আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কলাকৈবাল্যবাদ : শিল্পকলায় শুদ্ধতম বাস্তব না সৌন্দর্যবোধ

চারপাশে আত্মমুগ্ধ আদিমতাবোধ, আর গ্রন্থিবদ্ধ চিন্তা; সেখান থেকে মুক্তির পথ খুঁজি... আধুনিক মনোদৃষ্টিতে রেনেসাঁসে উজ্জীবিত ইউরোপে১ গড়ে ্ওঠে এক বহুমাত্রিক শিল্পসাহিত্য আন্দোলন। এই শিল্পকলাবাদ সৃষ্টি করে অনেকগুলো শিল্পরীতি, যে রীতি সমুহের ঝোঁক সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করে পরস্পরের মাঝে। সুতরাং আধুনিক শিল্পচর্চা অনেকগুলো শিল্পরীতির সম্মিলিত রূপ। এ গুলোর মধ্যে অভিব্যক্তিবাদ, প্রতীকবাদ, চিত্রকল্পবাদ, দাদাবাদ, পরাবাস্তবতাবাদ ইত্যাদি। এসব রীতির সাথে সমন্বয় করেছে কলাকৈবাল্যবাদ; অর্থাৎ শিল্প শিল্পের জন্যই, এখানে সৌন্দর্যবোধটাই মূল বিষয়।

আজকের প্রসঙ্গ এ নিয়েই। আজকে এই প্রবন্ধে আমরা খোঁজার চেষ্টা করবো শিল্পকলায় শুদ্ধতম বাস্তব না কি সৌন্দর্যবোধ কোনটা জরুরী। এবং কলাকৈবাল্যবাদ সমাজে ঠিক কি ধরনের প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। যদিও এই ধারার মতবাদী যারা তাদের কাছে শিল্পদর্শন হলো, 'শিল্পের জন্যই শিল্প; শিল্প শুধুমাত্র বিষ্ময় আর সুন্দরের জন্যই সৃষ্টি, তার কোন সামাজিক গুরুত্ব নেই, নেই তা থেকে বাস্তব অন্বিষ্ট কোন বস্তুর সন্ধান করা'। এই নিয়মকে কলাকৈবাল্যবাদ২ বলা হয়ে থাকে, যদিও কলাকৈবাল্যবাদ একক ভাবে আধুনিক প্রায় অধিকাংশ রীতির সাথে সমন্বয় সাধন করেছে।

আর এই মতবাদ ফ্রান্সে সূচনা হলেও এক সময় সারা ইউরোপীয় শিল্পসাহিত্যাঙ্গনে ব্যপক অনুরোণিত হয়ে উঠেছিল। আমরা এই প্রবন্ধে এর উপযোগীতা এবং সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কি রকম তার সন্ধান করবো। আমরা প্লেটোর কাব্য বিদ্বেষের কথা জানি; প্লেটোর শিল্প সম্পর্কে আপত্তিগুলো দুটি দিক দিয়ে বিচার করা চলে, তাহলো নৈতিকতা ও বুদ্বিবৃত্তিক। শিল্পকে প্লেটো অনুকরণ বলেছেন। 'যদি শিল্পমাত্রই অনুকরণ হয়, তবে কাব্য অসত্যমুলক, কাব্য ছায়ার ছায়ামাত্র সুতরাং কাব্যচর্চা অনিষ্টকর।

মানুষের কাজই হলো সত্যানুসন্ধান করা, তাই যা সত্য সম্পর্কে ভ্রন্তির সৃষ্টি করে, সত্য থেকে দূরে সরিয়ে আমাদের এক ছায়াছন্ন পরিবেশে নিয়ে যায় তার চর্চা মানুষের জন্য ক্ষতিকর বটে। ' পরবর্তীতে প্লেটো শিল্পকলার অনুকরণ কাঠামোকে উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্টতরের বিচার্য বিষয় সম্পর্কে বলেছেন, এটা হবে সত্যতার৩ মানদন্ডে। অনকরণে কতটা সত্যতা ধরা পড়েছে তা তাকে উৎকৃষ্ট মান নির্ধারণ করবে। এই অনুকণ আনন্দদায়ক হতে হবে এবং তা শুধুমাত্র সুন্দরের অন্বেষন করবে, অসুন্দরকে পরিহার করবে। কারণ অসুন্দরের অনুকরণ সমাজে কুফল বয়ে আনবে।

