আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বাংলাদেশের হিজড়া সম্প্রদায়

সমাজে ওরা খুব অবহেলিত, সভ্য মানুষরা ওদের বলে হিজড়া । হিজড়া শব্দটি এসেছে আরবী হিজরত বা হিজরী শব্দ থেকে যার আভিধানিক অর্থ পরিবর্তন বা Migrate বা Transfer । ট্রান্সজেন্ডার বলতে এমন এক লৈঙ্গিক অবস্থাকে বুঝায় যা দৈহিক বা জেনিটিক কারণে মেয়ে বা ছেলে কোন শ্রেণীতে পড়ে না । সায়েদাবাদ এলাকায় একটি পাঁচতলা বাড়ির মালিক আবুল হিজড়া । মানুষের কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া টাকা দিয়েই তিনি এ বাড়িটি তৈরি করেছেন ।

এ বাড়ির তৃতীয় তলার একটি রুমের দেয়ালে তিনি সাজিয়ে রেখেছেন নিজের ছোটবেলার অসংখ্য ছবি । বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় পনের হাজার, বন্দর নগরী চট্টগ্রামে অস্থায়ী ভাসমান । বসবাসকারী প্রান্তিক হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ২৫০-৩০০ জন । ভ্রুনের বিকাশকালে নিষিক্তকরন ও বিভাজনের ফলে বেশকিছু অস্বাভাবিক প্যাটার্নের সৃষ্টি হয় যেমন এক্স এক্স ওয়াই অথবা এক্স ওয়াই ওয়াই । এর ফলে বিভিন্ন গঠনের হিজড়া শিশুর জন্ম হয় ।

বাংলা অভিধানে বলা হয়েছে হিজড়া শব্দটির আগমন হয়েছে হিন্দি থেকে । সংস্কৃত ভাষায় নপুংসক শব্দটি পাওয়া যায় । প্রকৃতপক্ষে হিজড়া শব্দটি অশোভন মনে হলেও বাংলাতে হিজড়া বোঝানোর জন্য কোনও শোভন শব্দ পাওয়া যায়নি । সাধারণ অর্থে হিজড়ার অভিধানিক অর্থ বলতে আমরা বুঝি একই দেহে নারী ও পুরুষের চিহ্নযুক্ত মানুষ । যারা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম ।

হিজড়া শব্দটি মুলত পুরুষ বাচক । যার স্ত্রী বাচক শব্দ হিজড়ানি হতে পারে । তবে হিজড়ার স্ত্রী বাচক শব্দটি একেবারেই কাল্পনিক । শারীরিক ও মানসিক গঠনের উপর নির্ভর করে এদেরকে ৬ ভাগে ভাগ করা যায় । শারীরিক ভাবে পুরুষ কিন্তু মানষিক ভাবে নারী বৈশীষ্ট্য এর অধীকারী হিজড়াদের বলা হয় অকুয়া ।

পুরান ঢাকার হিজড়াদের গুরু দিপালী। তিনি নিজেও প্রতারণার শিকার হয়ে হিজড়ায় পরিণত হয়েছেন । দিপালী হিজড়া সমকালকে বলেন, ৯-১০ বছর বয়সে তাকে কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে অপহরণ করা হয় । কয়েকদিন পর মনু (হিজড়াদের গুরু মা হিসেবে পরিচিত) নামে এক হিজড়া নেতা তাকে ভারতের একটি হাসপাতালে অপারেশনের মাধ্যমে হিজড়ায় পরিণত করে । চট্টগ্রামে হিজড়াদের মধ্যে নেতৃস্থানে যারা রয়েছে তাদের মধ্যে গুরু মধুমালা, সীতা, গীতা, নাসু, শাবনূর, লিমা, রীনা, রঙিলা, রত্মা, নার্গিস কবিতা, শোভা উল্লেখযোগ্য ।

