:-)
ছোট মেয়েটা আলোকিত মানুষ হতে চেয়েছিল একদিন...
কত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেল মেয়েটা!
ছোট্টবেলায় মায়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটা আজিমপুরের বড় মাঠটাতে যেত শুক্রবার বিকালে। সেখানে তখন বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রের বইভর্তি বাসটা আসত। কত্ত কত্ত বই! পিচ্চি মেয়েটা ফোরে পড়ে তখন। বইয়ের নেশায় পাগল মেয়েটা হুমড়ি খেয়ে বাস থেকে বই খুঁজে খুঁজে বের করত,মনের আনন্দে। বিশাল সাইজের গল্পের বই হাতে দেখে মা চোখ কপালে তুলে বলতেন,”এই পিচ্চি মেয়ে এত মোটা বই পড়ে কিভাবে?” মাকে কখনো বলা হয়নি,মেয়েটা অনেক অনেক বই পড়ত শুধু আলোকিত মানুষ হ্ওয়ার লোভে।
আজিমপুর থেকে ধানমন্ডি। মেয়েটা বড় হয়ে গেছে। মাঝে কেটে গেছে প্রায় তেরো বছর। বইয়ের বাস এখন প্রতি বৃহস্পতিবার কলাবাগান কোয়াটার্স-এর সামনে আসে। একসময় নিয়মিত বাসে হুমড়ি খেয়ে নতুন বই খুঁজে মরা মেয়েটা সময়ের অভাবে দুই মাস পর পর বই নিতে যায়।
সেখানকার বেশিরভাগ বই-ই এখন পড়া হয়ে গেছে,তবু বইয়ের গন্ধ নিতে ছুটে যায় মেয়েটা। বাসে বই আদান-প্রদান করা আঙ্কেল মেয়েটার বইয়ের কার্ড বের করে মিষ্টি করে হেসে বলেন,”তুমি তো দেখি অনেক পুরোনো পাঠক!” মেয়েটা লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসে। তারপর শান্ত দৃষ্টিতে বাসের ভেতরে বই হাতে ছুটোছুটি করা পিচ্চি-পাচ্চাগুলোকে দেখে। নিজের ছেলেবেলার কথা মনে হয়। ওদের দিকে তাকিয়ে মেয়েটা ভাবে--এই পিচ্চিগুলো একদিন বড় হবে,ব্যস্ত হবে—তখনো বইয়ের নেশা থেকে মুক্তি না পেয়ে ওরা ছুটে আসবে এই বাসে—ঠিক আমার মত; একবার না,বারবার—বহুবার!
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের হাসিমাখা মুখের ছবি চোখে ভেসে ঊঠে মেয়েটার।
শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে সেই মানুষটার সৌম্য দৃষ্টির কথা মনে করে। অসম্ভব প্রিয় ব্যক্তিত্বকে মেয়েটা মনে মনে বলে,"স্যার,কত-শত মানুষের অন্তরকে আপনি আলোকিত করছেন আপনি নিজে জানেন কিনা জানিনা! আমরা আলোকিত মানুষ হব স্যার! বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আলোকিত মানুষ হবে স্যার!”
একা হলেই নিজের কাছে নতজানু মানুষ...
ছেলেবেলায় মেয়েটা খুব শান্ত-শিষ্ট একটা পিচ্চি ছিল,খুব কম কথা বলত। আত্মীয়-স্বজন,প্রতিবেশীরা অবাক হয়ে বলত,"মেয়েটা বোবা নাকি?” নাহ! মেয়েটা বোবা ছিলনা। মেয়েটা একা একা কি সব ভাবত আর একা একা ছবি আঁকত। বেশিরভাগ ছবিতে মেয়েটা একটা নীল ঘুড়ি আঁকত,আর আঁকত ঘন বন,বিশাল বিশাল সবুজ গাছ।
ইট-পাথরে বন্দী স্বাধীনতাহীন মেয়েটা মনে হয় সেই ছেলেবেলাতেই স্বপ্ন দেখত মুক্ত ঘুড়ি হয়ে গহীন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়ার!
