আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বিষয়: লিটলম্যাগ/ গুণে বৈগুণ্যে কথা ও কবিতা ২

পরিদৃশ্যমান সত্তা

ভণিতা: লিটলের বর্ণ গন্ধ ইত্যাদি বিষয়ে অনুধ্যায়ী হওয়ার আগে যে জিজ্ঞাসা নিজের জন্যই তৈরি হয়ে যায় তা হলো- লিটল ম্যাগ নিয়ে কথা বলার জন্য লেখক কতোটাইবা যোগ্য এবং লেখকের চরিত্র কি লিটল অনুগামী? উল্লেখিত প্রশ্নদ্বয়ের ১ম অংশটির সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়ে দ্বিতীয় অংশ প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত বাক্যব্যয় করা বোধ করি অমূলক হবে না- আমি কোন দৈনিকের লেখক নই। লিটল পরিবারের অতিক্ষুদ্র পাঠকমাত্র। আদি ও আসল: অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্টের প্রতিশব্দরূপে যে শব্দটি বহুল প্রচারিত তা হলো প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা। জিজ্ঞাসা তৈরি হতে পারে প্রতিষ্ঠান কী? পাড়ার মুদি দোকান থেকে শুরু করে কমিউনিস্ট পার্টি যেমন এক-একটি প্রতিষ্ঠান তেমনি কবিতা, গল্প এবং উপন্যাসের ফর্ম বা কাঠামোকেও প্রতিষ্ঠানরূপে চিহ্নিত করা অযৌক্তিক নয়। লিটল ম্যাগের প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার শ্লোগানচারীতায় বা ঘোষণায় কণ্ঠ দেয়ার পূর্বে প্রথমেই মলয় রায়চৌধুরীর কাছে কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হোক।

আব্বাসঃ এন্টি-স্টাবলিশমেন্ট বা প্রতিষ্ঠান বিরোধী বলতে স্পেসিফিকলি কী বোঝানো হয়? আলাপচারিতায় ওঠে এসেছে স্টাবলিশমেন্টের অ্যাবসট্রাক্ট ব্যাপারটিও। ঝেড়ে কাশি দেন। মলয়ঃ এস্টাবলিশমেন্ট শব্দটির বাংলা ''প্রতিষ্ঠান'' কেন যে করা হয়েছে কে জানে? এস্টাবলিশমেন্ট বলতে কোন প্রতিষ্ঠান বোঝায় না, অরগানাইজেশন বোঝায়। এস্টাবলিশমেন্ট একটি অ্যাবস্ট্যাক্ট ব্যাপার। প্রতিষ্ঠান শব্দটি দ্বারা ঠিক কোলাসা হয় না।

এস্টাবলিশমেন্ট এর টোটাল পাওয়ার স্ট্রাকচার এর বিরোধীতা করলেই বিপদ ঘনিয়ে আসবে। জেলে পুরে রাখবে, নাই করে দেবে। প্রতিষ্টান বিরোধীতা করলে আর কী করবে? কিছুক্ষণ চেচামেচি করবে। এস্টাবলিশমেন্ট হচ্ছে সিস্টেমেটিক পাওয়ার স্ট্রাকচার, একটা সমাজের। এসটাবলিশমেন্ট বলে একটা অ্যাক্ট আছে যা দোকান খোলার জন্য প্রয়োজন হয়।

ঐটা ট্রান্সলেট করার সময় প্রতিষ্ঠান আইন করা হয়েছিল, তা থেকেই শব্দটি এসে গেছে। সে যাই হোক, আমি অনেকের সঙ্গেই আলাপ করেছি শব্দটি নিয়ে। কেউ বলেছেন, ব্যবস্থা, ক্ষমতাকেন্দ্রিক, আসলে স্পেসিফিক শব্দ তৈরি হয়নি এখনও। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বলতেন- পশ্চিম বাংলায় চারটি পাওয়ার স্টেশন আছে। ঐ চারটি মিলিয়ে হলো এস্টাবলিশমেন্ট।

এক. পশ্চিমবঙ্গ সরকার। দুই. আনন্দবাজার। তিন. রামকৃষ্ণমিশন। চার. ব্রাহ্মণ সমাজের ঘাটি শান্তিনিকেতন- বিশ্ব ভারতী। এই মিলিয়ে পশ্চিম বঙ্গের স্টাবলিশমেন্ট।

