আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বনলতা সেন

হাসনাত সাহেব দরজা ঠেলে ঘরটায় প্রবেশ করলেন। ঘরটা প্রকান্ড। আশেপাশের যে দশটা বাসায় ঘরগুলো দেখতে পাওয়া যায় তার সাথে এর কোনভাবেই মিল করা চলে না। ঘরটা প্রশস্ত, বিশাল। অনেকটা ক্লাসরুমের মত।

হাসনাত সাহেব এ ঘরটায় প্রাণ খুলে শ্বাস নিতে পারেন। আজকাল যে ফ্ল্যাট-রুমগুলো তৈরী হয় সেখানে বেশিক্ষণ থাকা যায় না, দম বন্ধ হয়ে আসে। ঘরটার সবগুলো জানালা খুলে দিলে আলোতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। বাতাসও পাওয়া যায় ঢের। বোঝা যায়, মহসিন অনেক যত্ন করেই বাসাটা বানিয়েছে।

এক-তলার বিল্ডিং স্ট্রাকচারের সাথে দোতলার কোন মিল নেই। একতলায় বসলে সবাই এ বাসাকে আর দশটা বাসার মতই ভাববে। কিন্তু দোতলায় আসলে সবাই হতভম্ব হয়ে পড়বে। দোতলায় দু-তিনটি রুম ছাড়া একতলার মত আর কোন রুম নেই। সবটা জুড়েই এই বিশাল লাইব্রেরী।

মহসিনের স্বপ্নের লাইব্রেরী। মহসিনের সাথে হাসনাত সাহেবের প্রথম কোথার দেখা হয়েছে তা এই বৃদ্ধ বয়সে হাসনাত সাহেব মনে করতে পারেন না। পিছনে ফিরে তাকালেই হাসনাত সাহেব ভাসির্টির সেসব রঙ্গিন দিনগুলোতেই ফিরে যান। নিজের মধ্যে সেই টগবগে তরুণকে আবিষ্কার করেন। হাসনাত সাহেব ছিলেন বড় ঘরের সন্তান।

সেসব দিনেই তাদের পারিবারিক ব্যবসা ছিল রীতিমত ঈর্ষার মত। তাঁর বাবাকে পুরান ঢাকার সবাই এক নামে চিনত। সে সূত্রে তিনি দাপিয়ে বেড়াতেন সব জায়গায়, নিবির্ঘ্নে। বাবার নামের কারণে বলতে গেলে অনেক সুবিধাই পেয়েছেন ভাসির্টিতে। সেখানে কেউ গলা উঁচু করে তাঁর সাথে কখনও কথা বলে নি।

ছাত্র মহলে তাঁর মত জনপ্রিয় আর কেউই ছিল না। তিনি যখন কথা বলতেন, সবাই চুপ হয়ে যেত। অবাক হয়ে তাঁর কথা শুনত। ভাসির্টির মেয়েগুলোর কাছে তিনি ছিলেন আকষর্ণীয়, ব্যক্তিত্ব ও রুচিসম্পন্ন এক তরুণ! হাসনাত সাহেব মুচকি হাসেন। লাইব্রেরীর দুটো জানালা খুলে দেন।

এই চিরচেনা লাইব্রেরীটাই বড় অচেনা লাগছে তার। লাইব্রেরীর এক পাশে তার বিছানা, আলমারী। বইয়ের তাকে বইগুলো ঝকঝক করছে, ইজি চেয়ারটা এমনভাবে সাজানো যে এক্ষুণি কেউ এসে বসে পড়বে। টেবিলে চশমাটা পড়ে আছে, অথচ চশমার মালিকটা নেই। মোটা ফ্রেমের চশমাটায় যেন বিষাদের ছোঁয়া লেগেছে।

হাসনাত সাহেবের শরীরটা কদিন ধরে ভালো যাচ্ছে না। ডাক্তার বলেছে কমপ্লিট রেস্ট। বাইরে কোথাও ঘোরাঘুরি করা নিষেধ। তারপরেও এখানে না এসে তিনি পারেন না। কাল ঘুমানোর আগে বাদলের ফোন, মহসিনের ছেলে।

