আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

পাকিস্তানের মুখোশ কি খসে পড়বে?



পাকিস্তানের মুখোশ কি খসে পড়বে? ফকির ইলিয়াস =========================================== যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চোখ এবার পাকিস্তানের দিকে। তিনি বলে দিয়েছেন, পাকিস্তানে বিন লাদেনের শক্ত সমর্থন ছিল। তিনি বলেছেন, পাক সরকারের উচিত, তা তদন্ত করে বের করা। তিনি আরো বলেছেন, কিভাবে পাকিস্তানে লাদেন লুকিয়েছিলেন তা খুঁজে দেখতে হবে। এদিকে আল-কায়েদা স্বীকার করেছে, বিন লাদেন শহীদ হয়েছেন।

তিনি আর বেঁচে নেই। তারা এটাও বলেছে, তারা এই রক্তের শোধ কড়ায় গণ্ডায় নেবে। আল-কায়েদার এই হুমকিকে খুব সিরিয়াসভাবেই দেখছেন বিশ্বের নেতারা। তারা বলেছেন, জঙ্গিদেরকে অবশ্যই মোকাবেলা করা হবে। বিন লাদেন হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহের মাঝেই ‘হত্যা কাহিনী’র ধরন বারবার পাল্টানো হয়েছে মিডিয়ায়।

মার্কিনি সেনা সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে ভিন্ন কথা। প্রথমে বলা হয়েছিল, লাদেন ফায়ারফাইটে মারা গেছেন। তারপরে বলা হয়েছে, লাদেন নিরস্ত্র ছিলেন। মার্কিনি মানবাধিকার সংস্থাগুলোই প্রশ্ন তুলেছে, একজন নিরস্ত্র মানুষকে কেন হত্যা করা হলো? তারা আরো বলেছে, পানামার লৌহমানব নরিয়েগাকে পানামা থেকেই ধরে এনেছিল মার্কিনিরা। এখনো নরিয়েগা আমেরিকার কারাগারেই আছেন।

লাদেনকে এভাবে ধরে এনে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো না কেন? একজন ব্রিটিশ ধর্মযাজক ড. রোয়ান উইলিয়ামস বলেছেন, এ হত্যা দুঃখের জন্ম দিয়েছে। এই যাজক মাত্র কদিন আগে ব্রিটিশ প্রিন্স উইলিয়াম ও কেট মিডিলটনের বিয়ে পড়িয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র যখন ৯/১১ হামলার সঙ্গে জড়িত বিন লাদেনের মৃত্যুকে ‘উদযাপনের’ জন্য জোর গলায় আওয়াজ তুলছে, ঠিক তখন একজন গির্জার যাজকের মন্তব্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যাজক উইলয়ামস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নীতির বিরোধিতাও করেছেন। তিনি বলেছেন, ন্যায়বিচার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এ সময়ে নিরস্ত্র লাদেনকে হত্যা করায় ‘বেশ অস্বস্তির’ মধ্যে ফেলেছে শান্তির পথকে। উইলিয়ামস বলেন, একজন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা সব সময়ই অস্বস্তিকর অনুভূতির জন্ম দেয়। প্রায় একই কথা বলেছেন আরেক আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুতে ব্যথিত হয়েছেন তিব্বতের এই ধর্মীয় গুরু। নোবেলবিজয়ী তিব্বতের এই আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব বলেছেন, ১১ সেপ্টম্বরের সন্ত্রাসী হামলায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হয় যা নিশ্চিতভাবে দুঃখজনক।

এ জন্য এই হামলার সঙ্গে জড়িত বিন লাদেনকে অবশ্যই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত ছিল। তিনি বলেন, মানুষ হিসেবে লাদেন সহমর্মিতা দাবি করেন। এদিকে এই ঘটনায় পাকিস্তান প্রশাসনে চলছে তোলপাড়। হঠাৎ করেই- গোয়েন্দা ব্যর্থতার জন্য চাপ, অন্যদিকে পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যেই ওয়াশিংটন এসেছেন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ সুজা পাশা। আল-কায়েদা নেতাকে হত্যাসহ সামগ্রিক বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান ওয়াশিংটনের কাছে তুলে ধরবেন সুজা পাশা।

