আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

হুমায়ুননামা প্রসংগে শাওন

মানবিক দায় ও বোধহীন শিক্ষা মানুষকে প্রশিক্ষিত কুকুরে পরিণত করে....আইস্ট্যাইন। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দাফন-বিড়ম্বনায় কখনোই কোর্টে যাওয়ার কথা বলেননি বলে দাবি করেছেন এই লেখকের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, হুমায়ূন আহমেদের মেয়ে শীলা তার ক্লাসমেট ছিল না, সে ছিল তার দুই বছরের জুনিয়র। তবে অভিনয়ে তারা কলিগ ছিলেন বলে জানান। এ ছাড়া তিনি দাবি করেন, বেশ কয়েকটি বিষয় মিডিয়ায় ভুলভাবে এসেছে।

গত সোমবার চ্যানেল আইয়ের গ্রামীণফোন তৃতীয় মাত্রা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন শাওন। বিয়ের ঠিক পরের মুহূর্তে এবং বর্তমান সময়ে কেমন আছেন, জানতে চাইলে শাওন বলেন, এখন আমি ভালো নেই। ভালো থাকার চেষ্টা করে যা"িছ প্রতিনিয়ত। আর সে সময় একটা অব¯'ার মধ্য দিয়ে পার করেছিলাম। কারণ, চারদিকে তখন নানা ধরনের প্রশ্ন।

আবার যারা প্রশ্ন করছে, তারা নিজেরাই উত্তর বানিয়ে নি"েছ। তার পরও তখন আমি অনেক ভালো ছিলাম। কারণ, ভালো থাকার জন্য আমার সঙ্গে চমৎকার এবং খুব শক্ত মানসিকতার একজন মানুষ ছিলেন। সন্তানরা কেমন আছে, এমন প্রশ্নের জবাবে শাওন বলেন, যতটা ভালো থাকা সম্ভব, ততটা ভালো আছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর ছোটটার বয়স ২।

সে আসলে এখনও কিছুই বুঝতে পারে না, বুঝতে পারার কথাও না। সেলফোন হাতে নিয়ে সে এখনও বাবার সঙ্গে কথা বলে, ‘হ্যালো বাবা’Ñ তবে এ দুটো কথাই বলতে পারে, এর বেশি নয়। বাবার ছবি দেখে, ছবিতে আদর করে, চুমু খায়। আর বড় ছেলের বয়স সাড়ে ৫ বছর। ওর জগৎটা একটু ভিন্ন।

ও আসলে একটু ইন্টুভার্ট (অন্তর্মুখী)। ওর বাবার মতো। ও সবার সঙ্গে মনের কথা শেয়ার করে না, সবখানে প্রকাশও করে না। বিশেষ করে আমাকে আসলে সব কথা বলতে চায় না। ওর নানি-খালা, আমার বন্ধু এবং কাজের বুয়াদের কাছে কিছু বলে।

হয়তো ভাবে, আমি কষ্ট পাব। তাই সবকিছু বলে না আমাকে। হুমায়ূন আহমেদের অন্য সন্তানদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে শাওন বলেন, ভালো থাকার তো কথা নয়। ওদের বাবা নেই, নিশ্চয়ই খুব মনঃকষ্টে থাকারই কথা। হুমায়ূন আহমেদ নেই, আপনার বাকি জীবন পড়ে আছে।

এই সময়টায় আপনি কোন পরিচয়ে পরিচিত হবেনÑ ¯'পতি, সংগীতশিল্পী নাকি অভিনেত্রী, এমন প্রশ্নের জবাবে শাওন বলেন, আসলে একটি পরিচয়ে কি পরিচিত হতে হবে? হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী একজন ¯'পতি, একজন সংগীতশিল্পী ও একজন অভিনেত্রী। আমি জানি না, কতদিন পর গান গাইতে পারব বা আদৌ পারব কি না। অভিনয় করতে আদৌ আমার ই"ছা হবে কি না, তাও আমার জানা নেই। কিš' হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী এই পরিচয়টা আমার সব সময়ই থাকবে। এই পরিচয়টা খুব কাছের একটা পরিচয়, আমার খুব অহংকারের একটা পরিচয়।