আব্বাসঃ আজকাল যারা দৈনিকে লেখে তারাও লিটর ম্যাগের ধ্বজাধারী। গাদা গাদা বেরও হচ্ছে। এগুলো আদৌ কোন লিটল ম্যাগ? মলয়ঃ লিটল ম্যাগাজিন এখন আর সেই লিটল ম্যগাজিন নেই। এখন তো পশ্চিম বাংলায় যা লিখাপত্র থাকে তার চেয়ে থাকে বিজ্ঞাপন বেশি। শুনেছি অনেকে নাকি পত্রিকা বের করে সংসার চালায়।

বেশিরভাগ সম্পাদক আবার খবরের কাগজে কাজ করে। এখন তো টিভি চ্যানেল হয়েছে গাদাগাদা। টিভি চ্যানেলে, কলেজ স্ট্রীটের প্রকাশনা সংস্থাগুলোতেও কাজ করে। জগাখিচুরি হয়ে গেল না সবকিছু? সবাই খুব চালাক হয়ে গেছে- কে আার জীবন নষ্ট করতে চায় বলুন? আব্বাসঃ বাংলাদেশে ঠিক ঐ রকম নয়। আশির দশকের পর থেকে এখনও মূলত লিটল ম্যাগাজিনেই লেখকের রঙ তৈরি হয়।

দৈনিক-টৈনিক লেখককে পঁচিয়ে ফেলে , শস্তা করে দেয়। খুব অনবদ্য প্রতিভা না হলে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে না। বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে আপনার ধারণা কী? মলয়ঃ দু’চারটে পত্রিকাতো বেশ অসাধারণ। টোটাল প্রোডাক্ট, বাঁধাই, লেখা, ছাপা, প্রচ্ছদ এখানকার চেয়ে অনেক ভাল। ---------------------------------------------------------------------------- আব্বাসঃ প্রিয় মজনু শাহ, আমার চিন্তাস্তরে বিরাজমান ছিল আপনি একজন ঈমানদার লিটলম্যাগ কর্মী।

আপনার নাম উচ্চারিত হলে '৯০ দশকের একজন কবির চেহারাই ভেসে উঠতো, অর্থাৎ এতোদিনে আপনার নামের রঙ তৈরি হয়েছে; এর পেছনে প্রকাশনা জগতের যে মাধ্যমটি সরাসরি কাজ করেছে তা হলো লিটলম্যাগ। বেশ ক'বছর ধরে আপনি নির্দিষ্ট কিছু দৈনিক পত্রিকায় শুধু লিখছেনই না, ভিন্ন-অভিন্ন আলোচনায় মনে হলো- আপনি ওদের পক্ষেই সাফাই দিচ্ছেন এবং দুর্লক্ষ্য নয়, ঐ দলকেন্দ্রিক লেখকদের নামও আপনার মুখে ঘুরে ফিরে উচ্চারিত হচ্ছে, উচ্চকিত হচ্ছে। কারণ কী? এরকম প্রশ্নের বদলে তেজাব-তীব্র জিজ্ঞাসাই সয়ম্ভূ হয়- আপনি কি তবে লিটলম্যাগ পরিবারের ভ্রষ্ট সদস্যদের একজন? লিটল দৈনিক এসব মিলিয়ে যে হ-য-ব-র-ল অবস্থার তৈরি হয়েছে আপনিও কি এর অংশীদার নন? আমার তো মনে হয় আপনাদের এসব দুর্নীতির প্রভাব পড়ছে তৎপরবর্তী তরুণদের চিন্তায়। শূন্য দশকখ্যাত তরুণরা জনপ্রতি একটা বা দুইটা করে লিটল বের করেই যাচ্ছেন এবং এদের অধিকাংশ জনই আপনাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করায় কনসেপ্ট এর জায়গায় কেউই দাঁড়াতে পারছে না: না দাঁড়াচ্ছে লিটল, না দাঁড়াচ্ছে ব্যক্তি। শুধু দৃশ্যমান হচ্ছে ইঁদুর দৌড়।

