আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

লিমনের জন্য নাগরিক তহবিল

সমাজকর্মী

নিশাত জাহান রানা, কনক বর্মণ, অদিতি ফাল্গুনী, আহমেদ জাভেদ রনি, তুহিন দাস তন্ময় হ্যারিস, শুভ্রনীল সাগর, বাকি বিল্লাহ, মফিজুল হক, আখতারুজ্জামান আজাদ মনোয়ার মোনা, নূরুল হক, নূরুজ্জামান মানিক কথায় বলে, যে ঘুমিয়ে থাকে তাকে জাগিয়ে তোলা যায় কিন্তু যে জেগে ঘুমায়, তাকে জাগিয়ে তোলা সত্যিই খুব কঠিন। যদিও হাইকোর্ট থেকে লিমনের জামিনের আবেদন মঞ্জুর হওয়ার সুসংবাদ এসেছে, তবু গত ২৩ মার্চ র‌্যাবের গুলিতে আহত ও পঙ্গু হয়ে যাওয়া কলেজছাত্র লিমনকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই রিলিজ করে নিয়ে বরিশালের ঝালকাঠিতে কারাগারে প্রেরণ, আদালতে বিচারের জন্য তোলা, জেলখানা ও হাসপাতালে কর্তিত পা ১৬ বছরের 'সন্ত্রাসী' লিমনকে নিয়ে টানাহেঁচড়ার যে নাটক গত এক মাসের বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে, তা নূ্যনতম মানবিকতাবোধসম্পন্ন আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের পক্ষে সহ্য করা সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বরিশালের ঝালকাঠির রাজাপুরের এক ১৬ বছরের দরিদ্র কিন্তু মেধাবী কিশোর লিমন যে কি-না কখনও গরু চরিয়ে আবার কখনও ইটভাটায় কাজ করে এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছিল; চেয়েছিল ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবে... তাকে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে শুধু লাল জামা পরা দেখে 'র‌্যাবে'র অফিসাররা গ্রামবাসীর সাক্ষ্যের বিপরীতে গিয়ে পায়ে গুলি করেছে। ২৫ মার্চ রাতে লিমনকে ঢাকায় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকরা ওর বাঁ হাঁটুর নিচের অংশ কেটে ফেললেন।

সেখানেই শেষ হলো না নিষ্ঠুরতা। যে লিমনের ব্যাপারে র‌্যাবের মহাপরিচালক শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে, এই লিমন সন্ত্রাসী ছিল না এবং তার সঙ্গে যা করা হয়েছে তা ভুলক্রমে করা হয়েছে (দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ এপ্রিল ২০১১), সেই লিমনকেই ৩ মে মঙ্গলবার রাতে ঝালকাঠির জেলা কারাগারে পাঠানো হলো। মহাপরিচালকের নিজ মুখে স্বীকারোক্তির পরও এই ১৬ বছরের শিশুর বিরুদ্ধে ২৪ এপ্রিল নিজের কাছে অস্ত্র রাখার অপরাধে মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়। তারপর গত ৩ মে র‌্যাবের দায়ের করা অস্ত্র আইন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (রাজাপুর থানার এসআই) আরিফুল ইসলাম সকাল ১১টায় ঢাকা থেকে সড়কপথে লিমনসহ রওনা দিয়ে সন্ধ্যা ৭টায় ঝালকাঠিতে পেঁৗছেন। এরপর তাকে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়।

এ সময় পুলিশ লিমনকে কারাগারে পাঠানোর আবেদন জানায়। লিমনের পক্ষের আইনজীবীরা তার সুচিকিৎসার আবেদন জানালে বিচারক রাত পৌনে ৯টায় তাকে কারাগারে পাঠান। যা হোক, ৪ মে তাকে বরিশাল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন কিন্তু একটিই : কেন এত কিছু? র‌্যাবের মহাপরিচালক নিজ মুখে ভুল স্বীকারের পরও এই নিষ্পাপ কিশোরকে নিয়ে আর কত মরণ খেলা? এদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান খান গত ৪ মে বিডিনিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, 'একজন রোগীকে কোনো চিকিৎসক কি রাতের আঁধারে ছেড়ে দিতে পারেন? বিচারকদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, 'লিমন একজন কিশোর। তাকে সরাসরি কারাগারে পাঠানো যায় কি-না? পাঠানো গেলে আইনের কোন ধারা অনুযায়ী তাকে কারাগারে পাঠানো হলো?' পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ভিকটিম লিমনের নিজের বয়ানে, 'পায়ে এখনও ব্যথা আছে।

