আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

শুধু টিপাইমুখে নয়



পূঁজিবাদী বিশ্ব ও তার একচেটিয়া মুনাফাখোর বহুজাতিক কোম্পানীগুলো মরিয়া হয়ে উঠেছে বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মুনাফা অটুট রাখার জন্য। যে কোন সময় থেকে বর্তমান সময়ে পুঁজিবাদী উৎপাদন সংকট আরো ঘনিভূত হয়েছে, ভেঙে পড়েছে মুক্ত বাজার অর্থনীতি। পুঁজিবাদের ভয়াল রূপ আরো নৃশংস হচ্ছে, বেরিয়ে পড়ছে তার খাদক চেহারা। দুনিয়াব্যাপী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাজার-কাঁচামাল এবং পূনরোৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখার চেষ্টা হচ্ছে। এবার তার নজর পড়েছে হিমালয়ের উপর।

হিমালয়কে ঘিরে বিশ্বব্যাংক এডিবি জাপান সহ বেশ কিছু কর্পোরেট ব্যাংক ধ্বংসের মহাযজ্ঞ শুরু করেছে। টিপাইমুখ তারই একটি। টিপাইমুখের আড়ালে চলে গেছে আরো ৫৫২টি বাঁধ। বিশ্বব্যংক এডিবি যে ধ্বংসের পরিকল্পনায় অর্থ্যায়ন করছে এবার হয়তো খোদ বিশ্বব্যাংক এডিবি বিরোধী আন্দালনই শেষ হয়ে যাবে এই সব কথিত উন্নায়ন সহযোগীরা। আর যদি নিরাশাবাদিদের মতে মেনে নিতে হয় এই মরণদশা বাঁধ তবে দক্ষিণ এশিয়াই হয়তো একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে।

ধ্বংসের মহাযজ্ঞ হিমালয় অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কথা শোনা যাচ্ছে ৯০ দশকের শেষ দিক হতে। বিষয়টি আরো বেশি করে তখনই আলোচনায় এসেছে যখন খোদ ভারতের বিশেষজ্ঞ ও সংগঠন এসব বাঁধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে লেখালেখি করেছেন। ২০০৩ সালের এপ্রিলে ইকোলজিস্ট এশিয়া ইস্যুতে একটি বিশেষ সংখ্যাও হয়েছিলো বিষয়টি নিয়ে। প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন নিবন্ধ, সমাবেশ, সেমিনারও হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল রিভার্সের সমীক্ষায় যে চিত্র বের হয়ে এসেছে, তা আশঙ্কার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ।

তথ্যমতে, হিমালয় অঞ্চলে চীন সহ দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশেই সব মিলিয়ে ৫৫৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহল করেছে। এর মধ্যে পাকিস্তানের ছয়টির নির্মাণ কাজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। নির্মাণাধীন রয়েছে সাতটি। পরিকল্পনাধীন রয়েছে আরও ৩৫টি। ভারতে ৭৪টি বাঁধ ইতোমধ্যে নির্মাণ শেষ হয়েছে।

নির্মাণাধীন রয়েছে ৩৭টি। আরও ৩১৮টি বাঁধ পরিকল্পনাধীন রয়েছে। নেপালে ১৫টির কাজ শেষ হয়েছে। নির্মাণাধীন ২টি এবং পরিকল্পনাধীন রয়েছে ৩৭টি। ভুটানের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে পাঁচটির।

আরও ১৬টি পরিকল্পনাধীন রয়েছে। হিমালয় অঞ্চলের মধ্যে আফগানিস্তানের বর্তমান সরকার তালেবান ও আল-কায়েদা সামলানোর বদলে জলবিদ্যুৎ নিয়ে মাথা ঘামাবেÑ এমন সম্ভাবনাও নেই। প্রসঙ্গত, ভুটানের প্রায় সব কটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে ভারতের সহায়তায়। যেকোনো কৃত্রিম বাঁধ কিম্বা ড্যাম সেখানকার শত সহস্র বছর ধরে চলে আসা জৈব প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে বাঁধাগ্রস্ত করে এবং শেষ পযর্ন্ত ধ্বংস করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ল্যাটিন আমেরিকার বাঁধগুলো সেদেশের জৈব প্রাকৃতিক পরিবশে ধ্বংষ করে দিয়েছে।

মানুষ শুধুমাত্র খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে বাঁচে না, প্রাকৃতিক এবং পরিবেশের হাজার রকমের বিচিত্র দান এবং অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মানুষ এবং প্রকৃতিক টিকে থাকার শর্তগুলো জিইয়ে রাখে। ড্যাম এবং বাঁধ উক্ত জৈব প্রাকৃতিক ব্যভস্থার শর্তগুলো নষ্ট করে দেয়। হিমালয়জুড়ে বাঁধ হলে সাম্ভাব্য সেই ক্ষতি ঢেকে আনার নামান্তর। জলের তলে চলে যাবে পাহাড়ি গ্রাম হিমালয় অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাঁধের কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজন হবে বিশাল বিশাল জলাধার। এতে করে বাঁধ চালুর সঙ্গে সঙ্গেই তলিয়ে যাবে অনেক জনপদ।

ইতোমধ্যেই এমন অঘটন ঘটেছে। ভারতের উত্তরাখ- রাজ্যে এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে ডেইরি শহরসহ ৩৭টি গ্রাম সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। আরও ৮৮টি গ্রাম আংশিক জলমগ্ন হয়েছে। এতে করে ১০ হাজারের বেশি পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়তে হয়েছে। পাকিস্তানের দিয়ামের ভাসা বাঁধের কারণে ৩২ হাজার একর বা ১৩২ বর্গ কিমি জমি পানির নিচে হারিয়ে যাবে।

