আমি কেমনে তারে দেখি, তারই কাছে যাইতাম উইড়া- হইতাম যদি পাখি। । তার লাগিয়া পরান কাঁন্দে- জলে ভেজে আখি, কাছে পাইলে রাখতাম বুকে- করতাম মাখামাখি। । তার কারনে সব হারাইলাম- আর নাই কিছু বাকি, শায়খ বেধা পাখির মত- একা পড়ে থাকি।
। কেন এত পাষান সেযে- দেয় যে শুধুই
লাশ আর লাশ বাংলার বুকে এ যেন এক লাশের মহরা। আগুনের লেলিহান শিখা কেড়ে নিলো ১১৭ তাজা প্রাণ। আহত হয়েছে দুই শতাধিক। রাজধানীর নিমতলিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে।
স্বজন হারা মানুষের কান্না আর আহাজারীতে ভারী হয়ে উঠেছে ঢাকার আকাশ। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০৯ জনের লাশ দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার বাদ জুমা নাজিমউদ্দিন সড়ক দিয়ে স্বজনরা একের পর এক লাশ নিয়ে আসতে থাকেন আজিমপুর কবরস্থানে। এসময় আজিমপুর কবরস্থান এলাকায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়। বৃষ্টির কারণে লাশগুলো দাফনে কিছু সময় বিলম্ব হয়।
মানবিক দিক বিবেচনা করে সরকার ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। লাশগুলো পুড়ে অনেকটা কয়লা হয়ে গেছে। মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে বিয়ে বাড়ীতে আগত অতিথিদের। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছে বর আর কনে।
এ ঘটনায় আজ শনিবার জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করা হয়েছে।
গতকাল সারা দেশে মসজিদে মসজিদে দোয়া ও মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
দমকল বাহিনীর মহাপরিচালক শহীদুল্লাহ রাতে সাংবাদিকদের জানান, খবর পেয়ে সদরঘাট, লালবাগ ও মোহাম্মদপুর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। আগুন নিয়ন্ত্রণের পর উদ্ধার কাজ শুরু হয়। তিনি আরো জানান, ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন আশপাশের দোকানে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন পাশের আরেকটি ট্রান্সফরমারেও ছড়িয়ে পড়ে।
সরু গলি হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সমস্যা হয়। তার উপর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ায় এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। আলোর ব্যবস্থা করে দমকলকর্মীদের কাজ করতে হয়।
তিনি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যাওয়ায় সরাসরি অগ্নিদগ্ধ না হয়েও অনেকে মারা গেছে। দমকল বাহিনীর পাশাপাশি রেড ক্রিসেন্ট, র্যা ব ও পুলিশ উদ্ধার কাজ চালায়।
রাত আড়াইটার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল উদ্ধার কাজে যোগ দেয়।
রাজধানীর পুরান ঢাকার নিমতলি এলাকায় আগুনে হতাহতদের উদ্ধার অভিযান শুক্রবার ভোর ৫টায় সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আবু নাঈম মো. শহীদুল্লাহ গতকাল ভোরে জানান, আগুন সম্পূর্ণ নিভে গেছে। উদ্ধার তৎপরতাও শেষ হয়েছে। ভেতরে আর কোন লাশ নেই।
তিনি বলেন, ৮৭টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আশপাশের ভবনগুলোতে আর কোনো মৃতদেহ নেই। এ কারণে আমরা উদ্ধার অভিযান আপাতত শেষ করেছি। দমকল বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা শাহজাদী সুলতানা জানিয়েছেন, মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু নাইম মো. শহীদুল্লাহ শুক্রবার ভোর ৫টায় অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেন।
আগুন প্রাণ কেড়ে নিলো যাদের:
সকাল থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর শুরু হয়।
মানবিক দিক বিবেচনা করে সরকার ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। ৫টি লাশ শনাক্ত করা যায়নি। লাশগুলো পুড়ে অনেকটা কয়লা হয়ে গেছে। নিহতদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সেবিকা শামসুন্নাহার, তার মেয়ে চৈতি ও অদিতি, হাসান, বাবু, সুমাইয়া, নাসিমা ও সাবিনার পরিচয় মিলেছে। এছাড়া রুনার বিয়ের অনুষ্ঠানে, তার বাবা ওসমান মিয়া, মা ফাতেমা, খালা সাজেদা, মেহফুজ, খালাতো বোন সিমেন, অনিকা, আফরোজা মারা গেছেন।
নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই আগুনের ধোঁয়ায় শাসরুদ্ধ হয়ে মার গেছেন। রুনা বিউটিপার্লারে থাকায় মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ৫টি বাড়িতে আরো ১০/১৫ জন আটকা পড়েছে। তারা মারা গেছেন, নাকি বেঁচে আছেন এ ব্যাপারে কেউ কিছু জানাতে পারেননি। স্থানীয় সাইদ মো. ইসমাইল জানান, ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আসার আগেই এলাকাবাসী ১২টি লাশ উদ্ধার করে নিয়ে গেছে।
আকবর আলী নামের একজন বাসিন্দা বলেন, তার পরিবারের ১১ জন মার গেছেন।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির মালিক তিন ভাই গুলজার, ফারুক ও দিদার জানান, তারা ঘটনার সময় বাইরে ছিলেন। তাদের পরিবারের ১২ জন প্রাণ হারিয়েছে। সালমান নামের একজন জানান, তার মামা জামিলের সঙ্গে এলাকার রত্না নামের এক তরুণীর বিয়ের অনুষ্ঠান ছিলো। আগুনে তার নানি শাহজাদীসহ পরিবারটির ১২ জন মারা গেছে।
ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান সামন্ত লাল সেন বলেন, আমাদের সব চিকিৎসক ও সেবিকা কাজ করছে। এছাড়া রাত থেকেই সেনাবাহিনীর একটি চিকিৎসক দল সহায়তা করছে। তিনি জানান, অগ্নিদগ্ধ ৩০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সামন্ত আরো জানান, ৪০ বছরের পেশাজীবনে এক সঙ্গে এতো অগ্নিদগ্ধ রোগী তিনি দেখেননি।
ঘটনার পরপরই নিহতদের আত্মীয়-স্বজনসহ আশপাশের মানুষ ঘটনাস্থলে ছুটে আসে।
স্বজন হারানোদের আহাজারিতে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় হৃদয়বিদারক পরিবেশ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায়ও হতাহতদের স্বজনদের আর্তিতে ভারী হয়ে ওঠে।
নিমতলীতে শোকের মাতম
রাস্তায় সারি সারি লাশ। এক টুকরো কাপড় দিয়ে ঢাকা। দেহখানি ঝলসানো।
কিছুক্ষণ পরপরই উদ্ধার হচ্ছে লাশ। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্বজনদের কান্না আর আহাজারি। কান্নায় ভারী হচ্ছে পুরান ঢাকার নিমতলী এলাকা। মানুষের আর্তচিৎকার, কান্নাকাটিতে পুরো এলাকায় এক বীভিষীকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্বজন হারানোর বেদনায় বুক চাপড়াচ্ছেন সবাই।
ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে শতাধিক প্রাণহানির ঘটনায় চলছে শোকের মাতম।
নিমতলীর মত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিত্রও একই। হাসপাতাল জুড়ে স্বজন হারানোর চিৎকার। কিছুক্ষণ পর পর আসছে মৃত্যুর খবর। সেই সঙ্গে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হচ্ছে পুরো হাসপাতাল এলাকা।
এ ঘটনায় ওসমান মিয়ার পরিবারের ৮ জন আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। তার মেয়ে রুনার বাগদান অনুষ্ঠানে ওসমান মিয়া, স্ত্রী ফাতেমা, মেয়ে রুনা, রুনার খালা সাজেদা, মেজফুজ, খালাতো বোন সিমেন, অনিকা ও আফরোজা আগুনে পুড়ে নিহত হয়েছেন। ওসমান মিয়ার পরিবারের আরও এমন অনেক পরিবার রয়েছেন। ভয়াবহ এ অগ্নিকান্ডে হারিয়েছে বাবা, মা, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের। অনেকে সারারাত খুঁজে বেরিয়েছেন নিখোঁজ হওয়া স্বজনদের।
পরিস্থিতি সামাল দিতে চারদিকে পুলিশ ও র্যা ব ঘিরে রেখেছে। আগুনের খবর পেয়ে চারদিকে হাজার হাজার জনতা নিমতলীতে জড়ো হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ফায়ার সার্ভিসের গলি থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়।
তদন্ত কমিটি
ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ইকবাল হোসেন চৌধুরীকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের দুজন প্রতিনিধি রয়েছেন।
