,,,কুয়াশার আড়ালে লুকানো ঘটনা কুয়াশার চাদরে জড়ানো সকালের মোহনীয় রূপের মত নিস্পাপ, নিস্কলঙ্ক, নির্মোহ নয়,,, বরাবর
দেশপ্রভু
সমাজের সর্বোচ্চ তলা, বাংলাদেশ।
বিষয়ঃ মিষ্টচিন্তার উচ্ছিষ্ট মোড়কের সাথে যৎসামান্য মিষ্টচিন্তাও ডাষ্টবিনে ফেলার আবেদন।
প্রভু,
আমরা বাংলা মা’য়ের একদল ভবঘুড়ে টোকাই সন্তান অতি আনন্দের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে আমাদের সমুদ্রবক্ষে লুক্কায়িত প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের জন্য প্রযুক্তি প্রভুদের দেশ থেকে কনকো-ফিলিপস নামে একটি বহুজাতিক কোম্পানীর আগমন ঘটেছে। বাংলা মা’য়ের টোকাই সন্তানরা বৃষ্টি-স্নাত রাস্তায় যখন ‘কনকোফিলিপসের আগমন-শুভেচ্ছা স্বাগতম’ টাইপের স্লোগান দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক তখনি আপনার ডিজিটাল আন্দোলনের ফসল কিছু ডিজিটাল টোকাই দেশী বিদেশী পত্র-পত্রিকা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি পর্যালোচনা আর আমাদের নিকট অতীতের তিক্ততা স্বরণ করে গ্যাস উত্তোলনের এই চুক্তিটিতে দেশের স্বার্থবিরোধী মারাত্বক সব যুক্তির আভাস খুজে পেয়েছে।
আমরা টোকাই।
নিত্যব্যবহার্য জিনিস পত্রের দাম বেড়ে চলার এই সময়টাতে ক্ষুধা আমাদের জন্য অভিশাপ। আর সেই অভিশাপ মোচনে, দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন যোগাতে আমরা সারাদিন ছুটে বেড়াই এক ডাষ্টবিন থেকে আরেক ডাষ্টবিনে। কিন্তু আমাদেরও মা আছে। আমাদেরও আছে মাতৃপ্রেম। আর দেশমাতার প্রতি এই ভালবাসা নিয়েই কিছু টোকাই রক্ত দিয়েছিল ৫২’তে।
দেশমাতার সম্মান ছিনিয়ে আনতেই ৩০ লক্ষ টোকাই প্রাণ দিয়েছিল ৭১’এ। আজ সেই টোকাই সমাজ আবার দেশমাতার অমংগল শংকায় পাগল প্রায়। তাই গ্যাস চুক্তিটির ব্যাপারে কিছু কথা তুলে ধরার ধৃষ্টতা পোষণ করছি। হতে পারে এটি সংবিধান বিরুদ্ধ। কিন্তু মাতৃপ্রেম সংবিধান সিদ্ধ হয়ে আসতে হয় না।
কথা বলার এই অধিকার আমাদের জন্মের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রভু, কনকোফিলিপস হচ্ছে প্রযুক্তি-প্রভু দেশের ৩য় বৃহত্তম কোম্পানী। এরা সেই ডোনাল্ড রামস্ফেল্ডের দেশের কোম্পানী- যে রামস্ফেল্ড অস্ত্র ব্যবসার প্রসার ঘটাতে আশির দশকে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের পা চেটেছে। আর জ্বালানী সম্পদের দখল নিতে ইরাক যুদ্ধে মার্কিন রণ উপদেষ্টা হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তাই টোকাই সমাজের আশংকা কনকোফিলিপস আমাদের দেশে সুচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোবে।
প্রভু, এরা কিন্তু সেই দেশের কোম্পানী যে দেশ তার কোম্পানীর বড় বড় প্রজেক্ট পাহারা দেবার নাম করে আরেক দেশের সমুদ্র সীমায় রণতরী পাঠায়। এদের এহেন স্বভাবে টোকাই সমাজের আশংকা এরা আমাদের দেশেও ঝোপ বুঝে কোপ মারবে।
