আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বাঙলাদেশে গার্মেন্টস্ শ্রমিকদের উপর বর্বর পুঁজিবাদীশোষণ

নর্দমার রাত, হিরন্ময় তাঁত

০১. ২৯. জুলাই, ২০১০ গার্মেন্টস শিল্পের প্রায় ৩৫ লাখ শ্রমিকের ২ হাজার টাকা ন্যূনতম মূল মজুরি ঘোষণার পর সরকারের মানবিকতার মুখোশ উম্মোচিত হয়েছে। শ্রমিকরা যখন ৫ হাজার টাকা মজুরির দাবি নিয়ে রাজপথে বিক্ষোভে নেমেছিলো তখন মালিকগোষ্ঠীর কাছে আত্মসমর্পণকারী সরকার লাঠি নিয়ে নেমে শ্রমিকদের দমন করেছে। মামলা দেয়া হয়েছে হাজার হাজার শ্রমিকের নামে। শ্রমিকনেতাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি, গ্রেফতার এমনকি রিমান্ডে পর্যন্ত নেয়া হয়েছে। আন্দোলনকারী শ্রমিকনেতাদের নামে মামলা দিয়ে তাদের পলাতক রেখে কথিত ৪২টি শ্রমিক সংগঠনসহ ত্রিপক্ষিয় তথাকথিত সমঝোতার কথা বলে শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। সরকারের তরফ থেকে ৩ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির ঢাক পিটিয়ে বলা হচ্ছে, গত বছরের তুলনায় মজুরি দ্বিগুণ করা হয়েছে, শতকরা ৮০ ভাগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে ইত্যাদি। কিন্তু এটা যে মিথ্যাচার তা শ্রমিকদের অজানা নয়। বাস্তবে মূল মজুরি ২০০০ টাকা, এর সাথে ঘর ভাড়া ৮০০ টাকা ও চিকিৎসা ভাতা ২০০ টাকা মিলে হয় ৩০০০ টাকা। ২০০৬ সালে ন্যূনতম মজুরি ১৬৬২.৫০ টাকা বলা হলেও তখনও মূল মজুরি ছিল ১১৫০ টাকা।

এর সাথে ছিল ঘর ভাড়া ৩০০ টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা ২০০ টাকা। শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে মূল মজুরি ৫০০০ টাকা এবং মজুরির ৫টা গ্রেড ঘোষণার দাবি করা হলেও তার কোনোটাই মানা হয়নি। পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ৬ষ্ঠ গ্রেড থেকে ৩য় গ্রেডের মধ্যে ব্যবধান খুবই সামান্য। অর্থাৎ একজন শ্রমিক ৬ষ্ঠ গ্রেড থেকে ৫ম গ্রেডে প্রমোশন পেতে তার ৩/৪ বছর সময় লাগবে। ৩/৪ বৎসর পর প্রমোশন পেলে তার বেতন বাড়বে মাত্র ২৪৫ টাকা।

পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে সবচেয়ে বেশী শ্রমিক কাজ করে মেশিন অপারেটর পদে। এই পদ ৬ষ্ঠ থেকে ৩য় গ্রেড ভুক্ত। ফলে ঘোষিত মজুরি এবং গ্রেড বিন্যাস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘোষিত মজুরিতে পিস রেট অনুযায়ী কাজ করা শ্রমিকদের বিষয়ে কোনো কথাই বলা হয় নি। অথচ গার্মেন্টস সেক্টরে বেশীরভাগ শ্রমিক অসন্তোষ হয় এই পিস রেট নির্ধারণ করা নিয়ে।

আর যে মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে তাও কার্যকর হবে ১ নভেম্বর থেকে। অথচ ইতোমধ্যে আগস্ট মাস থেকে শ্রমিকদের এলাকায় ঘরভাড়া ২০০/৩০০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। রোজা আর ঈদকে সামনে রেখে সরকারের নাকের ডগায় বসে ব্যবসায়ীরা জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়েছে। শ্রমিকদের মজুরির বিষয়ে যেমন সরকার মালিকের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। একে তো মজুরি কম, তারওপর সেটা কার্যকর হবে ৩ মাস পর।