আপনারা যারা '৯০ দশকে কেন্দ্রে ছিলেন, খামচা খামচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, আমার তো মনে হয় এইসব হ-য-ব-র-ল অবস্থার জন্য পুরোটা না হলেও আংশিক আপনারাই দায়ী। মজনু শাহ: prosnota pore mone holo, abar sei vut fire esese, je ekbar kadhe uthle ar niche namar nam kore na. se pray 10 bosor ager kotha. aj e niye bolte gele, aghat na kore upay thakbe na tader, jara ekhono amar bondhu. bisoyta darshonikvabe bichar korleo, kenona, ekhono amra onner motamot dashonikvabe grohone okkhom. hoyto ekdin somoy peye bistarito bola jabe tobu. bistaritoi bolte hobe, noile onek bibvranti toiri hobe abar, jemon bohu purono tottho o bastobotar khuj na janar karone apnar prosnei onek bibvranti ar mongora kisu bepar agagora roye gese.... ------------------------------------------------------------------------------- দীর্ঘ লিটল ম্যাগ কেন্দ্রিক আন্দোলন তর্ক-প্রতর্কসহ আলোচনা প্রত্যালোচনায় আমাদের মনস্তত্বে লিটলম্যাগ নিয়ে যে ধারণা তৈরি হয়েছে তা অনেকটাই এরকম: লিটল ম্যাগাজিন এক প্রতিষ্ঠান বিরোধী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠান ১. সুনির্দিষ্ট ও গভীর লক্ষ্য নিয়ে বিদ্যমান ২. স্বনির্ধারিত মানবিক প্রয়োজন কিংবা মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ৩. ক্ষমতাকাঠামোর সাথে আন্তঃসম্পর্কিত, তাই প্রবল শক্তিধর ৪. সাধারণ প্রতিক্রিয়াশীল, কখনও ছদ্মপ্রগতিশীল ৫. জনজীবনের নিয়ন্ত্রণপ্রয়াসী। তাি সুকৌশলে মানুষকে চেতনাগতভাবে বৃত্তাবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট ৬. প্রতিষ্ঠিত প্রথা বা রীতির সমর্থক ৭. মুনাফালোভী। তাই শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতির পণ্যায়ণে বিশ্বাসী ৮. বাজার স্বার্থে স্থূলতা, অনৈতিকতার প্রশ্রয়দানারী ৯. মিডিয়া লালিত ১০. শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তিতে বলীয়ান ১১. মননশীলতা, নতুনত্ব বা নিরীক্ষায় অনীহ ১২. সাহিত্য সংস্কৃতির স্বঘোষিত কেয়ার টেকার ১৩. স্বরিনর্বাচিত সূত্রগুচ্ছের অনুসারী ১৪. সত্যিকার দায়বদ্ধতায় অবিশ্বাসী ১৫. নির্বিরোধী স্থিতদাবস্থার পক্ষপাতী ১৬. তারুণ্যের অভিযাত্রায় বাধাদানকালী ১৭. আত্মসম্মানবোধহীন পদলেহীদের সদাপ্রস্তুত পৃষ্ঠপোষক লিটল ম্যাগাজিন ১. ঐহিত্য ও সামাজ সচেতন ২. সদা নতুনত্বে আগ্রহী, নিরীক্ষাপ্রবণ, মননশীলতায় ঋদ্ধ ৩. ক্ষমতাবলয়ের বাইরে, প্রায়শ এর বিপকেষ অবস্থান ৪.প্রবল নৈতিক শক্তির অধিকারী। তাই স্পষ্ট বক্তব্য প্রকাশে নির্ভীক ৫. সর্বদা প্রগতিশীল, মুক্তবুদ্ধির সমর্থক।

প্রকৃত ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ৬. প্রথাবিরোধী ৭. অবাণিজ্যিক। তাই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পণ্যায়নের ঘোর বিরোধী ৮. চেতনার জাগরণের মাধ্যমে জনজীবনে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারে প্রয়াসী ৯. সৎ বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতি দায়বদ্ধ ১০. সুরুচির প্রতীক। তাই সব রকম স্থূলতা আর কূটকৌশল বিরোধী। ১১. মিডিয়ার বৈরিতার শিকার ১২. দুর্বল আর্থিক ভিত্তি কিন্তু এসবে থোড়াই পরোয়া ১৩. স্বরচিত সূত্রাবলী নিজেই অবিরাম অতিক্রমে নিয়োজিত ১৪. সকলরকম স্থিতাবস্থার বিরোধী ১৫ তারুণ্যের অভিযাত্রায় সঙ্গী, সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক। নতুন লেখক, পাঠক তৈরিতে নিবেদিত।

