আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

টেরোরিজম- কেন এই মিথ্যার বেসাতি!

টেরোরিজম- পশ্চিমা মিডিয়ার কল্যাণে বহুল উচ্চারিত একটি শব্দ। ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লব [১] এর মাধ্যমে শব্দটি ইউরোপিয়ান ভাষায় স্থান করে নেয়। একাডেমী ফ্রানিসে (Académie Française) ১৭৯৮ সালে ‘টেরোরিজম’কে সর্বপ্রথমে সংজ্ঞায়িত করা হয় “সন্ত্রাসের পদ্ধতি বা আইন (system or rule of terror)” হিসাবে। ফরাসী বিপ্লবের ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ এর সময় বামপন্থী মৌলবাদী ‘জেকোবিয়ান’দের [২] সন্ত্রাসকে বুঝাতে ‘টেরোরিজম’ শব্দটি ব্যবহার করা হতো। এরপর ১৮৭৮ থেকে ১৮৮১ সালের দিকে রাশিয়ান একটি ছোট বিপ্লবী গ্রুপ “Narodnaya Volya” (জনগণের ইচ্ছা) ‘টেররিস্ট’ শব্দটিকে গর্বের সাথে ব্যবহার করত।

অত্যাচারী শাসকদের হত্যা করাকে তারা ন্যায্য মনে করত। ১৩ই মার্চ ১৮৮১ সালে তারা সিজার আলেকজান্ডার-২ কে হত্যা করতেও সক্ষম হয়। ১৯১৮ সালে সমাজতান্ত্রিক বলশেভিক বিপ্লবীদের [৩] টেরোরিজমে খুন হয় সিজার-২ ও তার পুরো পরিবার, যার মধ্যে তার বউ, চৌদ্দ বছরের ছেলে ও চার কন্যা আছে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শব্দটি তার সংজ্ঞা পাল্টাতে থাকে। আর তা শুধু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর একটা মোক্ষম অস্ত্র হয়ে যায় এই ‘টেরোরিজম’। যেমনঃ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের চোখে ভারতীয় মুক্তিকামীরা ছিল ‘টেররিস্ট’। সত্তরের দশক থেকে নিজের ভুমি থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনীদের প্রতিবাদকেও লেবেল দেয়া হয় ‘টেররিস্ট’ কাজ বলে। অবশ্য ফিলিস্তিনিরাই জাহাজ ও বিমান ছিনতাই করে টেরোরিজমকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। রাশিয়ান দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইকারী আফগান মুজাহিদরা (পশ্চিমা পুঁজিবাদি দেশগুলো সে’নামেই ডাকত) রাশিয়ানদের কাছে ‘টেররিস্ট’।

সেই মুজাহিদরাই (!) যখন পশ্চিমা পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে তখন তাদেরকেই আবার বলা হয় ‘টেররিস্ট’! ১৯৮৭-৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দক্ষিণ আফ্রিকার দখলদার ‘সাদা’দের বিরুদ্ধে কালোমানুষদের মুক্তিকামীদের সংগঠন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি)কে লেবেল দেয় ‘টেরোরিস্ট’ সংগঠন হিসাবে! এর পরের ইতিহাস সন্ত্রাস আর মুসলিম, একে অপরের পরিপূরক, মিডিয়াতে সেভাবেই দেখানো হচ্ছে। বেশীদিন হয়নি (২২শে জুলাই) নরওয়ের একটি ছোট শহর আততায়ী দ্বারা রক্তে রঞ্জিত হয়, মারা পড়ে ৯১ জন মানুষ। আততায়ী ব্রেভিক একজন গোড়া ডানপন্থী, মুসলিমবিদ্বেষী, প্রো-ইজরায়েলী ও কট্টরপন্থী খৃষ্টান। পশ্চিমের মিডিয়ার অনেকেরই যেন কামান তাক করাই আছে। ঘটনা যাই ঘটুক সন্ত্রাসবাদ ঘটবে আর মুসলিমদের নাম আগে আসবে না তা যেন ভাবাই যায় না।

ঘটনার পরপরই যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বিক্রিত রুপার্ট মারডক এর বৃটিশ পত্রিকা ‘সান’ এর প্রথম পাতার হেডলাইনঃ “আল কায়েদার হত্যাযজ্ঞঃ নরওয়ের ৯/১১ (Al-Qaeda’ Massacre: Norway’s 9/11)”। [৪] সাথে মিডিয়ার কারসাজিও যেন উন্মুক্ত হয়। এএমসি মিডিয়া প্রিন্সিপ্যাল এন্থনি ম্যাক্লিল্যান এইসব মিডিয়ার সন্ত্রাস সম্পর্কে বলেছেনঃ “লক্ষ্যণীয়ভাবে অনেক ট্যাবলয়েড ও ট্যাবলয়েড সাইট এই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও উগ্রতাকে মুসলিম সন্ত্রাস হিসাবে দেখতে চায়”। মিডিয়ার এই সংজ্ঞা শুধু সান এর মত কিছু পত্রিকাই না এর সাথে জড়িত বিবিসি সহ আরো নামী-দামী অনেক পত্রিকাও। মারডকের ওয়াল স্ট্রীট জার্নালও প্রথম দিকে একে মুসলিমদের কাজ বলে বর্ণনা করেঃ “সত্যিকার পশ্চিমা মূল্যবোধ ধারণ করার কারণে নরওয়ে হামলার লক্ষ্যবস্তু।