ঘরছাড়া হবে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। পাকিস্তানের আরেকটি প্রকল্প আখোরির কারণে ২৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা তলিয়ে গিয়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হবে। বাংলাদেশে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে চাকমা রাজবাড়িসহ বিভিন্ন জনবসতি যেমন কাপ্তাই হ্রদে পরিণত হয়েছে, তেমনই বিপর্যয় নেমে আসবে হিমালয়ের পাঁচ শতাধিক বাঁধের প্রতিটি সংলগ্ন বিশাল এলাকায়। ভারত ও পাকিস্তানের তিনটি বাঁধের কারণে সরাসরি ও তাৎক্ষণিক কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সে কথাই শুধু বলা হলো। হিমালয় অঞ্চলের বাঁধগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব হবে আরও ভয়াবহ, সুদূরপ্রসারী।

নদী, বন, মাছের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল অনেক মানুষকেই জীবীকা হারাতে হবে। তবে সভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে, উন্নায়ন কার জন্য? মানুষ না বহুজাতিক কোম্পানীর মুনাফা? বাংলাদেশের ফুলবাড়ি কয়লা খনির মত এখানে সমান সত্য এই উন্নায়ন হলো বহুজাতিক কোম্পানীর মুনাফা আরো অধিক হারে করার জন্য জীব বৈচিত্র ধ্বংস করে এসব প্রজেক্ট করা হচ্ছে। সেখানে সাধারণ মানুষের যেমন কোন অংশগ্রহণ নেই তেমনি ভারতীয় রাষ্টের সামগ্রিক উন্নায়নের কোনও বাস্তব বিষয় নেই, যা আছে তা হলো পুঁজির উদাগ্র মুনাফা। এবং অতি অবশ্যই বহুজাতিক কোম্পানীর মুনাফা। প্রাকৃতিক সম্পদহানী হিমালয়বাহিত নদী অববাহিকাগুলো অঞ্চলের অধিবাসীরা কৃষি, মৎস্য ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।

হাজার বছর তাদের জীবন প্রণালী এভাবেই চলে আসছে। সেখানে কোন সমস্যা হচ্ছে বলে আমাদের জানা নেই। বাঁধগুলোর কারণে বিশাল বনজসম্পদ তলিয়ে যাবে। মাছ কমে যাবে। নদীতে পানি না থাকায় একদিকে সেচকাজ বিঘিœত হবে, অন্যদিকে দেখা দেবে মরুময়তা ও অনুর্বরতা, কৃষি খাত বিপর্যস্ত হবে।

বিবিসির ২০০৯ এর ২৮ আগস্ট এর তথ্য অনুযায়ী হিমালয়ের পাহাড়ে বসবাসরত নেপালের বিভিন্ন এলাকাতে পানির তিব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অর্থ্যাৎ বাঁধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ভারতের অরুণাচলে নির্মাণাধীন দুই হাজার মেগাওয়াটের লোয়ার ছুবনছিড়ি প্রকল্পের কারণে সেখানকার দুরপাই গ্রামসহ বেশ কয়েকটি জনপদ তলিয়ে তো যাবেই, ইতোমধ্যেই দেখা দিয়েছে নানা ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া। জলাধার নির্মাণের জন্য চিহ্নিত ৪০ বর্গকিলোমিটার বন এলাকায় শিকার মিলছে না, ধানক্ষেতগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নদীতে মাছ কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

ছুবনছিড়ি নদী ছিল ওই অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ পথ। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে এখন নৌকা ও ভেলা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এমন বিবর্ণ চিত্র প্রায় প্রতিটি বাঁধ এলাকায়। পাল্টে যাবে জীবনের গতি হিমালয় অঞ্চলের অধিবাসীদের সাংস্কৃতিক ও জীবন ব্যভস্থা সম্পূর্ন ভিন্ন। হিমালয়জুড়ে বাঁধ উক্ত অধিবাসীদের ভাষা, ধর্মচর্চা ও তীর্থ হুমকির সম্মুখীন করে তুলবে।

খুবই ক্ষুদ্র কিছু আদিবাসী গোষ্ঠী বাঁধ নির্মাণ করতে আসা বিপুল জনগোষ্ঠীর তোড়ে বিপন্ন হয়ে পড়বে। উদাহরণ হিসেবে অরুণাচল প্রদেশের তিন হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ডিবাং প্রকল্প এলাকার কথা বলা যায়। সেখানকার সবচেয়ে বড় আদিবাসী গোষ্ঠী হচ্ছে ‘ইদু মিশামি। তাদের জনসংখ্যা ১১ হাজার ২১। অথচ ওই প্রকল্পে কাজ করার জন্য বাইরে থেকে শ্রমিক আসবে ছয় হাজারের মতো।

একটি বাঁধ এলাকার সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠীর অবস্থা যদি এই হয়, মাত্র কয়েকশ সদস্যের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর কী হবে? আদিবাসীদের জীবনযাপন পদ্ধতির সঙ্গে স্থানীয় পাহাড়ি, নদী, জলাভূমি ও বনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তাদের জীবনাচরণেও মারাত্মক প্রভাব পড়বে। বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কারণে হিমালয় অঞ্চলের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থান নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। নেপালের কালীগ-কি প্রকল্পের কারণে হিন্দু ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থ শালগ্রাম শিলা ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। ভাগীরথী নদীও হিন্দুদের কাছে খুবই পবিত্র।

