আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অরুন্ধতী রায়ের রায়: শফিক রেহমান

ছাত্র পহেলা জানুয়ারিতে এ বছর প্রচণ্ড শীত পড়েছিল। পুরো জানুয়ারি মাসটায় দেশের মানুষ, বিশেষত উত্তর বাংলার মানুষ শীতে কষ্ট পেয়েছে। শীত পড়লেই রাজনৈতিক দলগুলো সামাজিক কাজে তৎপর ওয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেটাই কালচার। এই কালচারের শুরু সত্তরের দশকে স্বাধীনতার পর থেকে।

সেই সময়ের আওয়ামী লীগ শীতকালে দুস্থদের মধ্যে কম্বল বিলি করতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, চোররা সব কম্বল নিয়ে যাচ্ছে। হয়তো সেই লজ্জাকর অভিজ্ঞতার বিষয়টি মনে রেখে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান আওয়ামী লীগকে কম্বল বিতরণে জোরালো উৎসাহ দেননি। অন্য দিকে প্রধান বিরোধী দলের এবার কম্বল বিতরণে কিছুটা কম উৎসাহ দেখা গেছে। অথচ এ বছরই শীতার্ত মানুষের সবচেয়ে বেশি কম্বলের দরকার ছিল।

তারা বেশ কষ্টে শীত পাড়ি দিয়েছে। এখন ফেব্রুয়ারি চলছে। মাঘের প্রায় শেষ। গরম পড়ছে। ফালগুনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

রমনা পার্কের দিক থেকে মাঝে মাঝে কোকিলের ডাক শোনা যাচ্ছে এবং তা হারিয়ে যাচ্ছে গাড়ির হর্ন আর সিএনজির ভুটভুট শব্দে। নিউ ইয়র্কে গরু দেখতে হলে যেতে হবে ম্যানহ্যাটানে। সেখানে পাথর অথবা কংকৃটে বানানো শাদাকালো রংয়ের বৃহদাকায় গরুর মূর্তি আছে। কিন্তু বাংলাদেশে যখন কোকিল হারিয়ে যাবে তখন মানুষ কোথায় যাবে? শামীমের চিন্তা ভাংলো এসিসট্যান্ট এডিটর শরিফের কণ্ঠস্বরে। মে আই কাম ইন? এসো।

শামীম ভাই, আপনাকে একটা ডিসিশন দিতে হবে। কি বিষয়ে? এই দেখুন। লন্ডনের দি গার্ডিয়ান পত্রিকার অনলাইনে অরুন্ধতী রায়ের একটি লেখা। গতকাল ১০ ডিসেম্বর রোববারে এটা বেরিয়েছে। শরিফ চার পৃষ্ঠার পৃন্ট আউট এগিয়ে দিল।

তাকে বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। খুব সিরিয়াস কিছু? আর্জেন্ট? পৃন্ট আউট না দেখে ভুরু কুচকে শামীম জানতে চাইল। হ্যা। সিরিয়াস এবং আর্জেন্ট। দুটোই।

আপনি পড়–ন এবং ডিসিশন দিন এটা আমরা ছাপবো কি না। সময় খুব কম। এখন সকাল এগারোটা। অনুবাদ, কম্পোজ ও প্রুফ রিড করে এডিটোরিয়াল পেজে মেকআপের জন্য সময় বেশি নেই। লেখাটি বেশ লম্বা।

বসো। শান্ত হও। আমি পড়ছি। শামীম তার বিপরীতে একটা চেয়ারে শরিফ বসতে বলে পৃন্ট আউটটি পড়া শুরু করলো। শিরোনাম : দি হ্যাংগিং অফ আফজাল গুরু ইজ এ স্টেইন অন ইনডিয়ান ডেমক্রেসি (The hanging of Afzal Guru is a stain onIndia’s democracy) সাবহেডিং : আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে মামলায় বিরাট সব ত্রুটি সত্ত্বেও ইনডিয়ার সব প্রতিষ্ঠান একজন কাশ্মিরি ‘টেররিস্ট’-কে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে ভূমিকা রেখেছে।

