আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ঠোঁটের কাছাকাছি



গুলশানের পিজা কর্নারের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন এক ব্যক্তি। আমি তাকে চিনি না। অযাচিতভাবে আমি তাকে প্রশ্ন করলাম- দিনে কয় প্যাকেট সিগারেট খান ভাই?লোকটি বলল,দুই প্যাকেট। আমি বললাম,দুই প্যাকেটের দাম কত?লোকটি বলল,২২০ টাকা। আমি বললাম,কখনও হিসাব করে দেখেছেন প্রতিদিন ২২০ টাকা হলে সিগারেটের পেছনে মাসে কতো,বছরে কতো টাকা খরচ হয়?লোকটি রেগে গিয়ে বলল,এতো কথা বলেন কেন?আপনার সমস্যা কি?আমি হেসে বললাম,রাগ করেন কেন ভাই?আপনার ভালোর জন্যই বলছি।

ভেবে দেখেন সিগারেটের টাকা গুলো জমালে আপনিও ৫ বছরে এ রকম একটা পিজা কর্নারের মালিক হতে পারতেন!লোকটি একটু হেসে বলল,আমিই এ পিজা কর্নারের মালিক! কোনও নারীর যৌন আবেদন বাড়িয়ে তুলতে তার মুখের দু'টি জিনিস সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে। এক চোখ এবং দুই ঠোঁট। যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রীর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দু'টির নাম লিপস্টিক এবং কাজল। পুরুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে কাজল জড়ানো চোখ দু'টিই এককালে ছিল মেয়েদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। মিশরের রানী ক্লিওপেট্রার প্রসাধনপ্রীতির কথা তো আজ সবাই জানে।

গাধার দুধে গোছল করে ত্বকের ঔজ্জল্য বাড়াতেন তিনি। গ্রিক নারীরা অন্য প্রসাধনী খুব একটা ব্যবহার না করলেও লিপস্টিকের মোহ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। রোমানদের মধ্যে শুধু অভিজাত সম্প্রদায়ের মহিলারাই লিপস্টিক ব্যবহার করতেন। ইতিহাসবিদরা বলেন,তখনকার ফ্যাশনেবল পুরুষরা নাকি যুদ্ধে যাওয়ার আগে ঠোঁটে নীল রং লাগাতেন!'ব্রেভহার্ট' সিনেমায় স্বয়ং মেল গিবসনকেও এই সাজে দেখা গিয়েছে। ১৬৬০ সাল থেকে শুরু করে ১৭৮৯ সাল পর্যন্ত ফরাসি এবং ইংরেজদের লিপস্টিক প্রীতির কথা তো সারা দুনিয়া ছড়িয়ে পড়েছিল!গোলাকার মুক্তোর মতো ঠোঁট তখন আদর্শ ছিল।

একবিংশ শতকের শুরুতে লিপস্টিক তার বর্তমান চেহারা পায়। গারলেন নামে একটি ফরাসি কোম্পানি প্রথম এই ধরনের লিপস্টিক বাজারে আনে। ইউরোপের সমস্ত বড়-বড় দোকানে তখন পাওয়া যেত গারলেন কোম্পানির লিপস্টিক। গারলেন ছাড়াও জনপ্রিয় হয়েছিল স্কভিল এবং মরিস লেভির লিপস্টিক। ১৯২০ সাল নাগাদ শুরু হয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নকল করে সাজগোজের যুগ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর একটি প্রবন্ধে লেখা হয় যে,যুদ্ধের কারণে যে সমস্ত জিনিসের ভান্ডারে টান পড়ে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল লিপস্টিকের। মহিলারা মূলত লাল রং পছন্দ করলেও টিনএজ'রা গোলাপি। ব্রাউন ইত্যাদি শেডও পছন্দ করে। পেল মেকআপ,ন্যুড মেকআপ বা জম্ভি মেকআপের যুগেও লিপস্টিক কিন্তু স্বমহিমায় রয়ে গিয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের আগ পর্যন্ত পানের রসে ঠোঁট রাঙানোই চল ছিল।

সত্য কথা বলতে কি,লিপস্টিক ব্যবহারের মধ্যে আছে গৃঢ় যৌন রহস্য। এখন অবশ্য লিপস্টিকের রঙে এসেছে হরেক বৈচত্র। লিপস্টিক-এ ব্যবহার করা হয়,টাইটানিয়াম অক্সাইড,অলিভ ওয়েল,ক্যাস্টর ওয়েল,কোকো বাটার,ল্যানোলিন এবং প্রেট্রোলিয়াম জেলি। আবার কিছু লিপস্টিকে সিটাইল অ্যালকোহলও ব্যবহার করা হয়। সঠিক রঙের লিপস্টিকই ফুলিয়ে তুলে নারীর ব্যক্তিত্ব।

ইদানিং লিপস্টিক তৈরিতে অনেক ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। প্রতিদিন লিপস্টিক ব্যবহারের ফলে ঠোঁট কালো হয়ে যায়। তাই অনেক জায়গায় এখন তৈরি হচ্ছে ভেষজ লিপস্টিক। শুধু মাত্র আমেরিকায় লিপস্টিক ইন্ডাষ্ট্রির বার্ষিক টার্নওভার 'মাত্র' ১.৫ বিলিয়ন ডলার!আর ভারতে এর টার্নওভার 'মাত্র' ১১৬ কোটি টাকা!বিজ্ঞাপনে ক্রমাগত দেখানো হয় কীভাবে কোন রঙের লিপস্টিক লাগালে এভরিবডি উইল ওয়ান ইউর লিপ এভরি ডে। বাচ্চা মেয়ে গুলোর সব সময় মায়ের লিপস্টিকের দিকে নজর!এখান থেকেই তো বোঝা যায়,ওষ্ঠরঞ্জনীর মায়াজাল কোথায়-কোথায় বিস্তার করেছে নিজেকে "ঠোঁটের অল্প ফাঁকে যতটুকু কলরোল-- যতখানি নীরবতা নত হয়--- ভুরুর আলস্য-ঘেরা কৃষ্ণপক্ষ জলে--- আমি সেই খোলামেলা রূপ নিয়ে ডুবে যাই, ঢেউয়ের সংসার পালকে রচনা করি, নির্মাণের খুব কাছে এসে ভেঙে ফেলি আবার গড়ার হঠকারিতায়, " [ কবিতা : প্রিয়তমাসু / মণিভূষণ ভট্টাচার্য ] এরপর যখন কোনও চকচকে কাগজে ছাপা মন-ভালো-করে দেওয়া ম্যাগাজিন খুলবেন,লক্ষ্য করে দেখবেন সবচেয়ে আগে কোথায় আটকায় আপনার চোখ।

বাজি ধরে বলতে পারি,কোনও লিপস্টিক কোম্পানির বিজ্ঞাপনে সুন্দরীর ঈষৎ ফুলে ওঠা লাল রঙের ঠোঁট দু'টো আপনার চোখ কেড়ে নেবেই। যদি না নেয়?দূর,তাহলে আপনি- মস্ত বড় আঁতেল!

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.