আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

তেজস্ক্রিয় ও আত্মঘাতী বাঙালি

ভালো কিছু করতে চাই একজন ফন্দি আঁটছে, আজ রাতে কার মাংস খাবে। আরেকজন দ্বিধায় আছে, অপরের মাংস খাওয়ার চেয়ে নিজের হাত-পা খাওয়াই বেশি ভালো কি না। প্রথমজন খুন করল, দ্বিতীয়জন করল আত্মহত্যা। কিন্তু কার্যত, দুটোই আত্মঘাতী। নিজের প্রতি ঘৃণা বা হতাশায় নিজেকে খাওয়া আর হিংসার বশে অপরকে হত্যা করায় একদিকে থাকে মৃত মানুষ, অন্যদিকে থাকে খুনিমানুষ।

যে মানুষ অন্য মানুষের মাংস খায়, তাদের বলে ক্যানিবাল। বাস্তবে ক্যানিবালিজম কোথাও ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু পশ্চিমা সমাজে মুষ্টিমেয় কিছু তরুণ বিশ্বাস করে, ক্যানিবালিজম ভালো জিনিস। তারা নিশ্চয়ই বিকারগ্রস্ত। কিন্তু আমরা যারা পরস্পরের মাংস খেয়েচলছি, তারা কতটা সুস্থ? ক্যানিবালিজম না থাকলেও ‘সোশ্যাল ক্যানিবালিজম’ নামে একটি কথা চালু আছে।

অপরের ক্ষতি চাওয়া এর সামান্য রূপ। আর অসামান্য রূপটি হচ্ছে: অবিরত হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ ও গণপিটুনির হিড়িক। এসবই চলছে এখন বাংলাদেশে। মাস্তান কি বিবেকবান, পেশাদার কি দিলদার—সবাই যেন সহিংস হয়ে উঠছে। পরস্পরের মাংস খাওয়ার মতো তেজস্ক্রিয় ক্রোধ জমছে ব্যক্তি থেকে সমষ্টির মনের ভেতরে।

কোনো এক ঘটনায় বেরিয়ে পড়ছে তার ভয়াবহতা। এ ব্যাপারে আধুনিক জগতে বাঙালিরাই অদ্বিতীয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিতভাবে মার্কেটে, স্টেশনে ও স্কুলে গুলি করে হত্যালীলার কাহিনি শুনি। বর্ণবাদী যুগে আফ্রিকা ও আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের ‘লিঞ্চিং’য়ে হত্যার কথাও জানি। কিন্তু আমাদের বিষফোঁড়াটা মনে হয় ভিন্ন প্রকৃতির।

এর চিকিৎসা কত দূর করা যাবে জানি না, কিন্তু সমস্যাটাকে না বুঝে উপায় নেই। কারণ, সমস্যাটা আত্মঘাতী হয়ে উঠছে। অকারণে কে কখন কীভাবে কার শিকার হবে, তা কে বলবে? আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের সূচনায় কোনো ঘণ্টা বাজে না। নীরবেই তা শুরু হয়ে যায়। এক চীনা জল্লাদের সাধনা ছিল, এমন সূক্ষ্মভাবে মানুষের কল্লা কাটা, যাতে শিকার টেরটিও না পায়।

সাধনায় এমন নিখুঁত হয়ে উঠল তাঁর দক্ষতা যে, গলা কাটার পরও এক হতভাগা প্রশ্ন করে, ‘কই, কিছু টের পাচ্ছি না তো। ’ জল্লাদ মহাশয় গর্বিত হাসি দিয়ে বললেন, ‘জনাব, মাথাটা একটু ঝাঁকান, টের পাবেন। ’ ঝাঁকুনি দিতেই ধড়-মাথা আলাদা; নিহত লোকটি টেরও পেল না। ঝাঁকুনি ছাড়া আমরাও অনেক সময় বুঝি না, মাথাটা যথাস্থানে আছে কি নেই। গত কয়েক বছরে সামাজিক সহিংসতা, নৃশংসতা ও রাজনীতি-বহির্ভূত হানাহানি দেশকে ঝাঁকাচ্ছে।

সমাজের ভেতরে মানুষের মনের গহিনে গভীর থেকে গভীরতর ব্যাধি বাসা বেঁধেছে, অথচ সমাজপতিদের হুঁশ নেই। এককথায় এই ব্যাধিরই প্রতীকী নাম ‘নরমাংস ভক্ষণের ইচ্ছা’ বা ক্যানিবালিজম। জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ নেই। ’ এই সাধ এখন রাজনীতির ক্ষমতাবানদের মধ্যেতো বটেই, সামাজিক সমতলেও দৃশ্যমান। এটা একধরনের সামাজিক নৈরাজ্য, যেখানে আইন অকেজো হচ্ছে, অনেক অপরাধেরই প্রতিকার থাকছে না।