এর মধ্যে বাজার ও জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েকগুণ বাড়বে। মালিকরা অত্যন্ত সুকৌশলে নতুন মজুরি অনুযায়ী দুই ঈদে দুইটি উৎসব বোনাস দেয়া থেকে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা করেছে। এসব সিদ্ধান্ত শ্রমিককে বিক্ষুব্ধ হতে ভূমিকা রেখেছে। ফলত অসংখ্য শ্রমিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। শ্রমিক নেতৃবৃন্দের নামে দায়েরকৃত মামলায় তাদেরকে চশমা চুরি, ফার্নিচার চুরির মামলা দেয়া হয়েছে।

বলা হচ্ছে, এরা একই সময়ে তেজগাঁ, আদাবর, গুলশান, আশুলিয়া এলাকায় গিয়ে ভাঙচুর, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ০২. বিজিএমইএ’র সদস্য রফতানিকারক আসিফ ইব্রাহিম এক কেস স্টাডিতে দেখিয়েছেন, ২০০ সেলাই মেশিনের একটি শার্ট তৈরির কারখানায় ৫০০ শ্রমিক এক বছরে মোট ৩ লাখ ১০ হাজার ডলার মজুরি পায়। ওই কারখানার মালিক বছর শেষে মুনাফা করেন ১ লাখ ৫৪ হাজার ডলার। অর্থাৎ ২৫০ জন শ্রমিকের ১ বছরের মজুরির সমান একজন মালিকের মুনাফা। আমরা যদি এই হিসাবটা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব যে ৫০০ জন শ্রমিকের বাৎসরিক মজুরি ধরা হয়েছে ২ কোটি ১৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

এখানে একজন শ্রমিকের গড় মজুরি ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫৬৫ টাকা। এ হিসাবে ২৫০ জন শ্রমিক ১ বছরে মজুরি পায় ১ কোটি ৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। বিজিএমইএ’র পরিচালকের হিসাবে একজন মালিক বছরে ৫০০ শ্রমিকের একটি কারখানা থেকে ১ কোটি ৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা নিট মুনাফা করছে। বিজিএমই-এর এক পরিচালক জানান, বিশ্বমন্দা, জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও তারা লোকসান গুনছেন না। লাভের হার হয়ত কিছু কমেছে।

আগে যেখানে হয়ত প্রতি পিসে ২০ টাকা লাভ হত, এখন সেখানে হয়ত ১৫ টাকা লাভ হচ্ছে। গার্মেন্টস শিল্পে বিভিন্ন দেশের মালিকদের মুনাফার হার পর্যালোচনা করলেও মালিকদের মিথ্যাচারের মুখোশ উন্মোচিত হয়। অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ দেখিয়েছেন, বাঙলাদেশে মালিকদের মুনাফার হার ৪৩.১০ শতাংশ, যেখানে কম্বোডিয়ায় ৩১.০%, ভারতে ১১.৮%, ইন্দোনেশিয়ায় ১০%, ভিয়েতনামে ৬.৫%, নেপালে ৪.৪% এবং সবচেয়ে কম চীনে, ৩.২%। অর্থাৎ বাংলাদেশের মালিকরা বিশ্বের সবচেয়ে কম মজুরি দিয়ে, সরকারের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিয়ে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করছে। এই মালিকরা নিজেরা কোটি কোটি টাকার গাড়ি-বাড়ি ব্যবহার করছে।

বিশ্বমন্দা, বিদ্যুৎ সংকট, শ্রমিক অসন্তোষসহ নানান কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসায় মন্দা চলছে ইত্যাদি নানা অজুহাত তুলে রাষ্ট্রের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে প্রনোদনা প্যাকেজসহ নানা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করছে। ০৩. মালিকরা বলে, তারা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে, এটাই যথেষ্ট। শ্রমিকদের এতেই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। মজুরি যা দিচ্ছি তা দিয়েই শ্রমিকদের চলা উচিত। বাজারে মোটা চাল ৩২ টাকা, মশুর ডাল ১০৫ টাকা, চিনি ৪৫ টাকা, পুকুরের পাঙ্গাস মাছও ১০০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না।