শামীম লক্ষ্য করলো ইংরেজি টেররিস্ট শব্দটিকে কোলোনের মধ্যে রাখা হয়েছে। আফজাল গুরু কি তাহলে টেররিস্ট ছিলেন না? অরুন্ধতী রায় সাহসী লেখিকা রূপে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছেন। পুরস্কার পেয়েছেন। নিমন্ত্রিত হয়েছেন মানবাধিকার লংঘনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিদেশে বলার জন্য। ইনডিয়ান জনমতের একাংশের বিরুদ্ধে আবার অরুন্ধতী দাড়িয়েছেন তার বিবেকের তাড়নায়।

শামীম মেইন টেক্সটা পড়া শুরু করলো। শনিবারে দিল্লিতে বসন্ত তার আগমন বার্তা ঘোষণা করেছে। তখন সূর্যের আলোতে দিল্লি ভাসছিল। আর আইন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে গেল। ব্রেকফাস্টের একটু আগে ইনডিয়ান সরকার গোপনে আফজাল গুরুকে ফাসি দিল।

ডিসেম্বর ২০০১-এ ইনডিয়ার পার্লামেন্ট ভবনের বিরুদ্ধে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল সে বিষয়ে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন আফজাল গুরু। ফাসির পর দিল্লির তিহার জেলখানায় আফজালের মরদেহ কবর দেয়া হয়। ওই জেলে ১২ বছর যাবৎ আফজাল সলিটারি কনফাইনমেন্টে ছিলেন, অর্থাৎ তাকে এক যুগ নির্জন কারাবাস করতে হয়েছিল। আফজালের স্ত্রী ও তার ছেলেকে এই ফাসির বিষয়ে খবর দেয়া হয়নি। মিডিয়াকে ইনডিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্পিড পোস্ট ও রেজিস্টার্ড পোস্টের মাধ্যমে আফজালের পরিবারকে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানিয়েছে।

জম্মু ও কাশ্মিরের ডিরেক্টর জেনারেলকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তিনি যেন চেক করেন আফজালের পরিবার সেটা পেয়েছে কি না। তার এই নির্দেশ এমন কোনো বিগ ডিল না। তার কাছে কাশ্মিরি টেররিস্টদের মধ্যে আফজালরা আরও একটি পরিবার মাত্র। আইনের শাসন বা Rule of Law-ির এই বিজয় উদযাপনে ইনডিয়ান জাতির মধ্যে, বিশেষত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যেমন, কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইনডিয়া (মার্কসবাদী) প্রভৃতির মধ্যে একতা দেখা গেছে যা সচরাচর দেখা যায় না। যদিও “বিলম্ব” (Delay) এবং ‘ঠিক সময়’ (Timing) বিষয়ে এদের মধ্যে কিছু মতানৈক্য ছিল।

টিভি স্টুডিওগুলো থেকে সরাসরি সম্প্রচার বা লাইভ ব্রডকাস্টে “গণতন্ত্রের বিজয়” সম্পর্কে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়েছে। এসব সম্প্রচারে সাধারণত যে ধরনের মিকশ্চার থাকে তাই ছিল। অর্থাৎ, তীব্র আবেগের সঙ্গে মেশানো ছিল দুর্বল সব তথ্য। ফাসি হওয়ায় আনন্দ প্রকাশের জন্য দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা মিষ্টি বিতরণ করে এবং দিল্লিতে যেসব কাশ্মিরি প্রতিবাদের জন্য সমবেত হয় তাদের পেটায়। এই সময়ে সমবেত মেয়েদের প্রতি তাদের বিশেষ নজর ছিল।

