আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

দুর্নিতিগ্রস্থ গবেষনা কর্মঃ প্রয়োজন একটি বিশ্বাস যোগ্য গবেষনা পদ্ধতি

নিজেকে হয় নাই চেনা

দুনিয়ার যে প্রান্তেই যাবেন সে প্রান্তেই দেখবেন লোকে দুর্নিতির বিপক্ষে নাক ছিটকাচ্ছে, ঘৃনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে, এবং এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। আবার এদের কেউই দুর্নিতির কবল থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। আমি আজ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছি এই যুগের কোন ব্যাক্তি খুজে দিতে পারবেন নে যে কিনা কোন দিন বিন্দু মাত্রও দুর্নিতি করেন নি বা দুর্নিতির সুফল ভোগ করেন নি। আশির দশকে বা তার আগে যারা জন্ম গ্রহন করেছেন তাদের নিরান্নব্বই ভাগ মেট্রিক পরিক্ষার সময় জন্ম তারিখে হালকার উপ্রে ঝাপসা এডিট মেরেছেন। এর পর বাসের টিকিট কাটতে গিয়ে বা কোন কাজে গিয়ে যখন দেখলেন বিশাল লাইন তখন একেবারে সামনের দিকেই কোন এক পরিচিত বা বন্ধুর উপস্থিতি আবিষ্কার করে তার কাছে গিয়ে আকারে ইঙ্গিতে আরেকটা অতিরিক্ত টিকিট কাটার ইশারা দিয়া চামের উপর কেটে পড়েছেন।

আমলা তান্ত্রিক ঝামেলা এড়াতে অনেকেই সরকারি মহলে পরিচিত জনের সুবিধা নিতে কসুর করেন নি। এভাবে বলতে শুরু করলে কোন লোক দুর্নিতির ফায়েদা হাসিলের চরম রস আস্বাদনের কালিমা থেকে রেহাই পাবেন বলে মনে হয় না। প্রগতি আর মডার্ন যাই বলেন এই সিস্টেমটাকে এমন ভাবেই তৈরী করা হয়েছে যে বাই ডিফল্ট দুর্নিতি মানুষ করবেই করবে। তা নাহলে সে চিরকাল বঞ্চিতই থেকে যাবে। সাধু সেজে যিনি বসে থাকবেন তিনি নিজের পায়েই কুড়াল মারবেন।

দুর্নিতি এখন আর অপরাধ নয় এখন এটা সুযোগে পরিনিত হয়েছে। অপারচুনিটি যাকে বলে আরকি! সরকারকে কম ট্যাক্স দেয়ার জন্য বড় বড় ব্যাবসায়িক কোম্পানি গুলো তাদের নেট প্রফিট থেকে সম্পদের অবচয় বাদ দিয়ে টেক্স গননা করে আবার সেই অবচয় নেট প্রফিটের সাথে যোগ করে দেন। যারা একাউন্টিং এ পড়েন তারা ভালো বুঝবেন। এটা একটা আইনত স্বিকৃত দুর্নিতী। কলেজ ইউনিভার্সিটি গুলোতে এইটা খুব দাপটের সাথে একটা অলঙ্ঘনীয় রুলস হিসেবে পড়ানো হয়।

মাশাল্লাহ, আমাদের মানব জাতি এই রুলটা কোন দিন ভেঙ্গেছে বলে রেকর্ড নাই। কারন ভাংলেই সরকারকে ট্যাক্স দিতে হবে বেশী। বিশ্বের কলেজ ইউনিভার্সিটিগুলোতে দেদারসে রিসার্চ বা গবেষনা হচ্ছে। জার্নালের পর জার্নাল পাবলিশ হচ্ছে। কোন টিচার বছরে নির্দিষ্ট পরিমান জার্নাল পাবলিশ না করলে তার প্রমোশন হবে না নিশ্চিত।

এইখানেও দুর্নীতি কম হচ্ছে না। একটা জার্নাল পাবলিশ করা চাট্টিখানি কথা নয়। আর বছরে একের অধিক তো আরও টাফ। তাই টিচাররা নিজেদের মাঝে লিয়েজো করেন। তারা কোন আর্টিকেল পাবলিশ করলে সুসম্পর্কিয় কলিগের নামটা নিজের নামের সাথে জুড়ে দেন।