আমি হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী, আমি হুমায়ূন আহমেদের পাশে যেভাবে ছিলাম, সেভাবেই থাকব বাকিটা জীবন। হুমায়ূন আহমেদের কখন ক্যান্সার ধরা পড়ল, এমন প্রশ্নের জবাবে শাওন বলেন, ২০১১ সালের রোজার ঈদের আগে তিনি অন্যান্য বারের মতো ব্যস্ত ছিলেন। এ সময়টাতে লেখকদের ঈদ সংখ্যায় লেখা দেওয়ার জন্য একটা ব্যস্ততা থাকে। এ ছাড়া ঈদের নাটকসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে তো ব্যস্ততা আছেই। একদিন আমার মায়ের চিকিৎসার জন্য যখন সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কথা উঠল, তখন হুমায়ূন আহমেদও বললেন যে তিনি যাবেন।

তারপর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদের পরদিন মায়ের সঙ্গে আমরা সিঙ্গাপুরে গেলাম। হুমায়ূন আহমেদের আগেও বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। ওনার হার্টে ৯টি ব্লক ছিল। সে জন্য প্রায় প্রতিবছরই হার্টের টুকটাক চেকআপ হয়। আমি ওনাকে বারবার বলতে থাকলাম, এসেছি যখন একটা চেকআপ করিয়ে যাই।

কোনো উপস্বর্গ বা শারীরিক কষ্ট ছাড়াই চেকআপ করানো হলো র"টিন চেকআপ হিসেবে। এ র"টিন চেকআপ করতে গিয়ে রক্তে একটি উপাদান অনেক বেশি ধরা পড়ল। ওই বাড়তি উপাদান পাওয়ার পরই আমরা চিকিৎসকদের চেহারায় একটা ভয় দেখতে পেলাম। কিš' হুমায়ূন আহমেদের চেহারায় কোনো ভয় ছিল না। আমরা আসলে ব্যাপারটার ভয়াবহতা তখনও বুঝে উঠতে পারিনি।

চিকিৎসক তাড়াতাড়ি সিটি স্ক্যান করাতে বললেন। সিটি স্ক্যান রিপোর্টে কোলনে টিউমার ধরা পড়ল। কিš' তখনও নিশ্চিত হওয়া যা"িছল না যে এটা ক্যান্সার কি না। ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য ওখান থেকে স্প্যাসিস আনতে হবে, এনে ওটাকে বায়োপসি করাতে হবে। এ পরীক্ষা করতে যাওয়ার সময়ও হুমায়ূন আহমেদ হাসতে হাসতে বলছিলেন যে কী এক টিউমার হয়েছে যে এর জন্য পরীক্ষা করতে হবে।

এটা একটা টাকা নেওয়ার ফন্দি। কিš' এ পরীক্ষা করানোর পর আমরা নিশ্চিত হলাম যে হুমায়ূন আহমেদের কোলন ক্যান্সার হয়েছে এবং যেটি কোলন ছাড়িয়ে ব্লাড স্ট্রিমে চলে গেছে এবং লিভারেও ছড়িয়ে গেছে। শেষ দিকে হুমায়ূন আহমেদের অস্ত্রোপচার নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। এ প্রশ্নগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল যে ওনার অস্ত্রোপচার করার মতো শারীরিক সামর্থ্য ছিল না, বিষয়টিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে শাওন বলেন, ক্যান্সার স্টেইজ-৪ এটা জানার পর ওনি (হুমায়ূন আহমেদ) প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলেন এবং ট্রিটমেন্ট করাবেন না বলে জানান। ওনার যুক্তি ছিল, ট্রিটমেন্ট করে কী লাভ, ক্যান্সার যখন স্টেইজ-৪-এ আছে, যখন আমরা ট্রিটমেন্টের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গেলাম, তখন চিকিৎসক বলেছিলেন যে সার্জারি করার মতো শারীরিক যোগ্যতা ওনার নেই।

কিš' বাংলাদেশে বিষয়টি ভুলভাবে প্রচার পেয়েছে যে সার্জারি ছাড়াই ভালো হয়ে যাবেন হুমায়ূন আহমেদ। শাওন বলেন, প্রথম ৪টা কেমোথেরাপির পর আমরা আশা পেলাম যে ওষুধটা খুব ভালো কাজ করছে, টিউমারগুলো আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যা"েছ। খুবই আনন্দ নিয়ে আমরা পঞ্চম কেমোথেরাপিটা শুর" করলাম। ওখানে (যুক্তরাষ্ট্রে) ট্রিটমেন্টের খরচ জোগাড় করতে আমাদের খুব কষ্ট হ"িছল। ৫টা কেমোথেরাপির পর আমরা একটু অন্য চিন্তা করতে শুর" করলাম।

