আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আইরিন সুলতানার "১৯৭১ : বীরাঙ্গনা অধ্যায়" (মুক্তিযুদ্ধের দলিল)



আইরিন সুলতানার "১৯৭১ : বীরাঙ্গনা অধ্যায়" পোষ্টটা স্টিকি করার আহবান জানিয়েছিলাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সাড়া দেননি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, প্রতিবেলায় যে কারও একটি দলিল ভিত্তিক পোষ্ট আমি কপি-পেস্ট করে পোষ্ট করবো। হয়তো ব্লগ কর্তৃপক্ষ আমাকে এর শাস্তি দিবেন। যদি কেউ আমার সিদ্ধান্তটিকে মেনে না নেন তাহলে বলবেন; আমি তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবো।

(৪০০,০০০ বীরাঙ্গনাদের মধ্যে একজন; ছবি : Naib Uddin Ahmed/Autograph ABP & Guardian UK) ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অজির্ত হয়েছে স্বাধীনতা, একথাটুকু বলতে খুব বেশী সময় লাগেনা । অথচ সেসময়ে বাস্তবতা যে কতটা ভয়াবহ ছিল! যে কোন যুদ্ধে হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি অন্য যে ঘটনাটি দেদারসে হয়ে থাকে তা হলো নারী-ধর্ষণ । আমাদের নয় মাসের অর্জিত স্বাধীনতার সংগ্রামের পেছনে রয়েছে পাকসেনা আর রাজাকারদের সেরকমই কিছু কু-কীর্তি । *** লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী একাত্তরে সংগঠিত র্ধষণের ঘটনা স্বীকার করার সাথে সাথে একটি অসংলগ্ন উক্তি করেছিলেন - ”আপনি এরূপ আশা করতে পারেন না যে, সৈন্যরা থাকবে, যুদ্ধ করবে এবং মুত্যু বরণ করবে পূর্ব পাকিস্তানে আর শারীরবৃত্তিয় চাহিদা নিবৃত্ত করতে যাবে ঝিলামে(Jhelum, a river that flows in India and Pakistan.)” ! Brownmiller লিখেছিলেন, একাত্তরের ধর্ষণ নিছক সৌন্দর্যবোধে প্রলুব্ধ হওয়া কোন ঘটনা ছিলনা আদতে; আট বছরের বালিকা থেকে শুরু করে পঁচাত্তর বছরের নানী-দাদীর বয়সী বৃদ্ধাও স্বীকার হয়েছিল এই লোলুপতার। পাকসেনারা ঘটনাস্থলেই তাদের পৈচাশিকতা দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি ; প্রতি একশ জনের মধ্যে অন্তত দশ জনকে তাদের ক্যাম্প বা ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হতো সৈন্যদের জন্য।

রাতে চলতো আরেক দফা নারকীয়তা । কেউ কেউ হয়ত আশিবারেও বেশী সংখ্যক ধর্ষিত হয়েছে ! এই পাশবিক নির্যাতনে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, আর কতজনকে মেরে ফেলা হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা হয়ত কল্পনাও করা যাবে না । (Brownmiller, p. 83) *** নয় মাসের যুদ্ধে সংগঠিত ধর্ষণ, অপহরণ, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি বাঙালী মা-বোনদের লাঞ্ছনার কেবল প্রাথমিক ধাপ ছিল যেন। প্রধামন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক সেই সব মা-বোনদের যথাবিহীত সন্মানপূর্বক বীরাঙ্গনা উপাধি প্রদান ছিল সমাজে তাদের পূনর্বাসন প্রকল্পেরই একটি সূচনা মাত্র । এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল, বিবাহিত মহিলাদের তাদের স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেয়া এবং অবিবাহিত বা বিধবাদের বিবাহ সম্পন্ন করা ।

তথাকথিত রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় যেখানে মেয়েদের পর্দানশীলতা এবং শুদ্ধতাই প্রধান সেখানে এসব ধর্ষিত মেয়েদের বিবাহের প্রকল্পটি তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। অন্য দিকে কেউ কেউ এগিয়ে এলেও তারা সরকারের কাছে এর বিনিময়ে যৌতুক দাবী করে বসল। (Brownmiller, Against Our Will, p. 84) *** যদিও হাজার হাজার হিন্দু মহিলাদের হত্যা করা হয়েছিল, তবে কিছু সংখ্যক সুশ্রী রমণীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো মিলিটারী ক্যান্টনমেন্টে । যদি কেউ পরনের কাপড় ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করত, তাহলে তাদেরকে উলঙ্গ করে ফেলা হতো । কেউ যদি তাদের লম্বা চুল পেঁচিয়ে আত্মহননের চেষ্টা করত, তবে তাদেরকে ন্যাড়া করে দেয়া হতো ।

