আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

শেষ পর্যন্ত লেজই কুকুরকে নাড়াচ্ছে

জীবন বুনে স্বপ্ন বানাই মানবজমিনে অনেক চাষ চাই

দেশ চালানোর দায়িত্ব সরকারের। দেশের মানুষকে সব ধরনের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার নিজেই যখন জিম্মি হয়ে যায়, তখন দেশের মানুষ তার শেষ ভরসাটাও হারায়। দেশ চালানোর দায়িত্ব সরকারের বলেই দেশ চালানোর মতো ক্ষমতাও থাকা দরকার সরকারের। ক্ষমতাহীন সরকার দিয়ে দেশ চালানোর মতো দূরুহ কাজ সম্ভব নয়।

কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকার নয়, ব্যবসায়ীরাই এখন দেশ চালাচ্ছে। কুকুর লেজ নাড়াচ্ছে না, বরং লেজই এখন কুকুরকে নাড়াচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সরকারের বেঁধে দেয়া কোনো সিদ্ধান্ত মানবেন না দেশের চিনি আমদানিকারকরা। তারা বলছেন, চিনির ব্যবসা করি আমরা, কত দামে তা বাজারে বিক্রি করব তা আমরাই নির্ধারণ করব। সরকার চাপিয়ে দিলেই সেই দামে চিনি বিক্রি করা যাবে না।

আমাদের ব্যবসায় লাভক্ষতি গুনতে হয়। বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে চাইলে আপনারা সাংবাদিকরাও মিল চালাতে আমাদের উপদেষ্টা হতে পারেন। চিনির বর্তমান বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় দিনের বৈঠক শেষে গতকাল এ প্রতিবেদককে ক্ষোভের সঙ্গে এ কথাগুলো বলেন সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা সরকারকে কোনো পরামর্শ দিইনি। তাদের কোনো কথাও শুনিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী ডেকেছেন, এসেছি। চা খেয়ে চলে যাচ্ছি। এসময় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি আনিসুল হক, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, ইগলুর পক্ষ থেকে মহিউদ্দিন মোমেন, চিনি ডিলার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলসহ অপরাপর নেতারা উপস্থিত ছিলেন। জানা গেছে, চিনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব বিকাশ চন্দ্র সাহা বাণিজ্যমন্ত্রীকে জানান, গত ৭ দিনের আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুসারে হলেও প্রতিটন র’ সুগার রিফাইন করে সকল প্রকার ভ্যাট ট্যাক্স পরিশোধ করে এর সঙ্গে মালিকের মুনাফা যোগ করে প্রতি কেজি চিনির দাম পড়ে গড়ে সর্বোচ্চ ৩৭ থেকে ৩৮ টাকা। এ হিসাব বিবেচনায় এনে সরকার মিলগেটে বিক্রির জন্য প্রতি কেজি চিনির দাম বেঁধে দিতে চায় ৪০ টাকা দরে।

এখানেই আপত্তি ব্যবসায়ীদের। মিলগেটে বিক্রি জন্য সরকারের বেঁধে দেয়া মূল্য তারা মানতে রাজি নন। ব্যবসায়ীরা মিলগেটে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি করতে চায় ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা দরে। তাতে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনির বিক্রয়মূল্য হবে কমপক্ষে ৫০ থেকে ৫২ টাকা। উপ-সচিবের দেয়া তথ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন চিনি ব্যবসায়ীরা।

বৈঠক শেষে তারা একে অপরকে বলেন, ভবিষ্যতে মন্ত্রীর সঙ্গে কোনো বৈঠকে উপ-সচিব বিকাশ চন্দ্র সাহা থাকলে ব্যবসায়ীরা তাতে অংশ নেবেন না। চিনি ব্যবসায়ীর আরও কাণ্ড : চট্টগ্রামের এক শীর্ষ আমদানিকারক বর্তমানে দেশের চিনির বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির নেপথ্যে কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে জানা যায়, তথাকথিত ডেলিভারি অর্ডারের (ডিও) নামে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার অস্থিতিশীল করে তুলছেন ওই আমদানিকারক। আমদানি করা ও দেশে উৎপাদিতÑ দুধরনের চিনির বাজারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ওই ব্যবসায়ীর। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন কয়েকটি চিনি রিফাইন্ড মালিক।

