আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

পাহাড়ীরা কার উপর আস্থা রাখবে

ভালো লাগে স্বপ্নের মায়াজাল বুনতে ফজলুল বারী, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম শান্তি বাহিনীর সশস্ত্র একটি দলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল একবার। সখেদে নয়। পথ থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। পায়ে হেঁটে বাংলাদেশ ভ্রমণের সময় খাগড়াছড়ির গুইমারা থেকে পানছড়ি যাবার পথে তাদের সশস্ত্র একটি গ্রুপ পথ থেকে ধরে নিয়ে যায়। চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাবার পথে এলোপাতাড়ি মারধর করে।

পুরা পাহাড়ি মাইর! এরপর টুরিস্ট পরিচয় নিশ্চিত হবার পর আতিথেয়তাও পাওয়া যায়। তখন তারা বলতে চেয়েছে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের কথা। জাতিসত্তার স্বীকৃতি, ভাষা-সংস্কৃতির রক্ষা নিয়ন্ত্রণের তাগিদ থেকে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলন শুরু করে বাঙালি। সে আন্দোলন পরে স্বাধীনতায় পৌঁছে। শান্তি বাহিনীর ওই দলটি বলেছিল, পাহাড়ের আদিবাসী জাতিগুলো ক্ষুদ্র।

কিন্তু বাঙালিরা পাকিস্তানিদের সঙ্গে যে যে বিষয়ে একমত হতে পারোনি, সে নিয়ে আমাদের শঙ্কার বিষয়গুলোও সমান। তোমাদের উদ্বেগ আন্দোলন সংগ্রাম যদি রাইট হয়, আমাদেরটা রং’ ভাববে কেন? তোমরা স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলন করেছো। আমরা স্বায়ত্বশাসনের কথা বললে পাকিস্তানিদের মতো তোমাদেরও মাথা গরম হয়ে যায় কেন? তোমরা এ কেমন গণতান্ত্রিক? প্রশ্নগুলো অনেক ভাবিয়েছে। এরপর মিডিয়ায় আসার পর রিপোটিং’এ অনেক বিটের একটি হয় চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস। লংগদু গণহত্যার পর আবার যাই পাহাড়ে।

বিজু উৎসব এলেই যাই। আমাদের সাংবাদিক সেলিম সামাদ, বিপ্লব রহমানের বরাবরই পাহাড়ি নেতাদের সঙ্গে ভালো একটি যোগাযোগ ছিল। শান্তি চুক্তির আগে ধারাবাহিক ফলোআপ করি শান্তি আলোচনার। ত্রিপুরার শরণার্থী ক্যাম্প ঘুরেও রিপোর্ট করেছি। শান্তি চুক্তির পরেও রিপোর্টের দাবিতে লম্বা সময় থাকতে হয়েছে পাহাড়ে।

ইরাক যুদ্ধ কাভার করে ফেরার পর সন্তু লারমাকে মজা করে বলেছিলাম, আপনারা সারেন্ডার করে ফেলাতে আমাদের মিডিয়ার ওয়ার জার্নালিজমের ডেভলপমেন্টটা হলো না! সন্তু লারমাও মজা করে জবাব দিয়েছিলেন, আপনাদের ওয়ার জার্নালিজমের ডেভলপমেন্টের জন্য আমরা জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরি আর কি! পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যাটি সামরিক বাহিনী দিয়ে মোকাবেলার জটিল কাজটি শুরু করেন জেনারেল জিয়া। পাহাড়ে আদিবাসী পাহাড়িদের সংখ্যালঘু বানাতে সারাদেশের নদীভাঙ্গা, গরিব লোকজনকে নিয়ে তাদের পাহাড়ে সেটেলমেন্টের ব্যবস্থা করেন। কাপ্তাই বাঁধ সৃষ্টির পর ওই এলাকায় সৃষ্ট ফসলী জমি সংকট তখন আরো তীব্র ও জটিল। সামরিক মদদপুষ্ট সেটেলার বাঙালিদের সঙ্গে পেরে না উঠে পাহাড়িদের অনেকে দেশান্তরী হয়। অনেকে আরও গভীর জঙ্গলের দিকে চলে যায়।