হিজড়ারা সাধারণ মানুষের কটূক্তি থেকে রেহাই পেতে সবাই দলবদ্ধভাবে বসবাস করে । চট্টগ্রামে, ঝাউতলা, হালিশহর, নীমতলা, নিউমার্কেট, স্টেশন রোড, পাহাড়তলী বন্দরটিলা এলাকায় তাদের বসবাস । বাংলাদেশে বেশিরভাগ হিজড়ারাই সালোয়ার কামিজ বা শাড়ি পরে থাকতে পছন্দ করে এবং গহনাও পরে থাকে । অনেকে পরচুলা ব্যবহার করে এবং আবার পুরুষের পোশাকও পরে ঘুরে বেড়ায় । পুরাণে পাওয়া গেছে হার্মেস ও আফ্রোদিতি দম্পতির সুদর্শন পুত্র হার্মাফ্রোদিতাসের প্রেমে পড়ে ঝরণার উপদেবী ।

উপদেবী দেবতাদের কাছে প্রর্থনা করে , সে যেন চিরতরে হার্মাফ্রোদিতাসের সঙ্গে একীভূত হতে পারে । দেবতারা তার প্রার্থনা মঞ্জুর করেন । এর ফলে দুজনের সংমিশ্রনে তৈরি হয় একজন অর্ধপুরুষ ও অর্ধনারী বিশিষ্ট মানুষ । ইংরেজিতে হিজড়ার প্রতিশব্দ হিসেবে ইউনাক শব্দটি ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ নপুংসক বা খোজা । পৃথিবীতে কখন থেকে হিজড়াদের আবির্ভাব হয়েছে তা সঠিক জানা যায়নি।

তবে নৃতত্ত্ববিদদের মতে, যখন থেকে পৃথিবীতে মানব জাতির আবির্ভাব তখন থেকেই হিজড়ার আবির্ভাব । হিজড়া হওয়ার কারণে তাদের কে কেউ চাকরিতে নেয় না, কেউ ঘরভাড়া দিতে আগ্রহী হয় না । ভোটার তালিকায় তারা কেউ ছেলে বা মেয়ে হিসেবে ভোটার হয়েছেন । চলমান জন্মনিবন্ধন কার্যক্রমেও তাদের হিজড়া হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার সুযোগ নেই । চরম অভাব অনটনে তারা দিনাতিপাত করছে ।

হিজড়া বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মানো কোন শিশুর যদি পরিনত বয়সে যাওয়ার আগে চিকিৎসা করা হয় তাহলে বেশীভাগ ক্ষেত্রেই তাকে সুস্থ করা সম্ভব । আমাদের দেশের ন্যায় বৈষম্যমূলক হিজড়া সমাজ ব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোন দেশে নেই । অন্যান্য দেশের হিজড়ারা তাদের পরিবারের সঙ্গেই বসবাস করেন। ফাইট ফর ওমেন রাইটস এর সভানেত্রী অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন হিজড়াদের অধিকার রক্ষায় এখনও প্রতিষ্ঠা পায়নি উল্লেখযোগ্য কোন আইনি সহায়তা কেন্দ্র । শারীরিক সমস্যার কারণে সবাই তাদেরকে উত্যক্ত করে হিংসাত্মক করে তুলছে ।

হিজড়া হতে কখনো হিজড়া জন্মগ্রহণ করতে পারে না । আমাদের যে কারো পরিবারেই হিজড়া সন্তান জন্মগ্রহণ করতে পারে । তারা কাজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় বলে অনেকেই দোকানে দোকানে টাকা চাঁদা নিয়ে জীবন-যাপন করের আবার অনেকেই বাঁচার জন্য যৌন কাজের সঙ্গে লিপ্ত হয় । তবে যদি ওদের কাজের সুযোগ দেয়া হয় তারা তাদের অনেকেই যৌন পেশা থেকে ফেরত আসবে বলেছে । বর্তমানে রমনা পার্কে, কুড়িল বাড্ডা, পুরান ঢাকা, খিলগাঁও মার্কেটের পেছনে ভূঁইয়াপাড়াসহ অনেক এলাকাতেই হিজড়া সম্প্রদায়ের সংঘবদ্ধভাবে বসবাস ।