আটটি বাঁধ নির্মাণের পর ওই নদী তার পবিত্রতা কতখানি বজায় রাখতে পারবে সন্দেহ আছে। বাঁধের কারণে হিমালয় অঞ্চলে থাকা বিশ্বের প্রথম দিককার কিছু সভ্যতা হুমকির মুখে পড়ে যাবে। প্রতিবেশগত হুমকি হিমালয় পার্বত্যাঞ্চল কেবল জীববৈচিত্র্যেরই আধার নয়, এর নাজুক অবস্থার জন্যও পরিচিত। কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল হিমালয় অঞ্চলে ১০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ চিহ্নিত করেছে। এর প্রায় চার হাজারই হচ্ছে হিমালয় অঞ্চলের জন্য বিশেষায়িত।

ওই অঞ্চলে তিনশ প্রজাতির জীবজন্তুও রেকর্ড করা হয়েছে। এর অনেক হচ্ছে বিশেষায়িত। হিমালয় অঞ্চলের এক অরুণাচলেই হচ্ছে বিশ্বের ১৮ বায়োডাইভারসিটি হটস্পটের একটি। এখানে পাঁচ হাজারের বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ, ৮৫ প্রজাতি জীবজন্তু, ৫০০ প্রজাতির পাখি এবং বিপুলসংখ্যক প্রজাপতি, কীট-পতঙ্গ চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই অঞ্চলের আরেক রাজ্য সিকিমের বৈচিত্র্যময় উচ্চতা ও বৃষ্টিপাত ফুলেল স্বর্গ তৈরি করেছে।

দুই রাজ্যেই তৈরি করা হচ্ছে বিপুলসংখ্যক বাঁধ। এর ফলে অনেক এলাকা সরাসরি তলিয়ে যাওয়া ছাড়াও নদী ঘুরিয়ে দেয়া, জলজ পরিবেশ নষ্ট, খনন, বিস্ফোরণসহ নানা ধরনের নির্মাণ তৎপরতা চলবে। কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল বলছে, এর ফলে গোটা হিমালয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য প্রতিবেশ ও পরিবেশে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দেবে। ভূ-তাত্ত্বিক ঝুঁকি ভূ-তাত্ত্বিক ফাটলের কারণে হিমালয় অঞ্চলে এমনিতেই ভূমিকম্পের ঝুঁকি প্রবল। টেকটোনিক প্লেটের অবস্থানের দিক থেকে গোটা হিমালয় অঞ্চল নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

ভারতীয় প্লেট উত্তর এশীয় প্লেটের নিচে যাওয়া অব্যাহত রেখেছে এবং দুই প্লেটের মাঝের শিলা প্রবল চাপের মুখে পড়েছে। যে কারণে হিমালয়ের দক্ষিণ ভাগজুড়ে ভূতত্ত্বে অনেক চিড় ও ফাটল তৈরি হয়েছে। এর ওপর সেখানে নির্মিত হচ্ছে বাঁধের মতো শত শত ভারি স্থাপনা। এতে করে ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যেভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে, নদীর পানি অপসারণ বা প্রবাহ ঘুরিয়ে দেয়া হচ্ছে, বনভূমিতে সরোবর তৈরি করা হচ্ছে, তাতেও ভূমিকম্প বেড়ে যেতে পারে।

বাঁধ এলাকায় একেকটি ভূমিকম্প বিরাট বিপর্যয় তৈরি করবে। ভূমিকম্পের সামাজিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় সামাল দেয়াই কঠিন হয়ে যাবে। ভূমিকম্প ঝুঁকি এলাকায় বাঁধ নির্মাণ খোদ প্রকল্পের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। ছোটখাটো ভূমিকম্পে বাঁধের যদি ক্ষতি নাও হয়, উঁচুস্থানে জলাভূমি বা জলাভূমিতে পাহাড় মাথা তুলতে পারে। ২০০৮ সালে চীনের সিচুয়ান প্রদেশে যে ভূমিকম্প হয়েছিল, তাতে ১৩টি নতুন জলাশয় তৈরি হয়েছিল।

এমনটা ঘটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্দেশ্যই নস্যাৎ হয়ে যাবে। এতো পলি কোথায় যাবে হিমালয় আগাগোড়া পাথুরে নয়Ñ মাটি ও বালির আধিক্যের কারণেই পর্বতমালাটি এত সবুজ। এই অঞ্চলে প্রবাহিত প্রতিটি নদী বিপুল পলি বহন করে থাকে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উর্বর ভূমি হিমালয়ের পলিরই আশীর্বাদ। নদীর বিভিন্ন অংশে বাঁধ নির্মাণ হলে এ পলি সমতল পর্যন্ত আসতে পারবে না।

এতে করে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভূমি উর্বরতা হারাবে। উজানে জমে থাকা পলি বাঁধের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। বেশি পলি জমা হলে নদী খাত ও পানি মজুদের জন্য সৃষ্ট হ্রদ ভরাট হয়ে যাবে। এতে একদিকে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে, অন্যদিকে উজানে বন্যা ও ভাঙন বেড়ে যাবে। সিকিমে নির্মিত তিস্তা ভি ড্যাম প্রকল্পের এখনো এক বছর হয়নি।

অথচ এরই মধ্যে বাঁধটির উজানে পলি জমতে শুরু করেছে এবং খোদ প্রকল্পের জন্যই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। হিমালয়ে ভূমিধসের হারও অনেক বেশি। বাঁধের উজানে ভূমিধসের কারণে পলির হার হঠাৎই অনুমিত মাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। আবার বড় ভূমিধসের কারণে নদী বা হ্রদে বিশাল ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়ে বাঁধের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আকস্মিক প্লাবনে ভেসে যেতে পারে স্থাপনাগুলো।