মার্কসবাদী সমালোচকগণ প্লেটোর এই মনোভাবকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, প্লেটো মানুষের সুপ্ত চেতনাগুলোকে ভয় পান, তার কারণ তার চিন্তাধারার যে সমাজ কাঠামো, তাতে মানুষের এই সুপ্ত চেতনাগুলো থাকলে তা ভেঙ্গে পড়বে। অন্যদিকে প্লেটোর সেরা ছাত্র এ্যারিস্টটল তাঁর রচিত 'কাব্যতত্ত্বে' শিক্ষাগুরু প্লেটোর অনুকরণ মতকেই শিল্পকলা হিসেবে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু অন্যদিক থেকে তিনি প্লেটোর মতের বিরোধীতাও করেছেন। এ্যারিস্টটলের মতে, 'বাঁশি ও বীণার সঙ্গীতে দরকার হয় সুর সঙ্গতি ও ছন্দস্পন্দের।

এদের সঙ্গে যে, সকল শিল্পকলার সাদৃশ্য আছে, যেমন রাখালের বাঁশির, সেখানেও একথা সত্য। নৃত্য অনুকরণের মাধ্যম হচ্ছে ছন্দস্পন্দ, সেখানে সুরসঙ্গতির আবশ্যকতা নেই, কেননা এমনকি নৃত্যকলার মানুষের চরিত্র, কর্ম ও দুর্ভোগের অনুকরণ করে। '৪ এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এ্যারিস্টটল শিল্পকলার সংজ্ঞায় শিক্ষাগুরু প্লেটোর মত অনুসরণ করেছেন। কিন্তু তিনি শিল্পসাহিত্যকে মানব জীবনের এক প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে দেখিয়েছেন এবং তিনি এমতেও বিশ্বাসী যে, যতদিন মানুষ থাকছে ততদিন কাব্যকলারও বিনষ্টি নেই। তবুও তিনি প্লেটোর মতোই শিল্পসাহিত্যকে সততা ও নৈতিকতায় বেঁধে রাখার পক্ষে।

তাঁর মতে, শিল্পকলা যেহেতু মানব জীবনের অনুকরণ মাত্র, কাজেই তা হতে হবে সত্যনিষ্ঠ ও নৈতিক। তাই তিনি বলেছেন, 'হোমার কবি হিসেবে যেমন শ্রেষ্ঠ মিথ্যেবাদী হিসেবেও তেমনি। '৫ ‘কাব্যতত্ত্বে’ এ্যারিস্টটল পরবর্তীতে শুধুমাত্র ট্রাজেডি নিয়েই বৃহৎ আলোচনা করেছেন। যদিও সেই সময় সাহিত্যের কোন নামকরণ হয়নি৬। তবু সমগ্র শিল্পকলা নিয়ে তাঁর ব্যাপক আলোচনা দেখা যায় না।

এরকমও হতে পারে, তাঁর এই বিষয়ে আরও গ্রন্থ হয়তো ছিল যা আমাদের হাতে পৌছেনি। শিল্পকলার উপযোগিতা নিয়ে প্লেটো থেকে বর্তমান পর্যন্ত যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে আজও তার কোন সমাধান একটি সিদ্ধান্তে সমন্বয় হয়নি। তবু আমরা একটি সমাধান এভাবে করতে পারি যে, শিল্পসাহিত্য মানুষের মননের এক বিষ্ময়কর অনুযোজনা ও ইচ্ছাপুরণের মাধ্যম; মানুষের এই স্বাভাবিক প্রকৃতি, মানুষকে করে তোলে আনন্দ ও মানসিক তৃপ্তির এক সসমন্বয়, যাতে মানুষের মানবিক গুণ গুলোকে বিকশিত করে যথাযথভাবে। সুতরাং কলাকৈবাল্যবাদ মানুষের মানসিক উৎকর্ষে কতটা উপযোগিতা সৃষ্টি করেছে আমরা তার সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারবো বলে বিশ্বাস করি। কারণ আমরা এ কথা বলতে পারি যে, কাব্যের সত্য ও বাস্তবতার সত্যের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান।