বাংলাদেশে এক লাখেরও বেশি হিজড়া আছে । একজন হিজড়ার কাছে তার রক্তের সম্পর্ক বড় নয় । তার কাছে গুরুই সব । দলে ভিড়ে সে গ্রহণ করে বয়স্ক হিজড়ার শিষ্যত্ব । তাকে শ্রদ্ধা করে গুরু বলে ।

কারণ দলভুক্ত হয়ে থাকতে হলে তাকে গুরুর শিষ্য হতেই হবে । হিজড়াদের নিয়ে কাজ করছে কয়েকটি সংগঠন । এর মধ্যে রয়েছে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, সুস্থ জীবন, বাঁধন হিজড়া সংঘ, লাইট হাউস, দিনের আলো ইত্যাদি সংগঠন । সত্য একটা ঘটনাঃ অমলা ছিল ভারতের একজন । সে হিজড়া হলেও ছিল অপূর্ব সুন্দরী স্বাভাবিকভাবে তাকে কেউ বুঝতে পারত না এবং সে স্বাভাবিক ভাবেই চলাফেরা করতে পারত ।

এভাবেই একদিন সে গ্রামের একটি বিয়েতে যায় সেখানে তাকে দেখে গ্রমের এক যুবক যার নাম কার্তিক । সে তাকে পরবর্তীতে বিয়ে করতে চায় কিন্তু অমলা তার সমস্যার জন্য কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না । তবে কার্তিকও নাছোড়বান্দা পিছু হটবার পাত্র সে নয় । শেষ পর্যন্ত আর কোন উপায় না দেখে অসলা এ ব্যাপারটি তাকে জানায় । সে জানার পরও তাকে বিয়ের ব্যাপারে পিছু হটে না তার যুক্তি শারীরিক এর চাইতে মনের ভালবাসা অনেক বড় তাই সে তাকে বিযে করবেই ।

এরপর অমলার পরিবারের সহযোগীতায় বিয়ে হয় কিন্তু কার্তিক সমাজ ও তার পরিবার থেকে বিতাড়িত হয় । তাদের বিযের পর বেশকিছুদিন গেলে কার্তিক একদিন পত্রিকা দেখে জানতে পারে এরকম একটি শিশু চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়েছে এটা জানতে পেরে সে অমলাকেও সেখানে নিযে যেতে চায় । অমলা যেতে না চাইলও কার্তিকের জোরাজুরিতে সে হার মানে । সেই ডাক্তার অমলাকে দেখে জানায় এই বয়সে এটা চিকিৎসার মাধ্যমে সফল হওয়া অসম্ভব । কিন্তু কার্তিক এর আবেগ এর কাছে হার মেনে ডাক্তার তার সমস্যাটি দেখে এবং দেখার পর ডাক্তার অমলার অপারেশনের উদ্দ্যেগ নেয় ।

অস্ত্রোপচার এর পর অমলা একজন সম্পূর্ণ নারীতে পরিনত হয় এবং পরবর্তীতে সে সন্তানের জন্মও দেয় । এ ব্যাপারে সেই ডাক্তারের অভিমত আসলে অমলার ব্যাপারটি তিনি কার্তিকের অনুরোধে দেখেন এবং দেখার পরই সে খেয়াল করে আসলে অমলার ত্রুটিটি খুবই সামান্য এবং তার মধ্য নারী বৈশিষ্ট্য প্রকট ভাবে বিদ্যমান তাই সে অস্ত্রোপচার করেন। তবে কার্তিক মনে করেন তার ভালবাসার্ জন্যই সৃষ্টিকর্তা তাকে পুরস্কৃত করেছেন । কথিত আছে যখন কারো হিজড়ে বাচ্চা হয় তখন তা যদি হিজড়েরা জানতে পারে তবে তারা ওৎ পেতে থাকে তাকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর জন্ । একসময় ঠিকই তাকে হিজড়াদের দলে নিযে যায় ।

