আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

সেই পুরনো ভ্রান্ত পথে বিএনপি

আল্লাহ মহান, যাহা বলিব সত্য বলিব।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বিএনপির চেয়ারপারসনের বাসার সামনে থেকে বালুর ট্রাক সরিয়ে ফেলা ও বাড়তি র‌্যাব-পুলিশ প্রত্যাহার করার পরও প্রায় সপ্তাহখানেক খালেদা জিয়া জনসম্মুখে আসেননি। সে সময় তিনি বিবিসি বাংলাসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেসব সাক্ষাৎকারে তারা ক্ষোভ ও রাগের ঝাঁঝ ঠিক তেমনটাই ছিল, যেমনটা ছিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপের সময়। এমনকি 'মার্চ ফর ডেমোক্রেসি' কর্মসূচিতে যেতে না পেরে তিনি গণমাধ্যমের সামনে যেসব কথা বলেছেন, তার মধ্যেও ক্ষোভের উত্তাপ ও রাগের ঝাঁঝ টের পাওয়া গেছে বেশ ভালোই।

৫ জানুয়ারির পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে তার ক্ষোভ ও রাগের কারণ হয়তো এটা হতে পারে যে, গণতন্ত্র রক্ষা করতে না পেরে, জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পেরে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন। তবে দুর্মুখেরা বলেন, ভিন্ন কথা। তারা বলেন, এই মেয়াদেও কুর্সিতে চড়তে না পারার ক্ষোভেই তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। দুর্নীতিগ্রস্ত দুই পুত্রকে না জানি আর কত দিন-মাস-বছর বিদেশ বিভঁূইয়ে থাকতে হয় এই রাগে তিনি রাগান্বিত হয়েছেন। দুর্মুখেরা বলেন, মাথার ওপর স্বামী-পুত্র আর নিজের ছবি ঝুলিয়ে রেখে তিনি গণতন্ত্রের জন্য অভিযাত্রার কথা বললেও মানুষ পরিবারতন্ত্রের গন্ধ ঠিকই পেয়েছে।

গণতন্ত্রকামী সচেতন মানুষ গণতন্ত্রের মোড়কে পরিবারতন্ত্রের অভিযাত্রায় অংশ নেয়নি। গণতন্ত্র সচেতন মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবারতন্ত্র সম্পর্কে ভালোই সচেতন আছেন। দেশের ডানপন্থি দলগুলো যেমন মা-ছেলে, বাবা-মেয়ে, পিতা-পুত্রের মধ্যে গ-িবদ্ধ হয়ে পড়েছে তেমন অনেক বামপন্থি প্রগতিশীল দলও শালা-দুলাভাই, ভাই-বোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। তথাকথিত অনেক প্রগতিশীল দলের নেতাকর্মী-সমর্থক নিজের পরিবার-পরিজনের মধ্যেই ঘুরপাক খায়।

সংসদ নির্বাচনের পর দেশের প্রায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষই বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিল।

বিএনপি-জামায়াতের কর্মী-সমর্থকের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটিই কমন প্রশ্ন ছিল_ বিতর্কিত হোক আর প্রশ্নবিদ্ধই হোক, নির্বাচন তো প্রতিরোধ করা গেল না, এরপর কী হবে? সরাসরি বিএনপির চেয়ারপারসনের ভাষ্য জানা যায়নি বেশ কয়েকদিন। যা কিছু জানা যাচ্ছিল তার সবই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বদৌলতে। তিনি তার প্রধান মিত্র জামায়াত সম্পর্কে নতুন কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলেও নিউইয়র্ক টাইমস আভাস দিয়েছিল। বাসার সামনে থেকে বালুর ট্রাক সরে যাওয়ার পরও যখন সপ্তাহখানেক ঘর থেকে খালেদা জিয়া বের হননি তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি এক ধরনের হাইবারনেশনে আছেন হয়তো। এই সময়টাতে তিনি হয়তো তার নির্বাচনী-পূর্ববর্তী রাজনৈতিক কলাকৌশলের গুণাগুণ বা লাভালাভ বুঝে দেখতে চাচ্ছেন।