আফজালের মৃত্যু হলেও টিভি স্টুডিওতে ভাষ্যকাররা এবং রাস্তায় গুন্ডারা এমনভাবে ছিল যে মনে হচ্ছিল তারা কাপুরুষ যারা দলবদ্ধ হয়ে শিকার খুজে বেড়াচ্ছে এবং নিজেদের সাহস বজায় রাখার জন্য পারস্পরিক সাহায্য চাইছে। কারণ হয়তো তারা হৃদয়ের গভীরে জানে একটা ভয়ংকর অন্যায়ের পথে তারা যোগসাজশে কাজ করেছে। ফ্যাক্টস কি? কি হয়েছিল ১৩ ডিসেম্বর ২০০১-এ দিল্লিতে? ওই দিন পাচ সশস্ত্র ব্যক্তি গাড়ি চালিয়ে গেইট পেরিয়ে ইনডিয়ান পার্লামেন্টের সামনে চলে গিয়েছিল। তাদের গাড়িতে বোমা ফিট করা ছিল। তাদের চ্যালেঞ্জ করা হলে তারা গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসে গুলি ছুড়তে থাকে।

ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর আটজন এবং একজন মালি মারা যায়। এর পরে যে বন্দুকযুদ্ধ হয় তাতে ওই পাচজনই নিহত হয়। পরবর্তী কালে আফজালকে যখন পুলিশ হাজতে নেয়া হয় তখন সে নিহতদের, মোহাম্মদ, রানা, রাজা, হামজা ও হায়দার রূপে শনাক্ত করে স্বীকারোক্তি দেয়। তবে বাধ্য হয়ে দেওয়া এই স্বীকারোক্তির বিভিন্ন বিবরণ বেরিয়েছে, যার ফলে বলা মুশকিল কোন স্বীকরোক্তিটি সত্যি। আমরা তাদের সম্পর্কে শুধু এটুকুই জানি।

ওই নিহতদের পুরো নামগুলো আমরা জানি না। ওই সময়ে বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এল কে আদভানি। তিনি একটি বিবৃতিতে বলেন, ওদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল ওরা পাকিস্তানি (Looked like Pakistanis)। তার অবশ্য জানা উচিত ছিল পাকিস্তানিরা দেখতে কেমন, কেননা তার নিজেরই জন্ম হয়েছিল সিন্ধু প্রদেশে, যেটা এখন পাকিস্তানে। হাজতে আদায় করা আফজালের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তদানীন্তন ইনডিয়ান সরকার পাকিস্তান থেকে তার রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফিরিয়ে আনে এবং পাকিস্তানি সীমান্তে পঞ্চাশ লক্ষ সৈন্য মোতায়েন করে।

দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ বেধে যাবে এমন কথা ওঠে। ইনডিয়াতে অবস্থানরত বিদেশী এমবাসিগুলোকে তাদের স্টাফদের চলাচল বিষয়ে সতর্ক উপদেশ দেওয়া হয়। কিছু দূতাবাস তাদের কর্মচারিদের দিল্লি থেকে স্বদেশে পাঠিয়ে দেয়। পাকিস্তান ও ইনডিয়ার এই মুখোমুখি অবস্থান কয়েক মাস যাবৎ বজায় থাকে এবং এর ফলে ইনডিয়ার কোটি কোটি টাকা খরচ হয়। পরে ইনডিয়ার সুপৃম কোর্ট আফজাল গুরুর ওই স্বীকারোক্তি নাকচ করে দেয়।

সুপৃম কোর্ট বলে ওই স্বীকারোক্তিতে “ত্রুটি” ছিল এবং “পদ্ধতিগত স্বাধীনতা লংঘিত হয়েছিল”। ওই ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল (Special Cell) দাবি করে যে তারা রহস্য উদঘাটন করেছে। এই দিল্লি পুলিশ ভুয়া “এনকাউন্টার” হত্যাকাণ্ডের জন্য কুখ্যাত। টেররিস্ট রূপে যাদের সন্দেহ করা হয় তাদের “এনকাউন্টারে” মেরে ফেলা হয়। ১৫ ডিসেম্বরে দিল্লি পুলিশ দাবি করে তারা এই ঘটনার পেছনের “মাস্টারমাইন্ড”, প্রফেসর এস এ আর গিলানিকে দিল্লিতে এবং শওকত গুরু ও তার জ্ঞাতিভাই আফজালকে শ্রীনগর, কাশ্মিরে গ্রেফতার করেছে।

