আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

“পাহাড়তলীর মরণচূড়ায় ঝাঁপ দিলো যে অগ্নি”

"হরি আছেন পূর্বে, আল্লা আছেন পশ্চিমে, তুমি তোমার হৃদয় খুঁজে দেখ- করিম ও রাম উভয়েই আছেন হৃদয়ে; এ জগতের সমস্ত মানব-মানবীই তাঁর অংশ। " (সন্ত কবীরের গান; তর্জমা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) “ইতিহাস নিয়ে আমরা সাপলুডু খেলি। " (শাহাদুজ্জামান) ২০১১ সালে একটা শিক্ষিত, স্বচ্ছল পরিবারের, একুশ বছরের ''স্মার্ট'' মেয়ে পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনের আটপৌরে কাজকর্মের পর অবশিষ্ট সময়টুকু কিভাবে কাটায়? ১ মেকআপ, মেনিকিওর, পেডিকিওর নিয়ে অতি মাত্রায় ব্যাস্ত থেকে। ২ কেএফসি বা কসমো লাউঞ্জে বয়ফ্রেণ্ডের সাথে ডেট করে (বা আরেকটু “স্মার্ট’’ হলে কোনো অতিআধুনিক সাইবার কাফে-তে বয়ফ্রেন্ডের সাথে মেক আউট---শব্দটার অর্থ আমি জানি না---করে) ৩ জনপ্রিয় রক মিউজিকের কনসার্টে গিয়ে ‘লাইফকে এনজয়’ করে। উপর্যুক্ত সবগুলো উত্তরই গ্রহনযোগ্য।

একটু এদিক ওদিক করে ও কিছু শব্দ পরিবর্তন করে আমাদের---অর্থাৎ ছেলেদের ক্ষেত্রেও---উত্তরগুলো চালিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু একজন ছিলেন একটু অন্যরকম, যিনি ঠিক ‘’স্মার্টনেস’’ চাননি, আর যা চেয়েছিলেন তা আমাদের সময়ের অনেক ‘কুল ডিঊড’-এরই সম্ভবত পছন্দ হবে না; তিনি তাঁর স্বদেশের স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ রাজের হাত থেকে এবং পরোক্ষভাবে সাম্রাজ্যবাদ-মৌলবাদ থেকে। কথাটা একটু এক্সপ্লেইন করা দরকার। ‘স্বাধীনতা চেয়েছিলেন’ খুবই কাপঝাঁপ একটা কথা; কারণ স্বাধীনতা তো ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের এম কে গান্ধীও চেয়েছিলেন---শাদা শাহেবদের হাত থেকে কালো/বাদামি শাহেবদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেবার জন্য---(এখন এই ব্র্যান্ডের ‘স্বাধীনতা’-টি ভারতের দলিত ‘বধ’ ও মাওবাদি ‘নির্মূল’-এ বেশ সাফল্যের সাথে ব্যবহৃত হচ্ছে), আবার স্বাধীনতার কথা তো মুসলিম লীগের নেতা’রাও বলতেন---"কান মে বিড়ি মু মে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান" এর 'পবিত্র' শ্লোগান বাতাসে বাতাসে বেশ শোনা যেত একসময়, দিত ভারতবর্ষের দশ কোটি মুসলমানের স্বার্থের অন্তত-কিছু-সময়ের-জন্য-অতিজনপ্রিয় স্বত্বাধিকারীদের অনুসারীরা---(প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মাথায় নাচোলের রাণীমা এবং তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ইলা মিত্রের উপর বর্ণনা-অযোগ্য নির্যাতন চালিয়ে ‘পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ইসলামিক রাষ্ট্র’ পাকিস্তানের এই পুরোহিতরা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন তাঁদের ব্র্যান্ডের ‘স্বাধীনতা’ কতটা নৃশংস নির্লজ্জ আর নিরর্থক); তাহলে কোন ধরণের স্বাধীনতা চাইতেন মানুষটি? প্রশ্ন উঠতে পারে। উত্তরটা হচ্ছে তিনি স্বাধীনতা চাইতেন সবার জন্য, হ্যাঁ সবার জন্য, কোনো বিশেষ শ্রেণী বা বর্ণ বা লিঙ্গ এর মানুষের স্বাধীনতা নয়; নিও লিবারেল ইকোনমিক্স-এর ‘চুঁইয়ে পড়া’ নীতির ওপর যা নির্ভর করে না, যা নরেন্দ্র মোদির মত জানোয়ারকে তলোয়ার উঁচিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের পুরুষদের আগুনে পোড়ানো ও সেই সম্প্রদায়ের অন্তস্বত্তা নারীদের ধর্ষণ করার (‘’Impregnent them with Hindu children”) জন্য ‘আহবান’ জানানোর ‘ব্যাক্তিস্বাধীনতা’ ও ‘গনতন্ত্র-চর্চা’-য় বিশ্বাসী নয়, বিশ্বাসী নয় বোমা হামলা চালিয়ে মসজিদে নামাজ পড়ার সময় শিয়া’দের সুন্নী ও সুন্নী’দের শিয়া খতমের ‘ধর্মীয় অধিকারে’, বিশ্বাসী নয় হাজার মাইল দূরের একটি মসজিদ কিছু হিংস্র মানুষ ভেঙ্গে ফেললে তার 'প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য' বাংলাদেশের নিরীহ সাধারণ হিন্দুদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার পরিচালনায়, যেই স্বাধীনতা শুধুমাত্র মত প্রকাশ করার কারণে একজন তসলিমা নাসরিন-কে তাঁর স্বদেশ থেকে নির্বাসিত করে না; হ্যাঁ, এমন স্বাধীনতাই চাইতেন তিনি।

রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের---যারা বস্তিতে থাকে, তাঁদেরও; এই সময়ে জন্মালে এই মানুষটি সম্ভবত Slumdog শব্দটা অপছন্দই করতেন, কারণ যারা বস্তিতে থাকেন তাঁরা কেউ কুকুর না, তাঁরা মানুষ, আর মানুষকে কুকুর বলা মুক্তবাজার অর্থনীতির ফ্যাশন হতে পারে, তবে সেই মানুষটি মনে হয় খুব একটা ফ্যাশনসম্মত ছিলেন না---মৌল মানবাধিকার সংরক্ষনের উপায় হবে যেই স্বাধীনতা, যেই স্বাধীনতা মানুষকে মানুষের মত বাঁচবার সুযোগ এনে দেবে, আবার শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞানকেও করবে না অবহেলা; অর্থাৎ একদিকে মেটাবে মানুষের জৈবিক চাহিদাসমূহ, অন্যদিকে বিকাশ ঘটাবে তাঁর মানবিক গুনাবলির। এই ছিল তাঁর স্বপ্নের স্বাধীনতার রুপরেখা, অন্তত আমি বিশ্বাস করি। ১৯১১ সালের মে মাসের ৫ তারিখে ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব বাংলার চট্টগ্রামে জন্ম তাঁর। মেধাবি ছাত্রী হিসেবে ম্যাট্রিকুলেশান পরীক্কায় প্রথম বিভাগ পেয়েছিলেন। ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে দিয়েছিলেন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা, ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম স্থান অধিকার করেছিলেন।

