আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বাংলা ভাষার বিশ্বায়ন এবং পরবাসে বাঙালি প্রজন্ম

সম্পাদনা করি আমিরাত-বাংলা মাসিক মুকুল। ভালবাসি মা, মাটি ও মানুষকে.. লুৎফুর রহমান ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর পূর্ণ হলো। বাংলাদেশের একজন মানুষের গড় আয়ুর চেয়ে প্রায় বেশি সময় পেরিয়ে গেলো ভাষা আন্দোলনের। প্রাপ্তির খাতায় অনেক সফলতা আর প্রত্যাশার পাল্লায় আফসোস রেখে আবারো এলো একুশে ফেব্র“য়ারি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে মুক্তস্বপ্নের বীজ বপন করা হয়েছিল তারই সিঁড়ি বেয়ে পাওয়া আমাদের স্বাধীনতা।

আমাদের বাংলা ভাষা শুধু রাষ্ট্রভাষা নয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার ও মান পেয়েছে। একমাত্র আমরাই বুকের রক্তে আমাদের ভাষা পেয়েছি যা পৃথিবীর অন্য কোন জাতি পায়নি। কিন্তু সে তুলনায় আমরা আমাদের গেরৗরবোজ্জ্বল অতীতকে ধরে রাখতে পারছিনা। নিজেদের মধ্যে কোন্দল আর দলবাজি করেই অনেকে দ্বায়বোধ এড়িয়ে চলছেন প্রতিনিয়ত। বিশেষকরে যারা পরবাসে জীবনের চলার পথে নানা ভাষা নিয়ে দৈনন্দিন কাজ করেন তাদের কাছে মাতৃভাষা বাংলা যে কতোটা প্রিয় তা তারা ভাল জানেন।

কিন্তু দু:খের হলেও সত্য আমাদের ভাষার দাপ্তরিক ব্যবহার বাংলাদেশের অনেক জায়গায়ও অবহেলিত । রাজধানী ঢাকা সহ দেশের নানা জায়গায় নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ভিনদেশি ভাষায় সাইনবোর্ড এর ছড়াছড়ি। এখানে বাংলা ভাষাকে বিশেষ করে শিক্ষা ও সরকারি দপ্তরগুলোতে ব্যবহার করার আদৌ কোন আইন নেই বাংলাদেশে। আর যদিও আইন থাকে তার বাস্তবায়ন নেই। অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের লোকেরা তাদের মাতৃভাষা রক্তের বিনিময়ে না পেলেও তাদের মাতৃভাষাপ্রেম এতোই যে ওখানে কোন ব্যবসা প্রতিষ্টানেরও নামসাইনবোর্ড ওইদেশের ভাষায় হতে হবে।

যদি আরব আমিরাতে চোখ রাখি সে দৃশ্যটি আমরা পরিস্কার দেখতে পাই। এদেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যদি তাদের মাতৃভাষা আরবী সাইনবোর্ড না থাকে তাহলে জরিমানা দিতে হয়। আরবীর পাশাপাশি অন্যান্য ভাষা ব্যবহারে আপত্তি নেই। ঠিক তেমনি ৬০ বছর পার হয়ে গেলেও আজঅব্দি আমাদের দেশে কোন আইন কি করা যায়না? আমরা কি শুধু একুশ এলো শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে কিংবা দু’চারটি কথামালার ফুলঝুরি দিয়ে পার পেতে পারি? নিশ্চয় না। এ ব্যাপারে বর্তমান সরকার অনেকটা কাজ করেছে এবং করে যাচ্ছে সেজন্য সাধুবাদ জানাচ্ছি সরকারকে।

২০১০ সালের ২৫ আগস্ট বিচারপতি মো. মমতাজউদ্দিন ও বিচারপতি নাঈমা হায়দারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আট দফা নির্দেশনা দিয়ে যে রায় দেন, তা হলো- এক. ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষার্থে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষা করতে নির্দেশ দেওয়া হলো। ওই এলাকায় ভবঘুরে লোকজনের আনাগোনা ও অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধে পাহারার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দুই. শহীদ মিনারের মূল বেদিতে সভা-সমাবেশ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হলো। তবে মূল বেদিতে ফুল দেওয়া যাবে। ২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান করা যাবে।