এ অবস্থায় নিছক ছেলেধরা সন্দেহের বশে প্রতিবন্ধী নারীসহ তিনজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে গাজীপুরে। প্রতিবন্ধী নারীর প্রতি নৃশংসতা কিংবা অপ্রকৃতিস্থ পুরুষের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া থেকে বোঝা যায় ‘পাবলিক’ নৃশংসতার মাত্রা কত ভয়াবহ এখন। এ সপ্তাহেই সুন্দরবনে এভাবে নিহত হয়েছে ছয় ডাকাত। নোয়াখালীতে বেশি করে, তবে সারা দেশেই ডাকাত, ছিনতাইকারী অভিযোগে হত্যার পাবলিক উৎসব দেখা যাচ্ছে। সেই সব উৎসবের দৃশ্যভিডিও করার লোক পাওয়া যায়, জীবন বাঁচানোর হাত পাওয়া কঠিন।

২০১১ সালের ৭ আগস্ট নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে পুলিশের উসকানিতে পুলিশের গাড়ি থেকে নামিয়েনিয়ে গণপিটুনি দিয়ে ১৬ বছরের এক কিশোরকে হত্যা করা হয়। খেয়াল করা দরকার, নোয়াখালীতেই কিন্তু গণপিটুনির ঘটনা সবচেয়েবেশি। যেমন ঢাকায় বেশিগৃহপরিচারিকা নির্যাতন। এই নৃশংসতার সঙ্গে ছাত্রলীগের গোলাগুলিতে নিহত শিশুর মৃত্যু, কিংবা ঢাকার পল্টনে ধর্ষণের পর হত্যা করে বাথরুমে লাশ পচানোর নৃশংসতার মিল অস্বীকার করা যাবে না। বান্ধবীএখানে বান্ধবীকে তুলে দিচ্ছে ধর্ষকবন্ধুদের হাতে।

সবই আগ্রাসী আচরণ, সবই সহিংসতার শেষ সীমা তথা দলবদ্ধ হত্যালীলার বিবরণ। অপরাধবিজ্ঞানী এসব ঘটনায় ‘অভিযুক্ত’ ছাড়া কারও দোষ দেখবেন না। তাঁদের চোখে এসব আইনশৃঙ্খলা সমস্যা, কঠিন শাস্তি দিলেই সব ঠিক। এককথায়সমাধান; আইন কঠোর করো, নতুন নতুন বাহিনী সাজাও। তাতেও লাভ হচ্ছে না।

সমাজবিজ্ঞানী অপরাধী বাদে আর সবাইকে দুষবেন। বলবেন, শাস্তিতে সামাজিক ব্যাধি সারে না, এসব সহিংসতার বীজ রয়েছে আরও গভীরে, হাত দিতে হবে সেখানেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন গভীরে? সেটা কি ব্যক্তির মন, নাকি রাজনীতি-সংস্কৃতি-আইন ও আচার-ব্যবহারের মধ্যেই এর গোড়া খুঁজতে হবে। মনের সমস্যা ধরলে মনোচিকিৎসক আর কোয়ান্টাম মেথডই ভরসা। সমাজ-রাষ্ট্রের দোষে কেবল ব্যক্তিকে জেলে ভরেও লাভ নেই।

সব মেথডই এখানে ফেলমারছে। কারণ, সামষ্টিক সমস্যার ব্যক্তিগত সমাধান অসম্ভব। উপসর্গছেড়ে তাই রোগের কারণে হাত রাখতে হবে। প্রথম সমস্যা: বলপ্রয়োগ ছাড়া দ্বন্দ্ব মীমাংসার কোনো তরিকা তৈরি হয়নি বাংলাদেশে। বলপ্রয়োগের ক্ষমতার ওপর রাষ্ট্র, রাজনীতি, আইন ইত্যাদি দাঁড়িয়ে থাকে।

শাসনের যুক্তি ও প্রয়োজনীয়তা দিয়ে বলপ্রয়োগকে গ্রহণযোগ্য করাতে হয় তাদের। কিন্তু পুলিশ, র‌্যাব আইনবহির্ভূত পন্থায় চললে, রাষ্ট্রের ওই বলপ্রয়োগের বৈধতা খোয়া যায়। আইনি-বেআইনিসবাই যখন একই আচরণ করে, তখন ন্যায়-অন্যায়ের ভেদ ঘুচে যায়। এ রকম অবস্থার প্রধান দুটি লক্ষণ হলো, অপরাধের দায়মুক্তি ও নৃশংসতা। এরই নাম জোর যার মুলুক তার।