দর্শনশাস্ত্রে গ্র্যাজুয়েশান করেছেন কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে। ভালো ছাত্রী ছিলেন, বিয়ের বাজারে এখনকার মত সেই সময়ও নিশ্চয় শিক্ষাগত যোগ্যতার একটা ভ্যালু ছিল, খুবই স্বাভাবিক ছিল তাঁর জন্য ঘরসংসারের সুখ ও শান্তিতে হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু একটু ‘অস্বাভাবিক’ ছিলেন তো, আর ‘স্মার্টনেস’ তো তেমন একটা ছিল না; তাই তিনি অন্য পথ বেছে নিলেন। ১৯ বছর বয়সে (হ্যাঁ, ১৯ বছর বয়সেই, আমিও ভুল লিখিনি আপনিও ভুল পড়ছেন না)যোগ দিলেন মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী দলে, কারণ দেশ তো তাঁর পরাধীন, কি করে করেন তিনি ‘স্বাভাবিক’ জীবনযাপন? ১৯৩২ সালে, সেপ্টেম্বর মাসে, মাস্টারদা একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন, সেটা ছিল চট্টগ্রামের ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণ করার একটি অ-শান্তিপ্রিয় পরিকল্পনা (লোকটাকে শান্তি-না-বোঝা সন্ত্রাসী মনে হচ্ছে? জামায়েতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামীর কাছেও মনে হয়, ইন ফ্যাক্ট তিনি মাঝেমধ্যেই দুঃখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন যে এই ‘সন্ত্রাসী’টার নামে একটা হল বানিয়ে রেখেছে, তবে ইদানিং আর করছেন না, আল্লাহর রহমতে তিনি এখন জেল আছেন; বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়াটা শুরু করার পর নিজামী সাকা আর সাঈদীসাব দের গলার ভলিউম লো হয়ে গেছে)। অকারণে করেননি মাস্টারদা এই পরিকল্পনা, একটা কারণ ছিল; ইউরোপিয়ান ক্লাবের ‘সভ্য’রা দরজায় একটা সাইনবোর্ড টানিয়ে রেখেছিলেন: ‘’Dogs and Indians not allowed’; ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের ‘গান্ধীবাদী’-রা খুব শান্তিপ্রিয় ছিলেন তো, ব্রিটিশদের পেয়ারের কুত্তা হওয়ার ব্যাপারটা তাঁদের জন্য মনে হয় বেশ আত্মতৃপ্তির ব্যাপার ছিল, তাই এই জঘন্য নোটিসটা সম্ভবত তাঁদের ‘চোখে পড়েনি’; কিন্তু সূর্যসেনরা তো কুত্তা হতে চাননি কখনো, হতে চেয়েছিলেন (এবং বস্তুতও ছিলেনও) মানুষ।

তাই খুবই দরকার ছিল একটা উচিত শিক্ষা দেওয়া ব্রিটিশ White-skin গুলিকে। তিনি ১০/১২ জনের একটা টিম রেডি করলেন এই কাজের জন্য, নেতৃত্ব তুলে দিলেন একুশ বছরের সেই মেয়েটির হাতে, দিন ঠিক করলেন ২৪ সেপ্টেম্বর। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হল, উদ্দেশ্যও সফল হল, কিন্তু ছেলে-ছদ্মবেশে থাকা নেত্রীটি আটকা পড়লেন; তবে আত্মসমর্পণ করলেন না, প্রশ্নই আসে না; তাঁর সাথে ছিল পটাসিয়াম সায়ানাইড, নিজেকে কিছু বেজন্মা শূয়োরের হাতে তুলে দেওয়ার চেয়ে অনেক শ্রেয় ছিল তাঁর কাছে আত্মহত্যা... আর তারপর?একুশ বছর বয়সের এই মেয়েটি অনন্তকালের জন্য হয়ে গেলেন আমাদের ইতিহাসের জনদার্ক, না ভুল লিখলাম, আমাদের তো না শুধু, পৃথিবীর সকল মুক্তিকামী মানুষের জন্যই তো তিনি আদর্শের আর অনুপ্রেরণার দেবী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন, মোমবাতির মতই নিজেকে জ্বালিয়ে যিনি আলোকিত করেছেন তাঁর পরিপার্শ্বকে। স্বাধীনতার পথে ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটা স্টেপ নিয়ে যিনি তাঁর জাতিকে এমন এক ঝণে আবদ্ধ করলেন যা সে কখনোই শোধ করতে পারবে না। মাতৃঝণ কি কখনো শোধ করা যায়? তবে আমরা কিন্তু অনেক ‘স্মার্ট’ হয়ে গেছি! তাঁর এই শাহাদাত বিফলে যেতে দিয়েছি আমরা কর্পোরেটসুলভ হাসিমুখে।

তাঁর স্বপ্নের স্বাধীনতা আজও আসেনি এই দেশে, আজও আমরা বন্দী আমাদেরই তৈরি করা বা সমর্থন করা বা সহ্য করা নানাবিধ অনাচারে। জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের একটি হল ছাড়া এই বাংলাদেশে সেই মেয়েটির জন্য আমরা আর কিছুই রাখিনি। আমাদের ক্ষমা করবেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার.. (কৃতজ্ঞতাস্বীকার : লেখাটির শিরোনাম আল মাহমুদের কবিতা 'একুশে ফেব্রুয়ারি' থেকে নেওয়া) ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.