তারপর তারা শওকতের স্ত্রী আফসান গুরুকে গ্রেফতার করে। ইনডিয়ান মিডিয়া অতি উৎসাহ নিয়ে পুলিশের এই বিবৃতি বিভিন্ন রূপে প্রকাশ করে। যেমন কিছু হেডলাইন ছিল, “দিল্লি ইউনিভার্সিটি লেকচারার ছিলেন সন্ত্রাসী প্ল্যানের প্রধান ব্যক্তি”, “ভার্সিটি ডন পরিচালিত করেছেন ফিদাইনদের”, “ফৃটাইমে ডন সন্ত্রাস বিষয়ে লেকচার দিতেন। ” একটি জাতীয় নেটওয়ার্ক জিটিভি ডিসেম্বর ১৩ নামে একটি ডকুড্রামা সম্প্রচার করে। এতে দাবি করা হয় “পুলিশের চার্জশিটের ভিত্তিতে যে সত্য” সেটা নির্ভর করে এই ডকুড্রামাটি করা হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশের চার্জ বা অভিযোগই যদি সত্য হয়, তাহলে আদালতের আর দরকার কি? ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী বিজেপি নেতা আদভানি প্রকাশ্যে জিটিভি-র এই মুভির প্রশংসা করেন। মুভিটি দেখানোর বিরুদ্ধে আবেদন করা হলে সুপৃম কোর্ট এটি প্রদর্শনের পক্ষে রায় দেয়। সুপৃম কোর্ট বলে, বিচারকদের প্রভাবিত করতে পারবে না মিডিয়া। কিন্তু এই মুভিটি প্রদর্শিত হবার মাত্র কয়েক দিন পরেই দ্রুতগতিসম্পন্ন আদালত, গিলানি, আফজাল ও শওকত গুরুকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরবর্তী সময়ে হাই কোর্ট গিলানি ও আফজাল গুরুকে মুক্তি দেয়।

সুপৃম কোর্ট এই মুক্তির আদেশ বহাল রাখে। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০০৫-এর রায়ে আফজালকে তিনটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দুটি মৃত্যুদণ্ড দেয়। এই রায় বিনা বিলম্বে কার্যকরের জন্য বিজেপি ডাক দেয়। তাদের একটা সেøাগান ছিল, “দেশ আভি শরমিন্দা হ্যায়, আফজাল আবিভি জিন্দা হ্যায়” (দেশ এখনো লজ্জিত, আফজাল এখনো জীবিত)। যেসব গুঞ্জন উঠছিলো সেগুলোকে ভোতা করার লক্ষ্যে একটি নতুন মিডিয়া ক্যামপেইন শুরু হয়।

এখনকার বিজেপি এমপি চন্দন মিত্র তখন ছিলেন পাইওনিয়ার পত্রিকার সম্পাদক। তিনি লেখেন, “১৩ ডিসেম্বর ২০০১-এ পার্লামেন্ট ভবন হামলাকারী নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি তিনিই প্রথম গুলি করেন এবং ধারণা করা হয় নিহত ছয়জনের মধ্যে তিনজন মারা গিয়েছিল তার গুলিতে। ” মজার কথা এই যে, পুলিশের চার্জশিটেও আফজালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ছিল না। সুপৃম কোর্টেৃর রায়ও স্বীকার করে যে সাক্ষ্য-প্রমাণ সব ছিল Circumstancial (সারকমস্টানশিয়াল) অর্থাৎ, পারিপার্শ্বিক বিচারে জোরালো ইঙ্গিত বহন করলেও প্রত্যক্ষ প্রমাণ বহন করে না। সুপৃম কোর্ট রায় স্বীকার করে, কৃমিনাল ষড়যন্ত্র যে হয়েছে, সেটার প্রমাণ অধিকাংশ ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না।