গার্মেন্টস-এ ওভারটাইম ডিউটি করেও দুই-আড়াই হাজার টাকা বেতন পাওয়া শ্রমিক তার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি এবং প্রোটিন পাবে কীভাবে? অথচ এরাই দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। দেশের রপ্তানি আয়ের ৭৫ ভাগ আসে গার্মেন্টস খাত থেকে। গত বছর ১২ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৮৪,০০০ কোটি টাকা এ খাত থেকে আয় হয়েছে। ১৯৭৮ সালে ২টি গার্মেন্টস কারখানা দিয়ে যে শিল্পের যাত্রা শুরু সেখানে আজ প্রায় ৪৫০০টি কারখানা স্থাপিত হয়েছে। ৩০ লক্ষ শ্রমিক এ শিল্পের সাথে যুক্ত।

বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা শ্রমিক (চীন ও তুরস্কের পর) বাংলাদেশকে তৃতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে। ০৪. শ্রমিক অসন্তোষের মূল কারণগুলো দেখা যাক: ১. চাল, ডাল, তেলসহ জিনিষপত্রের দাম বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাড়িভাড়া, গাড়িভাড়া, চিকিৎসা খরচ কিন্তু শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে না; ২. সময়মতো বেতন এবং ওভারটাইম ভাতা না দেয়া, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচুইটি না থাকা; ৩. কর্মকর্তা কর্তৃক শ্রমিকদের সাথে দুর্ব্যবহার, অমানবিক ব্যবহার করা; ৪. যে কোনো অজুহাতে শ্রমিকদের ছাঁটাই, শোকজ ইত্যাদির মাধ্যমে হয়রানী করা; ৫. গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার না থাকা, অর্থাৎ শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কথা বলার কোনো পক্ষ নেই; ৬. ব্যবসায়ীরা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিক অসন্তোষের সুযোগ গ্রহণ করে আবার মালিকের পক্ষ নিয়ে শ্রমিকদের উপর নির্যাতন চালায়। এমনকি মালিকদের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ নানা বিরোধে শ্রমিকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এসব নানা বিষয়ের প্রতিক্রিয়ায় শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ সারা মাস হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে জীবনযাপেনর উপযোগী মনুষ্যোচিত ন্যূনতম মজুরি না পাওয়া।

০৫. আমাদের দেশে মজুরি নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন কমিটি আছে। ১. জাতীয় পে কমিশন: সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে। ২. মজুরি কমিশন: সরকারি খাতে পরিচালিত কল-কারখানাসমূহের শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করে। এটাকে ন্যাশনাল ওয়েজ এন্ড প্রোডাকটিভিটি কমিশন বলে। ৩. নূন্যতম মজুরি বোর্ড: বেসরকারি খাতে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর মজুরি নির্ধারণ করে।

এ বোর্ড ৩৮টি সেক্টরের জন্য আলাদাভাবে মজুরি নির্ধারণ করে থাকে। এটাকে মিনিমাম ওয়েজ বোর্ড বলা হয়। ৪. ওয়েজ বোর্ড: এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের জন্য বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। মজুরি সাধারণত মাসিক ভিত্তিতে হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক, দৈনিক, পিস রেট ইত্যাদি রূপেও হতে পারে।

আই.এল.ও-এর ১৩১ নং কনভেনশনে বলা হয়েছে, সর্বনিম্ন মজুরি অবশ্যই আইন দ্বারা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক ও তার পরিবারের প্রয়োজন, জীবন যাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা ইত্যাদিকে বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণায় বলা হয়েছে-- প্রত্যেক কর্মীর নিজের ও পরিবারের মানবিক মর্যাদা রক্ষায় সক্ষম এমন ন্যায্য পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বাঙলাদেশের সংবিধানের ১৫নং অনুচ্ছেদে নাগরিকদের যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার বিষয়টি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বলা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, যুক্তিসঙ্গত অথবা মানবিক মর্যাদা রক্ষা করার মতো মজুরি নির্ধারণ করা হবে কিভাবে? একটি শ্রমিক পরিবারে কি কি দরকার হয়? অন্তত তিন বেলা খাবার, পোষাক, মাথা গোঁজার ঠাঁই, অসুস্থ হলে চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, অতিথি আপ্যায়ন ও বিনোদন ছাড়া মানবিক জীবন কিভাবে হয়? এসব বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়।