পাশাপাশি হয়তো আগামীর রাজনৈতিক কলাকৌশলও ঠিক করবেন। জামায়াতের সঙ্গ প্রশ্নে তার কথায় যে আভাস মিলেছে তাতে হয়তো রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি নবজন্ম পাবে। দলীয় কৌশলের ভুল-ত্রুটি শুধরে, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গণআকাঙ্ক্ষাকে স্থান দিয়ে বিএনপি হয়তো ফ্রেশ একটা ইমেজ প্রতিষ্ঠা করবে। তবে নির্বাচনের ১০ দিন পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা দেখে পরিবর্তনকামী মানুষ হোঁচট খেয়েছে। এরপরও হয়তো অনেক ক্ষীণ আশায় ছিলেন যে, সময়ে দলটির মনোভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

গত সোমবার তার নির্বাচন পরবর্তী প্রথম জনসভায় দেয়া ভাষণের পর সেই আশাও ছেড়ে দিয়েছেন তারা।

সোহরাওয়ার্দীতে তিনি বলেছেন, সাতক্ষীরা ও গাইবান্ধার যৌথ অভিযানে 'অচেনা মুখ' অংশ নিয়েছে। 'অচেনা মুখ' বলে যে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ইঙ্গিত করেছেন সেটা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন রাখে না। এর আগেও তিনি বলেছেন, যে হেফাজতের তা-ব থামাতে 'অচেনা মুখদের' ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ যে তিনিই প্রথম করেছেন তা নয়।

অবশ্য একে অভিযোগ না বলে অপপ্রচার বলাই শ্রেয়। কারণ অভিযোগের পক্ষে কোন না কোন প্রমাণ হাজির করা যায়। খালেদা জিয়া বলার অনেক আগে থেকেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায় এই প্রচারণা চলে আসছিল যে, বাংলাদেশে ভারতীয় বাহিনী অনুপ্রবেশ করেছে। এই অপপ্রচার মূলত সেই চক্রের ফেসবুক ও অনলাইন মাধ্যমে দেখা গেছে যে চক্র চাঁদে সাঈদীর চেহারা দেখার, সাকা চৌধুরীর রায় ফাঁস হওয়ার, কাদের মোল্লা আর কসাই কাদের এক ব্যক্তি নয় এমন অপপ্রচার চালিয়েছিল। খালেদা যৌথবাহিনীর অভিযান সম্পর্কে মিথ্যে বলেছেন_ এটা হতাশার বিষয় নয়।

উদ্ভবকাল থেকেই বিএনপি যে রাজনীতি করে আসছে তাতে খালেদার বক্তব্যে তারা একদমই বিস্মিত হবেন না যারা এই দলটির অপরাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল আছেন। জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় টিকে ছিলেন এই ভ্রান্তি ছড়িয়ে যে, তার দল ভিন্ন অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে গোটা বাংলাদেশই ভারত নিয়ে নেবে। কিন্তু জিয়া অধ্যায় শেষ হয়ে এরশাদ অধ্যায় ফুরাবার পরও যখন গোটা বাংলাদেশ দখল হলো না তখন কৌশল বদলানো হলো। এবার খালেদাকে দিয়ে বলানো হলো, পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে। গোটা বাংলাদেশই ভারত হয়ে যাবে_ এমন তত্ত্ব বিংশশতাব্দীর বাঙালিকে বিশ্বাস করানো তাদের জন্য কঠিন ছিল।

এখন তারা দখল তত্ত্ব থেকে সরে এসে ভারতীয় বাহিনীর অনুপ্রবেশ তত্ত্ব হাজির করেছে। হতাশার বিষয় হচ্ছে, এসব তত্ত্ব প্রচারের জন্য খালেদা জিয়া যেসব 'অপপ্রচার মাধ্যম'_ এর ওপর নির্ভর করছেন সেসব মাধ্যমে তাকে এক ভ্রান্তি থেকে আরেক ভ্রান্তিতে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি যদি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-উপাত্তের ওপর নির্ভর করতেন তখন আমরা আশা করতে পারতাম যে, বিএনপি একদিন হয়তো তার ভ্রান্তি কাটিয়ে উঠবে।

গত ২৯ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন আওয়ামী লীগ নেত্রীকে সিকিমের লেন্দুপ দর্জির পরিণতির কথা বললে দেশের মানুষ কৌতূহলী হয়ে উঠেছিল। লেন্দুপ দর্জি সম্পর্কে আগে জানতেন না এমন অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল, কে এই লোক? বিএনপি নেত্রী তার ইতিহাস কোথায় পড়েছেন? কেউ কেউ ফোড়ন কেটে বলেছেন, বিএনপি নেত্রী ইতিহাস পড়েননি, বিএনপি-জামায়াতের সুহৃদ কারও কাছ থেকে সেটা শুনেছেন হয়তো।