১৬. প্রকৃত সাহিত্য, সংস্কৃতির অনুসন্ধানী ১৭ .সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকে স্পর্শ করে। প্রায়ই বিশেষ সংখ্যা বের করে এবং আকৃতির কোনো নির্দিষ্ট মাপ নেই। * সুবিমল মিশ্রের চোখে, প্রতিষ্ঠিত শক্তিই প্রতিষ্ঠান। তার চরিত্র হলো জিজ্ঞাসাকে জগিয়ে তোলা নয়, তাকে দাবিয়ে রাখা। যে কোনো স্বাধীন অভিব্যক্তির মুখ চেপে বন্ধ করা, অবশ্যই তা শ্রেণীস্বার্থে(সুবিমলের বিরুদ্ধে সুবিমল মিশ্র এবং উস্কানিমূলক অনেক কিছুই, আপাতভাবে) * লিটল ম্যাগাজিন চর্চার প্রেক্ষাপটে আমাদের বিবেচনায় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ক্ষমতা কাঠামোবর্জিত , অর্থ ও হীনস্বার্থে শিল্প সাহিত্যের পণ্যায়নের মাধ্যমে মানুষের চেতনাজগতে বিভ্রান্তি বুনে দিয়ে তাদের মানসিক দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে বন্দী করে রাখে।

প্রথা, রীতি, শিক্ষালয় কিংবা সংক্রামক প্রতিভাও ( রবীন্দ্রনাথ) প্রতিষ্ঠান * কারো পরোয়ানা করে নিজের ভাবনা-চিন্তা নিজের মতো লেখা, এটাই লিটল ম্যাগাজিনের মূলধর্ম... * লিটল ম্যাগাজিনস সাহিত্যের ধমনী, লিটল ম্যাগাজিন তো এক অর্থে আন্দোলন। তবে সেই আন্দোলন যদি হয় বুলিস্বর্বস্ব? মাইক নির্ভর, যদি তার মস্তিষ্কে সুদূরপ্রসারী কল্পনা না থাকে? তবে, ঐ কাঁচের ঘরে বনসাই, কী বাহারে লতা হয়ে কী লাভ? বরং পাহাড়ের চূড়ায় বৃক্ষ হওয়া অনেক শ্রেয়। অবশ্য ঘাতকের হাতের কুঠার বা ইলেকট্রিক করাত বুঝিয়ে দেয়, তার স্বল্পায়ু জীবন। একথা প্রায় সব লিটল ম্যাগাজিনের ভবিতব্য। * যে যে পত্রিকার ধান্দা থাকে, বিজ্ঞাপন মারফৎ শুধুমমাত্র টাকা উপার্জন অর্থাৎ তরুণ লেখকদের লেখা গৌণ- আর সবি মুখ্য, তাকে কে লিটল ম্যাগাজিন বলবে? লিটল ম্যাগাজিনের কাছ থেকে আমরা চাই নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পথ-নির্মাণের নিত্য নতুন চিন্তা ভাবনা বা বিদ্রোহের-হঠাৎ আলোর ঝলকানি বিশেষ।