ন্যুনতম মজুরি আইন প্রথম করা হয় নিউজিল্যান্ডে ১৮৯৬ সালে। এরপর অষ্ট্রেলিয়ায় ১৮৯৯ সালে, ব্রিটেনে ১৯০৯ সালে, শ্রীলংকায় ১৯২৭ সালে এবং ১৯৩৬ সালে ভারতে, ১৯৬১ সালে পাকিস্তানে প্রবর্তন করা হয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে বিবেচনায় নিয়ে ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, স্পেন, মরিশাস, মেক্সিকো প্রভৃ তি দেশে প্রতি বছর মজুরি পুনঃনির্ধারণ করা হয়। কানাডায় করা হয় প্রতি দুই বছর পর পর। বাঙলাদেশে ৫ বছর পর পর মজুরি পুনঃনির্ধারণের আইন করা হয়েছে।

শ্রমজীবী মানুষের দাবি -- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি রেখে প্রতিবছর মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। ০৬. বিভিন্ন দেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের তুলনামূলক মজুরি বাঙলাদেশ তৈরি পোষাক রপ্তানিতে পৃথিবীতে তৃতীয়। চীন, তুরস্কের পরই বাঙলাদেশের অবস্থান। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী তুরস্কে একজন শ্রমিক প্রতি ঘণ্টায় মজুরি পান ২.৪৪ ডলার, মেক্সিকোতে ২.১৭ ডলার, চীনে ১.৮৮ ডলার, পাকিস্তানে ৫৬ সেন্ট (১ ডলার = ১০০ সেন্ট), ভারতে ৫১ সেন্ট, শ্রীলংকায় ৪৪ সেন্ট, ভিয়েতনামে ৪৪ সেন্ট পেয়ে থাকেন। ভিয়েতনাম সরকার শ্রমিকদের জন্য সস্তায় আবাসন, পরিবহন ও অন্যান্য সুবিধা দিয়ে থাকে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাঙলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এখানে ধারাবাহিক শ্রমিক অসন্তোষের মূলে রয়েছে কম মজুরি। এর ফলে গোটা পোষাকশিল্পখাতের ভবিষ্যতও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বাঙলাদেশের পোষাকশিল্প খাতে শ্রমিকের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মজুরি হিসাব করে বলা হয়েছে, এখানে ঘণ্টাপ্রতি মজুরি ৩১সেন্ট। একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১৬৬২.৫০ টাকা। এ হিসেবে ন্যূনতম মজুরি দাড়ায় ঘণ্টাপ্রতি ১০ সেন্ট।

পাকিস্তান, ভারতের শ্রমিকেরা যে মজুরি পায় বাঙলাদেশে তার পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম মজুরি পেয়ে থাকে। বাঙলাদেশের শ্রমিকের মজুরি সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। পার্শ্ববর্তী নেপাল, ভুটানের চাইতেও আমাদের দেশের মজুরি কম। আনু মুহাম্মদ বাঙলাদেশের মজুরি কাঠামোকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে ২০০৬ সালে দেখিয়েছিলেন, বাঙলাদেশে উৎপাদিত একটি গার্মেন্টস পণ্য ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১০০ ডলারে বিক্রি হলে কারখানার মালিক পান ১৫-২০ ডলার, উক্ত রাষ্ট্র ২৫-৩০ ডলার এবং বিদেশি কোম্পানি ৫০-৬০ ডলার পেয়ে থাকে। উৎপাদনকারী শ্রমিকের ভাগে পড়ে মাত্র আধা ডলার।

ফলে গার্মেন্টসের রপ্তানি বাড়লে লাভবান হয় সবাই, শুধু বঞ্চিত হয় শ্রমিক। ০৭. মজুরি কতো হলে বাঙলাদেশের বিবেচনায় তা ন্যূনতম মজুরি হবে? ন্যূনতম মজুরি কত হওয়া উচিত তা হিসাব করার জন্য বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা উচিত। দেশের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, অতীতের মজুরির পরিমাণ, কতটুকু আয় করলে একজন শ্রমিক দারিদ্র্যসীমার উর্ধ্বে উঠবে, প্রতিদিন কতটুকু সুষম খাবার লাগে এবং অন্যান্য খরচ কত এসব হিসাব করতে হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে হলে একজন মানুষের দৈনিক ২ ডলার আয় প্রয়োজন। ৪ জনের একটি পরিবার ধরলে পরিবারের আয় হওয়া উচিত ৪x৩০x২ = ২৪০ ডলার প্রতি মাসে।