দু’ধরনের ডিও নামে-বেনামে সংগ্রহ করে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে। ডিও জিম্মি করে দাম কমানো ও বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারকে অস্থির করার নেপথ্যে রয়েছে এই চক্র। উদ্দেশ্য রমজান সামনে রেখে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা। আমদানিকারক এই প্রতিষ্ঠানটি নামের আদ্যক্ষর হচ্ছে ‘আ’ ও ‘ব’। আগের দুদিনের চেয়ে গতকাল দাম কমে পাইকারি বাজারে চিনির ডিও বিক্রি হয়েছে মণপ্রতি ১ হাজার ৬৪০ টাকা।

কিন্ত খুচরা বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়ছে না। কারণ পরদিন আবার দাম বেড়ে যেতে পারে। বিগত এক মাসে চিনির দাম মণপ্রতি ৪০০ টাকা বেড়েছে। গত রোবববার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিয়ে অভিযুক্ত ওই ব্যবসায়ী দাম নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। অভিযোগে আরো জানা যায়, ওই আমদানিকারক ওয়ান ইলেভেনের কয়েক মাস আগে চিনির এলসি আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বাজার থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন।

তখনকার আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য ২৮৫ ডলার থাকলেও ব্যাংক থেকে এলসি খোলা হয়েছিল ৫৫০ ডলার দরে। এর ফলে আন্ডার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে বিপুল অংকের টাকা এই আমদানিকারক হাতিয়ে নেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে অনুসন্ধান চালালেই প্রমাণাদি বেরিয়ে আসবে বলে চিনি ব্যবসায়ীরা মনে করছেন। রমজানে অন্যতম ভোগ্যপণ্য চিনির চাহিদাও বেড়ে যায়। বর্তমানে আমদানি করা এবং দেশে তৈরি সিটি, মেঘনা গ্র“প ও আবদুল মোনায়েমসহ সাতটি রিফাইন্ড মিলের দু’ধরনের চিনির দাম বেড়ে খুচরা বাজারে চিনি কেজি প্রতি ৪৮ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে সর্বশেষ বুকিং দর ৫৮০ ডলার দাঁড়িয়েছে। চটগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে ল্যান্ডিং কস্ট পড়বে ৬০০ ডলারের কাছাছাছি। ফলে খোলা বাজারে রমজানে চিনির কেজি ৬০ টাকা পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন কথা হল, খোলা বাজার অর্থনীতির নাম করে দেশের তাবৎ মানুষের ভাগ্য কয়েকটি অতিলোভী মানুষের হাতে তুলে দেয়া কি সরকারের দায়িত্ব ? খোদ সরকারকে না মানার হুমকি দেয়ার ক্ষমতা তারা পায় কোথায় ? অনৈতিকপন্থায় তারা ইচ্ছামতো উপার্জন করার পরও তাদের শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা কারো নাই কেন ? সাধারণ মানুষকে তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে সহায়তা করা সরকারের দায়িত্ব। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো কোন মুনাফাখোরের হাতে ছেড়ে দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়।

বরং এসব মুনাফাখোরের হাত থেকে দেশের সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর দায়িত্ব সরকারের। এর জন্য একচ্ছত্রভাবে বাজারকে মুনাফালোভীদের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত হয় নি। বাজার অর্থনীতির থিউরি কপচে বাজারটাকে কয়েকজনের সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেয়া কোন বুদ্ধিমানের কাজ হয় নি। আমাদের ব্যবসায়ীদের মুনাফালোভী চরিত্রের সাথে বাজার অর্থনীতির থিউরি মেলে না। তারা বাজার অর্থনীতির পুরো সুফল নিজেদের ঘরে তুলছেন এবং জনগণের পকেট সাফ করে সিন্ডিকেট ব্যবসা করছেন।

বাজার অর্থনীতি কোন সিণ্ডিকেটকে সমর্থন করে না। বাংলাদেশের বাজার অর্থনীতি পুরোপুরি মুনাফাখোরদের হাতে জিম্মি। এই সিন্ডিকেট ব্যবসাকে বন্ধ করতে হবে। তাই ব্যবসায়ীদের পিঠে হাত বুলিয়ে লাভ নাই, বরং টিসিবির মাধ্যমে সরকারকে বাজারে পণ্য ছেড়েই বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নইলে বার বার লেজই কুকুরকে নাড়াতে থাকবে।

খবরের সূত্র ০১ খবরের সূত্র ০২


এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।