” কিন্তু এটা বলার পরেই, সম্পূর্ণ বিপরীত সুরে, সুপৃম কোর্ট বলে, “এই ঘটনায় বহু ব্যক্তি হতাহত হয়েছে এবং পুরো জাতি শোকাহত হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সমাজের যৌথ বিবেক (Collective conscience of society) শুধু তখনই সন্তুষ্ট হবে যখন অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। ” প্রশ্ন হলো, পার্লামেন্ট ভবন হামলা বিষয়ে কে আমাদের যৌথ বিবেক সৃষ্টি করেছে? পত্রপত্রিকায় যেসব সংবাদের ওপর আমরা চোখ বুলিয়েছি, সেই সব? নাকি, টিভিতে যেসব প্রোগ্রাম আমরা দেখেছি সেই সব? আইনের শাসনের বিজয় উদযাপনের আগে দেখা যাক আসলে কি হয়েছিল? আইনের শাসনের এই বিজয়ে যারা উৎসব করছেন তারা যুক্তি দেন, ইন্ডিয়ান আদালত যে গিলানিকে মুক্তি দিয়েছে এবং আফজালকে দণ্ড দিয়েছে সেটাই প্রমাণ করে যে বিচারপ্রক্রিয়া ছিল অবাধ ও ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু তাই কি? দ্রুতগতিসম্পন্ন (ফাস্ট ট্রাক, Fast Track) আদালতে বিচারকাজ শুরু হয় মে ২০০২-এ। ১১ সেটেম্বর ২০০১ (নাইন-ইলেভেন)-এ নিউ ইয়র্কে টুইন টাওয়ার এবং ওয়াশিংটনে পেন্টাগন ভবনে যে হামলা হয়েছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় সারা বিশ্ব তখন ভুগছিল।

আমেরিকান সরকার আফগানিস্তানে তাদের “বিজয়” নিয়ে একটু আগেভাগেই নির্লজ্জ উল্লাস প্রকাশ করছিল। গুজরাট রাজ্যে হিন্দু গুন্ডাবাহিনী যে মুসলিম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তাতে সাহায্য করেছিল পুলিশ ও রাজ্য সরকার। এর সূচনা হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ২০০২-এ এবং তখনও তা বিক্ষপ্তভাবে চলছিল। সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিষবাষ্পে ভরে ছিল বাতাস। আর পার্লামেন্ট ভবন হামলার বিষয়ে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছিল।

কৃমিনাল কেস বা ফৌজদারি মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে, যখন সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপিত হয়, সাক্ষীদের জেরা ও পাল্টা জেরা করা হয়, তখন যুক্তির ভিত্তি রচিত হয়। তারপর হাই কোর্ট ও সুপৃম কোর্টে শুধু আইন বিষয়ে তর্ক করা যায়Ñ নতুন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা যায় না। কিন্তু বিচারের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আফজাল কোথায় ছিলেন? আফজাল তখন হাই সিকিউরিটি সলিটারি সেলে একা ছিলেন। তার কোনো উকিল ছিল না। আদালত দ্বারা তার পক্ষে নিযুক্ত একজন জুনিয়র উকিল এক দিনও জেলখানায় যাননি।

আফজালের পক্ষে তিনি একজন সাক্ষীও ডাকেননি। সরকারপক্ষের কোনো সাক্ষীকে পাল্টা জেরা বা ক্রস একজামিন করেননি। এই পরিস্থিতি বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য অনুরোধ করা হলে বিচারক বলেন, তিনি অসমর্থ। তা হলেও, বিচারের শুরু থেকেই মামলাটি কুপোকাৎ হয়ে যায়। অনেক উদাহরণই দেয়া যেতে পারে।

