ভালো আছি
যারা কুং-ফু সম্মন্ধে সামান্য খোঁজ খবরও রাখেন কিংবা জেট লী, জ্যাকি চ্যান, ব্র“স লী এদের ভক্ত তাদের কাছে ‘শাওলিন টেম্পল’ নামটি অচেনা নয় নিশ্চয়। চীনের হেনান প্রদেশে অবস্থিত এক সময়কার চীনের রাজধানী লুইয়াং থেকে ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে অনেক বিস্ময়কে সাথী করে দাড়িয়ে আছে অন্যরকম এই উপাসনালয় ‘শাওলিন টেম্পল’।
বর্তমানে এখানে সন্ন্যাসীর সংখ্যা প্রায় আশি। এদের ‘সন্ন্যাসী’ নামকরণে অবাক হতে পারেন অনেকে। ভাবতে পারেন কুং-ফু’র মত ভয়াবহ লড়াইয়ে যারা সিদ্ধহস্ত তারা কেমন করে সন্ন্যাসী হন? আসলে এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে ইতিহাস।
দেড় হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে এই অঞ্চলে সূচনা হয় ‘জেন’ নামক বৌদ্ধধর্মের একটি ধারা এবং একই সাথে যাত্রা শুরু করে কুং-ফুও। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ‘জেন’ আর ‘কুং-ফু’ চলে গেছে দু’পথে। কিন্তু শাওলীন টেম্পলের সন্ন্যাসীরা ‘জেন’ আর কুং-ফু’ এই দুই জীবনাদর্শকেই গ্রহণ করে নিয়েছেন তাদের জীবনে। তাই ধর্মের স্থিরতা আর মানসিক দৃঢ়তা তাদেরকে করেছে শান্ত, সৌম্য। পাশাপাশি কুং-ফুর কলাকৌশল তাদেরকে করছে ক্ষিপ্র ও শক্তিশালী।
সব মিলিয়ে শাওলীন টেম্পলের অধিবাসীদের সবচে উপযোগী নাম হবে বোধ হয় ‘যোদ্ধা সন্নাসী’।
বছর তিরিশেক আগেও শাওলীন টেম্পল এর কার্যক্রম বাইরের পৃথিবীর কাছে ছিল অনেকটাই অজানা আর রহস্যময়। শাওলীন টেম্পল তখনও ছিল সাধারণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। পরবর্তীতে কুং-ফু বিষয়ক চলচ্চিত্র আর শাওলীন সন্ন্যাসীদের নানান প্রদর্শনীর মাধ্যমে শাওলীন টেম্পল এর নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারদিকে। দেশি- বিদেশী পর্যটকদের জন্য শাওলীন টেম্পল হয়ে ওঠে জনপ্রিয় একটি পর্যটন কেন্দ্র।
খুব ভোর বেলা আরম্ভ হয় এই উপাসনালয়ের কর্মকাণ্ড। প্রথমেই দীর্ঘ সময় ধরে ধ্যান চর্চা করেন সন্ন্যাসীরা। তারপর ধ্যানের শেষে শুরু হয় কুং-ফু প্রশিক্ষণ। এটিও চলে দীর্ঘ সময় ধরে। তারপর পাঠ করা হয় পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ।
এরপর আরম্ভ হয় জাগতিক কাজ। বেঁচে থাকবার জন্য রুটি রুজি যোগাড়ও তো করতে হবে। এজন্য শাওলীন সন্ন্যাসীরা পর্যটকদের আকৃষ্ট করবার জন্য ব্যবস্থা করেন নানারকম শারীরিক কলাকৌশল প্রদর্শনীর আয়োজন। এছাড়া শাওলীন টেম্পল বিষয়ক নানারকম স্যুভেনির বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। এধরনের জাগতিক কাজে সন্ন্যাসীরা মন থেকে সায় পান না ঠিকই, কিন্তু নিজেদেন অস্তিত্বকে রক্ষা করবার জন্য এসব অপ্রিয় কাজগুলোও ভীষণ নিষ্ঠা আর অধ্যবসায়ের সাথেই তারা সম্পন্ন করেন।
প্রতি বছর হাজার হাজার কমবয়সী ছেলে শাওলীন টেম্পলে এসে হাজির হয় কুং-ফু শিখবে বলে। আগ্রহী এই শিশু-কিশোর-তরুণদের জন্য উপাসনালয়ের চারপাশে স্থাপন করা হয়েছে কুড়িটি স্কুল। নাম স্কুল হলেও মোটেও সহজ সরল নয় এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো। একবার ভর্তি হয়ে গেলে দেখা যাবে অসম্ভব কষ্টসহিঞ্চুতা, ধৈর্য, নিষ্ঠা আর অধ্যবসায় ছাড়া ওখান থেকে শেখা যায় না কিছুই। নিয়ম কানুন ভীষণ কড়া, পান থেকে চুন খসবার উপায় নেই।
