সৌধ এবং এর উচ্চতা ছিল ৪০ ফুট এবং এর দণি দিকে প্রবেশ পথে ছিল বহু খাঁজ বিশিষ্ট খিলান। কান্তজিউ মন্দিরের নির্মাণ তারিখ সম্পর্কিত তথ্যের অপ্রতুলতা পরিদৃষ্ট হয়। তবে মন্দিরটির উত্তর দেয়ালের ভিত্তি দেশে সংস্থাপিত একটি শিলালিপি থেকে এর নির্মাণ কাল সম্পর্কে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়। নির্মাণ সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট অন্য কতগুলো তথ্য এখান থেকে পাওয়া যায়। এই শিলালিপিটি বাংলা স্ক্রিপ্টে এবং সংস্কৃত ভাষায় লিখিত।

২৫ শিলালিপির ভাষ্য ছিল এ রকম “Sake vedabdhi Kala Sshiti pariganite bhumipa pran-natha prasadancatiromya Surochito nava-ratnakhya masminya karyata Rukmini Kanta tustitoya samuchito manasa Ramnathen ragma Datta Kantaya Kantasya tu nija nagare tato Sankalpo siddhya,”২৬ শিলালিপিটির শ্লোকগুলির বাংলা অর্থ দাড়ায় রাজা প্রাণনাথ অতি রমণীয় সুরচিত নবরতœঘ্য মন্দিরটির নির্মাণ আরম্ভ করেন। ১৬৭৪ শকাব্দে (১৭৫২ সালে) রাজা রামনাথ রবিসনিকান্তের সন্তাটির জন্য (তদীয়) পিতার সংকল্প সিদ্ধির নিমিত্তে কান্তর নিজ নগরে (অর্থাৎ কান্তনগরে) শ্রীকান্তের উদ্দেশ্যে এই মন্দির উৎসর্গ করেন। উল্লেখ্য যে, বেদ, অদ্ধি কাল ও িিত এই চারটি শব্দের আংকিক মান যথাক্রমে ৪, ৭, ৩ ও ১। এই অংকগুলিকে বামাগতিতে সাজিয়ে অনেকে ধারণা করেছেন যে, মন্দিরটির নির্মাণকাল ১৩৭৪ শকাব্দে বা ১৪৫২ সালে। কিন্তু ইতিহাস স্যা দেয় যে, এ ধারণা ভুল।

কারণ ১৪৫২ সালে দিনাজপুর রাজবংশের কোন অস্তিত্বই ছিল না। সপ্তদশ শতকে এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয়। তাই কালকে তিন (ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যত) না ধরে ছয় (ষঢ়ঋতু) ধরলে লিপির পাঠ দাঁড়ায় ১৬৭৪ শকাব্দ বা ১৭৫২ সাল। রাজা রামনাথ ১৭৬০ সালে মারা যান। অতএব এই মন্দির ১৭৫২ সালে সমাপ্ত হয়েছিল বলে মোটামুটি ধরা চলে।

জনশ্র“তি আছে যে, মন্দিরটির নির্মাণকাজে ৩০-৪০ বছরেরও বেশী সময় অতিবাহিত হয়। অবশ্য যে ধরনের সূক্ষ্ম কাজ এতে করা হয়েছে তাতে এত সময় লাগা অসম্ভব নয় বলেও অনেকেই মনে করেন। অবশ্য M. Martin বলেছেন যে, মন্দিরের প্রথম ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৭০৪ সালে। ১৭১৩ সালে বিল্ডিংয়ের কাজ শুরু হয় এবং ১৭২২ সাল থেকে মন্দিরের নকশাঁমূলক কাজের সূচনা হয় । কাজ সমাপ্তির কোনো তারিখ তিনি বলেননি।