কেবল পলি ও ভূমিধসই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা ও মেয়াদ কমিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। অতি বৃষ্টি হিমালয়ের অধিকাংশ নদী বৃষ্টি ও তুষারজাত। বাঁধ নির্মাতারা কয়েক দশকের গড় বৃষ্টিপাত হয়ত বিবেচনায় রাখছেন। কিন্তু সেটা হঠাৎ করে কমে কিংবা বেড়ে গেলে? জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন আশঙ্কা ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়ে গেলে বাঁধের উজানে পানির প্রবল চাপ ও প্লাবন দেখা দেবে।

তাতে পানি ছেড়ে দিলে ভাটিতে বন্যা দেখা দেবে। আবার পানির চাপ বেশি থাকলে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার আগেই বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। ১৯৯৩ সালের জুলাই মাসের ২ তারিখে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় নেপালের কাঠমন্ডু এলাকায় ৫৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল। বৃষ্টির ফলে কুলেখানি বাঁধের জলাধারেও জমেছিল ৫০ লাখ ঘনমিটার পলি। আর বৃষ্টিপাত কমে গেলে তিস্তার মতো অনেক নদীর পানি প্রবাহ আকস্মিকভাবে কমে যাবে।

ফলে অনেক বাঁধই অকার্যকর হয়ে পড়বে। ভয়ঙ্কর অতিত হিমালয় অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সমর্থকরা বলছেন, বাঁধের কারণে ‘কিছু’ ক্ষতি হবে; কিন্তু তার ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। কিন্তু এসব প্রকল্পের ট্র্যাক রেকর্ড ভালো নয়। চল্লিশের দশকে নির্মিত ভারতের ভাকরা বাঁধ এবং ষাটের দশকে নির্মিত পাকিস্থানের তারবেলা বাঁধের কারণে উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীকে এখন পর্যন্ত পুনর্বাসন সম্ভব হয়নি। ওয়ার্ল্ড কমিশন অন ড্যামসের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে বিভিন্ন সময়ে নির্মিত বাঁধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ৭৫ শতাংশই এখন পর্যন্ত প্রতিকার পায়নি।

প্রাকৃতিক ও সামাজিকভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি ছাড়াও খোদ বাঁধগুলোরই ঝুঁকির ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আসছে পরিবেশবাদীরা। প্রকৃতিতে সামান্য পরিবর্তনেই এসব বাঁধ যে কতটা নাজুক হয়ে পড়ে, এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল ১৯৮৫ সালে নেপালে। ওই বছরের ৪ আগস্ট দুধকুশি নদীর লাঙমোচে হিমবাহ ভেঙে পড়েছিল ডিগ শো হিমবাহ-হ্রদে। ওই ধাক্কায় উপচে গিয়েছিল হ্রদটির প্রান্তে অবস্থিত প্রাকৃতিক বাঁধ। এর ফল হয়েছিল ভয়াবহÑ মুহূর্তেই ভেসে গিয়েছিল নিচের দিকের ছোট একটি নদীতে ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।

ভাটির দিকে পরিবেশ ও প্রতিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। ৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত আবাদী জমি লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল। হিমালয় অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো হাতে নেয়া হচ্ছে ‘হাইড্রো ডলারের’ বিরাট স্বপ্ন দেখিয়ে। অরুণাচল সরকারের এক নোটে বলা হয়েছেÑ ‘আরব দেশগুলো যেমন পেট্রো ডলারের ওপর ভাসছে, এ রাজ্য ভাসবে হাইড্রো ডলারে’। বলা হচ্ছে, খুব সামান্য খরচেই হিমালয়বাহিত নদীগুলো থেকে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

আগামী ২০ বছরে দেড় লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় বাঁধ নির্মাণকারীরা। কিন্তু তাদের দাবি নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান প্রধান প্রশ্নের প্রথমটি হচ্ছে, বাঁধ নির্মাণ ব্যয়ে কেবল ইট-কাঠের খরচ হিসাব করা হয়েছে। কিন্তু এর ফলে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত যে ক্ষতি হবে; বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় মৎস্য, কৃষি ও বনজ সম্পদের যে উৎপাদন কমে যাবেÑ সেগুলোর হিসেবে বাইরে রেখে হিসেবে করা হয়েছে। অথচ জীব এবং পরিবশের যতো ক্ষতি হবে তা অর্থের মাধ্যমে হিসেব করাটা শুধু বোকামিই হবে না, তার পরণতি নিশ্চিত ধ্বংস।

এই ক্ষতি হলো পৃথিভীল বিভিন্ন সভ্যতা ধ্বংসের ক্ষীতর সাথে মিলিয়ে বলা যায়। দ্বিতীয়ত, যে দামে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলা হচ্ছে, সেটা ঠিক থাকবে না। সম্পূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, সেটা এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে ইন্টারন্যাশনাল রিভার্সের সমীক্ষায় বলা হচ্ছে। তার মানে, সম্ভাব্য অর্থদাতাদের পর সাধারণ ব্যাংক ও বেসরকারি খাত থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হবে সংশ্লিষ্টদের। এতে করে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।