এখানে মাত্র কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো : আফজালের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় দুটি আলামত ছিল একটি মোবাইল ফোন এবং একটি ল্যাপটপ কমপিউটার। বলা হয়েছিল, তাকে গ্রেফতারের সময়ে এ দুটো তার কাছে ছিল এবং তখনই জব্দ করা হয়। কিন্তু আদালতে তা পেশ করার সময়ে সিল করা অবস্থায় থাকা উচিত ছিল। কিন্তু কোনোটাই সিল করা ছিল না। শুনানির সময়ে জানা যায় যে আফজালের গ্রেফতারের পর ওই ল্যাপটপের হার্ড ডিস্কে অ্যাকসেস করা হয়েছিল।

সেখানে ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢোকার ভুয়া কিছু পাস, ভুয়া কিছু আইডি কার্ড যেসব “সন্ত্রাসী”রা ব্যবহার করেছিল পার্লামেন্ট ভবনে ঢোকার জন্য এবং পার্লামেন্ট ভবনের একটি জিটিভি ভিডিও কিপ। পুলিশের মতে, তাহলে ওই ল্যাপটপে কি ছিল? আফজাল অন্য সব কিছু ডিলিট করে দিয়ে তার বিরুদ্ধে যেসব তথ্য ব্যবহৃত হতে পারে শুধু সেসবই রেখেছিল! পুলিশের পক্ষে একজন সাক্ষী বলে, যে গুরুত্বপূর্ণ সিম কার্ড দ্বারা সব অভিযুক্তরা আফজালের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল, সেটা সে বিক্রি করেছিল ৪ ডিসেম্বর ২০০১-এ। কিন্তু সরকারপক্ষের পেশ করা কল রেকর্ডে দেখা যায় এই সিম ৬ নভেম্বর ২০০১ থেকে কার্যকর হয়েছিল। আফজালের কাছে কিভাবে পুলিশ পৌছেছিল? তারা বলে, গিলানি তাদের নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আদালতের রেকর্ডে দেখা যায়, গিলানিকে ধরার আগে আফজালকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

হাইকোর্ট বলে, এটা গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য (material contradiction)Ñ কিন্তু এর বেশি আর কিছু করে না। অ্যারেস্ট মেমো সই করেছিলেন দিল্লিতে গিলানির ভাই বিসমিল্লা। সিজার (Seizure) মেমো সই করেছিলেন জম্মু ও কাশ্মির পুলিশের দুই সদস্য। এদের মধ্যে একজন রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে আফজালকে আগেই হয়রানি করতেন। মিথ্যা ও বানোয়াট সাক্ষ্য-প্রমাণের পাহাড় এভাবেই গড়ে তোলা হয়।

আদালত এসব লক্ষ্য করেছে কিন্তু পুলিশকে শুধু মৃদু তিরস্কার করেছে। আর কিছু নয়। পার্লামেন্ট ভবন হামলার রহস্য উদঘাটনে যদি কেউ সত্যই উৎসাহী হতো তাহলে তারা সব সাক্ষ্য-প্রমাণ তন্ন তন্ন করে বিচার-বিবেচনা করতো। কেউ সেটা করেনি। আর তার ফলে এই ষড়যন্ত্রের প্রকৃত অপরাধীরা শনাক্ত হবে না এবং তাদের বিষয়ে তদন্তও হবে না।

আফজালের সত্য কাহিনী ও ট্র্যাজেডি অনেক বিশাল। সেটা আদালতের রুমে সীমিত রাখা সম্ভব নয়। সত্য কাহিনীটা আমাদের নিয়ে যাবে কাশ্মির উপত্যকায় যেখানে যেকোনো মুহূর্তে একটা পারমাণবিক যুদ্ধ বেধে যেতে পারে, যে এলাকায় এখন বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সৈন্য রেডি হয়ে আছে, যেখানে পঞ্চাশ লক্ষ ইনডিয়ান সৈন্য আছে। অর্থাৎ, প্রতি চার বেসামরিক ব্যক্তির জন্য এক সামরিক ব্যক্তি) শত শত আর্মি ক্যাম্প এবং এমন সব টর্চার চেম্বার যা ইরাকের আবু গ্রাইবকেও লজ্জায় ফেলে দেবে। এ সবই করা হয়েছে কাশ্মিরি জনগণেও কাছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র পৌছে দেয়ার জন্য।

