আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মপক্ষতা ও ধর্মবিপক্ষতা- ইঞ্জিনিয়ার আবু রামিন সম্পাদিত

মিথ্যার পতন সন্নিকটে.......... প্রারম্ভ: ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বলতে এমন একজন ব্যক্তিকে বুঝা যায় যিনি ধর্মের পক্ষেও নন; বিপক্ষেও নন। আর ‘ধর্মপক্ষ’ শব্দটি নতুন হলেও এর দ্বারা এমন ব্যক্তিকে বুঝানো হচ্ছে- যিনি ধর্মের পক্ষে। অনুরূপভাবে, ‘ধর্মবিপক্ষ’ শব্দটি দ্বারা এমন ব্যক্তিকে বুঝানো হচ্ছে- যিনি ধর্মের বিপক্ষে। ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মনিরপেক্ষতা: ইংরেজি Secular এবং Secularism শব্দের বাংলা করা হয়েছে যথাক্রমে ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। সাম্প্রতিক যে কোনো বিখ্যাত অভিধানে শব্দগুলোর অর্থ খুঁজলে বুঝা যায়- Secular বা ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং যিনি ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা ও পবিত্রতার বিরোধী।

আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হচ্ছে সেই রাজনৈতিক বা সামাজিক দর্শন, যা সকল ধর্মবিশ্বাসকেই প্রত্যাখ্যান করে। ধর্মনিরপেক্ষ মানেই অন্তত ধর্মের পক্ষে নয়: দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি যেমন কোনো দলের অন্তর্ভুক্ত নন, ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিও তেমনি কোনো ধর্মের অন্তর্ভুক্ত নন। কার্যক্ষেত্রে সংশয়বাদী ও নাস্তিক যেমন এক, তেমনি ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মহীন ব্যক্তিও এক: আল্লাহর অস্তিত্বে সংশয়বাদী ব্যক্তি নাস্তিকের মতোই আল্লাহর বিধান অমান্য করেন। ধর্মনিরপেক্ষতার বেলায়ও একই মনস্তত্ব কাজ করে। একজন ধর্মভীরু ব্যক্তি ধর্মাচরণ করে থাকেন যা কোনো ধর্মহীন ব্যক্তি করেন না।

কিন্তু একজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিও কার্যত: ধর্মহীন ব্যক্তির মতোই ধর্মাচরণ থেকে বিরত থাকেন। ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক হলে রাজনীতিতে অধার্মিক হওয়া যায় না: কেউ কেউ নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে ধর্মভীরু কিন্তু রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষ বলে প্রচার করেন। ব্যাপারটি অনেকটা সেই ব্যক্তির মতো যিনি ব্যক্তিগতভাবে সৎ কিন্তু রাজনীতির ক্ষেত্রে ভয়ানক অসৎ। এটা এক ধরনের স্ববিরোধিতা। এরকম আরও অনেক ধরনের স্ববিরোধিতা রয়েছে।

যেমন: চুরি করে দান করা, হিংস্র ও নিষ্ঠুর ব্যক্তি হয়েও কোথাও কোথাও স্নেহ-মমতার প্রকাশ ঘটানো, ব্যক্তিগতভাবে দানশীল হয়েও অফিসে ঘুষ খাওয়া, নামাযে ফাঁকি না দিয়েও অফিসের কাজে ফাঁকি দেয়া প্রভৃতি। ধর্ম সম্পর্কে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘ধার্মিক’-দের পরস্পরবিরোধী ধারণা: রাজনৈতিকভাবে যারা ধর্মনিরপেক্ষ তারা ধর্মকে মনে করেন এক শ্বেত-শুভ্র বস্ত্রখণ্ডের মতো- যা রাজনীতির ময়দানে টেনে নিয়ে এলে কালিমালিপ্ত হবে। এদের বিবেচনায় ধর্ম- রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিকে বিশুদ্ধ করার পরিবের্তে নিজেই সমাজ ও রাজনীতির পঙ্কিলতায় সমর্পিত হয়। পক্ষান্তরে, যাদের অবস্থান ধর্মনিরপেক্ষতার বিপক্ষে তারা ধর্মকে নিষ্ক্রিয় বস্ত্রখণ্ডের পরিবর্তে সক্রিয় ডিটারজেন্টের সাথে তুলনা করেন যা তার অন্তর্গত ক্ষমতা দিয়ে রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিকে শুভ্র ও পবিত্র করবে। ধর্ম সম্পর্কে কোনটি উচ্চ ধারণা? ধর্ম অন্য বিষয় দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে যায়- না ধর্ম অন্য বিষয়কে পরিবর্তিত করে? তাই, রাজনীতিতে ধর্ম টেনে না আনার দাবি নেহায়েত অজ্ঞতাপ্রসূত, ধর্মের প্রতি অনাস্থা (বা নিম্নধারণা) এবং একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।

