কাজের সূত্রে ঘুরে বেড়াতে হয় প্রায়ই, এটা আমার জন্য নতুন কোন ব্যপার না। বরং অনেক দিন একজায়গায় থাকলেই কেমন যেন হাপিয়ে উঠি। ঘনিষ্ট বান্ধবী ফোন করল খোশ গল্প করার জন্য, যখন শুনলো সামনে এক সপ্তাহ কঠিন রুটিন। অতি আহ্লাদের সাথে বলল, "এই বৃষ্টিতে কোথায় যাবা, যত্তসব। " "এই বৃষ্টিতে কি অন্য সব কাজ বন্ধ আছে? নাকি তোমার অফিসের ট্রেনিং গুলো দেয়া বন্ধ করে রেখেছ? এইটা কি ধরনের কথা বললা?"একসাথে আমার এত্তগুলো কথা শুনে হার মানলো।
তারপরও তার কথা, "হুম তুমি তো সবই পারো"। সে যাত্রা আমাদের আলাপ ওখানেই শেষ হল। আমার মনে খচখচ করছিল, আমি কি বেশীই পারি, কেন আমার ও মনে হয় না এই বর্ষায় ট্যুর, অসম্ভব! পরে নিজের ভাবনায় নিজেরই হাসি পেল। কাজের সাথে শীত বর্ষার কোন অজুহাত কি চলে? না চলে না। কাজেই আমি মোটেই বেশী পারি না।
---------------
ফিলিপিন থেকে আমার সুপারভাইজার এসেছেন, দু তিনটা কাজ একসাথে চলবে তাঁর। খুলনা ট্রিপ এর সিডিউল করার সময় উনার মনে হল, আইলা বিধ্বস্ত এলাকা ঘুরে দেখবেন, আমাদের রুটিন কাজের মধ্যে সেটার জন্য সময় এবং যাতায়াত এর ব্যবস্থা করা হল। আমার একজন অসম্ভব কর্মঠ কর্মী আছে, হুকুম করা মাত্র কাজ হাসিল করে ফেলতে পারে, শুধু কড়ি ঢালতে হবে ঠিকমত। কাজেই সব রুটিন একেবারে ঠিকঠাক।
চালনা বাজার থেকে আমরা স্পিড বোট এ উঠলাম, কালীনগর গন্তব্য।
কি কারনে আমরা কেউ সাথে ছাতা বা রেইন কোট কোনটাই নেইনি, ভুলে গেছিলাম। আকাশে মেঘের আনাগোনা ছিল, ছায়ায় ছায়ায় দুরন্ত বেগে চলতে ভালই লাগছিল। চলতে চলতে আমরা পড়লাম ভদ্রা নদীতে, কিছুদুর যাবার পর দেখা গেল সামনে ঝুম বৃষ্টি, আমাদের সাথে সব মুরুব্বী স্যার রা ভিজতে চাইছিলেন না, দুটো ছাতা ছিল স্পীড বোটে সেটি দিয়ে দুজন কে আধো আধো বাঁচানো গেল, কারন বৃষ্টির যা জোর! আমি মনের আনন্দে বসে বসে ভিজলাম, একেবারে কাক ভেজা। সে আনন্দ প্রকাশ করা যায় না, মনে মনেই অনুভব করলাম; নইলে আমার কলিগরা আমাকে পাগল বলতে পারে।
কালীনগর এ এমপি ছিলেন, আরো অনেকে ছিলেন; ওখানে যাবার পর যেন স্বপ্ন থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম।
আইলার ক্ষতি, কারন এবং ভবিষ্যতে আমরা কি কি করতে পারি তা নিয়ে আলাপ হল। স্থানীয় লোকজন এবং আমাদের ধারনা/জ্ঞান দুটো মিলে কিছু কিছু সমাধান বের কারা হল। রাস্তার উপর সারি সারি মানুষের বসতি, মানবেতর বসবাস, জীবন যাপন.........যে বর্ষা নিয়ে ক্ষানিক আগেও আমি রোমান্টিকতা করছিলাম, সে বর্ষা তাদের দুর্ভোগকে বাড়িয়ে দিচ্ছে শতগুন। আগামী শীতের আগে এসব মানুষগুলো তাদের ভিটেমাটিতে ফিরতে পারবে না, সেখানে এখন ভাটায় হাটু পানি......জোয়ারে গলা পানি। কিছু কিছু বাঁধ বেঁধে জমি জাগানোর চেষ্টা চলছে, সেখানে আমন ধান করার চেষ্টা হবে।
এখানে নতুন যে তথ্যটা জানলাম, আইলার ধ্বংসলীলা এখানটায় যতটা হয়েছে.....নদীর ওপারের পোল্ডারে ততটা হয়নি। কারন হল.......এখানকার মূল জীবিকা ছিল বাগদার চাষ। বাগদা চিংড়ির ঘের করবার জন্য, ঘেরে পানি ঢুকাবার জন্য যার যখন প্রয়োজন, যেভাবে প্রয়োজন ইচ্ছেমত যত্রতত্র বাঁধের মাটি কেটে নিয়েছে; বাঁধটাকে দূর্বল করে ফেলেছে। ফলে আইলার পানির তোড়ে পুরো বাঁধটাই ভেঙ্গে গেছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর, কয়রা প্রতিটা এলাকাতেই একই কারন, একই চিত্র।
এসব এলাকার মানুষ এখন জেনেছে, বাঁধ এভাবে ইচ্ছেমত কাটা যাবে না, বড় বেশী মূল্য দিয়ে এরা এ সত্যটা বুঝলো।
.
সুপারভাইজার আমাকে আরো কিছু বাড়তি কাজ চাপিয়ে দিলেন........পন্ডিত সুপারভাইজার নিয়ে বেশী ঘুরাঘুরি করার এই হল ফল। যা কিছু দেখেন, করতে চান, অতপর বলেন "শ্রাবনসন্ধ্যা উইল ডু ইট"।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।