১৯৯০ থেকে কাশ্মিরে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন উগ্র রূপ নিয়েছে। ফলে ৬৮,০০০ নিহত হয়েছে, ১০,০০০ গুম হয়েছে এবং অন্ততপক্ষে ১০০,০০০ ব্যক্তি নির্যাতিত হয়েছে। তবে যে হাজার হাজার মানুষ জেলে মারা গিয়েছে তাদের তুলনায় আফজাল হত্যাটি ভিন্ন। আফজালের জীবন-মৃত্যুর নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে চোখধাধানো দিনের আলোতে, যেখানে ইনডিয়ান গণতন্ত্রের সকল প্রতিষ্ঠানই তাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিতে অংশ নিয়েছে। এখন তো আফজালের ফাসি হয়েছে।

আশা করি আমাদের যৌথ বিবেক তুষ্ট হয়েছে। নাকি আমাদের পেয়ালার মাত্র অর্ধেক ভর্তি হয়েছে রক্তে? শামীম রুদ্ধশ্বাসে লেখাটি পড়া শেষ করে বললো, সিম্পলি সুপার। গ্রেট। ম্যাগনিফিশেন্ট। অরুন্ধতী রায়ের জন্ম হয়েছিল ২৪ নভেম্বর ১৯৬১ তে, শিলং, মেঘালয়ে।

২৬ বছর বয়সে দি গড অফ স্মল থিংস (The God of Small Things) বইটি লেখার জন্য ১৯৯৮-এ তিনি ম্যান বুকার প্রাইজ পেয়ে বিশ্ব খ্যাতি পান। তার পর থেকে তিনি মানবাধিকার রক্ষায় সক্রিয় আছেন, বিশেষত কাশ্মিরিদের স্বাধিকার আন্দোলন সমর্থন এবং ইসরেলিদের দমননীতির কড়া সমালোচনা করছেন। ইনডিয়াতে তিনি বিভিন্ন সাহসী ভূমিকা নিয়েছেন ও বক্তব্য রেখেছেন। এই লেখাটি তার সাহসের সর্বশেষ প্রমাণ। এটা ছাপতে তুমি সমস্যা দেখছ কোথায়? এই লেখায় অরুন্ধতী রায় ফাসির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন।

কিন্তু শাহবাগে যেসব যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরী ও কিছু শিশু তাদের মায়ের কোলে সমবেত হয়েছে, তারা তো এই দেশে ফাসির দাবি তুলেছে। অরুন্ধতীর এই লেখাটি তাদের অবস্থানকে দুর্বল করে দেবে না? তারা কি আমাদের দৈনিক শুকতারার বিরুদ্ধে সেøাগান তুলবে না? শরিফ জিজ্ঞাসা করলো। ওই রকম কিছু সেøাগান তারা তুলতে পারে। সেই অধিকার তাদের আছে। যেমন আমাদের অধিকার আছে এই লেখাটি ছাপানোর।

যেমন, ইনডিয়াতে অরুন্ধতীর অধিকার আছে এটি লেখার ও প্রকাশের। বাই দি ওয়ে, জেনে রেখ, পুরস্কারপ্রাপ্ত অরুন্ধতীর ওই বইটি কোনো ইনডিয়ান লেখকের সর্বাধিক বিক্রীত ইংরেজি বইয়ের রেকর্ড এখনো ধরে রেখেছে। ২০১০-এ অরুন্ধতীকে লেকচার দিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে। কেমবৃজ সাউথ এন্ড প্রেস থেকে তার দুটি বই বেরিয়েছে। ২০০৪-এ তিনি সিডনি শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন।