প্রভু, এরা কিন্তু সেই দেশের কোম্পানী যে দেশ থেকে এসেছিল অক্সিডেন্টাল। তারাই ৯৭ সালে মাগুরছড়ায় আগুন লাগানোর দায়ে অভিযুক্ত। তাদের লাগানো আগুনে আমরা তাৎক্ষণিক ভাবে পেয়েছি পোড়া ছাই আর শূন্য হয়ে যাওয়া গ্যাসকূপ।
কিন্তু আজও পাইনি ক্ষতিপূরণের টাকা। টোকাই সমাজ কনকোফিলিপসের কাছে এবার পুড়ে যাওয়া ছাইও আশা করতে পারছে না। আমাদের শংকা ভবিষ্যতে এদের লাগানো আগুনে সমুদ্র সম্পদ হবে বাষ্পীভূত।
প্রভু, কনকোফিলিপস যে দেশ থেকে এসেছে সে দেশের কর্ণধার কার্বণ নিঃসরণ মুক্ত জ্বালানী নির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি তৈরীতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের দেশের গ্যাস না’কি বহির্বিশ্বে ‘white gold’ নামে সুপরিচিত।
নগণ্য পরিমাণে অপ্রয়োজনীয় পদার্থ (impurity) মিশ্রিত এ গ্যাসের জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার পরিবেশ বান্ধব। কাজেই ৮০% গ্যাস L.N.G. করে রপ্তানীর চুক্তিটি টোকাই সমাজ দেখছে জ্বালানী পাচারের চুক্তি হিসেবে।
প্রভু, আমরা চুক্তি মানি, কিন্তু আড়ালের যুক্তি মানি না। প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবহার নিশ্চিত করতঃ দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করার যে কোন চুক্তি টোকাই সমাজ স্বাগত জানায়। কিন্তু অনন্তকাল প্রভুত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দেশবিরোধী কোন চুক্তি আমরা মানি না।
প্রভু, আপনার অধঃস্তন একজন পাতি প্রভু টোকাই সমাজের বর্তমান আস্ফালনে বিদ্রূপ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, আমরা নাকি কিছুই জানি না। আমরা স্বীকার করছি যে আমরা টোকাই, আমরা স্বীকার করছি যে আমরা কিছুই জানি না। কিন্তু আমরা টোকাই বলেই কিন্তু আপনি প্রভু। আমরা কিছু জানি বলেই কিন্তু আপনাকে সবজান্তা বলে মেনে নিয়েছি।
টোকাই বলে সম্বোধন করলে গায়ে লাগে না, কিন্তু টোকাই বলে গালি দিলে মনে বড় লাগে।
প্রভু, বাংলাদেশ যখন ৯০ দশকের প্রথমার্ধে সাবমেরিন কেবল এর সাথে প্রায় বিনা খরচে যুক্ত হবার সু্যোগ পেল তখন ইনফরমেশন সুপার হাইওয়েতে যুক্ত হবার সেই ক্ষণটি কাজে লাগাবার জন্য এদেশের টোকাইরা আজকের মতই লাফালাফি করেছিল। কিন্তু আপনারা কোন এক অজ্ঞাত নিরাপত্তা জনিত ইস্যুতে সেই সু্যোগ হেলায় হারিয়েছেন। অবশেষে ২০০৫ সালে ৩৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে সাবমেরিন কেবল কানেকটেড হলেও সমগ্র দেশ তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়ে ১৫টি বছর। তাই টোকাই সমাজ আজকের গ্যাস ইস্যু নিয়ে ভবিষ্যতে আপনাদের বোধোদয় হবার আশা প্রকাশ করছে।
কারণ কথায় আছে- ‘গরীবের কথা বাসি হলে ফলে’ ‘টোকাই শঙ্কাও’ হয়তো সমদ্রবক্ষে কোন দুর্ঘটনার মাধ্যমে সত্যি হবে।