কারণ, একেকটা কেমোথেরাপির খরচ ১৭ হাজার ডলার। যেখানে কেমোথেরাপি পুশ করার জন্য ৩০০ ডলার এবং এটা ডিসকানেক্ট করার জন্য নেওয়া হতো ৩৮৪ ডলার। এসব বিষয় দেখার পর নিউ ইয়র্কের সিটি হসপিটালগুলোতে আমরা খোঁজ নিতে লাগলাম। কারণ, সিটি হসপিটালগুলোতে সাধারণত খরচ কম হয়। খোঁজ নিলাম চিকিৎসার মান নিয়েও।

যদিও একই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানেই অন্য সিটি হসপিটালে চিকিৎসা হবে, তবুও। নানা জায়গায় খোঁজখবর নেওয়ার পর বেলভিউ হসপিটাল সবদিক থেকে সুবিধাজনক এবং ভালো বলে এটাই পছন্দ করা হলো। অপারেশনের ব্যাপারে শাওন বলেন, চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করা হলো, যদি কখনও সার্জারির অপশন না আসে, তবে বিকল্প কী। তিনি তখন আমাদের জানালেন, ১২টা কেমোথেরাপির পর একটা ওষুধ আছে, যেটা খেলে সর্বো"চ ৬ মাস বেঁচে থাকা যাবে। কিš' আমরা এটা চাইছিলাম না।

আমরা একটা মীরাকেল-এর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সেই মীরাকেলটা সার্জারি বা সার্জারির মতো শারীরিক সক্ষম হওয়া, অথবা যেকোনো একটা মীরাকেল। একসময় তিনি বলতে লাগলেন, চলো এসব কিছু বাদ দিয়ে আমরা নুহাশ পল্লীতে চলে যাই। নুহাশ পল্লীতে গিয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করি। আমি তখন বা"চাদের ওনার সামনে এনে বললাম, এখন তুমি বলো, তুমি কি আসলে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে চাও, নাকি নিনিত, নিষাদের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকতে চাও।

হুমায়ূন আহমেদের ক্যান্সারের ভয়াবহতা সম্পর্কে বোঝাতে শাওন বলেন, আপনারা ইন্টারনেটে ঢুকলেই দেখতে পাবেন, স্টেইজ-৪ ক্যান্সারে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র ৭ শতাংশ। তবুও আমাদের আশা ছিল যে এই ৭ শতাংশের মধ্যেই পড়বেন হুমায়ূন আহমেদ। উপ¯'াপক বলেন, আমরা সবাই জানি, বর্তমানে আপনি কারও কারও কাছে খানিকটা নিন্দিত ও বিতর্কিত। হুমায়ূন আহমেদের লাশ যখন দেশে নিয়ে আসা হলো, তখন আপনার বির"দ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে আপনি তার দাফন নিয়ে অনেক বেশি বাড়াবাড়ি করেছেন। আপনার কাছে কী মনে হয়? জবাবে শাওন বলেন, হুমায়ূন আহমেদের কবর হওয়া প্রসঙ্গে, দাফন প্রসঙ্গে তখন অনেক আলোচনা হয়েছে।

এ আলোচনাটা কিছুটা কমে গেলেও এখনও কিছুটা আছে মানুষের মধ্যে। হুমায়ূন আহমেদ এমন একজন মানুষ ছিলেন, উনি ওনার মৃত্যু নিয়ে সব সময় রসিকতা করতেন এবং অসু¯' হওয়ার পরও করেছেন, অসু¯' হওয়ার আগে তো অনেক বেশি করেছেন এবং কবর নিয়ে উনি অনেক সময় অনেক কথা বলেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে গত ৮ বছরে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ বার ওনার মুখ থেকে কবর নিয়ে গল্প শুনেছি। ২০-২৫ বারের প্রতিবারই ছিল নুহাশ পল্লীকে ঘিরে। হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘আমি’ বইয়ের ১৮৪ পৃষ্ঠায় কবর নিয়ে লিখেছেন।