রাজনৈতিক জীবনে ধর্মাচরণ না করার অর্থ: একজন ব্যক্তি তার ধর্মাচরণের কারণে ব্যক্তিগত জীবনে সৎ ও ন্যায়বান। এই ব্যক্তি তার রাজনৈতিক জীবনে ধর্মাচরণ না করার অর্থ হচ্ছে তিনি এখন জাল ভোট দিতে পারবেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি এমনকি খুন পর্যন্ত করতে পারবেন, মিথ্যা কথা বলতে পারবেন, অন্যের কুৎসা রটাতে পারবেন, গুজব ছড়াতে পারবেন এক কথায় যাবতীয় অন্যায় করতে তিনি এখন লাইসেন্সপ্রাপ্ত। পক্ষান্তরে, রাজনীতিতে ধর্মের বিধি-নিষেধ মেনে চললে তিনি এসব অপকর্ম করতে পারতেন না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে রাজনীতিতে ধর্মকে প্রবেশাধিকার দিতে যারা কুন্ঠিত তারা প্রকৃতপক্ষে এক বল্গাহীন রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রত্যাশা করে থাকেন যা অসুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক। রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্ম বর্জন এর তত্ত্ব কি ধর্মসম্মত? ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বলতে যারা শুধু রাষ্ট্রীয় আইন-বিধান তৈরির ক্ষেত্রে ধর্মের নি:সম্পর্কতার কথা বলেন তাদের দাবি মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সরকার যদি উত্তরাধিকার আইনে কোন পরিবর্তন করেন বা করতে চান তাহলে একজন ঈমানদার মুসলিম তা রুখে দাঁড়াতে বাধ্য হবে। কারণ, ধর্মবিরোধী রাষ্ট্রীয় আইন এক্ষেত্রে তাকে ধর্ম পালনে বাঁধা দেবে। রাষ্ট্রীয় জীবনে বিশেষ ধর্মের প্রভাব কি সংখ্যালঘুদের প্রতি অবিচার? ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের আরেকটি যুক্তি হলো, একটি দেশে নানা ধর্মের লোক থাকে। রাষ্ট্র যদি একটি ধর্মের ব্যাপারে পক্ষপাতদুষ্ট (biased) হয় তাহলে অন্য ধর্মের প্রতি অবিচার করা হবে। প্রশ্নটি ধর্ম থেকে সরিয়ে অন্য কোনো বিষয়ে নিবদ্ধ করা যাক।

একটি দেশে নানা ভাষাভাষী লোক থাকে। পৃথিবীর সকল দেশেই সরকার সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষায় রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকেন। আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিও ছিলো তাই। এক্ষেত্রে কি কখনও এ অভিযোগ ওঠে যে সংখ্যালঘুর অধিকার ক্ষুন্ন করা হয়েছে? তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মকে ভিত্তি করে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠলে সংখ্যালঘুর অধিকার ক্ষুন্ন হবে কেনো? ধর্ম কি কখনো ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ওকালতি করতে পারে? ধর্ম কখনো ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ওকালতি করতে পারে না কারণ এমনটি করার অর্থ হচ্ছে ধর্মের নিজের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। ধর্ম দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা: সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হয় তখন যখন একশ্রেণীর পণ্ডিতমূর্খ কিংবা হঠকারী রাজনীতিক ধর্মের বাণী দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রমাণের ব্যর্থ প্রয়াস চালান।

