আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আমরা-'মেডিকেল জীব'

হঠাৎ হঠাৎ লিখতে ইচ্ছে করে,সেটা বরাবরের মতই অখাদ্য-কুখাদ্য হয়। । তাতে কী-ই বা আসে-যায়! তুর্য আমার বন্ধু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। একদিন ওর সাথে কার্জন হলে ঘুরতে গিয়েছি।

তখনো আমার ক্লাস শুরু হয় নি, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ এ ভর্তি হয়েছি মাত্র। আমরা হাঁটছি আর কথা বলছি। হঠাৎ শিউলি ফুল দেখে আমি দাঁড়িয়ে যাই,তুর্য কথা বলতে বলতে শিউলি ফুল পায়ে মাড়িয়েই চলে গেল। আমার চিৎকারে ও পিছন ফিরে তাকায়। আমি ওকে ঝাঁঝাল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,'তুই এটা কি করলি?'ও জ়ানে,শিউলি ফুল আমার ভীষণ প্রিয়।

তাই বুঝতে পেরে বলল,'আমি তো শিউলি ফুল পায়ে মাড়িয়ে চলে গেছি;কয়েকদিন পর তুই কি করবি জানিস,পড়ার চাপে আর টেনশনে শিউলি গাছের মাথায় উঠে বসে থাকবি!' আজ ২বছর হতে চলল,মেডিকেলের ঘানি টানছি। এখনো আমার হোস্টেলের রুমের বারান্দায় দাঁড়ালে যখন শিউলি গাছটার দিকে চোখ যায় তখন তুর্য কে মনে পড়ে আর নিজেকে কল্পনা করি 'শিউলি গাছের মাথায় জবুথবু হয়ে বসে থাকা অবস্থায়'!সেদিন ওকে অনেক বকে ছিলাম,অনেক বড় বড় কথাও শুনিয়েছিলাম। কিন্তু আজ সত্যিই মাঝে মাঝে এমন অনুভূতি কাজ করে, শিউলি গাছ হোক আর কদম গাছ হো্ক,একটা হলেই হয়.। তাতে আমার কি! 'স্বপ্নে আমি ভেবেছিলাম অনেক কিছুই। এটা করব,সেটা করব;বাড়ি করব পাহাড়চূড়োয় স্বপ্ন এবং সুখের কুটো দিয়ে'।

স্বপ্ন দেখায় কার্পণ্য করি নি কখনো। অনেক কিছু হতে চেয়েছিলাম জীবনে,অনেক কিছুই। শুধুমাত্র 'চিকিৎসক' হওয়া ছাড়া!হঠাৎ করেই বাবা-মা'র ইচ্ছা সক্রামিত হল আমার মধ্যেও। বাহ্‌,মন্দ হয় না!স্বপ্নবিলাসী মন আমার শুরু করলো নতুন করে স্বপ্ন দেখা-মেডিকেল নিয়ে!সিওমেক-আমার স্বপ্নের কারখানা। অবশেষে ক্লাস শুরু হল।

হোস্টেলে থাকি,ক্লাস করি। ক্লাসে কিছুই বুঝি না। রাতে রুটিন করে কাঁদি-মা'র জন্য,বাবা'র জন্য,আপু'র জন্য-বাসার জন্য। আর সারাদিণ অঞ্জন দত্তের গান গাই,'বুঝিনি তো আমি আগে,বড় হওয়া বড়ই শক্ত'!ফোনে বাবা সাহস দেন,আপু স্বান্তনা দেয়। কিন্তু মা একটু ভয় পান।

যদি নানার মত ডাক্তার হবার বাসনা কে থোড়াই কেয়ার করে আমি ফিরে যাই!বন্ধুরা বলে,'আগেই বলেছিলাম,মেডিকেল ফালতু জায়গা। শুনিস নি। যাই হোক,লেগে থাক-তুই পারবি'। আস্তে আস্তে পড়াশোনা নিয়ে কষ্টটা কমে আসে। রেগুলার আইটেম দেই,কার্ড দেই।

কিন্তু সকাল ৮টায় উঠে ক্লাসে যাওয়া-অসম্ভব!ক্লাসে আমি কেন যাব?ক্লাসে যা পড়ায় তা আমি কিছুই বুঝি না!স্যার-ম্যাডাম রা নিজেরা বুঝে কিনা সন্দেহ!চলতে থাকে দিন,আমিও আমার মতই চলতে থাকি। প্রথম প্রথম সকালে ঘুম থেকে উঠে সবাই যখন এনাটমী বই নিয়ে বসে আমি তখন সত্যিই শিউলি ফুল কুড়াতাম। আর এখন.। । ???!!! মেডিকেলে যারা পড়ে তাদের সবার জীবনটাই একটু অন্যরকম।

