আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

লবনাক্ত এলাকায় চাষাবাদের জন্য বিনাধান-৮ এবং বিনাধান-৯

তেমন কিছু বলার নেই

বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে, যা দেশের কৃষি েেত্র বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে । জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে সকল দেশের ঝুকির পরিমাণ বাড়ছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এর প্রভাবে সাগরের উচ্চতা যেমন বাড়বে তেমনি বাড়বে ঘুর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা । বাংলাদেশের পরিবেশ বিষয়ক এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ২০৫০ সাল পর্যন্ত ১ মিটার বাড়তে পারে। যার প্রভাবে প্রায় ৩০০০ মিলিয়ন হেক্টর জমি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যেতে পারে এবং সার্বিক উৎপাদন শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ কমে যেতে পারে।

বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা এবং দণিাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ার কারণে এ দেশে ধানের উৎপাদন সন্তোষজনক না হওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স¤প্রতি দেশে সিডর, আইলা, নার্গিস নামে ঘুর্ণিঝড় দেশের দণিাঞ্চলে ফসলের ব্যাপক তি সাধন করেছে এবং এর ফলে অতি চড়া দামে ঐ সময়ে বিদেশ হতে আমাদের খাদ্য আমদানি করতে হয়েছে। জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সমুদ্রের লোনা পানি কৃষি জমিতে প্রবেশ করার কারণে আবাদি জমি ক্রমাগত লবণাক্ত হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে ধান চাষ মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। বাংলাদেশের দণিাঞ্চলের জেলা সমূহ বিশেষ করে সাতীরা, বাগেরহাট ও খুলনা জেলায় লবণাক্ততার কারণে ধান চাষের পরিবর্তে অধিক হারে চিংড়ি চাষ হয় কিন্তু চিংড়ি চাষে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ুদ্র ও মাঝারী কৃষকগণ প্রাপ্য মুনাফা পাচ্ছে না। ফলে স¤প্রতি কৃষকরা চিংড়ি চাষে অনিহা প্রকাশ করছে।

এ ছাড়াও অন্যান্য সমুদ্র উপকূলীয় লবণাক্ত জেলায় যেমন বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা সমূহে ধান চাষ বিঘিœত হচ্ছে। এ সকল জেলার যে সব অঞ্চলের জমিতে লবণের পরিমাণ বেশি সেসব জায়গায় ধান চাষ হয়না বললেই চলে। দেশে মোট লবণাক্ত এলাকার পরিমাণ প্রায় ১০ ল হেক্টর এবং ধান চাষের বোরো বা শুষ্ক মৌসুমে জমিতে ৪-২০ ডেসি সিমেন/মিটার মাত্রার লবণ বিদ্যমান থাকে । এই বিপুল পরিমাণ জমি ধান চাষের আওতায় নিয়ে আসতে পারলে, দেশের খাদ্য ঘাটতি অনেকাংশে লাঘব হবে বলে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের ধারণা। এমনি এক অবস্থায়, দেশের দণিাঞ্চলের মানুষের জন্য আশার বাণী নিয়ে এল ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবিত বোরো মৌসুমের জন্য দুটি লবণ সহিষ্ণু ধানের জাত যা ৮-১০ ডেসি সিমেন/মিটার মাত্রায় লবণ সহনশীল।

লবণ সহিষ্ণু ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনে প্রধান গবেষক এবং প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম ও তার দল বিগত ৫ থেকে ৬ বছর যাবৎ লবণাক্ত এলাকায় কৃষকের জমিতে ফলন পরীণ করে আসছেন। নতুন জাত দুটিকে ’বিনাধান-৮’ এবং ’বিনাধান-৯’ নামে ছাড়করণের জন্য আবেদন করা হয়েছে। ড. মির্জা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে জাত দুটি ছাড়করণ হলে তা প্রায় শতকরা ৩০-৪০ ভাগ লবণাক্ত এলাকায় ধান চাষের আওতায় নিয়ে আসতে পারবে । উল্লেখ্য, বিগত দিনে উদ্ভাবিত আমন মৌসুমের জন্য ব্রিধান ৪০ ও ব্রিধান ৪১ এবং বোরো মৌসুমের জন্য ব্রিধান ৪৭ এর লবণ সহিষ্ণুতা অনেক কম। কারণ জমিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে গেলে ব্রিধান ৪০, ৪১ ও ৪৭ জাতগুলোর ফলন ব্যাপক হারে কমে যায়।