এ নিয়ে মিডিয়াগুলো লিখছে নানা চমকপ্রদ রিপোর্ট। নিউজউইকের সহযোগী ওয়েবসাইট ‘দ্য বিস্ট’ জানিয়েছে, লাদেন হত্যায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের অভিযান ও আল-কায়েদা নেতার অবস্থান না জানার ব্যর্থতার জন্য সুজা পাশাকে সরিয়ে দেয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে সরিয়ে দেয়ার আগে সম্মানজনক বিদায়ের জন্য তিনি খুব শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইএসআই-এর এক শীর্ষ কর্মকর্তা ডেইলি বিস্টকে জানান পাশার পরিবারের সদস্যরাও চাচ্ছেন তিনি পদত্যাগ করুন। তার দু’কন্যা এ চাকরি করার বিপক্ষে।

পাশা নিজেও মনে করছেন সম্মানজনক উপায়ে বিদায় নিতে এটাই সবচেয়ে ভালো সময়। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, লাদেন ও তার এজেন্টদের সঙ্গে পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার যোগাযোগ ছিল। লাদেনের অবস্থান সম্পর্কেও জ্ঞাত ছিলেন তারা। পাকিস্তানের সাবেক কর্মকর্তা, বর্তমানে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসান আব্বাসের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি এমন সময় প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে, যখন লাদেনের অবস্থান জানতে না পারার দায়ে পাক গোয়েন্দাদের বিরুদ্ধে উঠেছে ব্যর্থতার অভিযোগ। মার্কিন প্রশাসন মনে করছে, স্বয়ং আইএসআই প্রধান আহমেদ সুজা পাশার সঙ্গেই যোগাযোগ ছিল লাদেনের।

এ-ও মনে করা হয়, পাক সেনাপ্রধান আশফাক পারভেজ কিয়ানিও লাদেনের অবস্থান জানতেন। পাকিস্তানে আহমেদ সুজা পাশাকে অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে মনে করা হয়। পাকিস্তানের কয়েকটি দৈনিকের খবরের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, লাদেনের সঙ্গে যোগাযোগের দায়ে পাকিস্তানের একজন প্রভাবশালী কর্তকর্তা পদচ্যুত হতে পারেন। তবে এই কর্মকর্তা সুজা পাশা কিনা, তা বলা হয়নি। মার্কিন কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে আল-কায়েদা জঙ্গিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন সুজা পাশা।

তারপরও ওয়াশিংটনে এসে সুজা পাশা কী বক্তব্য দেন, তা সময়ই প্রমাণ করবে। আরেকটি সংবাদ হাওয়ায় উড়ছে ঘটনার শুরু থেকেই। কারো কারো মতে, মার্কিনি গোয়েন্দারা পাকিস্তানের নিরাপত্তা স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ঐ অপারেশনের সময় নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিল। এ বিষয়ে প্রায় হুমকির সুরে কথা বলেছেন, পাক সেনা প্রধান জেনারেল কিয়ানি। আল-কায়দা নেতা লাদেন হত্যার পর দেশের ভেতরে মার্কিন অভিযানের ব্যাপারে নীরবতা ভেঙেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।

ভবিষ্যতে দেশের ভেতর আর কোনো অননুমোদিত মার্কিন অভিযান হলে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে কোনো ধরনের সহায়তা করা হবে না বলে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে তারা। পাক সেনাপ্রধান আশফাক কিয়ানি বলেছেন, আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আর কোনো হামলা হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ অভিযানের ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবো। তার এই হুমকি মার্কিন সিনেটেও পালে হাওয়া দিয়েছে। পাকিস্তানে মার্কিন সহায়তা বন্ধে, সিনেটে বিল উত্থাপন করা হয়েছে। ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান উভয় দলের বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা পাকিস্তানে সহায়তা বন্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন।

তারা বলেছেন, পাক সরকার হায়েনা জঙ্গিদের মদদ দেবে আর আমাদের আর্থিক সাহায্য পাবে, তা আর হতে দেয়া যায় না। এ বিষয়ে কংগ্রেসম্যান টেড পি বলেন যতোক্ষণ না পর্যন্ত পাকিস্তান প্রমাণ করতে পারে তারা মার্কিন জাতীয় শত্র“দের সহায়তা করছে না ততোক্ষণ পাকিস্তানে যে কোনো ধরনের মার্কিন সহায়তা বন্ধ করে দেয়া উচিত। কংগ্রেসম্যান ভার্ন ভাঞ্চম্যান, জন কালবারস, অ্যালেন ওয়েস্ট প্রভৃতি রিপাবলিকান দাবি করেন সহায়তা বন্ধ করে পাকিস্তানকে শাস্তি দেয়া উচিত। তবে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট অনেক নেতা মনে করেন এই মুহূর্তে পাকিস্তানে সহায়তা বন্ধ করা উচিত হবে না। এটা পাকিস্তানে জঙ্গি তৎপরতাকে আরো উস্কে দিতে পারে।