এ ব্যাপারে সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত বাণীটি হচ্ছে পবিত্র কুরআনের ১০৯ নম্বর সূরা- আল কাফিরুনের শেষ (বা ৬ নম্বর) আয়াত “লাকুম দী..নুকুম ওয়ালি ইয়া দ্বী..ন” অর্থাৎ “তোমাদের দ্বীন (কর্ম ও কর্মফল; ধর্ম নয়) তোমাদের জন্য আর আমার দ্বীন আমার জন্য”। এই বাক্যটি ধর্মের ব্যাপারে আপোষকামিতার বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত। ইসলাম সম্পর্কে যারা সামান্য জ্ঞান রাখেন তারাও জানেন যে, মক্কার কাফিরগণ প্রিয়নবী (সা.)-এর কাছে যখন পবিত্র কাবাগৃহে সকল ধর্মের সহাবস্থানের (আধুনিক পরিভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতার) প্রস্তাব পেশ করে তখন মহান আল্লাহপাক এই পবিত্র বাণীর মাধ্যমে চিরতরে ধর্মনিরপেক্ষতার কবর রচনা করেন। সুতরাং যে সকল রাজনীতিক ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বকে ম্লান করে তাকে আর দশটি ধর্মের কাতারে এনে দাঁড় করাতে চান তারা ধর্মনিরপেক্ষতাও বুঝেন না, ইসলামও বুঝেন না। পবিত্র কুরআনের আরো একটি আয়াত এ প্রসঙ্গে প্রায়শ: উদ্ধৃত করা হয়ে থাকে।

আয়াতটি হলো আল কুরআনের ২ নম্বর সূরা আল বাকারাহর ২৫৬ নম্বর আয়াতাংশ- “লা.. ইকরা..হা ফিদ্দি..ন” অর্থাৎ “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই”। এ আয়াতটিতে কাউকে জোর করে মুসলিম বানানোকে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু, ইসলামী রাষ্ট্রে ইসলাম গ্রহণকারীকে নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণে (যেমন: ফরয দায়িত্ব পালনে) ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়নি। এ আয়াতটি অন্য ধর্মাবলম্বীদের ব্যাপারে ইসলামের সহিষ্ণুতার প্রতীক। এ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা আবিষ্কারের সুযোগ নেই।

ইসলাম কখনোই ধর্মনিরপেক্ষ নয়: এতো কষ্ট করে যারা কুরআন-হাদীস থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার স্বপক্ষে দলিল পেশ করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন তাদের উচিত তাদের রোগপীড়িত হৃদয়পটে কুরআনের নিম্নোক্ত বাণীসমূহ স্থাপন করা। যেমন: ১.“ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ” অর্থাৎ (এ জগতে) হুকুম দেওয়ার অধিকার আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। (১২/সূরা ইউসুফ:৪০) ২.“আলা লাহুল খালকু ওয়াল আমরু” অর্থাৎ সৃষ্টি তাঁর, অতএব হুকুমও চলবে কেবলমাত্র তাঁরই। (৭/সূরা আরাফ:৫৪) ৩.“যারা (এ পৃথিবীতে) আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করে না তারা কাফির” (৫/সূরা মায়েদাহ:৪৪) পৃথিবীতে জীবন দিয়ে হলেও আল্লাহর বিধান কায়েম করার যে অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেগুলো আমাদের তথাকথিত বর্ণচোরা ও জ্ঞানপাপী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের চোখে পড়ে না। বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে রাষ্ট্র ও রাজনীতি বাস্তবে কতোটুকু ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে? বাংলাদেশের মতো একটি ধর্মলালিত এবং বিশেষভাবে মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ইচ্ছা করলেও ধর্মনিরপেক্ষ থাকতে পারে না।

যেমন: হজ্জ্ব সম্পাদনের মতো একটি ধর্মীয় কাজে রাষ্ট্রযন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষ থেকে বা সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা না করে পারবে কি তার জরপ্রিয়তা ধরে রাখতে? একইভাবে জাতীয় ঈদগাহ, জাতীয় মসজিদ, ওয়াকফ এস্টেটসমূহ, ইসলামিক ফাউণ্ডেশনসহ বহু জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সরকার রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করে থাকেন। এসবই তো ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা কি চান- ধর্মীয় রীতি মুনাজাত ছাড়াই সকল উদ্বোধন ও উন্মোচন হোক? তাছাড়া পার্লামেন্টে অনুষ্ঠান শুরুর আগে যে কুরআন তিলাওয়াত হয় সেটাও কি তারা রহিত করবেন? এমনিভাবে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ করতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা বার বার পরাজিত হয়েছেন এবং এ পরাজয়ের অনেক কাহিনী ইতিহাস হয়ে আছে শত আওলিয়ার পুণ্যস্মৃতির এই বাংলাদেশে। মুসলিমদের মাঝে অমুসলিমদের সেবাদাস: সাম্রাজ্যবাদী- আগ্রাসনবাদীরা মুসলিম নামধারীদের ভেতর থেকে দালাল-সেবাদাস সৃষ্টিতেও অত্যন্ত তৎপর। এজন্য আর্থিক সুবিধা বা উৎকোচ প্রদান, যৌনতা ও যথেচ্ছাচারের সুযোগ প্রদান, মিডিয়ায় প্রচারের সুযোগ প্রদান, মস্তক ধোলাই ইত্যাদি বিভিন্ন প্রক্রিয়া তারা অবলম্বন করে।

ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিদাররা কি আসলেই ধর্মনিরপেক্ষ? বাংলাদেশে মুসলিম নামধারী ইসলাম দ্রোহীরা নিজেদের স্যাকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করে। সত্যিকার স্যাকুলাররা সকল ধর্মেরই বিরোধী হলেও এইসব মুসলিম নামধারী স্যাকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা শুধুমাত্র ইসলাম তথা আল্লাহ, কুরআন, সুন্নাহ, ইবাদাত ইত্যাদিরই বিরোধিতা করে এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের গোঁড়ামী, উগ্রতা এমনকি উগ্র সহিংসতাকেও সমর্থন করে। ভারতীয় সৈন্যেরা যখন কাশ্মীরের মুসলিম রমণীদের ধর্ষণ করে, তখন বাংলাদেশের তথাকথিত এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা এসব কর্মকাণ্ডকে অন্ধভাবে (মৌন) সমর্থন করে, এরা (মৌন) সমর্থন করে ইসরাইল কর্তৃক মুসলিম নিধনকে। এরা ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের আন্দোলনকে বলে মৌলবাদ, কিন্তু রামরাজ্য কায়েমের তৎপরতাকে দেয় সমর্থন। এরা প্রতিমা পূজাকে বলে প্রগতিশীল, আল্লাহর উপাসনাকে বলে অন্ধ গোঁড়ামী।

এতেই প্রতীয়মান হয়, এরা প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ বা স্যাকুলার নয়, এরা নিছক ইসলামদ্রোহী মাত্র এবং এদের এই ইসলামদ্রোহিতার পেছনে আছে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত হীন ও বিকৃত স্বার্থ। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষরা যদি সত্যিই ধর্মনিরপেক্ষ (বা ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষ) হতেন তবে নিজেরা তো ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লিখতেনই না বরং অন্য কেউ ধর্ম ও ধর্মীয় নেতাদের কটাক্ষ করে কিছু লিখলে তারা স্বত:স্ফূর্তভাবে এর প্রতিবাদ জানাতেন। বাংলাদেশে যারাই ধর্মনিরেপক্ষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ধর্মহীনই শুধু নন বরং ধর্মবিরোধী। এরা প্রায়শ: ধর্মের বিরুদ্ধে লিখে থাকেন। কেউ আল্লাহ ও প্রিয়নবী (সা.) এর বিষোদগার করলে এসব ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা প্রতিবাদ করে না; বরং বাক-স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন তুলে তাদের পক্ষ নেয়।

এসবই হলো তাদের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সুস্পষ্ট লংঘন। ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিদারদের অনেকে আবার নামায পড়েন, রোযা রাখেন, কেউ একবার কেউ বার বার হজ্জ্ব করেন, কেউ কেউ যাকাতও দেন, মৃত্যুর পর তাদের জানাযাও হয়, কোনো কোনো নেতা মাথায় টুপি পরেন, কেউ কেউ দাড়ি রাখতে অভ্যস্ত, অনেকে নির্বাচনের আগে হজ্জ্ব শেষে মাথায় পট্টি বেঁধে এবং হাতে তসবিহ নিয়ে দেশবাসীকে রীতিমত তাক লাগিয়ে দেন। এগুলোও কি ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সুস্পষ্ট লংঘন নয়? কথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’-দের স্ববিরোধিতার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত : ১.১৯৭০ এর ঐতিহাসিক নির্বাচনের আগের প্রতিটি জনসভায় মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান বলতেন, “আমরাও মুসলমান: পার্লামেন্টে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন আমরা পাশ করবো না ইত্যাদি। ” ২.১৯৭২ সালে পাকিস্তানের জেল থেকে বেরিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বাংলাদেশকে পৃথিবীর (জনসংখ্যার বিচারে তৎকালীন) দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেন। ৩.১৯৭২ সালে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে যোগদান করেন।