১ ডলার সমান ৭০ টাকা ধরলে তা দাঁড়ায় ২৪০x৭০ = ১৬৮০০ টাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হিসাব করে দেখিয়েছে দৈনিক ১০ ঘণ্টা কাজ করলে একজন পুরুষ গার্মেন্টস শ্রমিকের ৩৩৬৪ কিলোক্যালরি এবং নারী শ্রমিকের ২৪০৬ কিলোক্যালরি তাপ লাগে। সাধারণত একজন মানুষের জন্য তাপশক্তি কত লাগে এটা হিশেব করতে হলে বিভিন্ন কাজে কত কিলোক্যালরি তাপলাগে তা জানা দরকার। স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের একজন মানুষের তাপশক্তি প্রয়োজন হয় : মাঝারি গতিতে হাঁটলে (১২ মিনিটে ১ কিমি.) ৪ কিলোক্যালরি মাঝারি ধরনের কাজে ৩ কিলোক্যালরি ঘরের কাজে ২ কিলোক্যালরি বসে থাকতে (টিভি দেখা, গল্প করা) ১.৫ কিলোক্যালরি ঘুমানোতে ১ কিলোক্যালরি। এ হিসাবে একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের প্রতিদিন কত কিলোক্যালরি তাপ প্রয়োজন : ৮ ঘণ্টা কাজ (৮x৬০x৩) = ১৪৪০ কিলোক্যালরি ৮ ঘণ্টা ঘুম (৮x৬০x১) = ৪৮০ কিলোক্যালরি ১ ঘণ্টা বিরতি (১x৬০x১.৫) = ৯০ কিলোক্যালরি ২ ঘণ্টা ওভারটাইম (২x৬০x৩) = ৩৬০ কিলোক্যালরি ২ ঘণ্টা ঘরের কাজ (২x৬০x২) = ২৪০ কিলোক্যালরি ২ ঘণ্টা অবসর/আড্ডা/গল্প (২x৬০x১.৫) = ১৮০ কিলোক্যালরি ১ ঘণ্টা হাঁটা : কর্মক্ষেত্রে যাওয়া-আসা (১x৬০x৪) = ২৪০ কিলোক্যালরি সর্বমোট = ৩০৩০ কিলোক্যালরি (নারী শ্রমিকদের ওজন ৫০ কেজি ধরলে এটা কিছুটা কম হবে।

আবার সন্তানসম্ভবা কিংবা প্রসব পরবর্তী সময়ে কিছু বেশি লাগবে। এখানে আরো একটি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। গার্মেন্টসের একজন নারী শ্রমিক ঘুমায় কতক্ষণ? এক হিসাবে দেখা গেছে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা। তাকে রান্নার জন্য লাইন দিতে হয়, বাথরুমে যাবার জন্য লাইন দিতে হয়। ফ্যাক্টরিতে দেরীতে আসলে মজুরি কাটে কিন্তু দেরীতে ফিরলে সে অনুযায়ী মজুরি বাড়ে না।

) সুষম খাদ্য দ্বারা এই ক্যালরির প্রয়োজন মেটালে শারীরিক সুস্থতা এবং কর্মশক্তি রক্ষা করা সম্ভব। মোট খাদ্যের ৫৭ শতাংশ কার্বহাইড্রেট যেমন চাল, আটা দ্বারা, ৩০ শতাংশ চর্বি জাতীয় খাবার যেমন তেল, ঘি, মাখন দ্বারা এবং ১৩ শতাংশ প্রোটিন জাতীয় খাদ্য যেমন মাছ, মাংস, ডিম, দুধ দ্বারা পূরণ করা দরকার। ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ খুবই প্রয়োজন রোগ প্রতিরোধ এবং শক্তি ব্যবহার করার জন্য। আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম শক্তি উৎপাদন করে না কিন্তু এগুলোর অভাব হলে শরীর কর্মক্ষম থাকতে পারে না। ভিটামিন ও খনিজ দ্রব্যের জন্য শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া প্রয়োজন।

