আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

তারকাঁটার ঐ পাশে আরশি নগর (উৎসর্গ কুঙ্গ থাঙ)

যারা উত্তম কে উচ্চকন্ঠে উত্তম বলতে পারে না তারা প্রয়োজনীয় মুহূর্তে শুকরকেও শুকর বলতে পারে না। এবং প্রায়শই আর একটি শুকরে রুপান্তরিত হয়।

এসময়ের নাভীশ্বাস তোলা রাষ্ট্রবাদীতার দিকে তাকালে এটাকে যতটা অনিবার্য, অনাদিকাল থেকে চলে আসা বৈশ্বিক প্রপঞ্চ বলে মনে হয়, তাতে সহজেই ধারনা তৈরী হতে পারে যে আজ রাষ্ট্র’র যে মহা উদযাপন দেখছি সেটাই চিরকালের রীতি। মানুষের মতই টিকে রয়েছে দীর্ঘকাল ধরে, যদিও মহাকালে মানুষও খুব পুরাতন নয় আসলে। আধুনিক জাতি রাষ্ট্রের উদ্ভবের ইতিহাস সোয়া দুইশ বছরের বেশি পুরাতন নয়।

যদিও এখনো অনেকেই রাষ্ট্রের শেকড় খুঁজতে যেয়ে বা বৈধতা খুঁজতে যেয়ে প্লেটো পর্যন্ত না পৌছালে ঠিক স্বস্তি বোধ করেন না। রাষ্ট্র ধারনার হেজেমনির শক্তিমত্তা পুরাতন তাই ন্যায্য এই রাস্তাতে হেঁটে চলেছে বেশ আগে থেকেই, রাষ্ট্র ধারনার হাত ধরে আসলে; হেজেমনিকে পোক্ত করতেই। ব্লগের প্রথম পাতায় কুঙ্গ থাঙ এর পোষ্ট মাথায় ঘুর ঘুর করছে আর আমি ভারতীয় সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছি। যারা সীমান্তবর্তী এলাকায় বড় হয়েছেন তাদের হয়ত মনে থাকতে পারে, প্রায়শই বন্ধুবান্ধবের কাছে বীরত্ব প্রকাশের একটা রাস্তা ছিল, “বুঝছস, ইন্ডিয়ার মুইতা আইলাম, আরেকটু হইলেই বিএসএফের গুলি খাইতাম”। এই মুত্র ত্যাগে যে অর্ন্তনিহিত সুখ তা জাতীয়তাবাদের, যে সুখ আমরা পাই ক্রিকেট টিম নিয়ে হইচই করে, যে সুখ আমরা পাই বিএসএফের তুলনায় বিডিআরকে সাহসী মনে করে।

আরো কত কিছুই না করে। সীমান্ত বড়ই অদ্ভুত, ভূমিতে অধিকারের দাগ টেনে টেনে পৃথকতার দাগ টেনে টেনে। হিলি সীমান্তেও এমন, একটা রেল ক্রসিং এর ঐ পাশে ভারত আরেকটা শহর। দেখি ব্যানার ঝুলছে টাটা স্কাই এর, একটা মন্দির, আরো অদ্ভুত ভাবে মানুষ। আমাদের মতই মানুষ।

কিন্তু আমি যেতে পারবো না ছুতে পারবো না। সীমানা সবসময়ই দ্বৈততাবোধক। কখনো মানুষ নিজের অধিকারের জন্যই সীমানা দেয়, কখনো অন্যের অধিকার খর্ব করার জন্য। আমার মনে পড়ে উর্বশী বুটালিয়ার রানা মামার কথা, ৪৭ এর পর মাকে নিয়ে পাকিস্তান অংশে থেকে গিয়েছিলেন বলে, সেখানে ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলমান হয়েছিলেন বলে ভারতে তার পরিবার কখনো ক্ষমা করতে পারেনি। অন্যদিকে পাকিস্তানে তার নতুন পরিবার নিজের সন্তান স্ত্রীর কাছেও তিনি চীরকাল ওপারের মানুষ।

নিজের ঘরে তিনি “অন্য” হয়ে ঘুরে বেড়ান। পৃথিবীর আনাচে কানাচে কতনা সীমান্ত আছে যা একই ঘরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে চলে গেছে। আক্ষরিক অর্থেই বিছানার এই পাশ আর ঐ পাশ দুটো দেশ হয়ে গেছে। যদিও রাষ্ট্রের হেজেমনি সকলে সমানভাবে মেনে নেয় নি, সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ পাহারাদারের গুলির তোয়াক্কা না করে নিয়মিত যাতায়ত করছে আর বহাল রেখেছে মানুষের নেটওয়ার্ক। আমার ভাবতে বিষ্ময় লাগে যে দেশের মানুষজন ভাষার স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে, শহীদ হয়।

নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করে সে দেশে অপরাপর ভাষার মানুষজনের পরিসর কতনা সীমিত, কতনা শৃঙ্খলিত। বিভেদের জন্য উচ্চারণকেও মানুষ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তেমনি মিলের জন্য জাতপাতবর্ণধর্মও কোন বিষয় নাও হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বলে এই উদারনীতি অধিকার আদায়ের জন্য খুব ভালো রাস্তা নয়। অধিকারের জন্য যুদ্ধ করতে হয়। তাহলে আদিবাসী মানুষজনের ভাষা আধিকারের জন্য বাংলাদেশ রাষ্ট্র কি যুদ্ধ অনিবার্য করে তুলবে? যেমন করে তুলেছে আদিবাসী জমি অধিগ্রহণ এবং বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে? রাষ্ট্রের হেজেমনিকে যত শক্ত বলে প্রচার করা হয় আমি তো দেখি হেজেমনি তত শক্ত নয়।

আবার সম্ভাব্য উপায় হিসেবে আরেকটি রাষ্ট্র’র ধারণা বহুলভাবে সমাদৃত। তাহলে একটি পৃথিবী কতগুলো রাষ্ট্র ধারণ করবে, যতগুলো মানুষ ততগুলোই? পুরো বিষয়টাকে একটা বড় বাহাসের মতন লাগে। আমার যে আদিবাসী বন্ধু ঢাকায় আমার সাথে বুকে বুক মিলিয়ে চলে রাঙামাটিতে তাকে অন্য আচরণ করতে হবে কেন, আমি যে বাঙ্গালী মুখ মুখে সাম্যের কথা বলি তাকে জাতীয়তাবাদী অন্ধ হয়ে উঠতে হবে কেন। বাড়ীর পাশে আরশি নগর তারকাঁটার সীমানা ঘেরা। আমি পড়শিকে দেখি পড়শি আমাকে দেখে আমাদের কিছুই এক নয় তবুও আমরা জানি আমরা মানুষ।

কিন্তু আমরা যে মানুষ তা বারবার আমাদের ভুলতে হবে কেন?

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।