৪.দেশে ধর্মের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামিক ফাউণ্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ৫.পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগ বারবার তাদের দৃষ্টিতে দেশের সর্ববৃহৎ মৌলবাদী দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট গঠন করে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ‘ডাক’ (DAC), পিডিএম (PDM) ইত্যাদি। উল্লেখ্য, অধ্যাপক গোলাম আযম ‘ডাক’ জোটের সেক্রেটারী ছিলেন। ৬.স্বৈরাচারী এরশাদ হঠাও আন্দোলনে আওয়ামী লীগ তাদের ভাষায় মৌলবাদী দল জামায়াতে ইসলামী ও আধা-মৌলবাদী বিএনপি-র সাথে মিলে অভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে আন্দোলন করে সফল হয়।

৭.এরশাদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী অধ্যাপক গোলাম আযমের কাছে দোয়া প্রার্থনা করতে গিয়েছিলেন। ৮.আওয়ামী লীগ পোস্টার, লিফলেট ইত্যাদির শুরুতে “আল্লাহ সর্বশক্তিমান” কথাটি উৎকীর্ণ করে প্রকাশ্যে দলীয়ভাবে তার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ক্ষুন্ন করে। ৯.শেখ হাসিনা গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির স্বার্থে দলীয় কর্মীদের বেশি বেশি মসজিদে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ১০.বিভিন্ন যায়গায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্লোগান দেওয়া হয়েছে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, নৌকার মালিক তুই আল্লাহ”। (উল্লেখ্য, বিএনপি বা জাতীয় পার্টিও নির্বাচনী কৌশল বা অন্য কারণে ধর্মমুখী আচরণ করে।

কিন্তু পার্থক্য হলো তারা আওয়ামী লীগের মতো নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষতার এজেন্ট হিসেবে দাবি করে না। ২) ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিদারদের দ্বারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যবসা: যারা নিজেদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি’ বরে দাবি করেন তারা তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারীদের ঢালাওভাবে ‘পাকিস্তানপন্থী’, ‘মৌলবাদী’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী’ এমনকি ‘রাজাকার’ বলে বেড়ান। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণকারী এমনকি সেক্টর কমান্ডার হলেও এ গালাগাল থেকে রেহাই পান না (উদাহরণ: মুক্তিযুদ্ধকালীন নবম সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল)। অপরদিকে ইসলামদ্রোহিতা, ভারতীয় আগ্রাসনের অন্ধ স্তুতি এবং ১৯৪৭ এর স্বাধীনতার প্রতি বিজাতীয় ঘৃণায় যারা সোচ্চার, তারা মুক্তিযুদ্ধের ধারে-কাছে না গেলেও, এমনকি পাকিস্তানী হানাদারদের দোসর-অনুচর হিসেবে কাজ করলেও, তাদেরকে এইসব “ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা” ‘মুক্তিযুদ্ধের মহান সৈনিক’, ‘যথার্থ বাঙ্গালী’ ইত্যাদি বিশেষণে অভিষিক্ত করেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিশ্লেষণ: ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যেই দু’টি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে যায়।

এক, মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় অনিবার্য ও সময়ের ব্যাপার মাত্র। দুই, মুক্তিযুদ্ধ আরো দীর্ঘতর হলে নিষ্ক্রিয় রাজনীতিবিদদের হাত থেকে নেতৃত্ব অচিরেই পুরোপুরিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে চলে যাবে। এমতাবস্থায় ভীত সন্ত্রস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিশেহারা হয়ে দিল্লীতে ছুটে যান এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে ধর্ণা দিয়ে পড়েন, যেনো ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের তড়িৎ সমাপ্তি ঘটায় এবং তাঁদের নেতৃত্ব রক্ষা করে। মুক্তিযুদ্ধ এক বাস্তব সত্য। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাও এক বাস্তব সত্য।

