আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

যে লেখাটা লিখব লিখব করেও লেখা হয়নি

কয়েকবার লিখতে গিয়েও থেমে গিয়েছি। হয়তো না লেখাই ভালো ছিল। কষ্ট বাড়বে। যে কষ্টটুকু সযত্নে লুকিয়ে রেখেছি সেটা বাইরে আসতে না দেয়াই তো উচিৎ। আবার উল্টোটাও হয়ত ঠিক, হয়ত লিখলেই বুকের ভিতর জমে থাকা কষ্টগুলোর ভার কমবে।

জানি না কোনটা ঠিক। প্রায় তিন মাস আগের কথা। কুরবানী ঈদে বাড়ি যেতে পারব না এমন একটা আভাস পাচ্ছিলাম। তাই ঈদের বেশ আগেই বলতে গেলে এক রকম জোর করেই ছুটি নিয়ে নিলাম বাড়ি থেকে ঘুরে আসার জন্য। আব্বার সাথে দেখা করতে গেলাম।

ওখানে গেলে পিচ্চি ভাগ্নে-ভাগ্নীদের সাথেই কেটে যায় সারাটা দিন। ফেরার সময় আব্বা জানতে চাইলেন কতদিনের ছুটি, আরেকদিন আসতে পারব কি না। কিন্তু আমার কর্মস্থলে ফেরার সময় হয়ে এসেছে, বললাম আর আসা হবে না। আব্বা একটু মন খারাপ করলেও বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, ভালোভাবে যাস। বাস ধর্মঘটের কারণে রওনা দেয়া হল না কর্মস্থলে।

বিকাল পর্যন্ত ধর্মঘট ছাড়ে কি না সেই আশায় সব গুছিয়ে তৈরি হয়ে বসে রইলাম। সন্ধ্যায় যখন নিশ্চিত হলাম আজকে আর যাওয়া হবে না, ভাবলাম আব্বার সাথে আরেকবার দেখা করেই আসি। বের হয়ে গেলাম তখুনি। সাধারণত ঐ বাসায় গেলে সকালের দিকে যাই, সন্ধ্যার পর চলে আসি। এবার রওনাই দিলাম সন্ধ্যায়।

বাসায় গিয়ে কলিংবেল টিপতেই দরজা খুলে দিলেন আব্বা নিজে। এই অসময়ে আমাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, তুই? তোর না আজ রওনা দেয়ার কথা? বললাম, যেতে পারিনি। আব্বা খুশিতে ঝলমল করে উঠলেন। যেন আমি একটা ছোট বাচ্চা এমনভাবে বললেন, কী খাবি বল, দোকান থেকে নিয়ে আসি। বললাম, কিছু লাগবে না।

তবু জোর করতে থাকলেন আব্বা। ওদিকে পিচ্চি ভাগ্নেটাও বাইরে যাওয়ার জন্য লাফাতে থাকল। আব্বার অসুস্থ শরীর, পিচ্চিকে সামাল দিতে পারবে না। বললাম, আচ্ছা পিচ্চিকে নিয়ে আমি সাথে যাচ্ছি। দোকানে গিয়ে আব্বার সেই এক কথা, কী খাবি বল কিনে দিই।

পিচ্চি চকলেট বাগিয়ে নিল। আব্বা বারবার আমাকে জোর করতে থাকলেন কিছু নেয়ার জন্য। জানেন যে আমি আইসক্রিম খুব পছন্দ করি, তাই আইসক্রিমের কথা বললেন। কিন্তু আমার তখন খুব ঠান্ডা লেগেছে। বললাম, আমি এখন আইসক্রিম খেতে পারব না আব্বা, আমার কিছু লাগবে না।

দেখলাম আব্বা মুখ কালো করে ফেলছেন। তাড়াতাড়ি বললাম, আচ্ছা আমি ডালভাজা খাব। এইবার আবার হাসিতে ভরে উঠল আব্বার মুখ। ডালভাজা কিনে দিয়ে আমাদেরকে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। একটু পর আব্বাও ফিরে এলেন।

এসেই খোঁজ নিলেন আমি ডালভাজা খেয়েছি কি না। বললাম, খেতে কি আর দেরী করেছি, সব সাবাড় করে দিয়েছি। তৃপ্তির হাসি দেখতে পেলাম আব্বার মুখে। আরও কিছুক্ষণ থাকতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু রাত হয়ে যাচ্ছিল। আব্বার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম।

পরদিনও ধর্মঘট চলছিল, তারপরও এরই মধ্যে অনেক ঝামেলা করে কর্মস্থলে পৌঁছুলাম। একদিন দেরি করে আসার জন্য ঝাড়িও খেতে হল। কুরবানী ঈদে যে ছুটি পাব না সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম। এমন কি ঈদের পরেও ছুটি পাব না। ঈদের দিন সকালে হাসপাতালে বসে আছি, আব্বা ফোন দিলেন।

দুঃখ করে বললেন, এইবার আমি কুরবানী দিতে পারলাম না রে, আমার আর সেই সামর্থ্য নেই। আমি কী কী রান্না করেছি তার খবরও নিলেন। ঈদের ছুটিতে ডিউটি করেই কাটাতে হল। ঈদের পরের সপ্তাহেও একটা ঝামেলায় আটকে গেলাম, আবারও সেই ডিউটি। তার পরের সপ্তাহেও ৪৮ ঘন্টার ডিউটি পড়ে গেল।

আর বুঝি বাড়ি যাওয়া হবে না এমন একটা আশংকায় পেয়ে বসল। হঠাৎ করে এত মন খারাপ লাগল যে টারজানকে ফোন করে কান্নায় ভেঙে পড়লাম, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। বারবার জানতে চাইছিল, কী হয়েছে তোমার। আমি তো নিজেও বুঝতে পারছিলাম না কী হয়েছে আমার। বললাম, কিছুই হয়নি, তুমি শুধু নিয়ে যাও আমাকে এখান থেকে।

কিন্তু কিছুই করার ছিল না ওর। ৪৮ ঘন্টার ডিউটি শেষ হল, পরদিন সকালে ওয়ার্ডে রাউন্ড দিচ্ছি। একটা ফোন এল বিটিসিএল-এর একটা নাম্বার থেকে। কেমন যেন একটা অনুভূতি হল, বুকটা যেন একটু কেঁপে উঠল। ফোনটা ধরলাম, ফোনটা এসেছিল হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল থেকে, নার্স কথা বলছিলেন, আপনি কোথায় আছেন? তাড়াতাড়ি আসুন, আপনার আব্বার অবস্থা ভালো না।

মেডিকেলের পেশায় এইরকম কথা বলার ধরণ আমার পরিচিত। আমি জানি কী হয়েছে আর নার্স আসলে কী বলতে চাইছে। আমার আর কিছু বলার শক্তি নেই, আমার পায়ের নীচেও যেন মাটি নেই। তখনই আম্মার গলার আওয়াজ পেলাম, তুই চলে আয়, তোর আব্বা আর নেই। ঐ দেখাই তাহলে আব্বার সাথে আমার শেষ দেখা ছিল, ঐ আদরটুকুই আব্বার শেষ আদর ছিল।

ঐটুকু আদর পাব বলেই আমার সেদিন রওনা দেয়া হয়নি, আর হঠাৎ করে ঐজন্যই হয়ত আব্বাকে দেখতে ইচ্ছা হচ্ছিল। জানি না, হয়ত আব্বাও আঁচ করতে পেরেছিলেন এটাই আমাদের শেষ দেখা হবে, তাই সেদিন এইভাবে আমাকে আদর করেছিলেন। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।