২০১০-এ ইনডিয়াতে দিল্লি পুলিশ তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনেছিল কিন্তু সেটা টেকেনি। অরুন্ধতীর এই লেখাটি যদি শাহবাগে জমায়েত ব্যক্তিরা পছন্দ না করে, তাহলে তাকে শাহবাগে এসে তার বক্তব্য পেশ করার জন্য দিল্লিতে নিমন্ত্রণ পাঠাতে পারে। গণতন্ত্র ও পরমতসহিষ্ণুতায় বিশ্বাসী হলে শাহবাগ জনতা নিশ্চয়ই এটা করবে। তবুও, তুমি যখন একটু দ্বিধা করছো, চলো, মেরি আপার রুমে। ওর মতামতটা নেয়া যাক।

পৃন্ট আউট হাতে শামীম এবং তার সঙ্গে শরিফ গেল নিউজ এডিটর মেরির রুমে। মেরির রুমে যথারীতি তার সিডি প্লেয়ার বাজছিল লো ভলিউমে। মান্না দের একটি গান। ও কোকিলা তোরে শুধাইরে সবারই তো ঘর রয়েছে কেনরে তোর বাসা কোথাও নাইরে? ডেস্কের সামনে দেয়ালে একাধিক ফ্যাট স্কৃনে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে শাহবাগ ঘটনার ছবি দেখানো হচ্ছিল। মেরি সিডির ভলিউমটা আরও লো করে দিল।

বসন্তকাল বাংলাদেশে আন্দোলনকাল। মানুষই যেখানে বাসায় ফিরতে পারে না সেখানে কোকিলের বাসা থাকলেও ফেরার চান্স কতোটুকু? শামীম টিভি স্কৃনের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললো, দেশের সবচাইতে বড় দুটো হসপিটাল এখানে, পিজি এবং বারডেম। সেখানে যাতায়াত এখন দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। শাহবাগে সৃজিত ট্র্যাফিক জ্যাম সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। কোকিলের অবশ্য ডানা আছে।

তার বাসা থাকলে হয়তো সাধারণ মানুষ, বিশেষত অফিস-হসপিটাল যাত্রীদের মতো এত অসুবিধা হতো না। এনিওয়ে মেরি, তুমি অরুন্ধতীর এই লেখাটা পড়েছ? শামীম জিজ্ঞাসা করলো। হ্যা, পড়েছি। আমরা নিউজ সেকশন থেকে এ বিষয়ে একটা ফ্রন্ট পেজ আইটেম করছি। সেটা ছোট।

পোস্ট এডিটোরিয়ালে এর পূর্ণ অনুবাদটা দিলে ভালো হবে। মানুষ যুক্তি, ন্যায় ও শান্তির দিকে এগোতে পারে। তোমার মতো আশাবাদী হয়তো সবাই হবে না। তবুও এটা ছেপে দাও। আর হ্যা, এটার ফলোআপ অবশ্যই থাকতে হবে।

ইনডিয়াতে আইনি প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা এবং পুলিশ তথা সরকারপক্ষের বানোয়াট সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রভৃতির সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির একটা তুলনা যত শিগগির সম্ভব ছাপবে। ম্যাটারটা আমাকে দেখিয়ে নিও। শামীম নির্দেশ দিল শরিফকে। শরিফ চলে গেল। শামীম একটা চেয়ারে বসলো।

এই গণশাসন বা মব রুল (Mob rule) কতো দূর যাবে? মেরি গম্ভীর মুখে জিজ্ঞাসা করলো। ফ্রেঞ্চ রিভলিউশনের ইতিহাসটা পড়ে দেখো। একটা উত্তর পাবে। আচ্ছা, অরুন্ধতী রায়ের বিগ সাপোর্টার যেসব সুশীল ইংরেজি-বাংলা পত্রিকা আছে, যারা চান্স পেলেই অরুন্ধতীর লেখা ছাপায়, এবং যারা এখন শাহবাগ জনতাকে সমর্থন দিচ্ছে, তাদের কেউ কি এটা ছাপবে বলে মনে করো? শামিম বললো। উই উইল সি।

মেরির মুখে একটা বাকা হাসি দেখা দিল। ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.