আরো একটা কথা প্রচলিত আছে যদি না নিতে পারে তাহলে তারা দলবদ্ধভাবে এসে হাতেতালি বাজাতে থাকে যা তারা সবসময়ই বাজায় আর এ হাতেতালিতে নাকি কি এক অমোঘ আকর্ষন আছে যা শুনে অন্য হিজড়ারা আর ঠিক থাকতে পারেনা সেও এসে তাদের এই হাতেতালিতে যোগ দেয় যদিও এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নাই । (দক্ষিণ এশিয়া) হিজড়ারা বেশীর ভাগ মুসলিম হলেও তারা হিন্দুদের এই পুজাটি করে যার মাধ্যমে তারা ভগবানের সাথে নিজের বিযে দেয় এরপর সারাদিন তারা সংসার সংসার খেলে । আমেরিকাতে জর্জ নামে একটি ছেলের জন্মের ১৫ মাস পর থেকেই শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল এবং ধীরে ধীরে সে বালক থেকে বালিকা হয়ে গেল । পরিবার থেকে সবাই তাকে বোঝাল যে, তার পুরুষাঙ্গটা সৃষ্টিকর্তার একটা ভুল ছিল তাই সে ভুলটাকে শুদ্ধ করে তাকে পুনরায় নারী বানিয়ে দিয়েছে এতে লজ্জা বা দু:খ পাওয়ার কিছু নেই । জর্জের জন্য চিকিৎসা এমনকি অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল ।

সে এখন নাম পাল্টেছে, পোশাক পাল্টেছে, এখন পুরোপুরি একজন নারী । আমাদের দেশেও চিকিৎসার সুযোগ পেলে অনেকেই নারী বা পুরুষ হিসেবে জীবন-যাপন করতে পারত । হিজড়াদের জীবনেও সাধারণ মানুষের মত প্রেম-ভালোবাসার ব্যাপারগুলো আসে । এর পরিনতি হিসাবে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় । একই লিঙ্গের দু’জন অথচ ঘর বাঁধার স্বপ্ন ।

আবার অনেকেই নিজের গণ্ডির বাইরে অন্য পুরুষের সঙ্গে সর্ম্পক গড়ে । তবে সে বিয়ে বেশি দিন টিকে থাকে না । হিজড়া হওয়ার কারণ সম্পর্কে নানা কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে । কেউ এটাকে সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ বলে, কেউ বলে পিতামাতার দোষ কিংবা প্রকৃতির খেয়াল । কিন' আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে মাতৃগর্ভে একটি শিশুর পূর্ণতা পেতে ২৮০ দিন সময়ের প্রয়োজন ।

এক্স এক্স প্যাটার্ন ডিম্বাণু বর্ধিত হয়ে জন্ম দেয় নারী শিশুর । আর এক্স-ওয়াই প্যাটার্ন জন্ম দেয় পুরুষ শিশুর। ভ্রূণের পূর্ণতা প্রাপ্তির একটি স্তরে ক্রোমোজম প্যাটার্নের প্রভাবে পুরুষ শিশুর মধ্যে অন্ডকোষ এবং মেয়ে শিশুর মধ্যে ডিম্বকোষ জন্ম নেয় । মূলত তারা তাদের এলাকার বিভিন্ন দোকান পাট আর বাজারে গিয়ে টাকা তোলে এই অর্থকে তারা তোলা বলে এছাড়াও কোন নবজাতকের জন্ম হলে সেখানে গিয়ে নাচ-গান করে চাঁদা তোলে তারা। তারা তাদের জমাকৃত সকল টাকা তাদের গুরুর কাছে দিয়ে দেয় এরপর গুরু যা দেয় তা থেকে প্রসাধনী কেনে আর ব্যাংকে জমা রাখে ।