আর বেদির পাদদেশে সভা-সমাবেশ করা যাবে। একই সঙ্গে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তিনজন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দিতে তথ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হলো। তিন. ভাষা আন্দোলনের শহীদদের মরণোত্তর পদক ও জীবিতদের জাতীয় পদক প্রদান করতে হবে। চার. জীবিত ভাষাসৈনিকরা আর্থিক সহায়তা চাইলে তা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হলো। পাঁচ. বিশ্ববিদ্যালয় ও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ ও এর মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।

ছয়. শহীদ মিনারের পাশে একটি গ্রন্থাগারসহ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা এবং ওই জাদুঘরে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসসমৃদ্ধ তথ্যপঞ্জিকা রাখার নির্দেশ, যাতে আগত ব্যক্তিরা এ সম্পর্কে জানতে পারেন। সাত. ভাষাসৈনিকদের প্রকৃত তালিকা তৈরির জন্য কমিটি গঠন করা এবং ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ওই তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশের নির্দেশ। আট. ভাষাসৈনিকদের সব রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো এবং সাধ্যমতো সরকারি সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। ফলে বাস্তবায়িত হয়নি হাইকোর্টের নির্দেশনাও।

এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশে বসবাসরত বাঙালিদের জেগে ওঠতে হবে। বিশেষকরে অন্তত সরকারি উদ্যোগে দেশের সবকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেন শহীদ মিনার ¯া’পন বাধ্যতামূলক করা হয়। বাংলা ভাষার বিশ্বায়নে বাংলার ব্যবহার প্রধান অন্তরায়। প্রবাসে বসবাসরত পরিবারগুলো তাদের সন্তানদেরকে অন্যভাষায় গড়ে তুলছে। এছাড়া অনেক দেশে বাংলা স্কুল বা স্কুলের পড়ায় বাংলা না থাকায় পরবাসের বেড়ে ওঠা প্রজন্ম বাংলা থেবে বঞ্চিত হচ্ছে।

বাংলা ভাষার বিশ্বায়নের অন্তরায় কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে এভাবেইÑ * প্রবাসীদের পরবর্তী প্রজšে§র সন্তানরা ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠে। সুতরাং তাদের পক্ষে বাংলা শেখাটা একদিকে যেমন সহজ হয়ে ওঠে না, তেমনি বাংলা শেখার আগ্রহটাও তেমন থাকে না। * আমাদের দেশের মধ্যে উচ্চ ও উচ্চ মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের ঘরে বাংলা চর্চা তেমন হয় না। তাদের ও তাদের সন্তানদের লক্ষ্য থাকে বিদেশ গমন এবং বিদেশে সেটেল করা। কাজেই তারা ইংরেজিটাই চর্চা করে, বাংলা তেমন শেখে না।

* ভারতীয় হিন্দি ভাষার আগ্রাসনে সে দেশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা বলার ও লেখার অর্থাৎ বাংলা চর্চা করার সুযোগ হ্রাস পাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ভারতে বাঙালি জনগোষ্ঠীর উল্লে¬খযোগ্য অংশ ক্রমে ক্রমে অবাঙালিতে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশেও হিন্দির এই আগ্রাসনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। * এদিকে বাংলাদেশের ভেতরে আঞ্চলিকতার কারণে বাংলা ভাষার উচ্চারণ এবং বানান ভ্রান্তি ঘটতে ঘটতে এখন এমন একটি জগাখিচুড়ি ভাষা (দেশের রাজধানীসহ অন্য বড় শহরগুলোতে) সৃষ্টি হচ্ছে যাকে প্রমিত বাংলা বলে মেনে নেয়া কষ্টকর। এই বিভ্রান্তির চর্চা চলতে দেয়া যায় না।

সবক্ষেত্রেই ব্যক্তির প্রচেষ্ঠা আসল। তাই পরবাসে বেড়ে ওঠা প্রজন্মকে নিজের পরিবার থেকে বাংলা ভাষার চর্চার অব্যাস করতে হবে। এভাবে এ চর্চা অব্যাহত থাকলে সেইদিন আর বেশি দূও নয় যেদিন হিন্দিও মতো বাংলা ও পরবাসে অন্যান্য দেশের নাগরিকরাও বলবে। সেদিন আসুক বাংলার ইতিহাসে সোনালী অক্ষরে। এ কামনা নিত্যদিনের।

তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক কালের কণ্ঠ। লেখক: সম্পাদক, মাসিক মুকুল, দুবাই। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.