বাজারে প্রাপ্ত সস্তা খাবার দ্বারা যদি একজন শ্রমিক তার শক্তি ও পুষ্টি রক্ষা করতে চায়, তাহলে প্রতিদিন নিম্নরূপ খরচ হবে : খাদ্য পরিমাণ ক্যালরি বাজার মূল্য (টাকা) ১. চাল ৫০০ গ্রাম ১৮০০ ১৬.০০ ২. আটা ৫০ গ্রাম ২০০ ১.৫০ ৩. ডাল (মসুর নয়, ছোলা) ৬০ গ্রাম ২০০ ৩.৫০ ৪. তেল (সয়াবিন) ৫০ মিলিলিটার ৪৫০ ৪.৫০ ৫. ডিম ১টি ৭০ ৬.৫০ ৬. মাছ ৬০ গ্রাম ৮০ ৬.০০ ৭. আলু ১০০ গ্রাম ১০০ ১.৫০ ৮. শাক-সবজি ১৫০ গ্রাম ৫০ ৩.০০ ৯. কাঁচা মরিচ, মশল্লা, হলুদ ২.০০ ১০. ফল ১টি কলা বা আমড়া ৫০ ৪.০০ ১১. রান্নার খরচ ১০.০০ ১২. চা দিনে ২ কাপ ৬.০০ সর্বমোট ৩০০০ কিলোক্যালরি ৬৪.৫০ টাকা (অসুস্থ হলে খরচ বাড়বে। শিশুদের ভাত কম লাগবে কিন্ত অন্যান্য খরচ বাড়বে। গড়ে ৬৪.৫০ প্রতিদিন খরচ ধরতে হবে) ৪ জনের পরিবারের খরচ কত? খাওয়া খরচ (৬৪.৫০x৪x৩০) = ৭৭৪০.০০ বাসা ভাড়া (১ রুম বিশিষ্ট + পানি + বিদ্যুৎ + গ্যাস) = ৩৫০০.০০ যাতায়াত (২ জন কর্মজীবী মানুষ) (৫০০x২) = ১০০০.০০ চিকিৎসা (২৫০x৪) = ১০০০.০০ পোষাক, অন্যান্য = ১০০০.০০ সর্বমোট = ১৪,২৪০.০০ অর্থাৎ ১৪,২৪০ টাকার কমে একটি পরিবার চলতে পারে না। স্বামী-স্ত্রী ২ জনই চাকুরী করলে প্রত্যেকের কমপক্ষে ৭১২০ টাকা মজুরি দরকার। এখানে সন্তানের শিক্ষা খরচ, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়, বিনোদন ও অতিথি আপ্যায়নের হিসেবও ধরা হয়নি।

মন্ত্রী-এমপিদের বেতন বাড়ে, শ্রমিকের বাড়ে না কেন? দ্রব্যমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপিদের বেতন ভাতা বাড়ানো হয়েছে। সরকার সম্প্রতি পে স্কেল ঘোষণা করেছে। এতে সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন বেতনের বিশাল বৈষম্য। তা সত্ত্বেও একজন পিওন পদের কর্মচারী ৪১০০ টাকা স্কেলে বেতন পাবেন। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও আনুসঙ্গিক ভাতাসহ সর্বনিম্ন বেতন দাঁড়ায় ৭০০০ টাকা।

তাহলে যারা উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত আছে তাদের বেতন কত হওয়া উচিত? ১৯৬৯ সালে যখন আমরা পরাধীন ছিলাম তখন শ্রমিক নিম্নতম মজুরি পেত ১২৫ টাকা, অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা মিলে তা হতো ১৫৫ টাকা। এ মজুরি দিয়ে তখনকার বাজার দরে ৩০ টাকা মণ হিসাবে ৫ মণ চাল কিনেও ৫ টাকা উদ্বৃত্ত থাকতো। শ্রমিকরা সেদিন এ মজুরির বিরোধীতা করেছিল। আজ অন্তত ৫ মণ চালের দামের সমান মজুরি পেতে হলেও ৭০০০ টাকা দরকার। তাই দেশের অর্থনীতির অবস্থা এবং মালিকদের সক্ষমতাসহ সামগ্রীক বিবেচনায় একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি হওয়া উচিত কমপক্ষে ৭০০০ টাকা।