* বুদ্ধদের বসুর সহিত্যপত্র পড়ে আমরা জেনেছি যে, লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কিত সেই অমোঘ পঙক্তি ঃ লিটল কেন? আকারে ছোট বলে? প্রচারে ক্ষুদ্র বলে? নাকি বেশিদিন বাঁচে না বলে? সবকটাই সত্য, কিন্তু এগুলোই সব কথা নয়; ওই ছোট বিশেষণটাতে আরো অনেকখানি অর্থ আছে। প্রথমত, কথাটা একটা প্রতিবাদ, বহুলতম প্রচারের ব্যাপকতম মাধ্যমিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। লিটল ম্যাগাজিন বললেই বোঝা গেল যে জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনও ছোঁবে না, নগদ মূল্যে বড়োবাজারে বিকোবে না, কিন্তু হয়তো কোনো একদিন এর একটি পুরোনো সংখ্যার জন্য গুণী-সমাজে ঔৎসুক্য জেগে উঠবে। সেটা সম্ভব হবে এই জন্যেই যে, এটি কখনও মন যোগাতে চায়নি, মনকে জাগাতে চেয়েছিল। চিয়েছিল নতুন সুরে কথা বলতে; কোনো এক সন্ধিক্ষণে যখন গতানুগতিকতা থেকে অব্যাহতির পথ দেখা যাচ্ছে না, তখন সাহিত্যের ক্লান্ত শিরায় তরুণ রক্ত বইয়ে দিয়েছিল- নিন্দা, নির্যাতন বা ধনক্ষয়ে প্রতিহত হয়নি।

এই সাহস, নিষ্ঠা, গতির একমুখিতা, সময়ের সেবা না করে সময়কে সৃষ্টি করার চেষ্ঠা- এই টেই লিটল ম্যাগাজিনের কূলধর্ম...। অরুণ মিত্র বলেছেন, শরীর দৃশ্যে তারা লিটল বটে, কিন্তু হৃদয় বলে রীতিমতো বিগ... * অরুণ মিত্র, বিনয় মজুমদার, উৎপল কুমার বসু, আলোক সরকার, উদয়ন ঘোষ, অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যঅয়, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবিমল মিশ্র, দেবদাস আচার্য্য, মলয় রায়চৌধুরী, অশোক চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ্বর ঘোষ কি মনীন্দ্র গুপ্ত দের চিনে নিতে আমাদের হয়তো সামান্য সময় লেগেছে। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসদের মতো লেখকদের চিনে নিতে আমাদের অসুবিধা হয়নি। * লিটল ম্যাগাজিনে ছাড় দেবার কোনো সুযোগ নেই। লেখক নতুন কি পুরোনো এটাও মূখ্য বিষয় নয়।

দেখতে হয় লেখাটিকে লিটল ম্যাগাজিন যে লেখাটিকে ধারণ করবে সেটি প্রচলের বাইরে কতটুকু, লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিটি কী, নাকি একেবারেই চলমান স্রোতে গা ভাসানো- এইসব। লিটল ম্যাগাজিনের লেখক কী বেছে নেবেন? আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেছেন, মৈথুনে পরিচিত মুখ না হলে তৃপ্তি পাওয়া যায় না। যাপিত জীবনের বাইর একটা মানুষ কতটুকু স্বচ্চন্দ হতে পারে? এই সমাজকাঠামোর ভেতরে থেকে সমাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি, সেক্স , ক্রাইম, ক্রমাগত অধোগতি, মিথ্যাচার-এগুলোর বাইরে একজন লেখক অবস্থান নেবেন কোন সে পরিসরে? যদি নাই থাকে তবে শুধু শুধু ফর্ম ফর্ম বলে চেঁচিয়ে, লেখার বিষয়টাকেই ফর্ম বানিয়ে ফেললে সমাজ থাকে না, সমাজের মানুষ থাকে না। মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, সার্থকতা, ব্যর্থতা, জীবনের টানাপোড়েন সর্বোপরি জীবন থাকে না। যুদ্ধ নাই থাকে তবে সাহিত্য কোথায়? চলমান জীবনের প্রতিচ্ছবি, মানুষের ভেতরকার বেপোরোয়া জেদ এবং হেরে যাওয়ার বেদনা কেবলই মুখ থুবড়ে পড়ে থেকে একসময় হারিয়ে যাবে সমাজেরই কোনো এক গলিতে।

সুবিমল বলেন, সমাজের এইসব অনিয়মগুলোকে আঙুল তুলে দেখাতে চাই। সুবিমল বলেন, আমার কাছে লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে কোনো লিটল ব্যাপার নেই, তা বাণিজ্যিক সাহিত্যের কোনো পরিপূরক নয়, প্যারালাল। লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে সাহিত্যের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি, বেপোরোয়া,রবীন্দ্রপরবর্তী বাংলা সাহিত্যে যা ক্রমশঃ প্রকট হচ্ছে, হয়ে উঠছে। এক কথায় আর্থ-সামাজিক তথা সাংস্কৃতিক সমস্ত রকম স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে তার অবস্থান। তথাকথিত জনপ্রিয় সাহিত্য পত্রিকাগুলোর প্রথম কথা হচ্ছে বাণিজ্য, দ্বিতীয় কথাও বাণিজ্য, এমনকি তৃতীয় কথাও।