এসব নির্যাতিতারা যখন পাঁচ-ছয় মাসের অন্ত:সত্ত্বা হতো তখন তাদেরকে মুক্তি দিয়ে উপহাস করা হতো, ”যখন আমার পুত্র ভূমিষ্ট হবে, তুমি তাকে অবশ্যই আমার কাছে নিয়ে আসবে” । (Daktar: Diplomat in Bangladesh by Dr. Viggo Olsen). *** পাঁচ সেনা সহ মেজর আসলাম ৩রা অক্টোবরে ঢাকা ইউনিভার্সিটির রোকেয়া হলের মহিলা সুপারিনটেনডেন্টকে বলেন তেজগাঁও ক্যান্টনমেন্টে নাচ-গান করার জন্য কিছু মেয়ে পাঠাতে। সুপারিনটেনডেন্ট জানান যে বেশীর ভাগ মেয়েই হোস্টেল ছেড়ে চলে গেছে এবং মাত্র চল্লিশ জন ছাত্রীই অবস্থান করছে; হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে তিনি মেয়েদেরকে এধরনের কাজে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানান । রুষ্ঠ হয়ে মেজর আসলাম সেদিন ফিরে যায় এবং পরবর্তীতে ৭ই অক্টোবর, প্রায় রাত্রী আট ঘটিকার সময় তার বাহিনী হোস্টেলের দরজা ভেঙে ফেলে মেয়েদেরকে টেনে-হিচঁড়ে বার করে এনে অসহায় সুপারিনটেনডেন্টের সামনে নির্যাতন করে। এই পৈচাশিকতা এতটাই উন্মুক্তভাবে করা হয়েছিল যে এই সংবাদ করাচীর একটি প্রত্রিকাতে (Dawn) প্রকাশিত হয়।

স্বাধীনতার সাত দিনের মধ্যে পাকসেনা কর্তৃক অপহরিত প্রায় তিনশত মেয়েদের ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়। ২৬শে ডিসেম্বর, মুক্তি বাহিনী এবং যৌথ বাহিনীর সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এবং ঢাকার আশেপাশের অন্যান্য ছোট শহরগুলো থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় প্রায় ৫৫ জন অস্বাভাবিক অসুস্থ এবং অর্ধ-মৃত মেয়েদের উদ্ধার করে রেড ক্রস (Red Cross) । (Genocide in Bangladesh (1972) by Kalayan Chaudhury, Orient Longman, pp 157-158) *** ”আমরা বাংলাদেশী মহিলাদের উপর পাকসেনাদের ধর্ষণ, নির্যাতনের বহু প্রমাণ সংগ্রহ করেছি । পাহাড়তলী, চট্রগ্রামের শহীদ আকবর আলী’র পুত্র রাউফুল হোসেইন সুজা ফয়জ লেকে’র হত্যাযজ্ঞ এলাকায় তার পিতার লাশ খুঁজতে যান। তারা সেখানে প্রায় ১০,০০০ বাঙালীর লাশ দেখতে পান যার বেশীর ভাগই নির্মমভাবে জবাই করা ।

তারা প্রায় ৮৪ জন অন্ত:স্বত্তা রমনীর মৃতদেহ আবিষ্কার করেছিলেন যাদের উদর ছিন্নভিন্ন ছিল। এই রকম নির্মমতার প্রতিচ্ছবি ছিল প্রায় সারা বাংলাদেশে। ” (The Rape of 71: The Dark Phase of History -Dr. M A Hassan) *** ”ডিসেম্বর এবং মার্চ এখন যেন একটি উৎসব পালনের মাসে পরিণত হয়েছে, এসময় আমরা অনুতাপ করি কেন ১৯৭১ এ গনহত্যা এবং গন-ধর্ষণের বিচার আজো হলোনা ! বিচারের এই ব্যর্থতা কিন্তু প্রমাণের অভাব নয় কোনক্রমেই ”। (The Lessons We Never Learn - By: Hameeda Hossain ) *** "একাত্তরে মা-বোনদের সম্ভ্রম নষ্টকারী, হত্যাকারী সেইসব ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই" *** সূত্র : জেনোসাইড বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতা : এই পোস্টে অনেক ব্লগার বীরাঙ্গনাদের উপর বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্রের ভিডিও লিংক দিয়ে যাচ্ছেন, যা পোস্টের অনুভূতিকে আরো জোরালো করে তুলেছে । পাঠকদের কাছে অনুরোধ ভিডিওগুলো দেখুন ।

লিংক দেয়ার জন্য ব্লগারদেরকে অশেষ ধন্যবাদ ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.