কিন্তু মেয়েটার কখনো গহীন অরণ্যে হারানো হয়নি। কখনো নীল ঘুড়ি ওড়ানো হয়নি। অসামাজিক বোবা মেয়েটা বড় হতে হতে অনেক বেশি সামাজিক হয়ে গেল। বন্ধুবৎসল,হাসি-খুশি,প্রানোচ্ছল। কিন্তু মেয়েটা যখন একা হত—তখন গভীর বিস্ময়ে লক্ষ্য করত তার মত করে তার কাছের বন্ধুগুলো ভাবেনা,মেয়েটার চিন্তাভাবনা কেন জানি সবসময় সবার থেকে আলাদা হয়।
এমনকি বাবা-মার থেকেও! তখন মন খারাপের দেশে থাকা মেয়েটা তার রিনরিনে কন্ঠে আবৃত্তি করত,"একা হলেই নিজের কাছে নতজানু মানুষ”!
চোখে একটু কাজল,এলোচুলে হালকা একটা রাবার ব্যান্ড পরলে কি ভালোবাসা পাওয়া যায়?
তুই কি একটু সুন্দর ভাবে কলেজে আসতে পারিসনা? চোখে একটু কাজল তো দেওয়া যায়! আর এত লম্বা চুল,সুন্দর করে বাঁধা যায়না?
বন্ধুদের কাছে তাকে নিয়ে অভিযোগমাখা কথা শুনে চশমা পড়া এলোচুলো মেয়েটা হাসত,নম্র হাসি। কিন্তু কখনো রেগে যেতনা। শান্ত কন্ঠে শুধু বলত,"ধুর! আমার ওসব সাজগোজ ভালো লাগেনা!”
মেয়েটাকে সবাই এত পছন্দ করত,এত ভালোবাসত যে মাঝে মাঝে মেয়েটার মনে হত তার বুঝি সব পাওয়া হয়ে গেছে। এর চেয়ে বেশি কি চায় মানুষ? কিন্তু তারপর্ও কোন যুগলবন্দী মানুষদের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে মেয়েটা চুপিচুপি দীর্ঘশ্বাস ফেলত! চিরচেনা গন্ডির বাইরে অন্য কারো প্রিয় হবার দীর্ঘশ্বাস! সেই দ্বীর্ঘশ্বাস কাছের কোন বন্ধু শুনে ফেলে একদিন মেয়েটাকে বলেছিল—“তোকে কোনদিন কোন ছেলে ভালোবাসবেনা। ক্লাসের একটা ছেলেও তোকে তুই করে বলেনা,তোর সাথে হাসি-ঠাট্টা করেনা! ছেলেরা তোকে সমীহ করে রে! তোকে দেখলে মনের মধ্যে রেসপেক্ট আসে,ভালোবাসা আসেনা!”
বন্ধুর কথাটা শুনে বাড়ি ফিরে মেয়েটা একা একা ভেবেছিল,"চোখে একটু কাজল,এলোচুলে হালকা একটা রাবার ব্যান্ড পরলে কি ভালোবাসা পাওয়া যায়?” তারপর নিজেকে প্রবোধ দিল এই বলে,"আসলে ভালোবাসা পেতে হলে অনেক সুন্দর হতে হয়,অন্নেক সুন্দর।
আমি তো সুন্দর না!”
মেয়েটার ভাবনা-চিন্তাগুলো মনে হয় আজীবন-ই পিচ্চি-ই রয়ে যাবে!
বাবার হাত কিংবা পশুর থাবা
মেয়েটার অসম্ভব প্রিয় মানুষ মেয়েটার মামা। একদিন মামার সাথে গ্রামের বাড়ির এলোমেলো রাস্তায় ঘুরতে যেয়ে হঠাৎ মামা আর মেয়েটা শ্মশান ঘাটের কাছে এসে পড়ল। মামা বললেন,এইটা পুরোনো শ্মশান। ছোট মেয়েটা বেশ ভয় পেল। শক্ত করে মামার হাতটা চেপে ধরে মামার কাছে এসে দাঁড়াল।
পিতৃতুল্য মামা মাথায় হাত রেখে প্রবোধ দিয়ে বললেন,"আম্মু ভয় পাচ্ছ নাকি? আমি তো আছি!”
সেদিন প্রথমবারের মত মেয়েটা বুঝতে পারল ফুল হাতা কামিজ পড়ে,পুরো শরীর ওড়না দিয়ে ঢেকেও একদিন গাউসিয়ার ভীড়ে যে লোমশ নোংরা হাতটার ছুঁয়ে যাওয়া থেকে মেয়েটা তার অনুন্নত শরীর বাঁচতে পারেনি,সেই হাতের সাথে মামার এই স্নেহের হাতটার কত পার্থক্য!
একটা হাত ছিল বাবার স্নেহের আর বহুদিন আগে গাউসিয়ার ভীড়ে মিশে থাকা সেই লোমশ হাত ছিল পশুর থাবার!
