সবকিছুই চুকিয়ে গেছে গালিব! বাকি আছে শুধু মৃত্যু!!
ফেসবুকে একটা একাউন্ট আমার আছে। নিয়মিত নই, ব্যবহারও ঠিকমতো জানিনা। এ অবধি কোন স্ট্যাটাসও দেওয়া হয়নি। নিজের অযোগ্যতার কারণে ফ্রেন্ডলিস্টের তালিকাটা ৩০ পার হয়নি। খর্বকায় এ তালিকার মানুষগুলোর চেহারা, আকৃতি, বয়স, অভিব্যক্তি ভিন্ন।
তবে একটা জায়গাতে খুব মিল পাই, প্রোফাইল স্ট্যাটাস অনুযায়ী এদের বেশিরভাগ সমাজতন্ত্রী। শুধু তাই নয়, মাঝে মাঝে সার্চ দিয়ে যাদের পাই তাঁদেরও বেশিরভাগ প্রোফাইল স্ট্যাটাস অনুযায়ী সমাজতন্ত্রী।
এতো সমাজতন্ত্রী! খুশি না হয়ে পারিনা। কারণ সমাজতন্ত্রের প্রতি খানিকটা দুর্বলতা আমারও আছে। কিন্তু সমাজের দিকে যখন তাকাই আশাহত না হয়ে পারিনা।
সমচিন্তার কাছাকাছিও কাউকে পাইনা। গত নির্বাচনে আমাদের কেন্দ্রে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রার্থী মাত্র একটি ভোট পেয়েছিলেন। বলাবাহুল্য, ভোটটি আমার নয়। পেশাগত জটিলতার কারণে ভোট দেওয়া হয়নি। সুযোগ থাকলে আমিও হয়তো দিতাম না।
কারণ সেক্ষেত্রে ডাকাত খেদানোর স্বার্থে চোরকে বেছে নেওয়াটাই প্রায়োরিটি দিতাম।
দু'একটা আড্ডার সূত্রে যে ক'জন ফেসবুকি সমাজতন্ত্রীর দেখা পেয়েছি বা যারা নিজেদেরকে সমাজতন্ত্রী বলে দাবি করেন তাঁদের কথা শুনলে ধারণা জন্মায় যে তাঁরা এক ধরণের আত্ম-অহমিকায় ভোগছেন। 'মুই কি হনুরে' বা 'এলিট', 'এলিট' একটা ভাব। শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্নও দেখেন আবার নিজেদের এলিটও ভাবেন। সাধারণ মানুষের সাথে মিশছেন বা ভবিষ্যতে মিশবেন এমনটা তাঁদের কাছ থেকে আশা করা যায়না।
সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়েও ওনারা উদগ্রীব নন। তত্ত্ব আলোচনাই এদের প্রধান সম্বল।
সমাজতন্ত্র একটি তত্ত্ব বা দর্শন, এটা কোন ধর্মগ্রন্থ নয়। বাস্তবক্ষেত্রে তত্ত্বের প্রয়োগ করতে গেলে স্থান, কাল, পাত্রভেদে সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্ধন, পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, মালিক শ্রমিকের সম্পর্কেরও পরিবর্তন ঘটেছে।
তত্ত্বজ্ঞান সমৃদ্ধ আমাদের সমাজবাদীরা নতুন ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার কোন চেষ্টা করেননি। আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের উৎস গার্সেন্টস সেক্টরের সমস্যাদির বিষয়ে সমাজবাদীদের কোন তৎপরতা নেই। সমস্যাগুলো ভুক্তভোগীরাই সমাধানের চেষ্টা করছেন। বড় কোন ঘটনা ঘটলে তত্ত্ববাদীরা একটি বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেন।
স্থান, কাল ও পাত্রভেদে বাস্তবতার আলোকে তত্ত্বজ্ঞানে সংযোজন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে নিজেদের উপযোগী রাখার সবচেয়ে উদাহরণ হলো পশ্চিবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার।
একটি ব্যবস্থাকে উপযোগী করে কীভাবে জনগণের কাছাকাছি থাকা যায় তাঁর দৃষ্টান্ত তাঁরা গত ৩৫ বছরে স্থাপন করেছেন। অবশ্য আমাদের দেশের এলিট সমাজতন্ত্রীরা পশ্চিম বঙ্গের সরকারকে বিশুদ্ধ সমাজবাদী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। আর এই বিশুদ্ধ সমাজতন্ত্রের ধুয়া তুলে আমাদের এলিটরা প্রতি বছর ব্রাকেটবন্দী দলে পরিণত হচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গের অবিশুদ্ধ সমাজতন্ত্রীরা কিছু না করতে পারলেও দরিদ্র ভূমিহীনদের বিনে পয়সায় জমি দিয়েছে। আপনারা কি দিয়েছেন? তত্ত্বজ্ঞান ছাড়া আর কিছুইনা।
সমাজতন্ত্রকে শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক মতবাদে সীমাবদ্ধ রাখার ব্যাপারে এসব তত্ত্ববাদীদের অবদান অসামান্য। সমাজের ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র অথচ গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর নিরসন যে শ্রেণী বৈষম্য হ্রাসে অবদান রাখতে পারেন এবং এগুলোকে কেন্দ্র করে যে বিরাট জনমত গড়ে তুলা যায় সে বিষয়ে তারা ওয়াকিবহাল নন বা প্রয়োজনীয় মনে করেন না। সে কারণেই স্থানীয় পর্যায়ে সংঘটিত কানসাটের বিদ্যুৎ আন্দোলন, ফুলবাড়িয়ার বহুজাতিক কোম্পানীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, শনি আখড়ার পানি, বিদ্যুত আন্দোলন বা অতিসম্প্রতি রুপগঞ্জের জমি আন্দোলনে সমাজতন্ত্রীদের কোন প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই। স্থানীয় জনতাই অসীম সাহসিকতার সাথে এ আন্দোলনগুলো গড়ে তুলেছে। তত্ত্বজ্ঞানী সমাজতন্ত্রীরা ঘটনার পরে স্থান পরিদর্শনের মাধ্যমে তাঁদের দায়িত্ব শেষ করেছেন।
আমার এই লেখাটিকে একগুচ্ছ হতাশা ভেবে এলিট সমাজবাদীদের এটা ভেবে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার কোন সুযোগ নেই যে আপনাদের অংশগ্রহণ ব্যতিত সমাজের মৌলিক পরিবর্তনের ধারাটি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। কানসাট, ফুলবাড়িয়া, শনি আখড়া বা অতিসম্প্রতি রুপগঞ্জের মানুষ প্রমাণ করেছে আপনাদের ছাড়াই গণআন্দোলন সম্ভব। হ্যাঁ, আপনাদের ছাড়াই সম্ভব।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।