কিন্তু বিনা উদ্ভাবিত জাত দুটি অপোকৃত বেশি মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে এবং ফলনও আশানুরূপ। ৮-১০ ডেসি সিমেন/মিটার লবণাক্ত জমিতে হেক্টর প্রতি ফলন ৪.৫-৫ টন এবং স¦াভাবিক জমিতে ৬.৫-৭ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। জাত দুটি আলোক অসংবেদনশীল হওয়ায় বোরো ও আমন উভয় মৌসুমে চাষের উপযোগী। বোরো মৌসুমে ১৩০-১৩৫ দিনে এবং আমন মৌসুমে ১২০-১২৫ দিনে পাকে। উল্লেখিত জাত দুটিতে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমন অনেক কম।

উল্লেখ্য যে, জাত দুটির পাতার রং গাঢ় সবুজ, কান্ড, পাতা ও শীষ খুবই শক্ত, ঝড়ো বাতাসেও ঢলে পড়ে না, পরিপক্ক অবস্থায় ধানের শীষ ঝরে পড়ে না, পাকা ধানের রং স্বাভাবিক সোনালী রঙের। বর্তমানে ১০ ল হেক্টর জমিতে ৪-২০ ডেসি সিমেন/মিটার লবণাক্ততার কারণে বোরো ধান চাষের আওতায় আনা যাচ্ছে না । বিনা উদ্ভাবিত নতুন প্রস্তাবিত জাত দুটি অবমুক্ত করা হলে প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ অর্থাৎ ৩ ল হেক্টর জমি ধান চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং লবণাক্ত এলাকায় এ জাত দুটির গড় ফলন প্রায় ৫ টন যা চালে হেক্টর প্রতি ৩.৫ টন পাওয়া যাবে। এ হিসেবে প্রায় ১০ ল টন চাল উৎপাদিত হবে। এ ছাড়াও বর্তমানে মধ্যম লবণ মাত্রায় প্রায় ৫ ল হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হচ্ছে।

এ সব এলাকায় লবণাক্ততার কারণে গড়ে প্রায় হেক্টর প্রতি ১.৫-২ টন ধান উৎপাদিত হয়। কিন্তু এ সব জমিতে বিনা উদ্ভাবিত উক্ত জাত দুটি চাষ করলে হেক্টর প্রতি গড়ে ৫ টনেরও অধিক ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। এ েেত্রও অতিরিক্ত ১০ টন ধান উৎপাদিত হবে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, শুধুমাত্র সাতীরা, বাগেরহাট ও খুলনা জেলার লবণাক্ত এলাকায় অতিরিক্ত প্রায় ২০ ল টন চাল উৎপাদিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। লবণাক্ত এলাকা ছাড়াও বৃহত্তর বরিশাল, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম জেলার লবণাক্ত এলাকায় এ প্রস্তাবিত জাতের চাষ করলে সার্বিকভাবে অতিরিক্ত প্রায় ৪০ ল টন চাল উৎপাদন করা সম্ভব হবে যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নবদিগন্তের সুচনা করবে।

ড. মির্জা জানান, চলতি বোরো মৌসুমে দুটি জাতের ২ টন বীজ উৎপাদিত হতে পারে। অধিক বীজ উৎপাদনের ল্েয এবং কৃষক পর্যায়ে বিতরণের জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) কে জাত দুটির বীজ সরবরাহ করা হবে ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।