আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

হতাশা নয়, চাই মেধাবী মননের বিকিরণ

হতাশা নয়, চাই মেধাবী মননের বিকিরণ ফকির ইলিয়াস ======================================== চরম সংকটের মুখে দেশ। প্রজন্ম ভীষণ হতাশ। পরপর তিনদিনের হরতাল। পরীক্ষা পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। না, রাজনীতিকদের কোনো দরদ নেই।

থাকলে তারা এমনটি করতে পারতেন না। ব্যবসায়ীরা মিটিং করে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। এরপর কী হবে, তা নিয়ে সবাই শঙ্কিত। কবি শামসুর রাহমান বলতেন, এই আঁধার কেটে যাবে। তখন বাংলাদেশে স্বৈরশাসক এরশাদের শাসন।

এরশাদকে কিভাবে নামানো যাবে, তা নিয়ে দেশের মানুষ খুব শঙ্কিত ছিলেন। এরশাদ থাকতে পারেননি। আমিও বিশ্বাস করি, এইপ্রজন্ম ঘুরে দাঁড়াবে। এরা শিক্ষিত হয়ে সকল অসত্যের বিরুদ্ধে সম্মিলিত কাফেলা নিয়ে এগিয়ে যাবে। আমরা দেখছি, ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার সিলেবাসে বিবর্তন এসেছে।

বদলেছে পাঠের বিষয়-আশয়। এটা ভালো লক্ষণ। হ্যাঁ, পঠনের ধারা, পেশার বিবর্তন দেশকে, মানুষকে, সমাজকে বদলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে এখন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি টেকনিক একটি বহুল আলোচিত পাঠ্য বিষয়। বিশ্বে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

তাই এক্সপার্টরা ব্যস্ত, তা প্রতিরোধের নানা কৌশল নির্মাণে। তা নিয়ে লেখা হচ্ছে বই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা শ্লট খুলেছে। অনেকে লেখাপড়া করছে ‘ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্ট’ নিয়ে। হ্যাঁ, তা-ও এখন বিশ্বে একটি লাভজনক ব্যবসা কিংবা চাকরি।

এমন উদাহরণ অনেক দেয়া যাবে। আমাদের সমাজে আমরা দেখি কিছু কিছু পেশা এবং তা থেকে পেশাজীবীর পদবিটিও একটি বিশেষ ভাবমূর্তি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তা শুধু একটি নির্দিষ্ট পেশা বা কাজ হিসেবে নয়, ঐ কাজের সঙ্গে কিছু বিশিষ্ট গুণাবলীর ধারক হিসেবেও। যেমন ‘শিক্ষক’ শব্দটির সঙ্গে সততা, সামাজিক নেতৃত্ব, একইভাবে ‘চিকিৎসক’ শব্দটির সঙ্গে সেবা, মহত্ত্ব এসব গুণাবলী যুক্ত হয়েই ঐসব শব্দ ও পেশায় এক একটি বিশেষ ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল। বাঙালির সমাজ ব্যবস্থায় এক সময় ‘শিক্ষক’ পেশাটি ছিল অত্যন্ত সম্মানীয়।

‘চিকিৎসক’ পেশাটির কথা উঠলেই একজন সেবকের মুখ আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠতো খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে। বর্তমানে সেই ধ্যান-ধারণার বিয়োগাত্মক পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ এই চলমান সময়ে ‘শিক্ষক’ কিংবা ‘চিকিৎসক’ পেশাজীবীদের আর আগের মতো শ্রদ্ধার চোখে দেখতে দ্বিধাবোধ করেন। এর কারণ কী? কারণ হচ্ছে, এই পেশা দুটিকে কিছু মানুষ খুবই ঘৃণ্য পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন। শিক্ষকের যে জ্ঞান-গরিমা থাকার কথা ছিল, তা ধারণ না করে এক-একজন শিক্ষক পরিচিত হচ্ছেন এক-একজন বিদ্যাবিক্রেতা হিসেবে।

বাংলাদেশে কোচিং ব্যবসা এখন রমরমা। আবার অনেকে প্রতারণাও করছে। বাংলাদেশ সরকার কোচিং সেন্টারগুলোর ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চেয়েও পারেনি। কারণ অনেক রাঘব-বোয়াল এর নেপথ্যে। যে সব কোচিং সেন্টার প্রতারণা করে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবকদের ঠকিয়েছে কিংবা এখনো ঠকাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত সরকারের।

প্রাইভেট চিকিৎসা ক্লিনিকগুলোর ব্যাপারেও নানা কথা আমরা কাগজে পড়ি। অব্যবস্থা , মুনাফাখোরি পরাজিত করছে মানবতাকে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে এই রেওয়াজ চালু আছে, রোগী যেই হোক তাকে জরুরি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দিতেই হবে। চিকিৎসার বিল কে দেবে তা প্রাথমিকভাবে বিবেচ্য বিষয় কখনই হয়নি। অথচ বাংলাদেশে আমরা দেখি মুমূর্ষু রোগী সামনে রেখে দরদাম হাঁকছেন চিকিৎসক।