পৃথিবীতে মানুষ বাস্তবতা বলে যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুকে দেখে তা স্থুল চোখে দেখা, কাব্য বা শিল্পকলার ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা রসাস্বাদনকেই বিলুপ্ত করে। তাই বলে অবাস্তব কল্পনায় শিল্পসৃষ্টি সম্ভব নয়। কাব্যের বাস্তবতা বস্তুর বাস্তবতার অতিরিক্ত আরও কিছু। এখানে বস্তু থেকেও বস্তুর অতিক্রান্ত মায়ার ব্যঞ্জনা কাব্যের বিষয়। শিল্পসাহিত্যের বিষয় সত্য, সুন্দর ও বিষ্ময়কে ঘিরে এক বহুমাত্রিক ভাবচিত্রের সম্মিলিত রূপ।

ফলে দেখা যায় কোন সাহিত্য-শিল্পকলায় বস্তু প্রত্যক্ষভাবে না এসে অপ্রত্যক্ষভাবে কল্পনায় প্রস্ফুটিত হয়। বস্তুর দৃশ্যমানতা বিমূর্ত রূপলাভ করে, অথবা প্রতীকী রূপে সাহিত্য রস সৃষ্টি করে। এ পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি স্মরণযোগ্য, তা হলো- ''বাহিরের জগৎ আমাদের মনের মধ্যে প্রবেশ করিয়া আর একটা জগৎ হইয়া উঠিতেছে। তাহাতে যে কেবল বাহিরের জগতের রঙ আকৃতি ধ্বনি প্রভৃতি আছে, তাহা নহে, তাহার সঙ্গে আমাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, আমাদের ভয়-বিষ্ময়, আমাদের সুখ-দুঃখ জড়িত-তাহা আমাদের হৃদয়বৃত্তির বিচিত্র রসে নানাভাবে আভাসিত হইয়া উঠিতেছে। এই হৃদয়বৃত্তির রসে জারিয়া তুলিয়া আমরা বাহিরের জগৎকে বিশেষরূপে আপনার করিয়া লই।

''৭ তবু রবীন্দ্রনাথ বাস্তবতাবাদ বলতে শুদ্ধতম বাস্তবকেই বুঝতেন। প্রমথ চৌধুরীও অনেকটা এরকমই মত পোষন করেন। বনফুলের 'শ্রীমধুসূদন' নাটকে নাট্যকারের কল্পনাজাত একটি দৃশ্যে বন্ধু গৌরদাসের স্বপ্ন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন, 'অমন একটা বাস্তব জীবনচিত্রের সঙ্গে স্বপ্নের অবতারনাটা গোঁজামিল হয়েছে। ' অবশ্য পরবর্তীতে বলেছেন, 'আমিতো মধুসূদনের জীবনচরিত লিখছি না, আমি নাটক লিখছি। শেষ দৃশ্যটা নাটকীয় হয়েছে কি না তাই বলুন।

'৮ আবার শেক্সপীয়ারের মতো নাট্যকার তাঁর নাটকে ভূত এনেছেন। ফলে সাহিত্যে শুদ্ধতম বাস্তবতা কতটা বাস্তব হয়ে উঠতে পারে আমরা তার কিছুটা অনুমান করতে পারি। আমরা আমাদের আলোচনার এই পর্যায়ে এসে দেখতে পাই যে, আসলে শুদ্ধতম বাস্তবতাবাদী পন্ডিতেরাও সত্যিকার 'শুদ্ধতম বাস্তবকে' নিয়ে নিজেরাই দ্বন্দ্বে পড়ে যান। এক্ষেত্রে কলাকৈবাল্যবাদ উঠে আসে তার সমস্ত রূপ নিয়ে, প্রকাশ করে বাস্তবকে অতিক্রম করে আরও এক অভিযোজনা; বাস্তবকে ধারন করেও ঠিক বাস্তবের মায়ায় এক নান্দনিক সৌন্দর্যকে কল্পনার ধ্রুব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ একটি শিল্প শুধুমাত্র শিল্পের জন্যই সৃষ্টি।