এছাড়া হিমালয়ের যেসব অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো অবস্থিত, বিদ্যুৎ ব্যবহƒত হবে তার থেকে অনেক দূরে। মূলত ভারত ও পাকিস্তানের শিল্প নগরীগুলোতে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় এই বিদ্যুৎ পরিবহনের খরচ ধরা হয়নি। সেটা হলে আরও বেশি দামে কিনতে হবে জলের দামের বিদ্যুৎ। তৃতীয়ত, হিমালয়ের বিদ্যুৎ যে ওই অঞ্চলের বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাজে আসবে না, সেটা এখন স্পষ্ট।

ওই বিদ্যুতে শত শত কিলোমিটার দূরের জনপদ আলোকিত হলেও অন্ধকারে ডুবে থাকবে হিমালয় অঞ্চল। নেপাল ও ভারতে ইতোমধ্যে নির্মিত বাঁধগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ চিত্র দেখা গেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেটা কতখানি সম্ভব? সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস রিভার এ্যান্ড পিপলের (এসএএনডিআরপি) হিমাংশু ঠাক্কর ভারতীয় বাঁধগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে একটি সমীক্ষা চালিয়েছেন। ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত চালু থাকা ২০৮টি প্রকল্প বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন, ৮৩ শতাংশই নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। বাঁধ যত পুরনো, তার কার্যকারিতা তত হালকা।

হিমালয়জুড়ে নির্মিত ও নির্মাণাধীন প্রতিটি বাঁধের ক্ষেত্রে হিমাংশু ঠাক্করের সমীক্ষা একটি গুরুতর সতর্কতা। এখানেও বিশ্বব্যাংক-এডিবি বিশ্বব্যাংক-এডিবি, জাপান সহ বেশ কয়েকটি কর্পোরেট ব্যাংকের অর্থে সমাপ্ত হবে ভয়ঙ্কর একতরফা পানি প্রত্যাহার। প্রাথমিকভাবে এই মহাপরিকল্পনার পেছনে ব্যায় ধরা হয়েছে ৫.৬ লক্ষ কোটি রুপি। নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তত্ত্ব দেশে দেশে ফেরি করে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো কিছু আন্তর্জাতিক অর্থকরী সংস্থা। সংশ্লিষ্ট দেশের যাই হোক, এতে তাদের যে বহুমুখী লাভ হয় সে প্রসঙ্গ দীর্ঘ।

ভারতীয় উপমহাদেশেও চল্লিশ থেকে সত্তর দশকে বিরাট বিরাট বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে এ সংস্থাগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। হিমালয়জুড়ে এখন যে বাঁধযজ্ঞ চলছে, তাতে এ দুটি সংস্থার সঙ্গে যোগ দিয়েছে কিছু দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানি। হিমালয় অঞ্চলের আলোচ্য চারটি দেশে কোনো একক পক্ষ বাঁধ নির্মাণের অর্থ জোগাচ্ছে না। সরকার স্বভাবতই বিপুল ব্যয় একা বহন করছে না। চারটি দেশে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থায়নের ক্ষেত্রে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে বেসরকারি খাত।

ভুটানের ক্ষেত্রে বাঁধ নির্মাণের নানা পর্যায়ে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো কয়েকটি আন্তর্জাতিক অর্থকরী প্রতিষ্ঠান, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার; টাটা, রিলায়েন্স, জিএমআর, ল্যাঙ্কো, জয় প্রকাশ, গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্টের মতো ভারতীয় কোম্পানি এবং নরওয়ে ও দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকটি কোম্পানি, নেপাল, এগুলোর পাশাপাশি চীনও উপস্থিত। পাকিস্তানে সক্রিয় বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি, চীন সরকার, জাপানভিত্তিক ওভারসিজ ইকোনমিক কো-অপারেশন ফান্ড, ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ও দেশীয় কয়েকটি কোম্পানি। ভারতে খোদ সরকার ছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি কোম্পানি, দেশীয় ব্যাংক ও অর্থকরী প্রতিষ্ঠান বাঁধ নির্মাণে মূল ভূমিকা পালন করছে। অন্য তিনটি দেশের সঙ্গে ভারতের পার্থক্য হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অর্থকরী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ করতে হচ্ছে দেশীয় কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। টিপাইমুখ বাঁধ বাংলাদেশ ধ্বংসের পায়তারা বরাক নদীর অমলশিদ নামক স্থানে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে সুরমা ও কুৃশিয়ারা নামে সিলেটের কুশিয়ারা নামে জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

এরপর নদীগুলো ৫টি প্লবান ভূমি অতিক্রম করে মেঘনায় গিয়ে মিশেছে। প্লাবন ভূমিগুলো হলো : পুরোনো মেঘনা সংলগ্ন প্লাবন ভূমি, পূর্বাঞ্চলীয় সুরমা কুশিয়ারা প্লবান ভূমি, সিলেট প্লবান ভূমি, উত্তর ও উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় পাইডমন্ট অববাহিকা এবং উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ী এলাকা। ৫৫৩টি বাঁধের একটি টিপাইমুখ বাঁধ। উজানে বাঁধ নির্মানের ফলে এসব প্লাবনভূমির প্লাবনের ধরণ, ঋতু এবং পরিমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুরমা ও কুশিয়ারার প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ শুস্ক করার ফলে কমপক্ষে ৭টি জেলা- সিলেট, মৌলোভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার ধান উৎপাদন ব্যহত হবে।