সৃষ্টিশীলতার প্রশ্ন যেখানে অবান্তর, না হলে অত্যন্ত গৌণ। রুচিশীল পাঠক সৃষ্টির দায়বদ্ধতা সে স্বীকার করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রচলিত স্রোতে তাকে গা ভাসাতে হয়, ভাসাতে হয় তার নিজের বাণিজ্যিক স্বার্থেই। যা ছাপলে কমার্স হবে না, বিক্রি হবে না, তার পৃষ্ঠপোষকতা তারা সচারচর করে না, করতে পারেনা। কশ্চিৎ কখনও যখন করে বা করার ভান করে, মনে রাখতে হবে করে অবশ্যই শ্রেণীস্বার্থে।

অন্য ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগাজিনের মূলধন হচ্ছে সমস্তরকম স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে তার বিপ্লবাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি ও সাহস। বড় কাগজ, সাহিত্যে বাণিজ্য সফল কাগজ, যা, যেসব ছাপতে ভয় পায় তাই ছাপবে লিটল ম্যাগাজিন। যা কখনই এই আর্থ-সামাজিক পরিবেশে বাণিজ্যিক নয়, বরং মৌলিক, একগুঁয়ে বা পরীক্ষানির্ভর। কখনও কখনও উস্কানিমূলকও। খ্যাতিমানের অনুগ্রহের এক-আধ পৃষ্ঠার এঁটোর সে তোয়াক্কা করে না।

পুরোনো কালের সৃষ্টিশীল বিষয়গুলির পুনরাবিষ্কারএর সঙ্গে সঙ্গে সমসাময়িককালে নতুন কে কী বলছে কী লিখছে তার একটা ধারণা তুলে ধরার দাযিত্ব লিটল ম্যাগাজিনের। প্রচলিত ধ্যান-ধারণাগুলোর ফাঁপা জায়গাটা সে দেখিয়ে দেবে, সমস্ত রকম ভাঙচুর আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করার দায়িত্ব তার, সাহিত্যের সবরকম আর সবদিকের সম্ভাবনাগুলি খতিয়ে দেখার - আর সেই সূত্রেই একধরণের বেপরোয়া আর বেহিসেবী তার ভঙ্গি। আগামী প্রজন্মের সমস্তরকম প্রশ্নচিহ্নের প্রতি তার থাকবে পিতৃপ্রতিম সহানুভূতি। লিটল ম্যাগাজিন যেহেতু মূলত সাহিত্য-সংস্কৃতি নির্ভর, তাই জীবনের লক্ষণ। আমি ব্যক্তিগতভাবে লিটল ম্যাগজিন থেকে আরো বেশি চাই-চাই এ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট মানসিকা।

প্রচ- রাগী চেহারা হবে তার। কোনরকম কম্প্রোমাইজের মধ্যে নেই সে। গতানুগতিকতার বিরুদ্ধে তার বিতৃষ্ণা হবে আন্তরিক, ব্যবসায়িক স্বার্থে যে সব আধমরা লেখককে প্রতিষ্ঠান তুলে ধরতে চায়, দেখাতে চায় এরাই লেখক, এদের লেখাই ১নং, আগমার্কা এবং বাজারের সেরা মাল-তাদের, সেইসব যশ-কাঙালের মুখোশ খুলে দেয়ার দায়িত্বও লিটল ম্যাগাজিনের। প্রচলিত দৈনিক সাপ্তাহিকগুলোতে সাহিত্যের নামে কুচো চিংড়ির যে রগরগে ঝালচচ্চরি চালাবার চেষ্টা করা হয়, তা স্বাদু হতে পারে কিন্তু স্বাস্থ্যের পক্ষে তা মারাত্মক, সেখান থেকে কলেরা ছড়াবার সম্ভাবনা প্রবল। এ সম্বন্ধে পাঠককে সতর্ক করে দেবার দাযিত্বও লিটল ম্যাগাজিনের।