তিন নম্বর লক্ষণ হলো অধিকারহীনতা ও অস্বাধীনতা। মানুষ কোথাও যখন উপযুক্ত সেবা পায় না, রাস্তাঘাট থেকে অফিস-আদালতে কেবলই রেষারেষি আর ভোগান্তি যেখানে, যেখানে বাজারের অস্থিরতা জীবন ও সংসারকে আরও অস্থির করে, সেখানে মানুষ উত্তেজিত থাকবেই। এই উত্তেজনার সঙ্গে যোগ হয়েছে কাঠামোগত ভয়। রাজনৈতিক সংকট, হানাহানি ও সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার এবং ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, ক্রসফায়ার ও দুর্ঘটনার ভয়। বারবার ঘটার দৌলতে আর মিডিয়ার পৌনঃপুনিক প্রচারে এ রকম ভয় কখনো কোনো এলাকার মানুষের মনে ঘনীভূত হলে অবস্থা ফেটে পড়ে।

ঢাকার পাশে গাজীপুরে ও কোনাবাড়ীতে ছেলেধরার গুজব এভাবেই স্থানিক ভয়ের আবহ সৃষ্টি করে রেখেছিল। এ রকম পরিস্থিতিতেই আমিনবাজারের কেবলার চরে ডাকাত সন্দেহে পাঁচ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। উভয় ঘটনাতেই উত্তেজনায় টানটান অবস্থাকে বিস্ফোরিত করায় ভূমিকা রেখেছিল ‘ছেলেধরার’ বা ‘ডাকাতের’ গুজব। এই গুজব কে ছড়িয়েছে, তা পুলিশ খুঁজুক। কিন্তু সামাজিক বিপর্যয়ের যে সতর্কসংকেতটি এসব গুজবের মধ্য দিয়ে উঠে আসছে, তা পাঠ করার সাহস আমাদের থাকা উচিত।

নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা, মানবিক মূল্যবোধের বিলয় এবংযোগাযোগহীনতার বিভিন্ন রকম চেহারাই সমাজে হাজির আছে। সামাজিক সহিংসতা এর একটা প্রকাশ। এর সঙ্গে ঔপনিবেশিক পরাধীনতার মিল অস্বীকার করা যাবে না। যখন অধিকাংশের সঙ্গে অল্প মানুষের বিরোধ বাড়ে, যখন অবিচারই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, যখন প্রতিবাদেরও সুযোগ থাকে না, তখন হয় বিদ্রোহ ঘটে নতুবা ক্ষোভ-বিক্ষোভ অবদমিত হয়ে আত্মঘাতী পথে চালিত হয়। এক ভদ্রলোকের শান্ত বিড়ালটা প্রতিবেশীর বেয়াড়া বিড়ালের খামচানি সইতে সইতে একদিন নিজেও সহিংস হয়ে উঠল।

কিন্তু শত্রু বিড়ালটাকে নয়, সে খামচাতে গেল তার প্রভুকে। সমাজ মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলে, ট্রান্সফারড অ্যাগ্রেশন বা ‘লক্ষ্য বদলে যাওয়া প্রতিহিংসা’। জেলখানার বন্দীরা মরিয়া হয়ে কারাগার ভাঙতে না পারলে মাথা ভাঙে আরেক বন্দীর। বাংলাদেশের সামাজিক স্তরে এ রকম মরিয়াপনা দেখা যাচ্ছে। একদিকে রাজনীতি অপরাধীদের সংখ্যা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে অপশাসন মানুষের সহনশীলতায় চিড় ধরাচ্ছে।

অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান আলজেরীয় বিপ্লবী ফ্রানজ ফ্যানোর বরাত দিয়ে একে বলছেন ইন্টারমিডিয়েট ভায়োলেন্স বা মধ্যবর্তী পর্যায়ের সহিংসতা। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সহিংসতা আরও ব্যাপক পর্যায়েসামাজিক সহিংসতা হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয়সহিংসতার মাঝামাঝি পর্যায়এটা। যে সমাজে মানুষ বিপ্লবের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়না বা পারে না, সেখানে এমন আলামত বেশি দেখা যায়। সমাজদেহে জমা বিষাক্ত রক্ত এভাবে পুঁজ হয়েবেরোয়।

এর কোনো একটা এসপার-ওসপার না হলে পুঁজ ও ঘা দেখা দিতেই থাকবে। রাষ্ট্রের বয়স ৪২ বছর হলেও শতবছর পেরিয়েগেলেও আমাদের সমাজে বড় রকমের সংস্কার হয়নি। এরই বিকার হয়তো আমরা দেখছি। পুনশ্চ: গত রাতে শুনি, অন্য বাড়ি থেকে একটি মেয়ের চিৎকার আসছে। সাড়া দিইনি দায়িত্ব নিতে হবে বলে এবং ভয়েও বটে।

কোনো দিন আমার বাড়ি থেকেও এ রকম আওয়াজ বেরোতে পারে। বিবিধ ভয় আর অপমান জমতে জমতে কোনো দিন হয়তো আমিও আঘাত করব আমারই মতো কাউকে। যার যার আশ্রয়ে বসে আওয়াজ শুনে যাওয়া কিংবা আঘাতের শিকার বা আঘাতকারী হওয়ার বাইরে আরও কিছু বোধ হয় আমাদের করার আছে। আর্ত মানুষের চিৎকার তো বাড়ছেই। ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।