০৮. ৩০ বছর ধরে পোষাক শিল্পখাত রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা ভোগ করছে যার নাম হচ্ছে ‘ইনকিউবেটর’। এর অর্থ, জন্মের পর নবজাতক শিশুকে যে বিশেষ পরিচর্যা দেওয়া হয়। আমাদের গার্মেন্টস শিল্পও এখন পর্যন্ত নবজাতক শিশু রয়ে গেছে! তারা এখনও মায়ের কোলেই আছে! এই ইনকিউবেটর-এর আওতায় গার্মেন্টস শিল্প গত ৩০ বছর ধরে যে সুবিধাগুলো পাচ্ছে তা হলো : ১. বিদেশে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা, ২. সরকারের নগদ সুবিধা, ৩. ব্যাক টু ব্যাক এলসি পদ্ধতিতে শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা, ৪. করমুক্ত রপ্তানি আয়, ৫. স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ, ৬. সস্তা জ্বালানি। এই ছয়টি সুবিধা ৩০ বছর ধরে মালিকরা সরাসরি পাচ্ছে। এই ছয় সুবিধার সাথে মালিকরা আরো কিছু সুবিধা পাচ্ছে তা হলো : ১. পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা মজুরি, ২. শ্রমিকদের ট্রেডইউনিয়ন করতে না দেয়া, ৩. শ্রমঘণ্টা না মানা, ৪. সাপ্তাহিক ছুটি না থাকা, ৫. পুলিশ ও মাস্তানের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা, ৬. শ্রমিকদের আবাসনের দায়িত্ব না নেয়া, ৭. শ্রমিকদের সন্তানের শিক্ষা ও শ্রমিকদের চিকিৎসার দায়িত্ব না নেয়া।

এ ধরনের অসংখ্য প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সুবিধার কথা বলা যাবে যা আমাদের গার্মেন্টস মালিকরা ভোগ করছে। এত সুবিধা পাওয়ার পরও গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও তাদের ন্যায়সঙ্গত গণতান্ত্রিক অধিকার দিতে নারাজ। মালিকরা কথায় কথায় বলে মজুরি বৃদ্ধি করলে তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না, অর্ধেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়ে যাবে। আর আন্দোলন করলে ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যাবে, ফলে ক্রেতারা আর এদেশে আসবে না। আমাদের এখানে একদল সবসময় তলে তলে ভারতের সাথে আঁতাত করে চলে আর ভারত জুজুর ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সুবিধা নেয়।

তারা বলছে আমাদের বাজার ভারতের হাতে তুলে দেয়ার চক্রান্ত হচ্ছে এবং ভারতীয় মালিকদের ইন্ধনেই নাকি এখানে আন্দোলন হয়। এসব কথা বলে বাস্তবে তারা দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে। আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও তুরস্কের তুলনায় এত কম মজুরি দেওয়ার পরও কি বায়াররা বাঙলাদেশ ছেড়ে বেশী দামে ওদের কাছ থেকে পোশাক কিনবে? প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপালের তুলনায়ও আমাদের মজুরি কম। পুঁজিবাদী অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে পুঁজিপতি যেখানে সস্তা শ্রমশক্তি বা কাঁচামাল পাবে সেখনেই সে যাবে। আমাদের দেশে গার্মেন্টস শিল্পের বিস্তার ঘটার এটা একটা অন্যতম প্রধান কারণ।

এখন বাঙলাদেশে ‘আউট সোর্সিং’ বেড়েছে তার কারণও কিন্তু এটাই, সস্তা শ্রমশক্তি। তাহলে কোনো অজুহাতেই এই দেশ থেকে গার্মেন্টস শিল্প বাইরের দেশে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। উপরন্তু ভারত থেকে আমরা ৫ লক্ষ পিস কাপড়ের অর্ডার পেয়েছি। এখানে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও উস্কানি তত্ত্ব মালিক ও সরকারের উর্বর মস্তিষ্কের আবিষ্কার ছাড়া কিছুই নয়। আর গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাবে, লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই হবে এসব কথাও ভ্রান্ত।

২০০৬ সালে মজুরি বৃদ্ধির সময়ও একথা বলা হয়েছিল কিন্তু পরিসংখ্যান একথা স্বীকার করে না। বাস্তবে সেই সময়ের তুলনায় কমেনি বরং বেড়েছে। যদি কিছু কমেও সেটাও পুঁজিবাদী অর্থনীতির কারণেই কমেছে। বাঙলাদেশে অনেক সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করে এমন গার্মেন্টস এবং ছোট ছোট অনেক গার্মেন্টস প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর সাথে মজুরি কিংবা অন্য কোনো কিছুর সর্ম্পক নেই।