শিক্ষা, চিকিৎসা ক্ষেত্রে দুর্নীতি সমাজের মেরুদ-ই ভেঙে দেয়। মানুষ স্বপ্নপূরণের সিঁড়ি হিসেবে বিভিন্ন সৃজনশীল পেশাকে বেছে নেয়। সমাজ লজ্জা পায়, যখন দেখা যায় তেমনি সৃজনশীল কোনো পেশাকে ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ হাসিলে কেউ ব্যবহার করছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে ‘সাংবাদিকতা’ পেশাটিকে একটি মননশীল রূপ দিতে অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু অন্যদিকে এই পেশাকে হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার কাজেও ব্যবহার করেছেন কেউ কেউ।

সামরিক জান্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাড়ি-গাড়িসহ নানা সুবিধা নেয়ার পাশাপাশি রাজনীতিকদের খাস আনুকূল্যও নিয়েছেন কেউ কেউ। ভাবতে অবাক লাগে ধস নামা ‘হাওয়া ভবনের’ ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত সাংবাদিক, সম্পাদকরা এখন দুর্নীতিবিরোধী সেজে নানা নসিহত শুনাচ্ছেন বাংলাদেশের মানুষকে। এখন তাদের লেখালেখি, রিপোর্ট দেখলে বুঝার কোনো উপায় নেই এক সময় তারা রাজ সম্পাদক (রাজ্যের পোষ্য সম্পাদক) ছিলেন। তাদের চরিত্র জলের মতো। যে পাত্রে রাখা হয় সেই রঙ ধারণ করে।

এরা আওয়ামী লীগের শাসনামলে সেই একই তরিকা বজায় রেখে চলেছেন। বিএনপির আমলে জাতীয়তাবাদী তরিকা গ্রহণ করে ‘রাষ্ট্রের কল্যাণে’ নিজেদের ব্রত রেখেছিলেন! মহামহিম এডওয়ার্ড সাঈদ তার এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, পেশাজীবীদের সৃজনশীল এবং সৎ ধ্যান-ধারণাই পারে সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটাতে। সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ববান মানুষ হচ্ছেন সমাজের আইকন। এদেরকে সমাজের ভিতও বলা হয়। যে সমাজে এই ভিত যতো বেশি গভীরে, সে সমাজই ততো শক্তিশালী।

বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চা এবং জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে তৃণমূল পর্যায়ে সৎ মানুষের বেষ্টনী নির্মাণ সে জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। মনে রাখতে হবে, যে ছাত্র বিদ্যা বিক্রেতা শিক্ষকের সাহচর্য পায়, সে কখনই নিজেকে মহানুভবতার আলোয় আলোকিত করতে পারে না। কারণ তার জ্ঞানসীমা হয়ে পড়ে খুবই সীমিত। এখানে ভারতের একটি উদাহরণ টানা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের আইটি, প্রযুক্তি, কারিগরি ফিল্ডে ভারতীয় তরুণদের পদচারণা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থলিংক, ডেল কম্পিউটার, এটি এন্ড টি, ক্যাপিটাল ওয়ানসহ অনেক বহুজাতিক কোম্পানি শোরুম, অফিস খুলেছে ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে। টল ফ্রি নম্বরে নিউইয়র্কে বসে ফোন করলে, অপারেটর জবাব দিচ্ছে ভারত, ফিলিপিন কিংবা থাইল্যান্ড থেকে। এই যে ব্যবসায়িক মননের বিবর্তন তা সম্ভব হয়েছে রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছার কারণে। গড়ে উঠেছে সৎ পেশাজীবী কর্মশক্তি। একটি প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সততার কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের অতি নিকট-প্রতিবেশী ভারত যা পারছে, বাংলাদেশ তা পারবে না কেন? তবে প্রথম কাজটি হচ্ছে সুবিধাবাদী পেশাদারদের দমন করা। প্রতিটি অগ্রসরমান সমাজের শেষ ভরসা থাকে তার তরুণ সমাজ। এরাই নানারকম উৎপাদনশীল, ক্রিয়েটিভ চেতনাকে লালন করে বিবর্তন সাধন করে। তারা বিশ্বের সমসাময়িক উত্থানের সঙ্গে নিজেদের মিশিয়ে দেয় সফল আঙ্গিকেই। বাংলাদেশে যারা ডিজিটাল অগ্রগতির প্রবক্তা, তাদের পেশার নান্দনিক বিবর্তনের প্রতি আরো দায়িত্বশীল, মনযোগী হওয়া দরকার।

রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে কোনো সমাজই এগিয়ে যেতে পারে না। কিন্তু সেই পৃষ্ঠপোষকতা কি এই প্রজন্ম পাচ্ছে? না, ঠিকমতো পাচ্ছে না। শুধু ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বললেই তো হবে না, সাইবার ক্রাইম রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নিতে হবে। আমার প্রত্যাশা, এই সমাজের আলোকিত প্রজন্মরা একদিন সকল রাজনৈতিক উৎপীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে। পলিটিক্যাল ক্রাইমের স্বরূপ তারা উন্মোচন করতে এগিয়ে আসবে সাহস নিয়ে।

মানুষের গণজাগরণ ছাড়া এই আঁধার কাটিয়ে ওঠা হয়তো যাবে না। সেই গণজাগরণ কে কার পক্ষে নিতে পারবেন তা মহাকালই বলে দেবে। ২৬ এপ্রিল ২০১২ ----------------------------------------------------------------- দৈনিক ভোরের কাগজ/ ঢাকা/ ২৮ এপ্রিল ২০১২ শনিবার ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।