তাদের খাবারের বন্দোবস্ত তাদের গুরুই করে । আমাদের দেশে একটা হিজড়া বলেছিল, ‘আমি শার্টের নিচে ব্রা পরে স্কুলে গিয়েছিলাম বলে স্যার প্রচণ্ড মেরেছিল । তারপর থেকে আর স্কুলেই যাই না। ’ হিন্দু ধর্মে হিজড়া সম্প্রদায়কে বিশেষ এক ধরনের কাস্ট হিসেবে ধরা হয় । তামিলনাড়ুতে এপ্রিল-মে মাসের দিকে হিজড়ারা দিনব্যাপী ধর্মীয় উৎসব পালন করে ।

ভারতে এবং বিভিন্ন দেশে এদের লোভী বয় বলা হয় । কোনকালেই কোন দেশেই হিজড়াদের কোন সম্মান কেউ দেয়নি । বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবেই স্পষ্ট বলছে­ ‘সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্খিতিজনিত আওত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য লাভের অধিকার । ’ মুঘল শাসকদের কাছে হিজড়ারা ছিল অত্যন্ত বিশ্বস্ত ভৃত্য । হিজড়ারা অদ্বিতীয় যৌনসত্তার জন্য অবাধে পুরুষ ও মহিলা মহলে যাতায়াত করতে পারত ।

এ কারনে মুঘল সম্রাটদের হেরেমের সবচেয়ে মুল্যবান নারীদের পাহারা দেয়া এবং তাদের ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করত বিশ্বস্ততার সঙ্গে । এরা এতই বিশ্বস্ত ছিল যে সম্রাটের অনেক গোপন দায়িত্ব পালন, এমনকি সন্তান প্রসবের সময় সম্রাট ছাড়া শুধু হিজড়াদেরই প্রবেশাধিকার ছিল । বেইমানি এরা কখনোই করতা না । কারও প্রতি বিশ্বাস জমে গেলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা বজায় রাখত । তাই মুঘলদের সময়ে এরা ছিল সবচেয়ে নিরাপদ কর্মী ।

ঢাকাতে হিজড়ারা মূলত পাঁচটি দলে বিভক্ত এক দলের হিজড়ারা অন্য দলের এলাকায় গিযে তোলা তুলতে পারবে না । তাদের এই পাঁচটি দলের প্রত্যেকটিতে আছে একজন করে গুরু । এসব এলাকা আর তাদের গুরু হচ্ছে । ১. শ্যামপুর, ডেমড়া ও ফতুল্লা, গুরু- লায়লা হিজড়া । ২. শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গুরু- হামিদা হিজড়া ।

৩. সাভার, ধামরাই, গুরু- মনু হিজড়া । ৪. নয়াবাজার ও কোতোয়ালী, গুরু- সাধু হিজড়া । ৫. পুরোনো ঢাকা,গুরু- দিপালী হিজড়া । হিজড়ারা অনেকেই মুসলিম হলেও তারা অনেক হিন্দু রীতি নীতিতে বিশ্বাষ করে । তাই তাদের যদিও কবর দেয়া হয় কিন্তু তারা মনে করে তাদের আবার পূণঃজনম হবে ।

প্রত্যেক হিজড়াকে কবর দেয়া হয় তারা যে বিছানায় থাকে তার নিচে এটাই তাদের রীতি (তবে বর্তমানে স্থান সংকুলানের জন্য তাদের অন্যত্রও কবর দেয়া হয়) । কিন্তু তাদের কবর দেয়ার নিয়মটি খুব অদ্ভুত তাদের কবরে প্রথমে ঢালা হয় লবন তারপর লাশ তারপর দেয়া হয় ফুল তারপর আবার লবন । এটার মূল কারন হল তাদের বিশ্বাষ এভাবে কবর দিলে তাদের আগের সকল পাপ ধুয়ে পরবর্তী জনমে তারা পূর্ণ নারী বা পুরূষ হিসেবে জন্ম গ্রহন করতে পারবে । ভারত থেকে অনুপ্রবেশকারী শতাধিক হিজড়া সদস্য ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারায় ইন্ধন জোগাচ্ছে এবং তারাও সরাসরি হামলায় অংশ নিচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে । ১২ জন হিজড়াকে দেওয়া হয়েছে বিউটি কেয়ার প্রশিক্ষণ ।