যেখানে লেখা, ‘কল্পনায় দেখছি, নুহাশ পল্লীর সবুজ ঘাসের মধ্যে ধবধবে শ্বেত পাথরের কবর। তার গায়ে লেখা, ‘চরণধূলি দিয়োগো আমারে, নিয়ো না নিয়ো না সরিয়ে। ’ নিজের কবর শ্বেত পাথর দিয়ে যে হবে, কবরের ম্যাটেরিয়ালটাও উনি লিখে গেছেন এবং নিজের কবরের এপিটাফে কী লেখা থাকবে, সেটাও উনি লিখে গেছেন। হুমায়ূন আহমেদ বেশ কয়েক বছর আগে তার বন্ধু আবু করিমকে বলেছিলেন, আমার জন্য একটা কবরের ডিজাইন করে দিওতো, ওটা ড্রয়িং র"মে বাঁধিয়ে রাখব। পরে দেখব আর ভাববো যে আমারও তো একদিন মরতে হবে।

এ ছাড়া উনি যতবারই নুহাশ পল্লীতে গিয়েছিলেন, ততবারই আমাদের লিচুগাছতলায় ওনার কবর হবে বলে বলেছেন। সর্বশেষ অপারেশনের আগের রাতে খুব স্বভাবতই ওনার মধ্যে অনেক ইমোশনাল কথা এসেছে। সেই সময় ওনার ছোটবেলার বন্ধু ফানসু মণ্ডল এবং আমি সামনে ছিলাম। এ রকমই এক মুহূর্তে উনি ওনার নিজের কবরের কথা বলেছেন। উনি তখন বলেছিলেন, কোনো কারণে যদি আমি মারা যাই, আমাকে নিয়ে অনেক টানাটানি হবে।

আমাকে টানাটানি করতে দিওনা, নুহাশ পল্লীতে নিয়ে শুয়াই রাইখো। আমি কখনোই ভাবিনি যে ওনার মৃত্যু হবে। আমি কখনোই ভাবিনি এ কথাটি রেকর্ড করে রাখতে হবে, মানুষকে বিশ্বাস করাতে হলে। একজন স্ত্রী কখনোই তার স্বামীর কথা রেকর্ড করে রাখে না। আমাকে উনি যে কথাটি বলে গিয়েছেন, আমার দায়িত্ব সে কথাটি রাখা।

উনি নুহাশ পল্লীকে কতটুকু ভালোবাসতেন, সেটা আমি যেমন জানি, আমি নিশ্চিত সেটা ওনার পরিবারের সবাই জানে, আমি নিশ্চিত ওনার সব সন্তান জানে। আমার চেয়েও একটু হলেও ওনার মা বেশি জানেন। উনি যখন মাঝখানে দেশে এসেছিলেন, তখন সরাসরি নুহাশ পল্লীতে গিয়েছিলেন, অন্য কোথাও যাননি। আমি একটা কথা খুব জোর দিয়ে বলব, আমাকে হুমায়ূন আহমেদ যা বলেছেন, তা আমি রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করেছি। ওনার শেষ কথাটা আমি যদি রাখতে না পারতাম, তবে আমি সারাজীবন ওনার কাছে ছোট হয়ে থাকতাম।

আমি এটাই বলার চেষ্টা করেছি তখন সবার কাছে। হুমায়ূন আহমেদের মা, অন্য সন্তানসহ তার সব পাঠক চেয়েছেন তাকে যেন ঢাকায় কবর দেওয়া হয়, তবুও আপনি নুহাশ পল্লীতে কবর দেওয়া না হলে কোর্টে যাওয়ার কথা বলেছেন বলে শোনা গেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে শাওন বলেন, আমি কখনও কোর্টের কথা বলিনি। আমি মনের ভুলেও এটি বলিনি এবং ইমোশনাল হয়েও আমি এ কথাটি একবারও উ"চারণ করিনি। কারণ, হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে কোর্টে যাওয়ার ই"ছা আমার কখনোই ছিল না, এ কথাটি আমি কখনোই বলিনি। মিডিয়ায় তো আসলে অনেক ধরনের রিপোর্টিং হয়, আমি জানি না কোন কারণে এ রিপোর্টিংটা হয়েছে।

এটা মিডিয়ার একটি ভুল রিপোর্টিং। হিমঘরে রাখার কথাও আমি বলিনি। আমি সবার কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করেছি। যে অনুরোধ করে, সে কোর্টে যাওয়ার হুমকি দেয় না। আমি আমার শাশুড়িকে পায়ে ধরে অনুরোধ জানিয়েছি।