এর মধ্যে সিলেট ও মৌলোভীবাজার এলকাতেই প্লাবনভূমির পরিমান কমে যাবে যথাক্রমে ৩০,১২৩ হেক্টর (২৬%) এবং ৫২০ হেক্টর (১১%)। বাঁধ নির্মানের পর থেকে সুরমা কুশিয়ারার উজানের ৭১% এলকায় আর স্বাভাবিক মৌসুমে জলমগ্ন হবে না। কুশিয়ারা নদীর প্রায় ৬৫ কিলোমিটার এলকাজুড়ে তার ডান পাশের প্লাবন ভূমি হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে শুকনো মৌসুমে কুশিয়ারার বাম তীরে কুশিয়ারা বরদাল হাওর পুরোপুরি শুকিয়ে যাবে। কাউয়ার দিঘীর হাওর এর ২,৯৭৯ হেক্টর (২৬%) জলাভূমি হারাবে। ফলে সুরমা কুশিয়ারা মেঘনা অববাহিকার বিশাল অঞ্চল জুড়ে চাষাবাদের জমি, জমির উর্বরতা, মাটির উপর এবং মাটির নিচের পানির স্তর, পুকুর হাওড়, বাউড়, মিঠে পানি, মাছ, জলজ উদ্ভিদ, গোচারণ ভূমি ও পশু খাদ্যর প্রাপ্যতা সব মিলিয়ে সমস্ত জলবায়ু, বাস্তসংস্থান এবং জীবন জীবিকার ব্যাপক ক্ষতিসাধন হবে।

ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং এর গবেষণায় এই পানির পরিমান বাড়া-কমার একটা হিসেব পাওয়া গেছে। এই হিসেব মতে, টিপাইমুখ বাঁধ যখন পূর্ণ কার্যক্রম শুরু হবে তখন বরাক নদী থেকে অমলসিধ পয়েন্টে সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা নদীর দিকে পানি প্রবাহ জুন মাসে ১০%, জুলাই মাসে ২৩%, আগস্ট মাসে ১৬% এবং সেপ্টেম্বর মাসে ১৫% কমে যাবে। কুশিয়ারা নদীর পানির উচ্চতা অমলসিধ স্টেশনে কমবে জুলাই মাসের দিকে গড়ে ১ মিটারেরও বেশী আর ফেঞ্চুগঞ্জ, শেরপুর ও মারকুলি স্টেশনের দিকে কমবে যথাক্রমে ০.২৫ মিটার এবং ০.৭৫ মিটার করে। অন্যদিকে একই সময়ে সুরমা নদীর পানির উচ্চতা সিলেট এবং কানাইয়েরঘাট স্টেশনে কমবে যথাক্রমে ০.২৫ মিটার এবং ০.৭৫ মিটার করে। এতো গেলো ভরা মৌসুমের চিত্র।

শুকনা মৌসুমে বরাক-সুরমা-কুশিয়ারা থেকে পানি প্রত্যাহারের হার আগস্ট মাসে ১৮% এবং সেপ্টেম্বর মাসে ১৭.৫% হারে। বাংলাদেশের নদীগুলোর ওপর বাংলাদেশের জীবন, উৎপাদন, ও জৈব প্রকৃতি প্রধানভাবে নির্ভরশীল। নদীর পলি বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে দেশের আর্থ সামাজিক ও পরিবেশগত বিরটা প্রভাব পড়েছে। টিপাইমুখ বাঁধে সেই প্রভাব আরো তীব্র হবে। টিপাইমুখ বাঁধের আদিকথা আসামের কাছার অঞ্চলের মৌসুমী বন্যা প্রতিরোধের নামে মনিপুরের ২৭৫.৫০ বর্গ কি. মি. এলাকার ১৬টি গ্রাম পুরোপুরি ডুবিয়ে এবং আরও ৫১টি গ্রামকে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত করে ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষের জীবন জীবিকা ও ঐতিহ্য সংস্কৃতি ধ্বংস করার পরিকল্পনা মনিপুরবাসী কখনই মেনে নেয়নি।

ফলে মনিপুরের বরাক নদীর উপর বাধ নির্মাণের স্থান ক্রমশই পরিবর্তিত হতে থাকে ১৯৫৫ সালে ময়নাধর, ১৯৬৪ সালে নারায়ণধর এবং তার পর ভুবন্দর এবং সবমেষে ১৯৮০’র দশকে তুইভাই এবং বরাকনদীর সংগম স্থলের ৫০০ মিটার ভাটিতে টিপাইমুখে বাধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো প্রথমে বাধটি ব্রহ্মপুত্র ফ্লাড কনট্রোল বোর্ড বা বিএফসিবির আওতায় থাকলেও ১৯৮৫ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ১৯৯৯ সালে বাধটিকে নর্থ ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন বা নেপকোর হাতে দিয়ে দেয়া হয় তখন বাধটির নাম টিপাইমুখ হাই ড্যাম থেকে পরিবর্তিত হয়ে টিপাইমুখ পাওয়ার প্রজেক্ট এ পরিবর্তিত হয় যদিও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে মুখ্য উদ্দেশ্যে পরিণত করার লক্ষে বাধের ডিজাইনে কোনো পরিবর্তনই করা হয়নি যে কারণে আগে বাধের যে উচ্চতা (১৬৮.২ মিটার) ও লোড ফ্যাক্ট (২৬.৭৫%) আছে এখনও তাই আছে। এর মানে হলো বছরের কোনো এক সময়ের সর্বোচ্চ বিদ্যুত উৎপাদন ক্ষমতার অর্থাৎ ১৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মাত্র ২৬.৭৫% অর্থাৎ ৪০১.২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত সারাবছর ধরে পাওয়া যাবে। এটা নাকি মনিপুরবাসীর জন্য বিদ্যুৎ অর্থাৎ অর্থাৎ ৪৮ মেগাওয়াট পাওয়া যাবে বিনামূল্যে। ফলে যতই ঘরে ঘরে বিদ্যুতের মূলা ঝোলানো হোক না কেন, সারা বছর ধরে ৪৮ মেগাওয়াট মাগনা বিদ্যুতের বিনিময়ে জল-জীবন-জীবিকা-পরিবেশ-সংস্কৃতি ধ্বংসের প্রকল্পের বিরুদ্ধে তামেলং ও চারুচাদপুরের হামার এবং জেলিয়াংরং নাগা আদিবাসী গোষ্ঠীসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ মণিপুরবাসী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