প্রভু, সত্য সবসময় উজ্জ্বল; তবে মাঝে মাঝে তা নির্মম, কখনোবা নিষ্ঠুর। আপনার জন্যে মেনে নেয়া কষ্টকর হলেও বাস্তব সত্যি হচ্ছে আপনার প্রভুত্ব অনন্তকালের জন্যে নয়। আপনি আর কিছু দিতে না পারেন, আশা দিতে কার্পণ্য করেন নি। নিত্য-পণ্যের দাম কমাবার আশা, ডিজিটাল যুগের আশা, গরীব মুক্তির আশা।
এদেশের টোকাই সমাজ আশা নিয়েই বেচে আছে – হোক না তা সত্যি কিংবা মিথ্যা। কিন্তু আপনার এহেন দেশ বিকানো চুক্তির ফলে পরবর্তী প্রভু ক্ষমতায় এসে তো আশা দেয়ার মতও কিছু খুজে পাবেন না। আপনি আমাদের জন্যে না হলেও পরবর্তী প্রভুর আশা দেখাবার জন্য গ্যাসবেচা চুক্তিটি বিবাচনা করুন।
প্রভু, স্বীকার করছি যে আমাদের দেশীয় কোন প্রতিষ্ঠানের সমদ্রবক্ষের গ্যাস উত্তোলনের কোন কারিগরী সক্ষমতা নেই। কিন্তু তাই বলে যে আমরা সেই সক্ষমতা কোনদিনই অর্জন করতে পারব না- তা কিন্তু নয়।
আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে প্রযুক্তি পণ্যের দাম সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কমে। কম্পিউটার এর ক্ষেত্রে টানা ৪০ বছর ধরে সিলিকন চিপের দাম প্রতি ১৮ মাসে শতকরা ৫০ ভাগ হারে কমছে। আর তাইতো এক যুগ আগের লক্ষাধিক মূল্যের কম্পিউটার আজ টোকাই সমাজ ব্যবহার করছে মাত্র ২৫-৩০ হাজার টাকায়। তাই আগামী ২০ বছরে হয়তো ড্রিলিং প্রযুক্তিও আমরা আমাদের হাতে পেয়ে যাব, কিন্তু তখন আমাদের হাতে থাকবে শুধু শুন্য গ্যাসকূপ।
প্রভু, কৃষি উৎপাদনে অপরিহা্র্য সার উৎপাদনের একমাত্র কাচামাল হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই সারের যোগান নিশ্চিত করণে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করছে। অথচ আমরা আমাদের গ্যাস কনকোফিলিপসের সাথে করা চুক্তির মাঘ্যমে বাইরে পাচারের শংকা করছি। এদেশের এই সাধারণ টোকাই সমাজ এক ‘ঘড় পোড়া গরু’ তাই বোধহয় আমরা আপনার করা চুক্তিটি নিয়ে কোন এক অজানা শংকায় কুৎসা রটনা করছি। তাই এই চুক্তির গুণগুলো আমাদের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরে সকল শংকাকে আপনি মিথ্যা প্রমাণ করবেন এবং কুৎসা রটনা থেকে টোকাই সমাজকে বিরত করবেন -এই আশা করছি।
প্রভু, আমাদের মত টোকাইয়ের দেশভাবনা করলে চলে না।
আপনার মত রাষ্ট্র প্রভুদের অমূল্য মিষ্ট চিন্তার চকমকে যে প্যাকেট টি ডাষ্টবিনে ফেলে দেন সেই প্যাকেট কুড়িয়ে এনে আমরা আমাদের তেতো চিন্তাগুলো আড়ালে সদা ব্যস্ত। কিন্তু সত্যি বলছি, এবার টোকাই সমাজের চিন্তাগুলো কেনো যেন বারাবারি রকমের তেতো। আপনি যদি এবার দয়া করে মিষ্ট চিন্তার ভান্ডার থেকে সামান্য অংশ ডাষ্টবিনে ফেলেন তবে তা কুড়িয়ে এনে চিরায়ত তিক্ততার অভিশাপ থেকে টোকাই সমাজ মুক্তি পেত।
তারিখ, ঢাকা;
২’রা জুলাই, ২০১১
নিবেদক-
একান্ত প্রভুভক্ত
বাংলা মা’য়ের টোকাই সন্তান।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।