মোট কথা, অন্যভাবে বললে আমাদের সমাজের কাঠামোগত দিক, সংস্কৃতির জগতেও চারিয়ে আছে সেই একই লড়াই। যে কাগজের পুঁজি তিনশ টাকা আর যে কাগজের তিরিশ লক্ষ তাদের উদ্দেশ্য কখনও এক হতে পারে না। সাহিত্য-সংস্কৃতির ব্যবসায়িক কাগজের সঙ্গে নিজের নাম জড়ানোকে আমি এক ধরণের বেশ্যাবৃত্তি ছাড়া অন্যকিছু মনে করি না। সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠানগুলি তো আমাদের দেশে , কুকুর পোষার মতো লেখক পোষে। আবার যাঁরা বই ছাপার জন্য রাইটার্স বিল্ডিং থেকে ‘‘ডোল’’ আনতে যান তাঁরাও ব্যবহৃত হন প্রায় একই রকমভাবে।

প্রত্যক্ষভাবে হয়তো নয়, কিন্তু পরোক্ষে তাঁদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা কিছু না কিছু কেড়ে নেওয়া হয়ই। নিজেদের শ্রেণীস্বার্থে তাদের ব্যবহার করা হয় এবং ছিবড়ে করে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়- এ । একথা অস্বীকার করে লাভ নেই যে বাণিজ্যিক সাহিত্যের একটা ধারা সব সময়ই সব দেশেই আছে থাকবে। শংকর-সুনীল-শ্যামল-শীর্ষেন্দু প্রফুল্ল রায়দের দল( আরো নাম যোগ হতে পারে) একশ বছর আহে ‘‘নীল বসনাসুন্দরী’’ লিখেছে, এখনও লিখছে, ভবিষ্যতেও লিখবে। কিন্তু সতর্ক হবার জায়গা এখানে যে, এনারা দাবি করেন এনাদের তৈরি মালই ১ নং, খাঁটি এবং মৌলিক।

এনাদের আগমার্কা প্রোডাকশনের বাইরে আর কিছু নেই, আর কেউ কিছু করছে না। ব্যবসায়ী সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান তার অস্তিত্বের পাশাপাশি আর কোনো সৃজনশীল সাহিত্যগোষ্ঠীর অবস্থিতি সত্য করতে পারে না। কমার্শিয়াল লেখা নয় এমন লেখাকে এক্সপেরিমে›াঁল নাম দিয়ে বসিয়ে দেয়া হয়। এঁরাই নিজেদের কাগজে বেস্ট সেলার ছেপে বাঙলা সাহিত্যেল ‘‘বেস্ট ’’ বইগুলো বেছে দেয়। মফস্বলের লাইব্রেরিগুলো এবং অগণিত সাধারণ পাঠক , যাঁরা অতশত খোঁজ খবর রাখেন না, ভেতরের ধান্দাবাজি বোঝেন না, তাঁরা -কলকাতায় এসে বেস্ট বইগুলো কিনে নিয়ে যান।

বিয়ে-শাদিতে এই বেস্ট বইগুলোই উপহার দেওয়া হয়। এইসব বইয়ের বাইরে বাংলা সাহিত্যের যে বিপুল জগৎ, সত্যিকারের সৃষ্টি যেখানে সম্ভব হচ্ছে, তার খোঁজ রাখা এঁদের সম্ভব হয় না, প্রচার নেই বলে, মিডিয়ার অনুগ্রহ নেই বলে, বিজ্ঞাপন নেই বলে। এই যে মিডিয়ার কথা বলছি, এ এক সাংঘাতিক বস্তু এ যুগে। যেহেতু এইসব সংবাদ সাহিত্য প্রতিষ্ঠান নিজেরাই এক একটা মিডিয়া, তাই এদের এই ভঙ্গি ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়ায়- কাদের এরা লেখক করবেন কাদের করবেন না তা এঁদের মেজাজ মর্জির ওপর নির্ভর করে। নির্ভর করে শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্দিষ্ট ব্যক্তি কতখানি অনুগত তার আনুপাতিক হারের ওপর।