আজ যারা হইচই করছে, তারা এত দিন কোথায় ছিল। এ কথাটি তো আপনি বলেছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে শাওন বলেন, হ্যাঁ, আমি কথাটি বলেছি। ব্যাপারটি ক্লিয়ার করা দরকার। আমি ১০ মাস কী স্ট্রেসের মধ্য দিয়ে গেছি, সেটা আমি কাউকে বলব না। কারণ, সেটা হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী হিসেবে আমার দায়িত্ব।

আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। এ দায়িত্ব পালনের জন্য আমি কারও কাছে বাহবা অথবা ধন্যবাদ চাই না, আশাও করি না। লেখক হুমায়ূন আহমেদকে যত-না সু¯' করার চেষ্টা করেছি, তার চেয়ে বেশি চেষ্টা করেছি আমার স্বামীকে সু¯' করতে, আমার সন্তানদের পিতাকে সু¯' করতে। ১৯ জুলাই দুপুরে উনি যখন মারা গেলেন, তখন আমার বাঁ হাতটা ওনার মাথার নিচে ছিল। ওনার ডান হাতটা আমার ধরা ছিল।

এই দৃশ্যটা যারা সেখানে চোখে দেখেছেন, শুধু তারাই জানেন। সেই মুহূর্তটা যে কী ভয়ংকর ছিল। পরে আবার টিকিট পাওয়া যা"িছল না। আমরা গিয়েছিলাম জেট এয়ারওয়েজে। জেট এয়ারওয়েজে ওনাকে কফিনে করে আনতে হবে, সে রকম সুবিধা পাওয়া যা"িছল না।

সরকারের পক্ষ থেকেও টিকিটের জন্য চেষ্টা করা হ"িছল। যে ধরনের টিকিট পাওয়া যা"িছল, সে ধরনের টিকিটে আমাদের আগে আসতে হ"িছল আর হুমায়ূন আহমেদকে আনা যা"িছল পরে। অভিযোগ রয়েছে, অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহার"ল ইসলাম নাকি বিজনেস ক্লাস ছাড়া টিকিট নিতে চাইছিলেন না, এমন প্রশ্নের জবাবে শাওন বলেন, এটাও একটা ভুল ধারণা। কারণ, টিকিট দেওয়া হবে সেটা আমরা শুনেছি। কোন ক্লাসের টিকিট দেওয়া হবে, সেটা জানার বা শোনার মতো মানসিক অব¯'া আমাদের ছিল না এবং থাকার কথাও নয়।

কিš' এ কারণেই নাকি দেরি হয়েছিল, এমন প্রশ্নে শাওন বলেন, টার্কিস এয়ারলাইনে আমাদের একদিন আগের টিকিট পাওয়া গিয়েছিল আর হুমায়ূন আহমেদের পাওয়া গিয়েছিল একদিন পর। কিš' আমি বলেছিলাম, আমি হুমায়ূন আহমেদকে একা ফেলে যেতে পারব না। তাই আমাদের দেরি হয়েছিল। আপনি মাজহার"ল ইসলামকে এ ধরনের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন, এ প্রশ্নে শাওন বলেন, হ্যাঁ, আমি ওনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। এ ছাড়া আমি উনাকে ভালো করেই চিনি, উনি এ ধরনের কথা বলতে পারেন না।

ফের দাফনের প্রসঙ্গ টেনে শাওন বলেন, আমি শারীরিকভাবে অসু¯' নই। তবুও দুই দিন বিমানে জার্নি করে এবং মানসিক কারণে আমি অনেক অসু¯' হয়ে যাই। তবুও শহীদ মিনারে আমাকে অনেকের পা ধরতে হয়েছে। আমি নিজেও বুঝিনি যে সারাদিন আমার পেটে কিছু পড়েনি। আমি শুনেছি একজন সন্তানের ইন্টারভিউ, বাবা বলতেন, আমার কবর যেন নুহাশ পল্লীতে না হয়, সেই মুহূর্তে আমি বলেছি, এই কথা বলার সুযোগ ওদের বাবা তো পাননি।