গত ৩০ বছরে গার্মেন্টস শিল্পে অনেকগুলো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান একচেটিয়া কারবার বা মনোপলি হাউজের মতো দাঁড়িয়েছে। ০৯. বর্তমান মহাজোট সরকার কিংবা বিগত কেয়ারটেকার সরকার কিংবা চারদলীয় জোট সরকার, এরা সকলেই মালিক লুটেরা ধনিকশ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী। সরকার যতই সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা বলুক কিংবা শ্রমিক-দরদি সাজার চেষ্টা করুক না কেন মজুরি বাড়ানোর প্রশ্নেই তাদের আসল চেহারা বেরিয়ে আসে। অর্থনীতিবাদী, সুবিধাবাদী ট্রেডইউনিয়নগুলো, এমনকি বামপন্থী নামধারী শ্রমিক সংগঠনও মালিকশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় চাতুরিপূর্ণ অবস্থান নিয়ে শিল্প রক্ষা, দেশের স্বার্থ রক্ষা ইত্যাদি বচন-বুলি দিয়ে শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করে। অধিকাংশ সাধারণ মানুষ, এমনকি আন্দোলনকারী শ্রমিকরা এসব চাতুরি ধরতে না পেরে বিভ্রান্তির শিকার হয়।

গার্মেন্টস সেক্টরে প্রায় ৩৫ লক্ষ শ্রমিক কাজ করছে। এরা অসংগঠিত, ট্রেডইউনিয়ন করার অধিকার তাদের নেই। তাদের এ দুর্বলতার সুযোগ যেমন মালিক পক্ষ নিচ্ছে, সরকার নিচ্ছে, তেমনি সুবিধাবাদী শ্রমিক সংগঠন, ঝুট ব্যবসায়ী, স্থানীয় কায়েমী স্বার্থবাদী মহল প্রত্যেকেই এর সুযোগ নিচ্ছে। শ্রমিকরা বার বারই নিপীড়ন-নির্যাতন-বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে শ্রেণীসচেতন ট্রেডইউনিয়ন আন্দোলন জোরদার করতে হবে।

এর কোনো বিকল্প নেই। দেশের স্বার্থেই শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন শ্রমিক বেতন পেলে সে টাকা দেশেই খরচ করে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য যেমন কাপড়, সাবান, টুথপেস্ট, স্যান্ডেলসহ দ্রব্য উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ে। লুটপাটকারী ধনীরা বিদেশে বাজার করে, বিদেশে টাকা পাচার করে। শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধি মানে দেশের উৎপাদনবৃদ্ধি।

তাই যে দেশের শ্রমিকদের মজুরি বেশী সে দেশ তত অর্থনৈতিকভাবে উন্নত। আড়াই-তিন হাজার টাকা বেতনের একজন দরিদ্র শ্রমিক মানে দুর্বল শ্রমিক, তার কাছে বেশী উৎপাদন আশা করা বোকামী। দুর্বল শ্রমিকের সন্তান শারীরিকভাবে দুর্বল এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই, শুধু গার্মেন্টস সেক্টরেই নয়, সকল শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৭০০০ টাকা করা প্রয়োজন। বাজার দরের সাথে সঙ্গতি রেখে জীবনধারণের মতো মজুরি তাকে দিতেই হবে।

গার্মেন্টস, পাট, চা, তাঁত, ঔষধ, রসায়ন, লৌহসহ বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে যে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে দেশের উৎপাদন হয়, বৈদেশিক মুদ্রা আসে, দেশে দামী গাড়ি আমদানী হয় সেই শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি বিবেকবান গণতন্ত্রমনা মানুষের দায়িত্ব। মানুষের মতো বাঁচার জন্য ন্যূনতম মজুরি, চাকুরীর নিশ্চয়তা, গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বেগবান করার উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ------------------------------------------------------------------------------ তথ্যসূত্র: ১. ভ্যানগার্ড, জুলাই এবং আগস্ট সংখ্যা ২. সংকটে পোশাক খাত-৩; আবুল কাশেম, কালের কণ্ঠ, ২০.০৭.১০ ৩. দৈনিক প্রথম আলো, ০৮.০৬.২০১০ ৪. সংবিধান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাঙলাদেশ সরকার ৫. অন্তর্জাল

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।