এর ফল হিসেবেই আমরা দেখতে পাই কমল কুমার মজুমদার বা অমিয়ভূষণ মজুমদারের মতো লেখকের নামই পৌঁছায় না ব্যাপক পাঠক-সাধারণের কাছে, রমেন্দ্রকুমার আচার্য্যচৌধুরীর মতো কবি সারাজীবন অনাবিস্কৃত থেকে যান, পুরস্কারটার মতো ঘরে লোকদেরও নিয়েও এরা ছেলেখেলা করে। । রবীন্দ্রপরবর্তী বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় দুর্লক্ষণ, যা ক্রমশঃই বর্ধমান, তা হচ্ছে এই যে নিস্কৃষ্ট বহু কিছুকে শ্রেষ্ঠত্বের মুখোশ পরিয়ে বাজারে বিপুলভাবে বিজ্ঞাপিত করে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করা-প্রচার করা ঐগুলোই একমাত্র ১নং- যে প্রবণতা অক্ষম সাহিত্য সৃষ্টির চেয়েও ক্ষতিকর। লিটল ম্যাগ কেন্দ্রিক বহুবিধ ধারণাপোষণ করে তৃতীয়বাংলা থেকে যে কয়টি কাগজ বের হয় তার মধ্যে শব্দপাঠ, স্রোতচিহ্ন, আদি কাকতাড়–য়া, ধী স্বর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসকল কাগজের সঙ্গে যারা জড়িত তারা কি শুধু সম্পাদকের দযিত্ব পালন করছেন না সংগ্রাহকের? কতোটা মৌলবাদ বিবর্জিত? আদৌ কি লিটল ম্যাগ হয়ে উঠছে নাকি নানা রকমের লেখকদের মহাসমাবেশ ঘটিয়ে বিশ্ব এজতেমা সংকলিত করছেন? পেটমোটা সংকলন করে ভলিউমের বাইসেপ, ট্রাইসপ দেখিয়েছে, দেখিয়ে যাচ্ছেন নিরন্তর? জিজ্ঞাসা আরো গভীরে প্রোথিত হলে তৃতীয় বাংলার লিটলম্যাগ উভয়বঙ্গে তথা বাংলাভাষাভাষী সর্বঅঞ্চলে চিহ্ন তৈরি করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত কছি।

পত্রিকাগুলোর সম্পাদেকের নামও স্মরণ করছি সেই সঙ্গে। আদি কাকতাড়ুয়া - মাশুক ইবনে আনিস, স্রোতচিহ্ন- সুমন সুপান্থ, শব্দপাঠ- আবু মকসুদ, ধীস্বর – মঞ্জু মিস্ত্রাল। প্রিয় নম্রতা আজ আপাতত এই সকল তথ্যই আপনাকে জানালাম তৃতীয়বাংলা এবং লিটলম্যাগ নিয়ে। এখন পচ্ছিল অন্ধকারে দীর্ঘ দাঁড়াবো... ভাল থাকুন। ইতি গেওর্গে আব্বাস।

------------------------------------------------------------------ তথ্যসূত্রঃ ১.শিল্পের জন্য স্বার্থত্যাগ, দেবী রায় ২. লিটল ম্যাগাজিন এক প্রতিষ্ঠান বিরোধী প্রতিষ্ঠান, কামাল মোস্তফা ৩. টেক্সচুয়াল কালচার থেকে অ্যাকটিভ কালচারে প্রত্যাবর্তন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার ইশতেহার বিষয়ে একটি খসড়া আলোচনাসূত্র ৪. লিটল ম্যাগাজিনের চারিত্র-সন্ধানে, সরকার আশরাফ ৫. ছোটকাগজ /বড় কাগজ বৈপরীত্য ও সৃষ্টির প্রকাশ, মঈন চৌধুরী ৬. সমাজ নিরীক্ষণ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ ৭. উলুখাগড়া, এপ্রিল ২০০৯ ৮. অমৃতলোক, ১৯৯৭ ৯. কবিতীর্থ, গ্রীষ্ম ২০০৪ ১০. নিসর্গ, বর্ষ ২১, সংখ্যা ০১

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ১৩ বার

এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.