আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

প্রতিবেশি লেখার খাতা



(এইলেখাটি সাঙস্কৃতিক বিকাশ কেন্দ্র বেশ আগে পাঠ করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিতে সঙস্কার প্রবনতার হিড়িক চলু হলে ভারত ভুখন্ডের সঙস্কারের ইতিহাস জানতে আমি আগ্রহী হয়ে উঠি। তখন সাদ্দাম হোসেনের সাথে আলাপ কালে তিনি এই বক্তৃতাটি পড়তে দেন। তার অনুমতিক্রমে লেখাটি আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। ) বাংলার রেনেসাঁস : অসুখী চৈতন্যের যুগ/ সাদ্দাম হোসেন ঊনবিংশ শতকে বাংলার হিন্দু ভদ্রলোক সমাজে যে বিশেষ কর্মচাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হয়, যা প্রকাশ পায় নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড এবং নানা সৃষ্টিশীল উদ্যমের ভেতর দিয়ে তাকেই বাংলার রেনেসাঁস বা নবজাগরন বা নবযুগ বলে অভিহিত করা হয়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, 'রেনেসাঁস' রূপকের আশ্রয় নিয়ে আমরা কি ঊনবিংশ শতকের বাঙালি মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক-সামাজিক অবদান সঠিকভাবে বুঝতে বা বিচার করতে পারব? সম্ভবত আরো ফলদায়ক হবে যদি এই প্রশ্ন করি, কখন এবং কিভাবে এই রেনেসাঁস প্রত্যয় ঊনবিংশ শতকের বাংলার সাথে যুক্ত হলো। এটা মোটামুটি পরিস্কার যে, 'বাংলার রেনেসাঁস' কথাটি বিংশ শতকের মধ্যভাগ বা শেষভাগের লেখকদের দ্বারা জনপ্রিয় হয়েছে। এ.এফ. সালাউদ্দিন তাঁর 'The Bengal Renaissance and the Muslim Community' প্রবন্ধে জানাচ্ছেন, 'বাংলার রেনেসাঁস' কথাটি ঐতিহাসিক লেখালেখিতে সাধারণভাবে শুরু হয় ১৯৪৬ সালে প্রফেসর সুশোভন সরকারের 'Notes on Bengal Renaissance' পুস্তিকাটি প্রকাশের পর, যে বইটি সুশোভন সরকার 'অমিত সেন' ছদ্মনামে লিখেছেন। আমার মতে, 'বাংলার রেনেসাঁস' নাম দিয়ে ঊনবিংশ শতকের যে সময়টি চিহ্নিত করা হয়, সে সময়টি সত্যিকারঅর্থে ঊনবিংশ শতকের ভদ্রলোক শ্রেনীর 'অসুখী চৈতন্যের' ফলাফল। আত্ম ও পরের টানাপোড়েনে দীর্ণ সেই ভদ্রলোক তার প্রকাশের ভাষা খুঁজে পায় নতুন ইতিহাস চেতনায়, মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনায়, দেশীয় লোক সম্পদ সংগ্রহে, সমাজ ও ধর্ম সংস্কারে, ধমীয় ভক্তিরসে ও আত্মচিন্তায়।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলার রেনেসাঁসের পিছনে ইউরোপীয় প্রাচ্য বিশারদদের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। David Copf এর মতে, মূলত ইউরোপীয় প্রচ্য বিশারদ ও এদেশীয় ভদ্রলোক শ্রেনীর অসুখী বুদ্ধিজীবীদের মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল হলো বাংলার রেনেসাঁস। এ সময়ে জাতীয় ইতিহাস লেখার প্রবণতা দেখা গেল এদেশীয়দের মধ্যে। পার্থ চট্টোপাধ্যায় আমাদের জানাচ্ছেন, এ সময় 'জাতীয়তাবাদীর কাছে প্রচীন ভারত হয়ে উঠল তার ক্লাসিকাল আদর্শ। আর প্রাচীন থেকে বর্তমানের মাঝের অংশটা হলো তমসাবৃত মধ্যযুগ'।

তিনি আরো জানাচ্ছেন , 'ঊনিশ শতকের ইংরেজ ঐতিহাসিকদের লেখা ভারতবর্ষের ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যারা পরিচিত, তাঁরাই জানবেন যে একদিকে যেমন উইলিয়াম জোনস প্রভৃতি প্রাচ্যবিদ্যাবিৎদের গবেশনায় প্রাচীন ভারতের কাব্য-দর্শন নিয়ে উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছিল, ঠিক তেমনি প্রাক-বৃটিশ পর্বে মুসলিম রাজত্বের অপদার্থতা সম্বন্ধেও ইংরেজ লেখকরা মোটামুটি একমত ছিলেন। এই অপদার্থতার কহিনী বলা বাহুল্য ব্রিটিশ শাসনের সপক্ষে যুক্তি হিসেবেই উপস্থিত করা হতো। জেমস মিল- এর অবশ্য প্রচীন ভারত এবং মুসলিম শাসন, উভয় পর্ব সম্বন্ধেই অশ্রদ্ধা ছিল। তাছাড়া সুলতানি এবং মুঘল সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রতত্ত্ব আদতে ইসলামি, সুতরাং তার গুনাগুন ইসলামের ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার্য, এ ধারণাও ইংরেজ ঐতিহাসিকরাই চালু করেন। তার সাথে যুক্ত হয় এডওয়ার্ড গিবনের সময় থেকে সুপ্রচলিত ইসলাম সম্বন্ধে যাবতীয় প্রেজুডিস।

আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার জাদুদন্ডের ছোঁয়ায় এদেশেও যখন ইতিহাস লেখা শুরু হল, তখন একদিকে যেমন প্রাচীন ভারতকে কল্পনা করে নেয়া হল সমস্ত আধুনিকতার ক্লাসিকাল সূত্র হিসেবে, তেমনি মুসলিম শাসনকে ঠেলে দেয়া হল মধ্যযুগীয় অন্ধকারে। এবং আলোকপ্রাপ্ত ইউরোপের ইসলাম সম্বন্ধে সবরকম কুসংস্কার আরোপ করা হল 'মুসলিম জাতীয় চরিত্র' নামক একটি কাল্পনিক ধারণার ওপর। দ্বাদশ শতাব্দীর পরবর্তী অধ্যায়ের ভারতের ইতিহাসে এই চরিত্রটিকে এবার সবৃত্র ঘুরে বেড়াতে দেখা যাবে। এই মুসলমানের চারিত্রিক বৈশিশ্ট্য হল, সে ধর্মান্ধ, অসহিষ্ণু, যুদ্ধপ্রিয়, দূর্নীতি পরায়ন এবং নিশ্ঠুর। এই ধরণের ইতিহাসচর্চার ফলাফল হয়েছিল মারাত্মক যার প্রভাব একালেও হিন্দু জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চায় বজায় আছে।

অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা বাংলার মুসলমান জনগোষ্ঠী এর ফলে ক্রমে ক্রমে হিন্দু জনগোষ্ঠি থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ভাবতে শুরু করে। তারাও নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় অনুস্ধানে ব্যাপৃত হয়, নেতৃস্থানীয়রা সতন্ত্র ইতিহাস রচনার ডাক দেন যার অনিবার্য পরিণতিতে দেখা যায় দ্বিজাতিত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম। কিন্তু বাংলার রেনেসাঁসের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৮০ সালে 'রেনেসাঁস' কথাটি ব্যবহার করেন, কিন্তু তাঁর নিজ সময়কার ভদ্রলোকদের কর্মকান্ডকে উদ্দেশ্য করে নয়, বরং তিনি নিজ সময়ের ভদ্রলোক সংস্কৃতি সম্পর্কে ছিলেন গভীর ভাবে সমালোচনামুখর ও পরিহাসপ্রবণ। 'বাঙ্গালার ইতিহাস' প্রবন্ধে বঙ্কিম বলছেন, 'রাজা ভিন্ন-জাতীয় হইলেই রাজ্যকে পরাধীন বলিতে পারা যায় না'।

এদিকে পার্থ চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, 'বাংলার স্বাধীন সুলতানদের আমলকেই বঙ্কিম প্রকৃত রেনেসাঁসের যুগ মনে করতেন'। মনমরা বঙ্কিম 'বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা' প্রবন্ধে বলছেন, 'পরাধীনতার একটি প্রধান ফল ইতিহাসে এই শুনা যায় যে, পরাধীন জাতির মানসিক স্ফুর্তি নিবিয়া যায়। পাঠান শাসনকালে বাঙ্গালীর মানসিক জ্যোতিতে বাঙ্গালার যেরূপ মুখোজ্জ্বল হইয়াছিল, সেরূপ তৎপূর্ব্বে বা তৎপরে আর কখনও হয় নাই'। আবার তিনি বলিতেছেন,' আমাদের এই রেনেসাঁস কোথা হইতে? কোথা হইতে সহসা এই জাতির এই মানসিক উদ্দীপ্তি হইল?..... এ আলোক নিবিল কেন? একদিকে ঔপনিবেশিক রাজের প্রতি সহযোগিতা, অন্যদিকে নিজের নিয়তি নিজে নির্ধারণের ইচ্ছা, একদিকে দাসসুলভ আচরণ, অন্যদিকে নিজে কর্তা হয়ে উঠবার বাসনা, এই দোটানাই বাংলার ঊনবিংশ শতকের রেনেসাঁসের চরিত্র নির্ধারণ করেছে। সেই অসুখী চৈতন্য খন্ডিত হলেও, স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে আমাদের মননে, আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।