এটাও অবধারিত যে, বাংলাদেশ আর কখনোই পাকিস্তান হবে না। পাশাপাশি এ সত্যও স্বীকার করার জো নেই যে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েম না হলে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ কায়েম কোনক্রমেই সম্ভবপর হতো না। অন্য ধর্মে রাষ্ট্রীয় বিধান না থাকলেও ইসলামে আছে: যীশু খ্রীস্ট কোনো রাষ্ট্র পরিচালনা করেননি। গৌতম বুদ্ধ রাজপুত্র হলেও সংসার ত্যাগ করে বৈরাগ্যে চলে গিয়েছিলেন, রাজ্যশাসন করেননি। চতুর্বেদের রচয়িতা ঋষিরাও রাষ্ট্রনায়ক, সেনাপতি, বিচারপতি ইত্যাদি হিসেবে কোনো ভূমিকা পালন করেননি।

শ্রীরামচন্দ্র বা শ্রীকৃষ্ণ ধর্মের প্রবর্তক নন, তাঁরা (হিন্দু বিশ্বাসে) ভগবানের অবতার। তাঁরা দু’জন অবশ্য রাজ্য শাসন করেছেন। কিন্তু তারাও রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদির এমন কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো রেখে যাননি, যার প্রতিষ্ঠা তাদের অনুসারীদের জন্য বাধ্যতামূলক। ফলে যে কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক মতবাদ কাঠামোর সঙ্গে এসব ধর্মের কোনো বিরোধের কোনো প্রশ্ন নেই, সংহতিরও কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ইসলামের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

এখানে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদিকে ইবাদাত থেকে আলাদা করার কোনোই সুযোগ নেই। ইসলাম একটি সামগ্রিক ও গ্রথিত জীবনব্যবস্থা। আল কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা কি এই কিতাবের (অর্থাৎ কুরআনের) কোনো অংশের প্রতি বিশ্বাস রাখো এবং কোনো অংশকে অবিশ্বাস করো? যারা এরূপ করে, তাদের জন্য রয়েছে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা আর কিয়ামাতের দিন ভীষণ আযাব। (২/সূরা আল বাকারাহ:৮৫) রাসূল (সা.) ইসলামের পক্ষে ছিলেন; নিরপেক্ষ ছিলেন না: রাসূল (সা.) তো সেই প্রেরিত পুরুষ, যিনি একাধারে ছিলেন ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারক, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং প্রধান নির্বাহী। মসজিদে নববী ছিলো তাঁর সেক্রেটারিয়েট।

তাঁর সচিবালয়ে নিরাপত্তা (পুলিশ), প্রতিরক্ষা, অর্থ ও হিসাব, বিচার, নগর উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসহ ১৭ টি বিভাগ ছিলো। এক কথায় তিনি রাষ্ট্র, সমাজ, আইন ব্যব্স্থা, অর্থনীতি, সশস্ত্র বাহিনী, কূটনীতি, ন্যায়নীতি (Ethics) ইত্যাদির জীবন্ত মডেল উপস্থাপন করে গেছেন। এই মডেলই হুবহু অনুসরণ করেছেন তাঁর পরবর্তী চার খলিফা। বলা বাহুল্য, এ সকল দিকসহ রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবন ও কর্মের সকল দিকের অনুসরণও প্রতিটি মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক। কুরআন-সুন্নাহর সমগ্র বিধি-বিধানকে গ্রহণ না করে বা আংশিকভাবে গ্রহণ করে মুসলমান থাকার কোনোই সুযোগ নেই।

শেষকথা: ধর্মে বিশ্বাসী কোনো লোক কখনো ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে না। আর কোনো মুসলিম ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। ধর্মনিরপেক্ষতা ত্যাগ করে ইসলামের পক্ষে আসলেই তো একজন মুসলিম হতে পারে। তাই আত্মপ্রত্যয়ী মুসলিমগণ ইসলামে অগ্রযাত্রায় চূড়ান্ত ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকে। ধর্মনিরপেক্ষতার মাঝে সে কোনো কল্যাণ খুঁজে পায় না।

আর এ মতাদর্শে বাস্তবেই বিশ্ব-মানবতার কোনো কল্যাণ নেই। তথ্যসূত্র: ১.ধর্মনিরপেক্ষতা মৌলবাদ সাম্প্রদায়িকতা ও ইসলাম- হারুনুর রশীদ (চিন্তাবিদ কলামিস্ট) ২.মৌলবাদ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ- মুজাহিদুল ইসলাম, প্রকাশক- মুহাম্মদ আশরাফুল হক, সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিজ, প্রকাশ: ১৮ জুন ১৯৯৭ ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.