আর তা দেওয়া হয়েছে পারসোনার তত্ত্বাবধানে । তাঁরা এখানে কাজ শিখে বিভিন্ন বিউটি পার্লারে নিজেদের কর্মসংস্থান করে নিয়েছেন । হিজড়াদের রয়েছে নিজস্ব বিচার ব্যাবস্থা। বিচারকার্য সম্পাদন করেন গুরুমা । শাস্তি হিসেবে বেতের বাড়ি এবং আর্থিক জরিমানা করা হয় ।

যে আর্থিক জরিমানা প্রাপ্ত হয় তাকে একা এলাকা থেকে টাকা তুলে জরিমানার টাকা প্রদান করতে হয় । বাংলাদেশের হিজড়াদের উচ্চ বিচারালয় সাভারে । বছরে একবার এদের সমাজের অভ্যন্তরীন বড় ধরনের বিচার এখানে সম্পন্ন হয় । সব ধরনের অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি আর্থিক জরিমানা । হিজড়ারা যুগ যুগ ধরে তাদের এই বিচার ব্যাবস্থা মেনে আসছে পরম আস্থায় ।

হিজড়ারা বাংলায় কথা বলতে পারলেও তারা অপরিচিতদের সামনে গোপন কথা সংকেতের মাধ্যমে আদান প্রদান করে । হিজড়াদের সম্মুখিন হননি এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে । তারা নানা ভাবে আমাদের সামনে উপস্থিত হয় । নেচে গেয়ে কৌতুক করে আমাদের করুনা কামনা করে । আমরা বেশির ভাগ স্বাভাবিক মানুষরা কৌতুহলী হয়ে ওঠি, ঠাট্টা মশকরা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করি তাদের নিয়ে ।

কবার চিন্তা করে দেখুন এই পৃথিবীতে ওরা জোর করে আসেনি । দুইজন মানব মানবীর চূড়ান্ত ভালোবাসার ফসল ওরা । যারা ওদের পৃথিবীতে এনেছিলো তারাই ওদের স্থান দেয়নি । কতটা দুঃখ কষ্ট আর বঞ্চনা সহ্য করে ওরা হাতে তালি দিয়ে যাচ্ছে, হয়তো আমাদের মানবতাবোধকে পরিহাস করে । আসুন ওদের মানুষ ভাবি, ওদের দুঃখ কষ্টগুলো লাঘব করার চেষ্টা করি, এ পৃথিবী থেকে ওদের পাওনা বুঝিয়ে দেই ।

রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করেছিলেন বাল্মীকি তাঁর রামায়ণে ঊর্মিলা সম্পর্কে বিশেষ কিছু লেখেননি বলে । ঊর্মিলা ছিলেন রামের অনুজ লক্ষ্মণের স্ত্রী । কবি ও সাহিত্যিকদের কলমে আরেক উপেক্ষিত হচ্ছে হিজড়া সম্প্রদায় । হিজড়াদের একটা বড় অংশ পতিতাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত । এরা সস্তা দামের পারফিউম দিয়ে দিনে রাতে পার্কে কিংবা জনবহুল জায়গাগুলোতে খদ্দেরের আশায় ঘুরে বেড়ায় ।

সামান্য কয়েক টাকার জন্য বিকৃত রুচির কিছু পুরুষের কয়েক মুহূর্তের শয্যাসঙ্গী হয় । ফলে এরা এইচআইভি/এইডস ঝুঁকিপূর্ণ । এদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং এইচআইভি ভাইরাস যাতে না ছড়ায় এ বিষয়ে সচেতন করতে কয়েকটি সংগঠন কাজে করছে। ওরা এখন অনেক সচেতন । ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.