অনেকে যোগ দেয় শান্তি বাহিনীতে। মুক্তিবাহিনী, মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীর মতো পাহাড়ি শরণার্থী-শান্তিবাহিনীরও সহজ-স্বাভাবিক আশ্রয়স্থল হয় ভারত। এভাবে বাংলাদেশের সমস্যাটি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে গিয়েছিল। জিয়াসৃষ্ট সামরিকায়ন, ভূমি জটিলতা আজও অব্যাহত আছে পাহাড়ে। বরঞ্চ দিনেদিনে তা শুধুই বাড়ছে।

এরশাদ মূলত দাতাদের চাপে শুরু করেন শান্তি আলোচনা। এরপর খালেদা জিয়ার নেতৃ্ত্বে বিএনপির সরকার ক্ষমতায় ফেরার পরও সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকে। কর্নেল (অবঃ) অলির নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটির অনেক সদস্যের মধ্যে আজকের মহাজোট নেতা রাশেদ খান মেননও ছিলেন। কিন্তু তখন শান্তি চুক্তি কেন হয়নি? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে আস্থার অভাব। নানা কারণে পাহাড়ি নেতৃ্ত্ব এরশাদ বা খালেদা সরকারের ওপর আস্থা আনতে পারেনি।

ত্রিপুরার শরণার্থী ক্যাম্পের সমাবেশে অলি আহমেদের একটি বক্তব্য উল্লেখ করে অনেকে বলেন, বিএনপি আসলে সমস্যাটির সমাধান চাইতো না! কারণ পাহাড়িদের মূলধারা অথবা সিংহভাগ কখনোই বিএনপির ভোটার নয়। শরণার্থীদের সমাবেশে কর্নেল (অবঃ) অলি বলেছিলেন, `আপনারা দেশে গেলেও আমাদের কোনও লাভ নেই। এখানে থাকলেও ক্ষতি নেই। ` আওয়ামী লীগের পক্ষে তুলনামূলক সেক্যুলার চরিত্র, পাহাড়িদের জাতিসত্তা, আদিবাসী ইস্যুতে উদার-স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি, তিন পাহাড়ি জেলায় কল্পরঞ্জন চাকমা, দীপংকর চাকমা, বীর বাহাদুরের মতো পাহাড়ি এমপি থাকাতে এই আস্থা অর্জন সহজ হয়। নেপথ্যে নানাকিছুতে চাকমা রাজা দেবাশীষ চাকমা, যোগাযোগ কমিটির প্রধান হংসধবজ চাকমাসহ আরো অনেকের ভূমিকাটি ছিল গুরত্বপূর্ণ।

জাতিসংঘ যখন বিশ্ব আদিবাসী বর্ষ পালন শুরু করে তখনও বিএনপি ক্ষমতায়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর একটি উক্তিতে পাহাড়িদের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব চিহ্নিত হয়। বাংলাদেশে কোনও আদিবাসী নেই ঘোষণা দেন খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ এর প্রতিবাদ করে। আদিবাসী দিবস পালনের স্মরণিকাতে শুভেচ্ছাবাণী দেন তৎকালীন বিরোধীদলের নেত্রী শেখ হাসিনা।

আজকের আইনমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকার-সরকারি দলের অনেকে রাজপথে-সেমিনারে সরব-সোচ্চার ছিলেন আদিবাসীদের পক্ষে। অনেকের মতে গত ইলেকশনে পাহাড়ের তিনটি আসনই যে আওয়ামী লীগ জিতেছে, এর পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে আদিবাসী ইস্যুতে দলটির প্রকাশ্য অবস্থান । শান্তি চুক্তিকে শুরু থেকেই আপোস বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ইউপিডিএফসহ পাহাড়িদের একটি অংশ। বিএনপি এটিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে এটি দেশবিরোধী। কিন্তু শান্তি আলোচনা ধারাবাহিক অনুসরণ করাতে চুক্তিটি নিয়ে একজন রিপোর্টার হিসাবে কিছু অনুভব হয়েছিল।

এক, বাংলাদেশের জন্য এটি বড় বিজয়। কারণ এর মাধ্যমে শান্তিবাহিনী ও শরণার্থী সমস্যা দুটি ভারত থেকে বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা যুদ্ধ ছেড়ে আমাদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে পারেনি। আমরা শান্তিবাহিনীকে বুঝিয়ে রণাঙ্গন থেকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে পেরেছি। দুই, চূড়ান্ত চুক্তিটি ছিল আদিবাসী পাহাড়িদের জন্য এটি আপোষ।