একটি কবিতা শুধুমাত্র ঐ কবিতাটির জন্যই রচিত হয়েছে। এখানে প্রকাশ পায় নন্দনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে মনস্তাত্ত্বিক রসায়ন। যদিও শিল্পবোধ স্থিরতর নয় তা স্থান ও কালভেদে পরিমার্জিত হয়। শিল্পসাহিত্যই শুধু নয়, বাস্তব পৃথিবীর সকল সুস্থ্য মানুষের কাছে সৌন্দর্যবোধ একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি; বাস্তব অনুসঙ্গ থেকে দৃষ্টিভঙ্গি পর্যন্ত এই বোধ কাজ করে। সৌন্দর্যবোধ বা সুন্দর এই প্রতীতীর অর্থ কি? কাকে সুন্দর বলা হয়! সুন্দর লাগে কেন? প্লেটো ও এ্যারিস্টটলের সত্যতা ও নৈতিকতা এখানে কতটুকু কর্যকর! অথবা 'শুদ্ধ বাস্তব' সব সময়ই কি সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারে? সৌন্দর্য একপ্রকার জৈবিক তাড়িত বোধ।

আমরা যদি সৌন্দর্যের একটা সংজ্ঞা দিতে পারি এভাবে, মানসিক প্রশান্তির নিমিত্তে যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপলদ্ধি উপস্থাপিত হয় তাই সুন্দর। সুন্দর যখন প্রায়োগিক ক্ষেত্রে অতিন্দ্রিয় অনুভূতি জাগিয়ে তোলে তখন তাকে সৌন্দর্য বলা যায়। যেমন চাঁদের সৌন্দর্য; এখানে চাঁদের সুন্দর উপস্থাপনই বলা হচ্ছে। সৌন্দর্যবোধ মানুষের মানসিক প্রবৃত্তি পরিতৃপ্তি ও পরিপুষ্ঠি লাভের মাধ্যমে প্রশান্তিবোধ করে এবং জীবনে নতুন উদ্যম লাভ করে। সুতরাং আমরা এখন একথা বলতে পারি যে, মানসিক প্রশান্তি ও জীবনের নতুন উদ্যমের জন্য সুন্দর ও সৌন্দর্যবোধটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; এখানে শুদ্ধতম বাস্তব, সত্যতা ও নৈতিকতার কোন রূপ সীমার বৃত্ত গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই।

কারণ কোন অপরাধের মধ্যে সৌন্দর্য থাকে না। আলোচনার মাধ্যমে আমরা এখন এই সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে, কলাকৈবাল্যবাদের ভিত্তি শিল্পকলাকে এমন এক সৌন্দর্যচেতনার পর্যায়ে নিয়ে এসেছে যা মনস্তাত্ত্বিক ও মানবীয় অপরিহার্যতাকে প্রকাশ করে। আমরা এই প্রবন্ধের অন্বিষ্ট বিষয়ে পৌছার আগেই এ পর্যন্ত আলোচনার পর কয়েকটি অনুসিদ্ধান্ত নিতে পারি। এগুলি হলো,- ১. সত্যতা ও নৈতিকতার সাথে সৌন্দর্যবোধের সমন্বয় থাকতে বাধ্য নয়। ২. শুদ্ধতম বাস্তব ব্যতিতও সৌন্দর্যবোধ সৃষ্টি করা সম্ভব।

৩. শিল্পকলার মানবীয় অপরিহার্যতা ৪. শিল্পকলার মনস্তাত্ত্বিক অভিব্যক্তি ও স্বাভাবিক সৌন্দর্যচেতনার সাথে সমাজের মিথস্ক্রিয়া সুদৃঢ়। সমাজের সাথে শিল্পসাহিত্যের যোগ সুদৃঢ়; এ ব্যপারে আমরা আগেও আলোচনার মাধ্যমে একটা অনুসিদ্ধন্তে পৌছার প্রায়াস নিয়েছি। শিল্প সৃষ্টির পেছনে সামাজিক উপযোগিতা রয়েছে, তা মানবীয় সত্ত্বার কারণেই। জৈবসত্তার সমগ্রতায় যেমনি মানুষের পরিচয় বিধৃত, ঠিক তেমনি মনবসত্তাকে লালিত করে যে অর্ন্তকাঠামো তা শৈল্পিক সত্ত্বা নিয়েই সমাজের একক হয়ে ওঠে। ব্যক্তি ও সমাজ স্বরূপে যেমনি ঐক্যসূত্রে গঠিত ঠিক তেমনি সমাজের একক হিসেবে ব্যক্তির মনসংযোগক্রিয়া প্রত্যক্ষভাবে শৈল্পিক দৃষ্টি সম্পন্ন।