অবশ্য তাঁর বিবরণ ছিল স্থানীয় লোককাহিনীর উপর নির্ভরশীল। নির্ভরযোগ্য কোন সূত্র থেকে এর সত্যতা পাওযা যায়নি। তবে M. M. Haque বলেছেন যে, রাজা প্রাণনাথের আমলে যে কোন সময়ে মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং রামনাথের আমলে সমাপ্ত হয়। ২৭ কান্তজিউ মন্দিরের মূল বিল্ডিংয়ের পাশাপাশি মন্দির কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে এর সন্নিকটে অনেক স্থাপনা চোখে পড়ে। এগুলোর মধ্যে মন্দিরের ১৫ মিটার দণি পশ্চিম দিকে একটি রেস্ট হাউস অবস্থিত ছিল, যা বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে।

বলা হয়ে থাকে যে, প্রাণনাথ অভিজাত মহিলাদের জন্য এই মনুমেন্ট নির্মাণ করেন। মূল মন্দিরের ৯০ মিটার উত্তরে একটি মন্দির ছিল, যার বর্তমানে কোন অস্তিত্ব নেই এবং সেখানে সবজির চাষ করা হয়। বর্তমান মন্দির প্রাকারের ২৭৫ মিটার উত্তরে দোল মঞ্চ নামক একটি বর্গাকৃতির স্থাপনা অবস্থিত। বাংলার হিন্দু স¤প্রদায়ের মধ্যে দোলযাত্রা উৎসব খুবই জনপ্রিয়। জনসাধারণ ফাল্গুনের পূর্ণিমা রাতে এই উৎসব পালন করে।

দণি দিকে মুখ করা ৪.৫৭ মিটার বর্গাকৃতির এ স্থাপনা মূলভূমি থেকে ১.২২ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এর দণি দিকের মাঝখানে একটি মঞ্চ দেখা যায়। তার আয়তন হচ্ছে ১.৮০*১.৬৮ মিটার। উৎসবের সময় এখানে প্রতিমা অধিষ্ঠিত করা হয়। মন্দির কমপ্লেক্সের ১৮৫ মিটার পশ্চিমে অবস্থিত রাসমঞ্চ।

এটা হলো অষ্টভূজাকৃতির উন্মুক্ত প্লাটফর্ম। এ প্লাটফর্মের উপরে ২.২৪*২.৫২ মিটারের একটি আয়তকার প্লাটফর্মে রাসযাত্রা উৎসবের সময়ে প্রতিমা স্থাপিত হয়। এই স্থাপনাটি মূল ভূমি থেকে ১.৫৫ মিটার উচুঁতে অবস্থিত। প্রতি বছরের কার্তিক মাসের পূর্ণ পূর্ণিমা রাতে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে রাসযাত্রা উৎসব পালিত হয়। এ সময় মূল মন্দিরের প্রতিমা রাসমঞ্চে স্থাপন করা হয় এবং পূজা দেয়া হয়।

এ অনুষ্ঠান উপলে বাৎসরিকভাবে এখানে ৫ দিন ব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়। ২৮ তথ্য নির্দেশনা: ২০.Fergusson. J. "History of Indian and Eastern Architecture", New Delhi: Munshilal Mwnoharlal publishers pvt. lt. 1972. vol: 11. PP. 161.উদ্ধৃত Hoque, M. M et al, Ibid. P. 50. ২১.Hoque, M. M. et.al. “Kantajee Temple An Outstanding Monument of Late Madieval Bengal”, publication Dept. of Drik, Dkaha, 2005, P. 50. ২২.Martin, M. "Eastern India", Delhi- Cosmopublication, 1976, PP. 625-629 উদ্ধৃত Hoque, M. M I et al, Ibid. P. 51. ২৩.Hoque, M. M et al, Op. Cit. P. 51. ২৪.Hoque, M. M. et al, Ibid, P. 55. ২৫.Ahmed, N. ÒEpic stories in Terrawtta Depicted on Kantanagar TempleÓ, Bangladesh, Dkaha University pross Limited, 1990, P. 21, উদ্ধৃত Hoque, M. M et al. Ibid. P. 58. ২৬.Hoque, M. M. et al. Op. Cit., P.58 ২৭.Ibid, P. 59, ২৮.Ahmed, N. Op. Cit, P. 20. উদ্ধৃত Hoque, M. M et al. Ibid. P. 59. ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.