আমাদেরকে ঠিক পারিবারিক বা সামাজিক জীব বলা যায় না,তাই আমরা-মেডিকেল জীব!একটা সার্ভে তে পড়েছিলাম সবচেয়ে হতাশাগ্রস্থ হয় মেডিকেল শিক্ষার্থীরা!আসলেই তাই। এর মধ্যেও অনেক ব্যাপার আছে,মেডিকেলে সত্যিকার অর্থেই কেউ 'নিঃস্বার্থ' বন্ধু হয় না!বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে। অনেকেই হয়ত এর ঘোর বিরোধিতা করবেন। কিন্তু এটাই সত্যি। সবার মনেই একটা অলিখিত কম্পিটিশন!এক সিনিয়র আপুর ভাষায়,'মেডিকেল হচ্ছে সেই জায়গা যেখানে একটা ছেলে সাপ্লি খেলে সব ছেলে উঠেপড়ে লাগে ওকে পাশ করানোর জন্য আর একটা মেয়ে সাপ্লি খেলে তাকে মোটামুটি একঘরে করে রাখা হয়'।

অবশ্য ছেলেদের মধ্যেও আছে নোংরা রাজনীতি! ৮ অক্টোবর,২০১০। আমরা দো'তলায় ক্লাস করছি। তখন কলেজে ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়া চলছে। হঠাৎ বাইরে চিৎকার চেঁচামেচি। বাইরে বেরিয়ে হতবাক হয়ে গেলাম,নিচে শিবির-ছাত্রলীগ মারামারি হচ্ছে!ক্লাসের যে ছেলেটা কে নিরীহ বলেই জানতাম,তার হাতেও দেখি অস্ত্র! এপ্রন কোমরে বেঁধে একজন আরেকজন কে পিটাচ্ছে!অদ্ভুত,এরাই কিছুদিন পর হবে ডাক্তার!হঠাৎ দেখি আমার আশে-পাশে সবাই দৌড়াচ্ছে,পিছনে তাকিয়ে দেখি একজন হকি স্টীক নিয়ে আমাদের ধাওয়া করছে!সিওমেক এ অবশ্য প্রকাশ্য রাজনীতি বন্ধ।

তারপর সব ঠাণ্ডা,ছুটির পর আবার পুরোদমে ক্লাস শুরু। এভাবে চলতে চলতেই চলে এলো ১ম পেশাগত পরীক্ষা। আবার নতুন করে বুঝলাম,মেডিকেল কী জিনিস!শুরু হল অমানষিক কষ্ট। সবাই যখন পড়তে পড়তে অজ্ঞান। আমার তখন উলটো অবস্থা!ইচ্ছে হলে পড়ি ইচ্ছে হলে ঘুমাই, লিস্ট করি-পরীক্ষার পর কী কী করব,সাইকেল কিনব নাকি গীটার!আর ভাবি,কতোদিন খালি পায়ে ঘাসের উপর হাঁটি না!নিজেকে স্বান্তনা দেই গান গেয়ে-'যদি ছেড়ে যেতে বলে শিকড়েবাঁধা মাটি,জেনো ছাড়তে দিব না'! খুব কষ্ট হয়েছিল সেদিন,যেদিন একমাত্র বোনের বিয়ের দিন সকালে আমাকে সিলেট চলে আসতে হয়েছিল হঠাৎ তারিখ দিয়ে দেয়া পরীক্ষায় বসার জন্য।

আমার শিক্ষক মা সেদিন তার এতদিনের গাম্ভীর্য কে অবলীলায় ভুলে গিয়ে শিশুর মত কেঁদে ফেলেছিলেন! তারপরও আমি স্বপ্ন দেখি। একের পর এক স্বপ্ন গুলো চোখের সামনেই দুঃস্বপ্ন হয়ে যাচ্ছে,তাতে কি!স্বপ্ন দেখা আমার ফুরোয় না। আমার সিওমেক,আমার স্বপ্নের কারখানা। এত কষ্ট,এত ত্যাগ স্বীকারের পরেও আমরা বলতে ভালবাসি, আমরা মেডিকেল জীব! ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।