জলবিদ্যুৎ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ কিংবা সেচ প্রদান ইত্যাদি ঘোষিত উদ্দেশ্যের বাইরে রয়েছে বিশাল ও সম্পদশালী কিন্তু স্বায়ত্তশাসিনের দাবিতে অস্থিতিশীল উত্তরাঞ্চলের জলজ শক্তি, গ্যাস, ইউরোনিয়াম ইত্যাদির ওপরে দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি একই সঙ্গে সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সামরিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান বাসনা। টিপাইমুখ বাধ সেই পরিকল্পনারই অংশ। মনিপুরবাসীর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুফলের কথা বলে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ায়ী টিপাইমুখ বাধের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার এবং মনিপুর রাজ্য সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলেও খোদ মণিপুরবাসীসহ বাধের উজান এবং ভাটির উভয় অঞ্চলের জনগণের তীব্র বিরোধিতার মুখে এখনো নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারেনি। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর অধিনস্ত আধাসামরিক বাহিনী আসাম রাইফেলস বাধ রক্ষণাবেক্ষণের ঘোষণা দিলেও কাজ হয়নি। সবশেষ, ২০০৮ সালের ২৮ জুলাই রাজ্য সরকার আইন পাস করে টিপাইমুখ বাঁধের নির্মাণ কাজের প্রয়োজনে নির্মাণ সামগ্রী আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহৃত মনবাহাদুর রোডের ৯৯ কিমি দূরত্বের ৭ কিমি অন্তর সামরিক পোস্ট স্তাপন করেছে।

তলিয়ে যাবে খোদ ভারতের অনেক গ্রাম আসামের কাছার অঞ্চলের মৌসুমী বন্যা প্রতিরোধের নামে মনিপুরের ২৭৫.৫০ বর্গ কি. মি. এলাকার ১৬টি গ্রাম পুরোপুরি ডুবিয়ে এবং আরও ৫১টি গ্রামকে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত করে ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষের জীবন জীবিকা ও ঐতিহ্য সংস্কৃতি ধ্বংস করার পরিকল্পনা মনিপুরবাসী কখনই মেনে নেয়নি। ফলে মনিপুরের বরাক নদীর উপর বাঁধ নির্মাণের স্থান ক্রমশই পরিবর্তিত হতে থাকে ১৯৫৫ সালে ময়নাধর, ১৯৬৪ সালে নারায়ণধর এবং তার পর ভুবন্দর এবং সবমেষে ১৯৮০’র দশকে তুইভাই এবং বরাকনদীর সংগম স্থলের ৫০০ মিটার ভাটিতে টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো প্রথমে বাঁধটি ব্রহ্মপুত্র ফ্লাড কনট্রোল বোর্ড বা বিএফসিবির আওতায় থাকলেও ১৯৮৫ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ১৯৯৯ সালে বাধটিকে নর্থ ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন বা নেপকোর হাতে দিয়ে দেয়া হয় তখন বাঁধটির নাম টিপাইমুখ হাই ড্যাম থেকে পরিবর্তিত হয়ে টিপাইমুখ পাওয়ার প্রজেক্ট এ পরিবর্তিত হয় যদিও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে মুখ্য উদ্দেশ্যে পরিণত করার লক্ষে বাধের ডিজাইনে কোনো পরিবর্তনই করা হয়নি যে কারণে আগে বাঁধের যে উচ্চতা (১৬৮.২ মিটার) ও লোড ফ্যাক্ট (২৬.৭৫%) আছে এখনও তাই আছে। এর মানে হলো বছরের কোনো এক সময়ের সর্বোচ্চ বিদ্যুত উৎপাদন ক্ষমতার অর্থাৎ ১৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মাত্র ২৬.৭৫% অর্থাৎ ৪০১.২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত সারাবছর ধরে পাওয়া যাবে। এটা নাকি মনিপুরবাসীর জন্য বিদ্যুৎ অর্থাৎ অর্থাৎ ৪৮ মেগাওয়াট পাওয়া যাবে বিনামূল্যে।

ফলে যতই ঘরে ঘরে বিদ্যুতের মূলা ঝোলানো হোক না কেন, সারা বছর ধরে ৪৮ মেগাওয়াট মাগনা বিদ্যুতের বিনিময়ে জল-জীবন-জীবিকা-পরিবেশ-সংস্কৃতি ধ্বংসের প্রকল্পের বিরুদ্ধে তামেলং ও চারুচাদপুরের হামার এবং জেলিয়াংরং নাগা আদিবাসী গোষ্ঠীসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ মণিপুরবাসী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। জলবিদ্যুৎ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ কিংবা সেচ প্রদান ইত্যাদি ঘোষিত উদ্দেশ্যের বাইরে রয়েছে বিশাল ও সম্পদশালী কিন্তু স্বায়ত্তশাসিনের দাবিতে অস্থিতিশীল উত্তরাঞ্চলের জলজ শক্তি, গ্যাস, ইউরোনিয়াম ইত্যাদির ওপরে দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি একই সঙ্গে সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সামরিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান বাসনা। টিপাইমুখ বাঁধ সেই পরিকল্পনারই অংশ। মনিপুরবাসীর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুফলের কথা বলে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ায়ী টিপাইমুখ বাঁধের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার এবং মনিপুর রাজ্য সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলেও খোদ মণিপুরবাসীসহ বাধের উজান এবং ভাটির উভয় অঞ্চলের জনগণের তীব্র বিরোধিতার মুখে এখনো নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারেনি। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর অধিনস্ত আধাসামরিক বাহিনী আসাম রাইফেলস বাধ রক্ষণাবেক্ষণের ঘোষণা দিলেও কাজ হয়নি।