কারন তাদের জাতিস্বত্ত্বার স্বীকৃতি, স্বায়ত্বশাসন, ভূমি বিরোধসহ নানা কিছুতে দেবো দেবো প্রতিশ্রুতি থাকলেও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসাবে সন্তু লারমার পদ ছাড়া নিশ্চিত আর কিছু ছিলনা। তিন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর যখন এ নিয়ে তিন পাহাড়ি জেলার বাঙালি বাসিন্দাদের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল, তখন সরকারের এক মন্ত্রী একান্তে বলেন, ওরা মিছামিছি হইচই করছে। শরণার্থী আর শান্তিবাহিনীকে ইন্ডিয়া থেকে আনার জন্য চুক্তিতে অনেক কিছু বলতে হয়েছে। আসলে ওসব দেবো-টেবো নাতো! চুক্তি নিয়ে আজকের লেজেগোবরে না ঘরকা না ঘাটকা অবস্থা দেখে সেদিনের সেই মন্ত্রীর কথা মনে পড়ে প্রায়। কিন্তু চুক্তির বিরোধিতা, খাগড়ছড়ি লংমার্চ নিয়ে গেলেও ২০০১ সালের ইলেকশনে ক্ষমতায় ফিরলেও দাতাদের চাপে চুক্তিটি বাতিল করতে পারেনি বিএনপি।

তবে চুক্তির বাস্তবায়ন ঠেকিয়ে রাখে। এখন যদি প্রতারিত পাহাড়িরা আবার যুদ্ধে ফেরত যায়? বিএনপির তৎকালীন এক মন্ত্রীকে প্রশ্নটি করলে জবাব আসে, অসম্ভব, সন্তু লারমার শীতাতপ বাড়ি-গাড়িতে আমরা হাত দিইনি। এই শীতাতপ বাড়ি-গাড়ির আরাম ফেলে লারমা আবার জঙ্গলে ফেরত যাবেন মনে করছেন! আজ আবার আদিবাসী ইস্যুতে পুরা ইউ টার্ন কেন করলো আওয়ামী লীগ? শান্তিচুক্তির আগে-পরে পাহাড়ে সেনাবাহিনীর নানা তৎপরতার কথা মনে পড়ে যায়। শান্তি চুক্তির আগে নানা সময়ে ঢাকার চিহ্নিত একদল লেখক-সাংবাদিককে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হতো। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে তারা ঘুরতেন-বেড়াতেন, ফেরার সময় নিয়ে যেতেন গিফটের প্যাকেট।

এরপর লিখতেন সেনাবাহিনীর ব্রিফিং রচনা! শান্তিচুক্তির পরেও দেখি একটু রাখঢাক করে হলেও তারা সমান-সক্রিয়! ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সরকার একটি চুক্তি করেছে, কিন্তু সরকারের নেতা-মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে সেনাবাহিনীর লোকজনকে তখনই রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ির নানা সভা-সেমিনারে চুক্তির বিরুদ্ধে সক্রিয় দেখি। মিডিয়া ট্যুরও চলতে থাকে। অতএব শান্তিচুক্তি অনুসারে ঢাকার মন্ত্রণালয় আর তিন পাহাড়ি জেলার নানাকিছুতে নিজস্ব লোকজনের পদায়ন ছাড়া চুক্তির গতি-পতি কিচ্ছু আর হয়নি। আদিবাসী ইস্যুতে আওয়ামী লীগের চলতি মতিগতির বিষয়ে ঢাকার ওয়াকিফহাল মহলগুলোতে খোঁজখবর নিতে গেলে সেনাবাহিনী আর একজন উপদেষ্টার প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। এর আশু প্রতিক্রিয়া কি গড়াতে পারে? জানতে চাইলে বলা হয়, কি আর হবে? আগামী ইলেকশনে আওয়ামী লীগ তিন জেলার তিনটি আসনই হারাবে।

আওয়ামী লীগ এখন আর এসব বিষয়ে কেয়ার করে নাকি! শক্তি বাড়বে শান্তি চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ’এর। এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন চলে আসবে সামনে, পাদপ্রদীপের আলোয়। আবার কি যুদ্ধে যাবে শান্তিচুক্তিতে প্রতারিত পাহাড়ি? আবার কি সমস্যাটি চলে যাবে আমাদের সীমানার বাইরে? ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।