আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মধুর ডাক বধু: যৌন সংস্কৃতির পরিচয়বাহী?

সকল অন্ধকারের হোক অবসান

কাজী নজরুল বলছেন, বধু তোমার আমার এই যে বিরহ/ এক জনমের নহে/ তাই যত কাছে পাই তত এ হিয়ায়/ কি যেন অভাব রহে। নজরুলের এ গানের মতো আরেকটি বধু বিষয়ক গান সব বাঙালীর মুখস্ত প্রায়। প্রখ্যাত গীতিকার ও শিল্পী জটিলেশ্বর মখোপাধ্যায়ের লেখা ও গাওয়া গানটি হলো: বধুয়া আমার চোখে জল এনেছে বিনা কারণে। এই গানেরই কিছু লাইন: দিনে দিনে মূল্যবিনে সে যে নিলো কিনে/ এ মনে যতন করে বিফল প্রেমের বীজ বুনেছি হায়/ বিনা কারণে। গানটিকে আধুনিক প্রজন্মের কাছে আরো জনপ্রিয় করে তোলেন শ্রকান্ত।

সে যাহোক, বধু শব্দটি বড়ই মধুর। বাঙালীর প্রেমচর্চা ও যৌনতায় বহুমুখীতার যে স্থান নেই বা অন্যভাবে বললে বাঙালীর মানসে এক মানসীর চর্চার ঝোক প্রকটিত ঐসব বধু বিষয়ক গানে। শুধু বাঙালী বললে বিষয়টি একপেশে হয়ে যায়। ভিক্টোরিয় যুগের পর থেকেই সারা পৃথিবীতেই এক সম্পর্কের প্রতি জোড় দেয়া হয়েছে। সন্তান উৎপাদনই সেখানে মূখ্য।

বৈধ সন্তান উৎপাদনে তাই বধু অপরিহার্য। যদিও মিশেল ফুকো বলছেন, বুর্জোয়া মানসিকতা থেকেই এ ধারণার জন্ম। মানুষ যেন সন্তান উৎপাদনের চাইতে পণ্য উৎপাদনে বেশী মনযোগী হয় তাই যৌনতাকে আটক করা হয়েছে চার দেয়ালের ভেতর, স্বামী-স্ত্রীর ভেতর। মার্কসীয় দর্শনও তাই বলে। তবে এ দর্শন বহুমুখীতাকে সমর্থন করে না।

মার্কসীয় দর্শন মতে নারীর মুক্তি সমাজে আরো বেশী একমুখী প্রেম ও সম্পর্কের দিকে ধাবিত করবে। নারীর শৃঙ্খল অবস্থা, অর্থনৈতিকভাবে, পুরুষের বহুমুখী হওয়ার পেছনে একটি কারণ। নয় তো পুরুষ তার এক বধু নিয়েই সুখী থাকতো। শত বৎসর আগে রাজা বাদশারা বহু বধু রাখতো এক. রাজনৈতিক কারণে, দুই. যৌন সংস্কৃতির কারণে। সে ধারণা আজ পাল্টেছে অনেকাংশে।

যদিও এখনো বহু জায়গায় এক পুরুষের বহু স্ত্রী দেখা যায়। তারপরও এ কথা বলা যায়, বাবু কালচার কিংবা বাঈজি যুগের পর বাঙালী মূলত বধুমুখী। তার যৌন চর্চা বধুকে ঘিরেই। নারীর বেলাতেও বিষয়টি পরিপূরক। তাই গানের কথাতেও বধু শব্দটি উঠে এসেছে বারবার।

ইংরাজিতে কোনো গানে আমি অন্তত ওয়াইফ শব্দ শুনিনি। ডার্লিং শুনেছি। পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা ভিক্টোরিয় ধারণা থেকে বেরিয়ে আসছে তার ছায়াই বোধহয় ঐসব গানের কথায় পাওয়া যায়। লোবো তাই গানে গানে বলে: বেবি হাউ ক্যান আই টেল হার, আই লাভ ইউ সো মাচ (গানের কথা হুবহু নাও হতে পারে)। এই ক্ষেত্রে বাঙালী এখনো ভিক্টোরিয় যুগের বাসিন্দা।

সেটা ভালো কি খারাপ সেই বিচার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। এই লেখার উদ্দেশ্য ছিলো বধু শব্দটির গানে ব্যবহার এবং এর পেছনে বাঙালীর যৌন সংস্কৃতির যোগ ইঙ্গিত করা। যাহোক, শেষে বলতে চাই- বধুর প্রতি বরের প্রেম যদি বারবার জাগ্রত হয়, একই প্রেম নিত্য নতুন সাজে, যদি একই প্রেমে অভ্যস্ত না হয়ে ওঠে প্রেমিক বরের মন তাহলে হয় তো সেই বর তার বধুর উদ্দেশে গেয়ে উঠবে: মোদের মিলন মঞ্জরী দুটি হায়/ শতবার ফোটে শতবার ঝরে যায়/ আমি কাঁদি ব্রজে (বধু)/ আর তুমি কাঁদ মথুরায়/ মাঝে অপার যমুনা বহে।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।