দলিত শিউলি ফুল
আজিমপুরে থাকতে শীতের ভোরবেলা বাসার পাশে শিউলি গাছের তলায় পড়ে থাকা ফুল কুড়াতে যেত মেয়েটা,সাথে থাকত নানী। মুঠোয় অনেক অনেক শিউলি ফুল আলতো স্পর্শে তুলে আনার সময় হঠাৎ মেয়েটার চোখ পড়ত দুই একটা শিউলি ফুলকে মাড়িয়ে চলে যাওয়া পথচারীদের দিকে। মেয়েটা খুব রাগী দৃষ্টিতে সেই পথচারীদের দিকে তাকাতো। তারপর দলিত শিউলি ফুলগুলোকে আলতো করে তুলে নিয়ে অবাক হয়ে দেখত,দলিত ফুলগুলো যেন আরো সুন্দর,সাদা আর কমলার মিশেলে অপরূপা হয়ে উঠছে। পথচারীদের মাড়িয়ে যাওয়া ফুলের সৌন্দর্যে বিন্দুমাত্র দাগ কাটেনি।
একদিন মেয়েটা বড় হল, ভাল-মন্দের ধারণা করে নিল নিজের ভেতর। মেয়েটা যখন বড় হয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করা শুরু করল, তখন হঠাৎ একদিন সমাজের কুৎসিত রূপ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুকে নোংরা কিছু মানুষের নোংরা ভাষায় পেজ পরিচালনা দেখতে পেল। প্রথমে শান্ত মেয়েটা ভেতরে ভেতরে ক্ষয় হতে থাকল মানুষের বিবেকের অধঃপতন দেখে! তারপর হঠাৎ করে মেয়েটার মনে পড়ল ছেলেবেলার সেই শিউলি ফুলের কথা! শিউলি ফুলকে যতই দলিত করা যাকনা কেন,শিউলি ফুল ঠিক-ই মিষ্টি থাকে,পবিত্র থাকে! মেয়েটা তখন মনে মনে ভাবল,"সব সুন্দর মনের মানুষ আসলে শিউলি ফুলের মত। কিছু নোংরা মানুষ তাকে যতই কলুষিত করুক না কেন,আলোকিত মানুষ আলো ছড়াবেই!”
তিমিরদুয়ার খোলো
মেয়েটা সবসময় খুব আশা নিয়ে বড় হয়েছে। একটা ভাল রেজাল্ট করার আশা,ভাইয়ার মত অধ্যবসায়ী হ্ওয়ার আশা,মায়ের মত পরিশ্রমী হ্ওয়ার আশা,বাবার মত সৎ হ্ওয়ার আশা।
অনেক স্বপ্ন থরে থরে সাজিয়ে রাখা মেয়েটা মাঝে মাঝে নিজেকে স্বার্থপর বলে গালি দেয়। নিজেকে নিজেই বলে,"তুই শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবিস কেন? নিজের স্বপ্নগুলো পূরণ হ্ওয়াই কি সব? তুই আলোকিত মানুষ হতে চেয়েছিলি না?” তখন মেয়েটার আরেকটা স্বত্তা হায়েনার মত হেসে উঠে যেন বলে,"আমার কি দোষ বল? সেই ছোটবেলা থেকে বন্দী থেকে থেকে আমার স্বপ্নগুলোও খুব সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে! আমি এখন শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবি! শুধু নিজেকে নিয়ে! দেশ-সমাজ এসব নিয়ে ভাবার সময় আছে নাকি?”
মনের সাথে কথোপকথনের যুদ্ধে হেরে যাওয়া মেয়েটা একমুঠো জল নিয়ে চোখ বন্ধ করে। বন্ধ চোখের অন্ধকার গহীনে তখন ভেসে উঠে তার কিছু প্রিয় আলোকিত মানুষের ছবি—মেয়েটা দেখে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার,জাফর ইকবাল স্যার কিংবা তার বাবা-মা’র হেরে না যাওয়া মুখ। মেয়েটা তখন বন্ধ চোখে মনের তিমিরদুয়ার খুলে দিয়ে শান্ত স্বরে উচ্চারণ করে কবিগুরুর দৃপ্ত বানী—
অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর হে।
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো,
সুন্দর কর হে।
জাগ্রত করো, উদ্যত করো,
নির্ভয় করো হে।
মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে।
অন্তর মম বিকশিত করো,
অন্তরতর হে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।