অবশ্য আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের অবস্থান জানতে ব্যর্থ হওয়ার ব্যাপারে নতুন করে তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি আশফাক পারভেজ কিয়ানি। পাক সরকার এখন যাই করুক না কেন, তাদের সহায়তায়ই অ্যাবাটোবাদে যে লাদেন ভালো তবিয়তে ছিলেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সামরিক একাডেমির কাছে অবস্থিত এই বাড়িটি আইএসআই-এর নজরে আসেনি, তা কোনো পাগলও বিশ্বাস করবে না। কিছু কিছু পাকিস্তানি যে এখনো ঠিক আফগানিস্তানের মোল্লা ওমরের শাসনই চাইছে, তা আমরা এখনো দেখছি। বিন লাদেন হত্যার প্রতিবাদে সেখানে বিক্ষোভ করেছে প্রায় দেড় সহস্রাধিক জঙ্গিপন্থী।

বেলুচিস্তান প্রদেশের রাজধানী কোয়েটা নগরীর কাছে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করেছে তারা। এ বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেয় জামায়াত-ই- ইসলামি, পাকিস্তান। এ সময় তারা যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা পদদলিত করে এবং পোড়ায়। রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ-সমাবেশও করে। বিক্ষোভ মিছিলে পাকিস্তানের প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা ফজল মোহাম্মদ বারাইখ বলেন, ওসামার মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জিহাদ বন্ধ হবে না।

ওসামা বিন লাদেন শহীদ হয়েছেন। তার রক্ত হাজার-হাজার ওসামার জন্ম দেবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় প্রভাবশালী ইসলামি ভাবধারার রাজনৈতিক দল জামায়াত-ই-ইসলামি (জেআই), যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে পাকিস্তানের সমর্থন ও সহযোগিতা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। জেআই প্রধান সৈয়দ মুনাওয়ার হাসান বলেছেন, মার্কিনিরা যেভাবে আমাদের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করেছে, তাতে তাদের প্রতি আর কোনো সহানুভূতি নেই। তিনি আরো বলেন, আমাদের প্রথম দাবি, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে পাকিস্তানকে সরে দাঁড়াতে হবে।

পাক কিছু নেতার এই যে হুমকি, তা এখন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। সিবিএস চ্যানেলে ৬০ মিনিট অনুষ্ঠানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বারাক ওবামা বলেন, লাদেনের সঙ্গে পাক সরকারের ভেতরে-বাইরে কেমন সখ্য ছিল তা আমরা খতিয়ে দেখছি। কারণ আমরা সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে বদ্ধপরিকর। ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের সিনেটর রিচার্ড লোগার বলেছেন, পাকিস্তানে এখনো অনেক জঙ্গি রয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এরা আফগানিস্তানে নিয়মিত যাওয়া-আসা করছে।

যোগাযোগ রাখছে তালেবানদের সঙ্গে। লোগার আরো বলেন, আমরা জানি পাকিস্তানের কাছে পরমাণু অস্ত্র আছে। ভয়ের কারণ হচ্ছে, এই পরমাণু অস্ত্র যদি কোনোভাবে তালেবান জঙ্গিদের হাতে পৌঁছে যায়! অতএব বুঝাই যাচ্ছে, একটা ফ্যাক্টরে পরিণত হয়েছে পাকিস্তান এখন মার্কিনিদের কাছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে তাই পাকিস্তানের জঙ্গিত্ববাদের মুখোশ উন্মোচনে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যর্থ প্রচেষ্টা চালানো এখন সময়ের দাবি। একই কথা বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের সমর বিশ্লেষকরাও।

১৯৪৭ এর পর থেকেই চরম শোষণ মনোবৃত্তিবাদী পাকিস্তানিরা যে আদতে একটি একগুঁয়ে জাতি তা ক্রমশই প্রকাশিত হচ্ছে। ধর্মের নামে এরা বাঙালি জাতিকে চোখ রাঙিয়েছে। এখন নিজেদের মধ্যেই ফেৎনা-ফ্যাসাদ করছে। আমার বারবারই জানতে ইচ্ছে করে, নিজ প্রজন্মকে আঁধারের গহ্বর থেকে উদ্ধার করতে পাক নেতারা রুখে দাঁড়াচ্ছেন না কেন? -------------------------------------------------------------------------------- দৈনিক ভোরের কাগজ/ ঢাকা/ ১৪ মে ২০১১ শনিবার প্রকাশিত ছবি- লি সান

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.