সপ্তাহে একদিন ছুটি, বাকি ছ’দিনই চলে কঠিন প্রশিক্ষণ। প্রতিদিন চারটি সেশনে ভাগ করা সময়ে সারাক্ষণই কঠোর প্রশিক্ষণ। ওখানে নিজেদের সবকাজ করতে হয় নিজেদেরকেই। কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে অন্য যে কোন কাজ করতে অন্যের সাহায্য পাওয়া যায় না। খাবার পরিবেশন করা হয় উপাসনালয়ের সামনে খোলা জায়গায়।
এমনকি যখন বরফ পড়ে, হাড় কনকনে ঠাণ্ডা চারদিকে, তখনও খেতে হয় বাইরে বসেই। রাতে শোবার জন্য রয়েছে লম্বা হলঘর। সেখানে শিক্ষার্থীরা পাশাপাশি শুয়ে ঘুমোয় অঘোরে। সারাদিন পরিশ্রমের পর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চায় শরীর, বিছানাই পিঠ ঠেকা মাত্রই দুই চোখ বুজে আসে নিজেরই অজান্তে। এই কঠোর নিমানুবর্তিতার মাঝে বিনোদনের জন্য সময় বরাদ্দ রয়েছে সপ্তাহের একটি দিনের ঘন্টা কয়েক।
ওই দিন খোলা জায়গায় প্রজেক্টরের মাধ্যমে একটি সিনেমা দেখাবার আয়োজন করা হয়। বেশিরভাগ সময়ই সিনেমাগুলো হয় কুং-ফু বিষয়ক।
সারাটা সপ্তাহ কঠিন নিয়মের মধ্যে কাটানো প্রশিক্ষণার্থীরা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে এই ক’টা ঘন্টার জন্য। মুগ্ধ চোখে সবাই তাকিয়ে থাকে সিনেমার ঝলমলে জীবনের দিকে। হয়তো কল্পনায় নিজেকে ভেবে নেয় সিনেমার ওই দুর্ধর্ষ কুং-ফু দক্ষ নায়কের জায়গায়।
তবে কুং-ফু’র পাশাপাশি চীনের ভাষা অর্থাৎ ম্যান্ডারিন এবং অংক-ও শিখতে হয় এখানকার প্রশিক্ষণার্থীদের। তবে মূল মনোযোগ এবং একাগ্রতা থাকে একদিকেই কেন্দ্রীভূত। আর সেই দিকটে হচ্ছে এক এবং অদ্বিতীয় কুং-ফু।
যতদূর জানা যায়, শাওলীন টেম্পলের এই বিশেষ চর্চার আগমন ঘটে ভারতীয় সন্তবোধিধর্মের মাধ্যমে। আর এই ‘কুং-ফু’ নামক অসামান্য শিল্পটির অনন্যসাধারণ কৌশল আর ভঙ্গিগুলো ধার করা হয়েছে বিভিন্ন জীবজন্তুর নানান রকম ভঙ্গিমা থেকে।
বাঘ, ঈগল, সাপ, ভালুক, ড্রাগন ইত্যাদি নানান জীবজন্তু কীভাবে কোন পদ্ধতিতে আক্রমণ করে, মুহূর্তের মধ্যে সরে যায় শত্র“র নাগালের বাইরে, কীভাবেই বা ছোটে বিদ্যুৎগতিতে এসব কিছু পর্যবেক্ষণ করে তার নির্যাসগুলো নিয়ে আসা হয়েছে কুং-ফুতে। কুং-ফু নিয়ে শাওলীন টেম্পলে প্রচলিত রয়েছে একটি প্রবচন ‘আত্মরক্ষা কর কুমারী মেয়ের মত, আর আক্রমণ কর বাঘের মত,’ অর্থাৎ লড়াইয়ে সাহসের পাশাপাশি সতর্কও হতে হয় না হলে সমূহ বিপদ।
কথিত আছে বোধিধর্ম চতুর্থ শতকের সূচনাকালে ভারত থেকে চীনে এসেছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রচারের জন্য। শাওলীনে তিনি খোঁজ পান ‘জেন’ মতাবলম্বীদের। যাদের বিশ্বাস ছিল যে নিবিড় তপস্যা এবং আত্ম-অনুসন্ধানের মাধ্যমে বোধি বা নির্বাণ লাভ করা যায়।
তারা জোর দিয়েছিলেন নিজের অন্তরের খোঁজ করা এবং একাকী তপস্যার উপর। বোধিধর্মও এই মতে উপাসনালয়ের উপরের পাহাড়ের নির্জন এক গুহায় দীর্ঘ নয় বছর নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তপস্যায়। বলা হয়, সেই সময়ে তার ছায়া নাকি গুহার দেয়ালের গায়ে বসে গিয়েছিল চিরস্থায়ী ভাবে। সেই ছায়া খোদাই করা প্রস্তর খণ্ডটি শাওলীন টেম্পলে সংরক্ষিত আছে আজও।
সুই সাম্রাজ্যের (৫৮১-৬১৪ খ্রিস্টাব্দ) পর সম্রাট ‘ওয়েন ডি’ শাওলীন টেম্পলের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন পাহাড়ী অঞ্চলের বিশাল এক খণ্ড জমি।