যেমন একজন টিচার একটা আর্টিকেল পাবলিশ করলেন, তিনি তার নামের সাথে আরও পাঁচ জনের নাম জুড়ে দিলেন আর সাথে সাথে সেই পাঁচ জনকে জানিয়ে দিলেন, “স্যার আপনের নামটা আমার আর্টিকেলে জুড়ে দিলাম আমারে মনে রাইখেন” টিচাররা আবার অতটা নেমক হারাম নন। আজীবন ছাত্রদেরকে এথিক্স শিখাইতে শিখাইতে উনারা অত নীচে আর নামার সুযোগ পান না। তাই তিনারা আবার যখন কোন জার্নালে আর্টিকেল পাবলিশ করেন ঐ টিচারের নামটা জুড়ে দিতে কসুর করেন না। এভাবেই এক এক জন টিচারের বছরে বহু আর্টিকেল পাবলিশ হয়ে যায়। অথচ তারা নিজেরাই জানেন না ঐ আর্টিকেলে কি বলা হয়েছে।

এখন টিচাররা যে আর্টিকেলখানা নিজেদের নাম ফাষ্ট অথারে রেখে প্রকাশ করেন তা যে তিনি নিজে রাত জেগে কষ্ট করে তোইয়ার করেছেন তা কিন্তু সব সময় ঘটে না। ছাত্রদের মধ্যে যারা ভালো প্রতিষ্ঠানে মাষ্টার্স বা পি এইচ ডি করতে চায়, তাদের আবার ভালো কিছু পাবলিকেশন থাকা লাগে। এই জন্য তারা অনেক কষ্ট করে কোন মতে আর্টিকেল গুলো লেখেন। কিন্তু এই আর্টিকেল প্রকাশ করতে যে টাকা লাগবে সেই টাকা তো ছাত্রদের নাই ই তার উপর নামের জোর নাথাকায় সেটা পাবলিশ না হওয়ার সম্ভাবনাই থাকে বেশি। তাই অগ্যতা টিচারদের কাছে যাইতে হয়।

তারা পেপার খানা নিয়া হালকা দিক নির্দেশনা আর ভুল সংশোধন করে দেন, ব্যাস তাতেই কর্ম সারা, ঐ টিচারই বনে গেলেন ফার্ষ্ট অথার। এক একটা পাবলিকেশন বা আর্টিকেল কে এক একটা গবেষনা পত্র বলতে পারেন। এই গবেষনায়ও আছে বিশাল দুর্নিতীর সুযোগ সুবিধা। মনে করুন আপনি প্রমান করতে চান যে “একদা মানুষ ঘাস খাইতো” ব্যাস খুজে খুজে বের করুন আগে কোন আর্টিকেলে কোন লেখক এরকম কথা বলেছে কিনা। এর বীপরিত কথা পাইলে চোখ বুজে এড়িয়ে যান, তা না হলে আপনি যা প্রমান করতে চান তা তো হবে না।

তবে কয়েকটা বিপরিত পয়েন্ট উল্লেখ করে হালকা দুই চারটা যুক্তি দিয়ে সেটা উড়িয়ে দিলে সেটা আরও ভালো হয়। এতে বায়াসনেসটা অনেকটাই ঢাকা পড়ে যায়। আবার কেউ যদি চায় যে না “মানুষ জীবনে ঘাস খাওয়া তো দুরের কথা চেখেও দেখে নাই” সেইটাও প্রমান করতে পারবেন। অহরহ রেফারেন্স পাবেন। কোন সমস্যা নাই।

এই জন্যই আমাদের গোটা মানব জাতি আজ মাতালের মত ঘুর পাক খায়। এই স্কলার বলে সুর্য পশ্চিম দিকে উঠে পুর্ব্ দিকে অস্ত যায়, আমার কাছে এই এই প্রমান আছে এবং অমুক অমুক স্কলার এই এই সালে এভাবে এই পক্ষে ঐ আর্টিকেলে বলেছেন। অতএব এইটাই সত্য। ব্যাস এইবার কিছু জনগন এইটা নিয়াই পড়ে থাকলো। কিছুদিন পর আরেক স্কলার আসে বললেন নাহ, সুর্য পুর্ব দিকে উঠিয়া পশ্চিম দিকে অস্ত যায়।

আমার কাছে এই এই প্রমান আছে এবং অমুক অমুক স্কলার এই এই সালে এভাবে এই পক্ষে ঐ আর্টিকেলে বলেছেন। অতএব এইটাই সত্য। এবার আরও কিছু লোক এই নিয়া পড়ে থাক্লো। এভাবেই চলছে। আপনি যেকোন বিষয়ে হালকা ঘাটাঘাটি করে দেখুন দেখবেন একেবারে সম্পুর্ন ভিন্ন মতাবলম্বি গবেষনাপত্র পাবেন।