বলল, “চাচা কালকে আব্বার মিলাদ। ” হাসনাত সাহেব কী একটা বলতে গিয়েও বললেন না। একটা দীঘর্শ্বাস ফেলে বললেন, “কখন বাবা?” -“বাদ আছর ডেকেছি, চাচা তবে আপনি রাতে খেয়ে তারপর যাবেন। ” -“বাবা আমি একলা মানুষ অতক্ষণ কীভাবে থাকব বল তো? আমি বরং মিলাদ শেষেই......” বাদল কিছুতেই মানল না। হাসনাত সাহেবকে আসতেই হবে।

হাসনাত সাহেবও বুঝতে পারলেন, বাদল চাচ্ছে তার পাশে একটা মুরব্বী কারো ছায়া থাকুক। বড়টা তো বাইরে, একা একা সব সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে। তিনি জানেন তাঁর ওখানে কিছুতেই ভালো লাগবে না, তবুও যেতে হয়, দায়বদ্ধতায়! হাসনাত সাহেব মিলাদ শেষে উপরে উঠে এলেন। নীচে সবার সাথে বসে থাকতে তাঁর একদম ভালো লাগছিল না। রুনাকে বলতেই রুনা লাইব্রেরীটা খুলে দিল।

ভাগ্যিস লাইব্রেরীতে কেউ আসে নি। মহসিন তাঁর খুব কাছের কাউকে ছাড়া লাইব্রেরীতে বসতে দিত না। ‘চলুন নীচে বসি’ বলে লাইব্রেরী থেকে বের করে দিত। লাইব্রেরীটায় ঢুকলেই যেন এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়, মহসিনের সান্নিধ্যে আসা গেল। সবাই বলে না, প্রত্যেক মানুষের একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে? হাসনাত সাহেন নিশ্চিত, লাইব্রেরীর গন্ধের সাথে মহসিনের এই নিজস্ব গন্ধ মিলে যাবে।

হাসনাত সাহেব তাকের বইগুলোতে হাত ছোঁয়ালেন। বইয়ের নেশা মহসিনের রক্তে ঢুকে গিয়েছিল। একটা ভালো বই পেলে নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে বইটা গোগ্রাসে গিলত। পুরাতন বইয়ের দোকানগুলো ছিল তার নখদপর্ণে। হাসনাত সাহেবের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর লোক ছিল মহসিন।

হাসনাত সাহেব যেমন হৈ-হল্লা পছন্দ করতেন, মহসিন পছন্দ করত নীরবতা। একটা ভালো বইয়ের সাথে নিজর্নে সে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিত। তারপরেও তাদের ছিল প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। মা-বাপ মরা ছেলে। চাচার ঘরে মানুষ।

টিউশনি করে নিজের খরচ চালাত। হাসনাত সাহেবের আম্মা মহসিনকে খুব স্নেহ করতেন। প্রায়ই মহসিনের জন্যে রান্না করতেন। গরমের দিনে মহসিন প্রায়ই তাদের বাসায় চলে আসত। ছাদে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে খোলা বাতাসে রাত পার করে দিতেন।


হাসনাত সাহেব ভাসির্টির যে দিনগুলো দেখতে পান, সবগুলোতেই মহসিন নামটা উচ্চারিত হচ্ছে, বারবার। তিনি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা পার করেছেন মহসিনকে পাশে রেখে। কত নাম, কত মানুষ, কত প্রিয় মুখ! বদরাগী আমজাদ স্যার, নাইস ম্যাডাম, হেলাল, শামসুর, সম্পা, শিউলি...... শিউলির নামটা মাথায় আসতেই তিনি একটা দীঘর্শ্বাস ফেললেন। তাঁর প্রথম প্রেম। শিউলিকে দেখে প্রথমে হাসনাত সাহেবের মনে কোনো অনুভূতিই তৈরী হয়নি।

কয়েক মাস শিউলি একই সাথে ক্লাস করেছে। হাসনাত সাহেব কখনও আলাদা করে দেখেননি তাকে। মহসিনের সাথে মাঝে মাঝে কথা বলতে দেখতেন তিনি। তাদের বন্ধুত্বই শিউলিকে হাসনাত সাহেবের কাছে আনে। বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, হাসনাত সাহেব নতুন করে শিউলিকে আবিষ্কার করেন।