ইতিহাস পড়লে তিনি স্বাধীনচেতা বাঙালির রগটাও চিনতেন। এদেশের কোন একজন লেন্দুপ দর্জি হয়ে যাবে আর দেশের ১৬ কোটি মানুষ সিকিমবাসীর পরিণতি মেনে নেবে সেটা ইতিহাস সচেতন মানুষ বিশ্বাস করে না। খালেদা জিয়া কাউকে লেন্দুপ দর্জির পরিণতির কথা মনে করিয়ে দিতেই পারেন। তবে তিনি এটা না ভুললে ভালো করবেন যে, পরিণতি জগতের প্রতিটি মানুষের জন্যই অপেক্ষা করে। সেই পরিণতি শুভ হোক কি অশুভ।

প্রতিটি মুহূর্তই, প্রতিটি ঘটনাই একেকটি পরিণতি বয়ে আনে। লেন্দুপ দর্জির কর্মকা- তাকে যেমন একটি করুণ পরিণতি দান করেছে, মিথ্যেবাদী রাখালের কর্মকা-ও তেমন তার জন্য নির্মম পরিণতি ডেকে এনেছে। আশা করি, লেন্দুপ দর্জির বিরাট ইতিহাস জানা বিএনপি নেত্রী মিথ্যেবাদী রাখালের ছোট্ট নীতি গল্পটি জানেন।

বিএনপির চেয়ারপারসন সরকারকে স্বৈরাচারের বাপ বলেছেন। তিনি বলেছেন, সরকার গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে।

তিনি 'মৃত গণতন্ত্রকে' উদ্ধার করার ঘোষণাও দিয়েছেন। দেশের মানুষ জানে, শুধু সামরিক সরকারই স্বৈরাচার হয় না। একটি নির্বাচিত সরকারও স্বৈরাচার হয়ে উঠতে পারে। নব্বইয়ে সামরিক স্বৈরাচারের পতনের পর যতগুলো সরকারই নির্বাচিত হয়েছে ততগুলো সরকারই স্বেচ্ছাচারের বেশুমার নজির রেখেছে। একথা সত্য যে দিনে দিনে নির্বাচিত সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

আর একথাও সত্য যে আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও নির্বাচিত সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়বে না। একটি দল নিজেই যদি গণতান্ত্রিক না হয় তবে সে সরকারে গিয়েও গণতান্ত্রিক হতে পারে না। যে কারণে দেশে একজন স্বৈরাচার, আরেকজন স্বৈরাচারের বাপ হলে বাকি একজনের স্বৈরাচারের দাদা হওয়ারই কথা। আর এই সংকটের জন্য পালাক্রমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা দলগুলোই দায়ী।

প্রশ্ন হচ্ছে বিএনপি আন্দোলন করে কী উদ্ধার করবে? তাদের ভাষায় ইতিমধ্যে মরে যাওয়া গণতন্ত্র? মৃত গণতন্ত্র উদ্ধার করে তার দাফন-কাফন সম্পন্ন করবে? গণতন্ত্র কখনো মরে নাকি জনতার চেতনায় প্রোথিত থাকে সেটা এক তর্ক।

আরেকটি তর্ক হচ্ছে, নব্বইয়ের পর দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র কি আদৌ ছিল। বিএনপি তার মেয়াদে না নিজেরা গণতন্ত্র চর্চা করেছে, না অন্যকে গণতন্ত্র চর্চা করতে দিয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের সর্বশেষ মেয়াদে যে রাজনৈতিক হত্যা, হামলা হয়েছে সেটা শুধু জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রেই সম্ভব। আওয়ামী লীগ সরকার অগণতান্ত্রিক কায়দায় বিরোধীদলের ওপর দমনপীড়ন চালিয়েছে। প্রধান দুই দল মিলে গত ২৩ বছরে দেশে গণতন্ত্রকে তো স্পেসই দেয়নি।

গণতন্ত্রের মুলা ঝুলিয়ে পরিবারতান্ত্রিক বিএনপি জনতাকে তাদের আন্দোলনে ভেড়াতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। বিএনপি নেত্রীকে বুঝতে হবে, ক্ষমতার সুবিধা ভোগের প্রত্যাশী নেতাকর্মী আর গণতন্ত্রকামী জনতা এক নয়।
- See more at: Click This Link
 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।