আর তারা এত দিন কোথায় ছিল? হুমায়ূন আহমেদের কষ্টটা কিছুটা দেখেছি, কিছুটা নয়, পুরোটাই দেখেছি। এ কষ্টের পেছনে কারণ ছিল, বা"চারা বাবার ওপর অভিমান করবেই। অনেক কারণ ছিল অভিমানের। অভিমান বা"চাদের ছিল, বাবারও তো কষ্ট ছিল। বাবার কষ্ট আমি দেখেছি।

হয়তো বা সেই পয়েন্ট অব ভিউ থেকেই বলেছি যে এতদিন কোথায় ছিল। এক প্রশ্নের জবাবে শাওন জানান, হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে তার পরিচয় ১৯৯১ সালে। আর হুমায়ূন আহমেদের মেয়ে শীলার সঙ্গে পরিচয় ১৯৯৬ সালে। শাওন বলেন, আমি ভিকার"ননিসাতে পড়েছি, শীলা পড়েছে হলিক্রসে। আমি এসএসসি পাস করেছি ১৯৯৬ সালে, শীলা ১৯৯৮ সালে।

সে আমার দুই বছরের জুনিয়র। ও আর আমি একসঙ্গে অভিনয় করেছি অনেকগুলো নাটকে। একসঙ্গে অভিনয় করলে অ্যাক্টিং কলিগ হিসেবে সখ্য গড়ে ওঠা খুব স্বাভাবিক। সেই অর্থে ওর সঙ্গে আমার সখ্য ছিল। বয়সের ব্যবধানের দিক থেকে চিন্তা করলেও হুমায়ূন আহমেদ শাওনের চেয়ে অনেক বড়।

তবুও এ ধরনের সম্পর্ক আগে ছিল, এখন আছে হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে। কিš' বাংলাদেশের মতো একটি সমাজে এ ধরনের সম্পর্ক গড়তে মানুষ এটি কীভাবে নেবে, এমন বিবেচনাবোধ কি আপনার মধ্যে কাজ করেনি, এমন প্রশ্নে শাওন বলেন, এ বিষয়টি অভিপ্রেত না অনভিপ্রেত, তা চিন্তা করা হয়নি। আমি লেখক বা নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের পেছনের হুমায়ূন আহমেদ এবং একজন অভিমানী হুমায়ূন আহমেদকে দেখেছি বিয়ের আগে। আমি একজন দুঃখী এবং খুব রাগি হুমায়ূন আহমেদকে দেখেছি। হুমায়ূন আহমেদকে দেখে এবং ওনার কথা শুনে এইটুকু বুঝেছি যে ওনার পাশে দাঁড়ানোর জন্য একজন মানুষ খুব দরকার।

হুমায়ূন আহমেদ একা হওয়ার পেছনে শাওনের কোনো দায় নেই বলেও দাবি করেন তিনি। গুলতেকিন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে শাওন বলেন, একটি বা"চা ছোটকালে ভাবে যে এই গাড়িটি না হলে আমার জীবন বিফল হয়ে যাবে। কিছুদিন পর আবার ভাবে অন্যকিছু। একটা সময় আসলে মনে হয়, ওই মেয়েটিকে বা ছেলেটিকে না পেলে আমি মরেই যাব। এ কথাটি বলার কারণ হলো, আমি হুমায়ূন আহমেদের একটি পর্যায় দেখেছি।

আমি তো আর সব পর্যায় দেখিনি। এ ছাড়া হুমায়ূন আহমেদ মাঝেমধ্যে বলতেন, ‘অ্যা ম্যান হেভ মেনি ফেইসেস। ’ তিনি বলতেন, তিনিও মুখোশ পরে আছেন। তার আসল চেহারা খুব কম মানুষই দেখেছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে শাওন বলেন, জানি না কী যেন এক না-পাওয়ার বেদনা কাজ করত হুমায়ূন আহমেদের ভেতরে।

পরে জানার চেষ্টা করেও তা জানতে পারিনি। শাওন বলেন, হয়তো গণমাধ্যমে বলা উচিত নয়, উনি আগেও অনেকবার গৃহত্যাগী হয়েছেন। আমি নিজেও ওনাকে অনেকবার গৃহত্যাগী হতে দেখেছি। সেটার পেছনের কারণ আমি ছিলাম না। তিনি বলেন, হুমায়ূন আহমেদ রাজকীয় ছিলেন সব সময়।

তার পকেটে টাকা হলে কখন তা বেড়ানোর মাধ্যমে বা অন্যভাবে খরচ করবেন, সে চিন্তাই করতেন। এইখানে  ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।