ভাতের মজা কিছুতেই পাই না। আমার বড় ভাইয়ের বিয়ে। বছর খানেক কনে খোঁজাখুজির পর পছন্দসই মেয়ে পাওয়া গেল। প্রথম দেখাতেই মেয়েকে ভাইয়ের পছন্দ হয়ে যায়। আম্মারও খারাপ লাগেনি।
ভাইয়া দিল প্লাস। আম্মাও দিলেন প্লাস। আর প্লাসে প্লাসে প্লাস হয় সেটা কে না জানে সেই সাথে আমাদের ইয়েস কার্ড তো ছিলই। অনতিবিলম্বে চিনি পানের কাজটা সেরে ফেলা হল। এবং বিয়ের দিনক্ষনও ঠিক হয়ে গেল।
দেখতে দেখতে বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসল। {যারা বিয়ে শাদির আয়োজন করেন তারা আসলে বুঝেন যে দিন দেখতে দেখতে ঘনিয়ে আসে নাকি কাজ করতে করতে ঘনিয়ে আসে!! যাই হোক, শুভকাজে একটু আধটু কাজ টাজ কিছু করতেই হয়, সেটা কিছু না} কনের বাড়িতে বিয়ের দিনের আয়োজন আর আমাদের ভাগে বউভাতের আয়োজন!
আব্বা এলাকার বিশিষ্ট্য পরিচিত ব্যক্তি। অনেক লোকের সাথে পরিচয়, উঠাবসা। উনার বড় ছেলের বিয়ে। তাই মোটামুটি সবাইকেই ত দাওয়াত দিতে হবে, তাই না? দেয়া ও হল দাওয়াত, পাইকারী হারে।
হেহেহেহে... তখন আবার নির্বাচনের মৌসুম চলছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের এলাকা থেকে যিনি প্রার্থী হয়েছিলেন উনার সাথে আব্বার অনেক ঘনিষ্টতা ছিল। প্রতি রাতেই নির্বাচনের কাজে উনার সাথে বের হতেন। সঙ্গে আরো অনেক জন সমাগম থাকত। তো উনাকে আমার বড় ভাইয়ের বিয়েতে বিশেষভাবে দাওয়াত দেয়া হল।
যেহেতু উনার আগে পিছে, আশে পাশে অনেক লোকের আনাগোনা থাকে তাই ধরে নেয়া হল যে উনি যদি বিয়েতে আসেন তাহলে বাড়তি একশত লোক ত উনার সাথে আসবেই! তাই বিয়ের অনুষ্ঠানের খাবার দাবারের আয়োজনও সেই অনুপাতেই করা হল। বিশাল না হলেও আমাদের আয়োজন চলনসই।
আমাদের আত্মীয়স্বজন সবাই আসলেন, পাড়া প্রতিবেশীও কেউ বাদ পড়েন নি। গ্রামের বাড়ীর আত্মীয়রা আসলেন, নানাবাড়ীর আত্মীয়রাও আসলেন। খুব ধুমধাম হল।
বাচ্চাকাচ্চারা অনেক আনন্দ ফুর্তি করল। কোর্মা, পোলাও, রোস্ট, গরুর গোশত, খাসির মাংস, সব্জি, মাছের তরকারী, টক দই, মিস্টি দই, বোরহানি আরও কত কিছুর আয়োজন! নামকরা বাবুর্চি দিয়ে রান্না করানো হল। বাবুর্চি গেরান্টি দিয়েছিল যে খাবার খেয়ে সবাই হাতের কনুই পর্যন্ত চাটা শুরু করবে!!!! হেহেহেহে...... আমি রিসেপশনে ছিলাম তাই সরেজমিনে তদন্ত করতে পারিনি!!!
মাননীয় সংসদ সদস্যপদপ্রার্থী আসলেন পড়ন্ত বিকেলে। উনার উপহারটা দুইজন কাঁধে করে নিয়ে আসল। মহা চমক।
আমরা ভাবলাম যেমন বড় উপহার তেমনি হয়ত জনতার বহর! কিন্তু না, মাত্র একটাই গাড়ি। সর্বসাকুল্যে পাচঁজন মেহমান। এ কি তাজ্জব ব্যপার! আমাদের এত আয়োজন তাইলে মিছে! মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম। এক ডেগ পোলাও ভাত, এক ডেগ সবজি, আধা ডেগ গরুর গোশত!!! রোস্টের কথা না হয় বাদ ই দিলাম। এত গুলো খাবারের এখন কি করি???
সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসল।
বর কনে বিদেয় নিল। অধিকাংশ মেহমান যার যার বাড়ী চলে গেলেন। আমাদেরও ঘরে ফেরার পালা। কমিউনিটি সেন্টারে বউভাতের আয়োজন করা হয়েছিল। ভ্যানরিক্সা করে মালামাল, উপহার সামগ্রী আর খাবারগুলো আমাদের বাসায় নিয়ে আসলাম।
যেই মাত্র ভ্যানগাড়ি থেকে মালামাল গুলো নামিয়ে শেষ করলাম এমনি অঝোর ধারায় বৃষ্ঠি পড়া শুরু হয়ে গেল। পড়লাম আরেক জ্বালায়! এতগুলো খাবার এখন কি করি। বৃষ্ঠি থামতে থামতে রাত নয়টা বেজে গেল। বাসার ফ্রিজে আর কতগুলো খাবার ই বা রাখা যায়! কিছু খাবার ভ্যানে করে আমাদের গ্রামের বাড়ীতে পাঠিয়ে দেয়া হল আত্মীয়সজনদের জন্য। তারপরও অনেক খাবার বেঁচে গেল।
আম্মা বললেন, পুকুরে ফেলে দাও। মাছেরা খাবে। আব্বা বলেন না না মানুষেই এ গুলো খেতে পায়না আর তুমি বলছ পুকুরে ফেলে মাছকে খাওয়াতে!!! তো এতগুলো খাবারের এখন কি করা যায়???
এই সমস্যার সমাধান দিতে এক মামা(আম্মার চাচাত ভাই) এগিয়ে আসলেন। উনি বললেন আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। আমি ভাবলাম বৃষ্ঠি থামল তাই বুঝি একটু বিড়ি ফুকতে গেছেন
সময় গড়িয়ে চলল...
...
...
...
অ-নে-ক ক্ষন পর কোত্থেকে যেন একটা ছোট ছেলেকে ধরে আনলেন।
এনে বললেন ওকে কিছু পোলাও ভাত, সবজি আর গরুর গোশত দিয়ে দাও। আমি বললাম কিসে করে নিবি? কোমর থেকে গামছা খুলে মেঝেতে বিছিয়ে দিয়ে বলল এখানে দিয়ে দাও। আমি শক্ত করে একটা ধমক দিলাম। আর আমাদের কাজের ছেলেটাকে বললাম ওকে একটা পলিথিনের ব্যাগ দিতে। ব্যাগ ভরে ওকে গোশত পোলাও আর সবজি দিলাম।
অনেক ভাল লাগল। ব্যাগ ভর্তি খাবার নিয়ে ছেলেটা চলে গেল। কিছুক্ষন পর আমাদের বাসায় একটা ছোটখাট জটলা লেগে গেল। দলে দলে হার জিরজিরে নারী পুরুষ বাচ্চাগুলো আসতে লাগল। আমিও মনের আনন্দে দিতে লাগলাম।
এক বৃদ্ধা মহিলা দুইবার আসল। একবার মুখে নেকাব দিয়ে আরেকবার নেকাব ছাড়া। আমি টের পেলাম সত্যি কিন্তু বলার কিছু ছিল না। পেছনের মেয়েটি ঠিকই গলা ফাটিয়ে বলে উঠল স্যার এই বেটি দুইবার খাওয়ন নিতাছে!!! বৃদ্ধাটি কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে উঠল বাবাগো আমার বউমার বাচ্চা হবে তাই আসতে পারেনি। কতদিন ভালমন্দ কিছু খায়নি।
বলতে বলতেই মহিলার গাল বেয়ে টপটপ করে পানি বেয়ে পড়তে লাগল। আমি বউমার হয়ে নিতে আসছি। আমি ত হতভম্ব। তিনবেলা পেট পুরে শুধু খেয়েই গেছি। এই রকম দৃশ্য জীবনেও দেখিনি।
চিন্তাও করিনি। মহিলাটির চোখের পানি দেখে আমার চোখেও পানি এসে গেল। :'(
আরেক বৃদ্ধা এত সুন্দর পোলাও ভাত দেখে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল আল্লাহ আল্লাহ এত সুন্দর ভাত কত দিন খাইনা। কত সুন্দর ভাত আহারে!!! কত সুন্দর ভাত!!!
আহারে ভাত!!! আমার দীর্ঘশ্বাস!!!
আধা ঘন্টায় সব খাবারগুলো শেষ হয়ে গেল। ভীড় বেড়ে গেল আরো বেশি।
শেষ পর্যন্ত ফ্রিজে রাখা খাবারগুলোও দেয়া হল। ভীড় কমার নাম ই নেই। শেষে আর কি করা বাধ্য হয়ে গেট তালা দেয়া হল। কিছু মানুষের ক্ষুধা ত মিটল কিন্তু আরো কতজনের ক্ষুধা যে আমরা বাড়িয়ে দিলাম!!! খুব খারাপ লাগছিল সে কথা ভেবে।
যতটুক পারলাম ততটুকুই দিলাম।
সেদিন খুব গভীর ভাবে একটা কথা উপলব্ধি করলাম যে আসলে অপচয়ে সুখ নেই, বিতরণেই প্রকৃত সুখ ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।