ওখানকার কুং-ফু কৌশলে পারদর্শী একদল সন্ত হয়ে ওঠেন ভীষণ জনপ্রিয়। তাদের অসামান্য কৌশল আর ক্ষিপ্রতার কথা কিংবদন্তীর মত ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। সত্যের পাশাপাশি নানারকম অতিকথনের মধ্য দিয়ে শাওলীন টেম্পল হয়ে ওঠে রহস্যময় এক স্থান। ‘জেন’ ধর্মাচার আর শাওলীন কুং-ফু চীন পেড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে জাপানসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও। যুয়ান সাম্রাজ্যে (১২৮০-১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দ) শাওলীন কুং-ফুর জনপ্রিয়তা হয়ে ওঠে আকাশচুম্বী।
সেসময় প্রায় কুড়ি হাজার সন্ন্যাসী শাওলীন টেম্পলে প্রশিক্ষিত হয়েছিল। এরপর সময়ের সাথে সাথে এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা স্তিমিত হয়ে আসে। ১৯২৮ সালে শাওলীন টেম্পলে চলে ব্যাপক লুটতরাজ, ধরিয়ে দেওয়া হয় আগুন। বেঁচে যায় সামান্য কিছু স্থাপনা। এই গুটিকয় স্থাপনাগুলোও ১৯৪৯ সালের কম্যুনিস্ট বিপ্লবের পর থেকে হতে থাকে অবহেলিত।
উপাসনালয়ের দেয়ালে ধরে ফাটল। অযতœ আর অবহেলায় পড়ে থাকে শাওলীন টেম্পল।
অবশ্য বর্তমানে অবস্থার অনেক উন্নতি ঘটেছে। উপাসনালয়ের মূল স্থাপনাগুলো তৈরি করা হয়েছে নতুন ভাবে। আবারও অনেক অনেক শিক্ষার্থী আর সন্ন্যাসীতে ভরে উঠেছে শাওলীন টেম্পলের চত্বর।
সকাল বেলাতেই শুরু হয়ে যায় নতুন দিনের কর্মচাঞ্চল্য। ধ্যান চর্চার পর শুরু হয়ে যায় কুং-ফু শিখবার কঠিন চর্চা। কেউ বালির বস্তায় লাথি কষায় জোরে জোরে বারংবার, কেউ চর্চা করে নানারকম অস্ত্র তরবারি চালনা, কেউবা শরীরকে পোক্ত করতে করে নানারকম কসরত। আর এসব কিছুই পরিচালিত হয় কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্য দিয়ে । এতটুকু এদিক ওদিক করবার কোন উপায় নেই।
ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে পড়ে উপাসনালয়ের সবাই। শুরু হয়ে যায় ধ্যান চর্চা, অতঃপর কুং-ফু। একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠবে, বিছানায় গড়িয়ে নেবে যখন তখন, এমনকিছু কল্পনাতেও আনা যায় না শাওলীন টেম্পলে।
স্থানীয় তথা চীনের অধিবাসী ছাড়া শাওলীন টেম্পল থেকে সত্যিকারের শিক্ষা অর্জন করা ভীষণ কঠিন ব্যাপার। মনের শুদ্ধতার সাথে কুং-ফু’র অসামান্য শারীরিক দক্ষতার কীভাবে মিশেল ঘটানো যায় তার নানান গোপন কলাকৌশল বিদেশীদের কাছে সহজে ভাঙতে চান না সন্ন্যাসীরা।
এজন্যই বলা হয় যে শাওলীন টেম্পলের সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে কিছু শিখতে হলে আগে তার বিশ্বাসভাজন হতে হবে, হতে হবে বন্ধু। নচেৎ ‘দিল্লী দূর অস্ত’ই থেকে যাবে, শেখা হবে না কিছুই। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশ, যেমন থাইল্যান্ড আর লাওসে তীর্থে আসা সন্ন্যাসীদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন সরকার কিংবা দেশবাসীরাই, চীনে তেমন রেওয়াজ নেই। ফলে নিবিষ্ট মনে শুধু ধ্যান এবং কুং-ফু চর্চা করে যাবেন তার উপায় নেই শাওলীন টেম্পলে। উপার্জনের ব্যবস্থাও করতে হয় নিজেদেরকেই।
স্যুভেনির বিক্রির দোকানের পাশাপাশি নানান রকম প্রদর্শনীরও আয়োজন করে থাকেন সন্ন্যাসীরা। ২০০০ সাল থেকে শুরু হয়েছে ‘আগুনের চাকা’ নামের এমনই এক আয়োজন। এই প্রদর্শনীতে কুং-ফু’র অসামান্য সব কৌশল এবং নাটকের মত দৃশ্য পরম্পরার মাধ্যমে তুলে ধরা হয় শাওলীন টেম্পলের ঐতিহ্য। আর এজন্য দর্শনী হিসাবে পকেটের টাকা খরচ করে টিকিট কিনতে হয়। অর্থাৎ দিনকাল এমনই দাড়িয়েছে যে সন্ন্যাসী হয়েও রক্ষে নেই।
টাকার খোঁজে বেরোতেই হয়, তা সে যত অপছন্দই হোক না কেন।
(সংগৃহীত)
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।