উভয়ই কিন্তু গবেষনা করেছেন কেউ কবুতরের মত শুধু বক বক করে যান নি বা শুধু গরুর রচনা লিখে যান নি। গবেষোনার উদ্দেশ্য হলো সত্যকে খুজে বের করা। আর সত্য সর্বদাই এক রকম হয়। সত্যের চেহারা কখনই দুই রকম হয় না। কিন্তু আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনোইতিক ও আদর্শিক যত গবেষনা আজ অবধি হয়েছে সবগুলিরই বীপরিত গবেষনালব্ধ ফলাফল আমাদের কাছে বিদ্যমান।

আর এজন্যই আমাদের কেউ ধার্মিক, কেউ অধার্মিক আবার কেউ নাস্তিক, কেউ আস্তিক। কেউ ডান পন্থি আবার কেউ বাম পন্থি। এ পথ ওপথের জ্বালায় দিশাহারা হয়ে কেউ কেউ অবশ্য নিরপেক্ষ বলে এক দিকে সরে থাকলেও তারা আবার জন্ম দিয়েছেন আরেক ধুয়াশার। এভাবেই হাজার হাজার ভাগে বিভক্ত মানবজাতি। ধর্মিয় ফিল্ডেও এরকম কায় কারবার চলছে হরদম।

ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে আছে এরকমই ধুয়াশা, কেউ কেউ বলেছেন কনভেনশনাল ব্যাংক গুলো যে সুদ দেয় ওটা জায়েজ আছে, কউ বলেন নাহ ওটা হারাম বরং ইসলামী ব্যাংকিংএরটাই জায়েজ, আবার কেউ বলেন কোনটাই জায়েজ নাই। সবগুলোই হারাম। এদের সবার কাছেই কিছু না কিছু যুক্তি আছে। আবার দেখুন অমুক দল আসলেই ইসলামিক কি না তা নিয়েও আছে বিরাট হুলুস্থুল কান্ড। কে কারে পথ ভ্রষ্ট বলতে পারবে তাতেই যেন সকল সফলতা নিহিত আছে।

সবাই কিন্তু কোরান হাদিস দিয়েই প্রমান করে দেন যে “ঐ দল হল মুরতাদের দল” এখন আপনি আমি যামু কই? এবার আসল রহস্যের কথা বলি, আসলে কেন এমন হচ্ছে, গবেষনার মুল জিনিস হলো ইনফরমেশান বা নলেজ (জ্ঞান)। বিভিন্ন উৎস থেকে নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কিয় ইনফরমেশন বা জ্ঞান নিয়ে একটা সিধ্যান্তে আসা হয়। এখন আমাদের দেখা উচিৎ আমাদের চারিপাশে কত পরিমান ইনফরমেশন মজুদ আছে। নিঃসন্দেহে এই পরিমানটুকু পরিমাপ করার সাধ্য মানব কুলের নাই। এর পুরাটা কোন একার পক্ষে আহরন করাও সম্ভব নয়।

তাই আমাদের এই জ্ঞানের সিমাবদ্ধতাকে কাজে লাগানো হচ্ছে। সকল ধরনের ইনফরনমেশন মজুদ আছে, আপনি যে সিধ্যান্তে পৌছাতে চান সেই রকম ইনফরমেশন গুলো বেছে বেছে নিন। তার পর একসাথে সব গুলোকে দক্ষতার সাথে জোড়া দিন। ব্যাস আপনার গবেষনার কাংখিত ফলাফল অর্জিত হয়ে যাবে সন্দেহ নাই। একই কথা প্রজোয্য ইসলামিক ক্ষেত্রেও, ইসলাম একটি বিশাল জ্ঞানের ভান্ডার, একটি জ্ঞানের দরিয়া।

এ জ্ঞানের দরিয়া পাড়ি দেয়ার সাধ্যি কারো নাই। তাই যার যেমনে ইচ্ছা সিলেক্টিভ কিছু আয়াত ও হাদীস কোট করে একটা ফতোয়া জারি করে দিলেই হল। আপনার পাশে পাবেন হাজারো লোক। যারা আত্বঘাতি বোমা হামলা চালিয়ে ইসলাম ও জিহাদ কে কলংকিত করেছে তারা কিন্তু কতগুলো সিলেক্টিভ আয়াত ও হাদীসের অপব্যাবহারেই এমনটা করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের ব্লগীয় গবেষনা সহ প্রায় সকল গবেষনা এই ওয়েষ্টার্নাইজ পদ্ধতিতে চলছে যার কারনে আমাদের গবেষনালব্ধ জ্ঞানের তোড়ে আমরাই বিভাজিত হচ্ছি।

তাই এখনই সময় আমাদের গবেষনার স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট খুজে বের করে সেই খানে ফিরে যাওয়া, যেখানে একটি বিশ্বাস যোগ্য গবেষনা পদ্ধতির সন্ধান মিলবে।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।