ফলে সমাজের প্রতিটি এককের যে সৌন্দর্যবোধ বা যে শৈল্পিক চেতনা তা চাহিদাসূত্রেই প্রভাব বিস্তার করে সমাজের অধিকাংশ এককের নিকট। তবে এক্ষেত্রে তথ্য প্রবাহের প্রক্রিয়া৯ যতটা প্রত্যক্ষ ও অনুভূতিসঞ্জাত হবে, সমাজে তার বোধ ততটাই শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সুতরাং যা মানবীয় তাই সামাজিক হতে বাধ্য। তবে শিল্পকলার সামাজিক উপযোগিতা নিয়ে কিছু প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠি এখনও লক্ষ্য করা যায়। যারা আর্থ-সামাজিক দিক দিয়ে বিষয়ী ক্রিয়াকলাপের উর্ধে উঠতে পারেন না।

এছাড়াও কোন কোন দার্শনিক সমালোচক ও গবেষকও প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠতে পারে। তবুও মানবীয় গ্রহনযোগ্যতা সাহিত্যশিল্পকলার প্রতিটি ক্ষেত্রে। সমাজ মনোবিজ্ঞানী কার্ল ম্যানহাইমের মতে, ''আমরা সময় সময় সামাজিক গতিশীলতার বিরূদ্ধে সমষ্টিগত প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে থাকি। ঐ প্রতিক্রিয়া তাদেরই যাদের জীবনক্ষেত্রে ভুমিকা স্থিরবদ্ধ হয়ে গেছে। ''১০ তিনি আরও বলেন, ''যারা ব্যক্তির সিদ্ধির সামাজিক আয়তনের সঙ্গে পরিচিত নয়, যারা শুধু মানসিক প্রক্রিয়ার চুড়ান্ত ফসলই অবলোকন করে, জানে না কি করে ঐসব ফসলের জন্ম হয়, তারা সৃষ্টিশীল সিদ্ধির ব্যক্তিগত অংশকে সামাজিক অংশ থেকে পৃথক করে দেখার যোগ্য নয়।

''১১ সুতরাং মানতেই হয় মানবীয় গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে এবং কলাকৈবাল্যবাদী দর্শন নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন তাদের বিতর্ক, শিল্পের সৌন্দর্যবোধকে বৃত্তবন্দী করতে তৎপর। শিল্পকলার একটি সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি সমাজের প্রতিটি মানুষের নান্দনিক দৃষ্টি তাকে মননে ঋদ্ধ ও জীবনের প্রতি উদ্যমী করে তোলে। সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ আছে বলেই মানুষ বেঁচে থাকার আনন্দলাভ করে। শিল্পসাহিত্য এভাবেই মানুষ ও সামাজিক ক্রমোন্নতির পথকে সমৃদ্ধ করে থাকে। ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণ তত্ত্ব ইউরোপের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে মানসিক-বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে তার সবচেয়ে স্পষ্ট ছাপ আমরা শিল্পসাহিত্যে দেখতে পাই।

মানুষের মনের প্রভাব তার বহিঃজীবনের কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের যে সুপ্ত ইচ্ছা সবসময় লুকিয়ে থাকতো, তার প্রকাশ ঘটতে শুরু করলো ফ্রয়েডের 'মনোসমিক্ষণের ভূমিকা' নামের অভিজ্ঞতাবাদী মনোবিশ্লেষণ তত্ত্বের দ্রুত বিস্তারে। শিল্পসাহিত্যে 'শুদ্ধতম বাস্তব', 'সত্যতা ও নৈতিকতা'র বৃত্ত ভেঙ্গে ফেলে এই তত্ত্ব। ফ্রয়েডের এই মনোবিকলন তত্ত্বকে ঘিরেই শিল্পসাহিত্যের অন্যতম রীতি পরাবাস্তবতাবাদের সৃষ্টি হয়েছে। পরাবাস্তবতাবাদীরা তাদের শিল্পকর্মে যে পরাজগৎ নির্মান করেন তাকে অন্য অর্থে মনোবাস্তব বলা যায়, যা অর্ন্তমূলের পথ পরিক্রমন করে। পরাবাস্তবতাবাদের প্রথম প্রবর্তক আদ্রেঁ ব্রেতোঁ পরাবস্তবাতাবাদের ইশতেহারে বলেন, ''যা বিষ্ময়কর তা সবসময় সুন্দর, যা কিছু বিষ্ময়কর তাই সুন্দর, শুধুমাত্র বিষ্ময়করই সুন্দর।