এরকম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মেয়ে আগে কখনও দেখেননি তিনি। অচিরেই প্রেমে পড়ে গেলেন তার। মহসিনকে সব বলে দিতেন। মহসিন চুপ করে শুনে যেত। একসময় শিউলিকে প্রেমের প্রস্তাব দিলেন।

হাসনাতের মত ভাসির্টির জনপ্রিয় ছেলেকে ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো কারণও ছিল না। প্রায় তিন বছর চু্টিয়ে প্রেম করলেন। একসময় সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল। শিউলির বিয়ে হয়ে গেল কয়েক মাস পরেই। এইসব ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে মহসিন।

রুনাদের কাজের ছেলেটা চা দিয়ে গেল। চা খেতে খেতে হাসনাত সাহেব মহসিনের টেবিলটার পাশে বসলেন। বেশ কিছু খাতা, কাগজ দিয়ে টেবিলটা পূর্ণ হয়ে আছে। হাসনাত সাহেব জানতেন যে মহসিনের লেখালেখির একটু অভ্যাস আছে। কী লিখত মহসিন? হাসনাত সাহেব কখনও মহসিনের লেখা পড়েছেন কিনা মনে করতে পারলেন না।

খুব ইচ্ছা করছে সেগুলো দেখার। আলমারীতেই লেখাগুলো পাওয়া যাবে। রুনাকে বলতেই রুনা চাবিটা দিয়ে গেল। বলল আলমারীতেই আব্বার লেখাগুলো আছে। হাসনাত সাহেব আজকে রুনার সাথে কথা বলার সুযোগই পান নি।

অসম্ভব ব্যস্ত আজকে মেয়েটা । বাদলের বউটাকে হাসনাত সাহেব ভারী পছন্দ করেন। আলমারী খুলেই নীচের দিকে বেশ কিছু পুরোনো খাতা আর কাগজ খুজে পেলেন তিনি। সেগুলো বের করে আনতে একটা পুরোনো সুটকেসে চোখ পড়ল তার। ধূসর-রঙা সুটকেসটা তিনি বের করে আনলেন।

সুটকেসটা খুলতেই একটা বহু পুরোনো গন্ধ হাস্নাত সাহেবের নাকে আসল। সেখানে বেশ কিছু পুরোনো পত্র-পত্রিকা পাওয়া গেল।
সুটকেসের একদম শেষের দিকে একটা পেপার দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা বই পেলেন। ইতস্তত করে শেষে পেপারটা খুলেই ফেললেন। বহু পুরোনো জীবনানন্দের “বনলতা সেন” পাওয়া গেল।

কভারটা প্রায় ছিঁড়ে গেছে। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে। বইয়ের প্রথম পাতায় গোটা গোটা অক্ষরে খুব সুন্দর করে লেখাঃ
মহসিনকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। শিউলি ১২/১১/৬১
শিউলির দেওয়া বই! মহসিন এত যত্ন করে রেখেছে, কেন? হাসনাত সাহেব ভালোভাবেই জানেন মহসিনের এই লাইব্রেরীতে আরো অনেক পুরোনো বইয়ের সন্ধান মিলবে। তবে এই বই এত যত্ন করে রাখা কেন? হাসনাত সাহেব তারিখটা আবার দেখলেন।

নাহ্‌ , তখন শিউলির সাথে তার সম্পর্ক ছিল না। শিউলির সাথে তার প্রথম আলাপ ৬২’র একুশে ফেব্রুয়ারীতে। তাঁর স্পষ্ট মনে আছে। তাঁর আগে অবশ্য মহসিনের সাথে শিউলির ভালোই বন্ধুত্ব ছিল। তবে কি তাদের মধ্যে কিছু ছিল? এটা মনে হতেই কিছুক্ষণের জন্যে হলেও হাসনাত সাহেব নিজের উপর বিরক্ত হলেন।

নাহ্‌ ! তাদের দুজনের একজনও তাঁর কাছে যে কিছু লুকাবে না এ বিশ্বাস হাসনাত সাহেবের আছে। তবে কী মহসিন শিউলিকে পছন্দ করত? কখনও বলেনি? হাসনাত সাহেব কিছু ভেবে পেলেন না। বনলতা সেন তাঁর কাছে একটি রহস্য হয়ে রইল।
রাসিক রেজা নাহিয়েন

সোর্স: http://www.sachalayatan.com/     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।