” কিন্তু যখনই জানা গেল যে নরওয়ের এই গণহত্যা মুসলিমদের কাজ নয় উলটো মুসলিমবিদ্বেষীর কাজ, ঐসব মিডিয়ার ভাষ্যে ‘টেরোরিজম’ শব্দটি যেন কচিৎ উচ্চারিত হতে থাকে। ‘টেরোরিজম’ নিয়ে এই খেলা নতুন নয়। একে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে মুসলিমদের সাথে জড়ানো একটা ফ্যাশন, আর তা কিছু হেটমুগারদের অন্যতম অবলমম্বন। কিন্তু পরিসংখ্যান বলে ভিন্ন কথা! ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সন্ত্রাসী হামলার মাত্র ৬% হয় মুসলিম সন্ত্রাসীদের দ্বারা। [৫] যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থানুকুল্যে পরিচালিত RAND যে তথ্য প্রকাশ করে তাতে দেখা যায়, মুসলিম সন্ত্রাসীদের দ্বারা পরিচালিত সন্ত্রাসকে খুব ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে।

৯/১১ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে যে ৮৩টি সন্ত্রাসী হামলা হয় তার মাত্র তিনটি সংঘটিত হয় মুসলিম সন্ত্রাসীদের দ্বারা। প্রতিবছর বাদামের এলার্জিতে যে পরিমাণ আমেরিকানের মৃত্যুর সম্ভবনা থাকে, সেখানে সন্ত্রাসবাদ থেকে মৃত্যুর সম্ভবনা থাকে শতকরা ৬০ ভাগ কম। ইসলামবিদ্বেষীদের একটা প্রিয় উক্তি হলঃ “সব মুসলিমই সন্ত্রাসী না, তবে প্রায় সব সন্ত্রাসীই মুসলিম (not all Muslims are terrorists, but (nearly) all terrorists are Muslims)”। অথচ, ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ইউরোপের সন্ত্রাসের হিসাব দেখা দেখলে চিত্রটি ভিন্ন বলেই মনে হবে। সবচেয়ে বেশী হামলা হয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বারা, যেখানে মুসলিম সন্ত্রাসীদের দ্বারা হামলা হয় মাত্র ০.৪% যা কিনা বামপন্থী সন্ত্রাসীদের করা হামলার (৬.৫%) চেয়েও অনেক কম! [৬] ২০১০ সালে ইউরোপে ২৪৯টি সন্ত্রাসী হামলা হয়।

সবমিলিয়ে মাত্র ৭জন (!) এই হামলায় প্রাণ হারায়। মুসলিম সন্ত্রাসীরা মাত্র ৩টি হামলা চালায়। [৭] বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলো চালায় মোট ১৬০টি আক্রমণ, আর বামপন্থী ও অরাজকতা সৃষ্টিকারী দলগুলো চালায় মোট ৪৫টা আক্রমণ। বিচ্ছিন্ন ব্যাক্তি উদ্যোগে ৮৯ জন মুসলিমকে হামলার পরিকল্পনার সন্দেহে আটক করা হয়। অপরদিকে সবমিলিয়ে ৩০৭ জনকে সন্ত্রাসের অভিযোগে শাস্তি দেয়া হয়।

তারপরও মুসলিম সন্ত্রাসে তাদের ঘুম হারাম। সমগ্র পৃথিবীর যে সন্ত্রাসের হার তাতেও মুসলিমরা পিছিয়ে! [৮] টেররিস্ট আক্রমণ ও ক্ষতির হিসাবে যেসব দেশ সামনের সারিতে তাদের মধ্যে মুসলিম অধ্যুষিত প্রথম দেশটির অবস্থান পাঁচ নম্বরে। টেরোরিজমের যে খতিয়ান পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায় মুসলিমরা এর সাথে যুক্ত হয়েছে অনেক পরে। তাই বলে, কিছু মুসলিমদের করা টেরোরিজমকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এ রোগের ব্যাপকতাতো অন্যখানে, দাওয়াইটাতো দেবার কথা সেখানেই বেশী! আসলে কি তাই হচ্ছে!! সুত্রঃ ১. Click This Link ২. http://en.wikipedia.org/wiki/Terrorism ৩. http://news.bbc.co.uk/2/hi/europe/7511267.stm ৪. Click This Link ৫. Click This Link ৬. Click This Link ৭. Click This Link ৮. Click This Link নোটঃ লেখাটি ইতিপূর্বে সদালাপে প্রকাশিত হয়েছিল।

সদালাপে আমি শামস নামে লিখে থাকি।  ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।