তাদেরকে সাতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
হতাহতদের পাশে জাতীয় নেতৃবৃন্দ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি হতাহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। আহতদের যথাযথ চিকিৎসা দিতে প্রধানমন্ত্রী সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালসহ (সিএমএইচ) সরকারি সব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার উপ প্রেস সচিব মাহবুবুল হক শাকিল।
বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যান।
তিনি নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে তাদের শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। তিনি আহতদের চিকিৎসার খোঁজ খবরও নেন।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হতাহতদের দেখতে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আফম রুহুল হক, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। এছাড়া আওয়ামী লীগের যুগ সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। হাসপাতালে আহতদের দেখতে এসে খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক জানান, প্রধানমন্ত্রী নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
অগ্নিকান্ডের সাথে সাথেই ঘটনা স্থলে ছুটে যান জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তারা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয় এবং আহতদের হাসপাতালে প্রেরণে সহায়তা করে। এ সময় জামায়াত নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন চকবাজার থানা আমীর মফিজুল ইসলাম, বংশাল থানার সেক্রেটারি এসএম আহসান উল্লাহ, ৬৯ নং ওয়ার্ডের সভাপতি এডভোকেট আবুবকর প্রমুখ।
হাসপাতালে কান্না
ডিএমসিএইচ মর্গের প্রবেশ দ্বারে এক সেবিকা ৬ বছরের এক শিশুর লাশের পাশে দাঁড়িয়ে হুহু করে কাঁদছিলেন। এসময় তিনি বলছিলেন, ওই আমার আল্লাহ শিশুটি যখন পুড়ে যাচ্ছিল তখন তার বাবা মা কোথায় ছিল।
তবে প্রত্যদর্শী ও উদ্ধারকৃত ব্যক্তিরা জানান, অনেক লোক জীবন্ত দগ্ধ হয়েছে এবং তারা তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অগ্নিকান্ডের হাত থেকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্ট চালিয়েছেন।
অগ্নিদগ্ধ আর আহতদের অধিকাংশই ঢামেক হাসপাতালে আনা হয়েছে। আহতদের অ্যাম্বুলেন্স ছাড়াও রিকশা ও রিকশা ভ্যানে করে চিকিৎসা দেয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আহতদের কিছু লোককে সলিমুল্লাহ মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে পুড়ে যাওয়া রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বার্ন ইউনিট চালু করা হয়েছে।
আজিমপুরে লাশের মিছিল
জুম্মার নামাজের পর পুরান ঢাকা থেকে একের পর এক লাশ আসতে শুরু করেছে আজিমপুর কবরস্থানে। নাজিমউদ্দিন সড়ক দিয়ে শুক্রবার বাদ জুম্মা ট্রাকে করে স্বজনরা নিয়ে আসছে এসব লাশ। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। লাশগুলো রাজধানীর পুরান ঢাকার নিমতলী এলাকার বৃহস্পতিবার রাতের আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারানোদের।
সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকা জানান, নিহত সবার দাফন আজিমপুর কবরস্থানে করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
কর্পোরেশনের উদ্যোগে কবর খোঁড়া হয়।
এদিকে ভোর সাড়ে ৬টা থেকে নিহতদের লাশ আত্মীয়-স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা শুরু হয়। মানুষের আর্তচিৎকার, কান্নাকাটিতে পুরো এলাকায় এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বজনদের খোঁজে সবাই বুক চাপড়াচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও র্যা ব এলাকাটি ঘিরে রাখে।
আগুনের খবর পেয়ে চারদিক থেকে হাজার হাজার জনতা জড়ো হয়।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।