''১২ এখানে দ্রষ্টা হতে হয় সবাইকে, তবে দ্রষ্টা হিসেবে কবি ও দার্শনিকের মধ্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য; কবি র্যঁবো জীবনটাকে বদলাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কার্ল মার্কস চেয়েছিলেন জগৎটাকেই বদলে ফেলতে। তবে কখনো কখনো কবি ও দার্শনিক একই অবস্থানে বাস করেন; দুজনেই দ্রষ্টা, দুজনেই স্বপ্ন দেখেন এবং স্বপ্নকেই সত্য বলে ধরে নেন। তবে কবির কাছে সে স্বপ্ন সৌন্দর্য পিয়াসী; বাস্তবতা এখানে প্রতীকী রূপে আসে শ্রেষ্ঠ সুন্দরের মাত্রা নিয়ে। তাই এ কথা বলা যায় যে, শিল্পসাহিত্যে সৌন্দর্যবোধ-ই মূখ্য আর বাস্তবতা তাতে যোগ হয় উপমার আলোকে, সেখানে সত্যতা ও নৈতিকতা বাধ্যতামূলক নয় এবং শুদ্ধতম বাস্তব তার শিল্পচেতনাকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে। ***** তথ্যসূত্র: ১ ইউরোপীয় সাহিত্যের সংস্পর্শেই আধুনিক বাঙলা সাহিত্য পল্লবিত হয়।

এর পাশাপাশি ঐ সকল শিল্পরীতি গুলোও বাঙলা সাহিত্যকে প্রভাবিত করে। ২ কলাকৈবাল্যবাদ অর্থাৎ শিল্পের জন্যই শিল্প। ইংরেজিতে যাকে বলে, Art for arts shake. দেখুন, কবীর চৌধুরী ; সাহিত্য কোষ ; শিল্পতরু প্রকাশনী, ২৯১ সোনারগাঁও রোড, ঢাকা-১২০৫। ৩ সত্যতা বা সত্য এখানে শুদ্ধতম বাস্তবের সমানুপাতিক হিসেবে ধরা হয়েছে। ৪ এ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব ; ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অনুদিত ও সম্পাদিত ; শিখা প্রকাশনী, ৩৮/৪ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

৫ এ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব'র ভূমিকায় ড. সিরাজূল ইসলাম চৌধুরী। ৬ এ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব ; প্রথম পরিচ্ছদ ; ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অনুদিত ও সম্পাদিত , শিখা প্রকাশনী, ৩৮/৪ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০। ৭ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , সাহিত্যের পথে , সাহিত্যের তাৎপর্য। ৮ সাহিত্য প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ , মনন , আজাহার ইসলামের 'সাহিত্যে বাস্তবতা থেকে। বাংলা একাডেমী।

৯ 'তথ্য প্রবাহের প্রক্রিয়া' বলতে এখানে শিল্পসাহিত্যের সামাজিক প্রবাহমানতাকে বোঝানো হচ্ছে। এমনকি সমাজে শিল্প কতটা প্রসারিত বা প্রচারিত তাকেও বোঝানো হচ্ছে। ১০ কার্ল ম্যানহাইম ; সংস্কৃতির সমাজতত্ত্ব ; অনু: রোহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর ; বাংলা একাডেমী, ঢাকা। ফুটনোট: পৃষ্ঠা-১১২। ১১ কার্ল ম্যানহাইম ; সংস্কৃতির সমাজতত্ত্ব ; অনু: রোহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর ; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

পৃষ্ঠ-২৯-৩০ ১২ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ; 'জীবনান্দ দাশ : তিমির হননে' প্রবন্ধ হতে ; সাহিত্য পত্রিকা ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ; মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সম্পাদিত; সপ্তবিংশ বর্ষ ; দ্বিতীয় সংখ্যা : বর্ষা ১৩৯১। সমাপ্ত  ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।