সবশেষ, ২০০৮ সালের ২৮ জুলাই রাজ্য সরকার আইন পাস করে টিপাইমুখ বাধের নির্মাণ কাজের প্রয়োজনে নির্মাণ সামগ্রী আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহৃত মনবাহাদুর রোডের ৯৯ কিমি দূরত্বের ৭ কিমি অন্তর সামরিক পোস্ট স্তাপন করেছে। টিপাইমুখ বাঁধও ভূমিকম্পকে উশকে দেবে বাধের জরাধারে যে বিপুল পরিমাণে পানি জমা করা হয়, বাঁধের ভিত্তি ভূমি এবং এর আশপাশের শিলাস্তরের ওপর তার চাপের পরিমাণও হয় ব্যাপক। অল্প একটু অঞ্চলে এই বিপুল চাপ পড়ার কারণে ইতোমধ্যেই ঐ অঞ্চলে থাকা শিলাস্তরের ফাটলকে সক্রিয় করে তুলতে পারে। এই ঘটনাটি কখনো তাৎক্ষণিকভাবে বাঁধ চালু হওয়ার কয়েক দিনেরমধ্যে কিংবা শুকনো ও ভরা মৌসুমে চাপের কম বেশি হতে হতে বাধ চালুর অনেক পরেও হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় মাটির নিচের সচ্ছিদ্র শিলাস্তরের ফাকে ফাকে জমে থাকা পানির যে স্বাাভাবিক চাপ (ঢ়ড়ৎড়ঁং ঢ়ৎবংংঁৎব) থাকে তা বাধের পানির ভাবে এবং শিলাস্তরে চুইয়ে যাওয়া বাড়তি পানির প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়।

এ (ঢ়ড়ৎড়ঁং ঢ়ৎবংংঁৎব বেড়ে যাওয়া ছাড়াও বাড়তি পানির রাসায়নিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার কারণেও ফাটলের দুদিকের শিলাস্তর যা এমনিতেই টেকটোনিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার কারণে পরস্পর থেকে দূরে সরে যেতে চায় কিন্তু পরস্পরের মধ্যকার ঘর্ষণের শক্তির কারণে একত্রিতই থাকে, সেটা এবার আর বাড়তি চাপ সহ্য করতে না পেরে চ্যুতি বা স্লিপ-স্ট্রাইকের সৃষ্টি করে ফলে ভূমিকম্পের হাইপোসেন্টার সৃষ্টি হয়ে সেখান থেকে ভূমিকম্প চারিদিকে ছড়িয়ে পরে। জলাধারের প্রভাবে এভাবে কোনো অঞ্চলে ভূমিকম্প প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে বলা হয় জরাবৎ ওহফঁপবফ ঝবরংসরপরঃু (জওঝ)। এভাবে ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রথম নজরে আসে ১৯৩২ সালে আলজেরিয়ার কুঢে ফড্ডা বাধের ক্ষেত্রে। পরবর্তীতে এ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে এ ধরনের বাধের সঙ্গে ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়া নজির পাওয়া গেছে কমপক্ষে ৭০টি। ভারতের কাছে বিষয়টি আরো বেশি করে র্স্পশকাতর বলে আমাদের কাছ খবর রয়েছে।

কেননা এ যাবতকালে বিশ্বের সবচেয়ে তীব্র মাত্রার জলাধার প্রভাবিত ভূমিকম্প হয়েছে খোদ ভারতের মহারাষ্ট্রের কয়লা বাধের কারণে। ১৯৬৭ সালের ১১ ডিসেম্বর ঘটা ৬.৩ মাত্রার এই ভূমি কম্পটি এমনকি তার কেন্দ্র থেকে ২৩০ কিমি দূরেও তীব্র আঘাত হেনেছিল। ১০ এতসব জেনেশুনেও ভারত যে জায়গায় টিপাইমুখ বাধ নির্মাণ করছে সেটা হলো সারা দুনিয়ার ছয়টা ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মধ্যে একটা উত্তর-পূর্ব ভারত ছাড়া অন্যান্য অঞ্চলগুলো হলো হলো ক্যালিফোর্নিয়া, জাপান, মেক্সিকো, তুরস্ক ও তাইওয়ান। এতসব জেনেশুনেও ভারতের যে জায়গায় টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করছে নেটা হলো সারা দুনিয়ার মধ্যে ছয়টা ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প প্রবণ এলাকার মধ্যে একটা উত্তর পূর্ব ভারত ছাড়া অন্যান্য অঞ্চলগুলো হলো ক্যালিফোর্নিয়া, মেক্সিকো, তুরস্ক, তাইওয়ান ও জাপান। টিপাইমুখ বাঁধের ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে গত ১০০ বছরের মধ্যে ৭+ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে ২টি এর মধ্যে একটিতো হয়েছে ১৯৫৭ সালে টিপাইমুখ থেকে মাত্র ৭৫ কিলোমিটার দূরে।

এটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হওয়ার কারণ হলো এটি সুরমা-গ্রু।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.