কেটে ফেলা বাঁ পা থেকে রক্ত পড়ছে। আমি ন্যায়বিচার পেলাম না। এ অবস্থায় কীভাবে জেলে থাকব? নিরপরাধ হয়েও আমাকে জেলে যেতে হচ্ছে। ' গত কয়েক বছর ধরে র‌্যাবের পর্যায়ক্রমিক নানা নিষ্ঠুরতার 'মুকুটে (?)' সর্বশেষ যুক্ত পালক হলো লিমনের এই পঙ্গু হওয়ার ঘটনা। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের খুব সাধারণ কয়েকজন নাগরিক হিসেবে সরকার, মিডিয়া, মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিকদের কাছ থেকে পাওয়া কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরতে চাই : ক. লিমনের জন্য একটি 'নাগরিক তহবিল' গঠন করা হোক।

এই তহবিলের অর্থ থেকে যেন তাকে প্রয়োজনীয় একটি কৃত্রিম পায়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায় ও সেই সঙ্গে এইচএসসি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত তার পড়াশোনার খরচ চালানো যায়। দেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নাগরিকরা যদি তাদের মাসের বেতনের একদিনের সমপরিমাণ অর্থ এই তহবিলে দান করেন, তাহলেও তো লিমনের চিকিৎসা এবং পড়াশোনার খরচ উঠে আসে। দৈনিক কোনো পত্রিকা কর্তৃপক্ষ যদি এই 'নাগরিক তহবিল' গঠন ও তহবিলে লিমনের নামে জমা অর্থের পরিমাণ, দাতার নাম (দাতার ইচ্ছানুসারে) প্রকাশ করে তাহলে এ বিষয়ে স্বচ্ছতা যেমন রক্ষা হবে, তেমনি এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়বে। লিমনের নামে প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থও জমা পড়বে। খ. যেসব 'মানবাধিকার' বা 'উন্নয়ন' প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা দেশে এনে কাজ করে, সেসব সংস্থার একটিও কি লিমনকে একটি চাকরি দিতে পারে না? এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিনের সংবাদপত্র পড়া ও প্রয়োজনীয় খবর নথিবদ্ধ করার মতো কাজে অনেক সময় এসএসসি বা এইচএসসি পাস বা পাঠরত তরুণ-তরুণীদের চাকরি দেওয়া হয়।

তেমনি একটা চাকরি পেলেও জীবনে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে লিমন। ইদানীং নাগরিক তরুণ সমাজের ভেতর জনপ্রিয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং (ফেসবুক, টুইটারিং প্রভৃতি) সাইট, বিভিন্ন বল্গগিং সাইট থেকে দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে দেখেছি। র‌্যাবের প্রশ্নে আমরা কি নীরব থাকব? ফেসবুকে আমরা এ দেশের কিছু সচেতন নাগরিক 'সেভ লিমন অ্যান্ড প্রটেস্ট অ্যাট্রোসিটিস অব র‌্যাব' নামে একটি গ্রুপ খুলেছি। এই গ্রুপের পক্ষ থেকে আগামী শুক্রবার অর্থাৎ ১৩ মে র‌্যাবের হাতে পঙ্গু কিশোর লিমনের অন্যায় কারাবরণ ও তার বিরুদ্ধে পরিচালিত মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে একটি মানববন্ধন আহ্বান করা হয়েছে। আজ আরব বিশ্বে ফেসবুক বিপল্গব ঘটিয়ে দিচ্ছে।

আমরা কি পারি না তথ্যপ্রযুক্তি সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে লিমনের পাশে দাঁড়িয়ে দেশে র‌্যাবের বিরুদ্ধে বিবেকবান মানুষদের অভ্যুত্থান ঘটাতে? গ. রাষ্ট্রের নাগরিকদের নির্বিকার ও নির্বিচার হত্যাকারী এলিট ফোর্স র‌্যাবকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা প্রশ্নে সত্যিই কতটুকু দরকার সে বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক মহল, দেশে সক্রিয় মানবাধিকার কমিশন, মানবাধিকার সংগঠনসহ সবাইকে ভেবে দেখতে ও প্রয়োজনীয় সংলাপের সূচনা করতে অনুরোধ জানাই। র‌্যাবকৃত বিগত কয়েক বছরের সব অন্যায় ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যথাযথ তদন্ত অবিলম্বে শুরু হোক। ঘ. লিমনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক। ঙ. দোষী র‌্যাব কর্মকর্তাদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হোক। লেখকগণ সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী, উন্নয়ন কর্মী সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যকর্মী।

এছাড়া সবাই 'সেভ লিমন অ্যান্ড প্রটেস্ট অ্যাট্রোসিটিস অব র‌্যাব' গ্রুপের সদস্য

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.