আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আমার ডেঙ্গুকাহিনী ২

skype :: hasib.zaman

আমার ডেঙ্গুকাহিনী ১ প্রথম পর্বের পর থেকে ওয়ার্ডের ডাক্তার আমাদেরকে তাজ্জব করে দিয়ে বলে ডেঙ্গু হয় নাই। সে উলটো এন্টিবায়োটিক দিয়ে আমাকে রাত একটার সময় বাসায় পাঠিয়ে দেয় আর প্রবলেম হলে আবার আসতে বলে। অথচ ডেঙ্গু রোগীদের এন্টিবায়োটিক নিষিদ্ধ!!! খুশী মনে বাসায় ফিরি, যাক ডেঙ্গু হয় নাই। আমার নিজেরো একটা কনফিডেন্স ছিল- আমি থাকি সারাদিন মশারীর ভিতর, আমার আছে অত্যাধুনিক মশক নিধন র‌্যাকেট, ডেঙ্গু আমার হতে যাবে কোন দুঃখে?? পরদিন সকালে জ্বর মাপতে গিয়ে দেখি একশই আছে। কিন্তু দিনের আলোয় ভয়ানক যে জিনিস টা আবিষ্কার হল, আমার সারা শরীরে ছোট ছোট লাল গুটির মত র‌্যাশ উঠসে আর চোখের কোঠায় রক্ত জমসে।

কেউ কেউ দেখে বলল, মনে হয় হাম হইসে। এই ১৬ বছর বয়সে হাম! ব্যাপারটা আমার জন্য লজ্জাজনক। হাম তো সেই পিচ্চিকালে একবার হইসে, জীবনে এটা একবারই হয় জানতাম। সব কাজকর্ম বাদ দিয়ে বাবা তখনি আমাকে নিয়ে ডিএমসি ছুটল। আবার সেই একই প্রসেস।

প্রথমে ইমার্জেন্সী তারপর লম্বা করিডর ধরে ওয়ার্ড নাম্বার ১, পুরাই পেইন। ছোটখাট সুন্দরমত এক ডাক্তার আমার সবকিছু দেখে বলে, ওর তো ডেঙ্গু হইসে, এখনি ভর্তি করান। রাতের ঘটনা তাকে খুলে বললে বিরক্ত হয়ে বলল, ওই ডাক্তারকে গিয়ে খুঁজে বের করেন। আমি পুরোপুরি হতাশ। এখানে থাকতে হবে আমাকে, চারদিকে কেওয়াজ- নানান কিসিমের মানুষজন।

এটা নাকি ডেঙ্গু ইউনিট। আমার ধারনা হল ডেঙ্গু যদি আমার নাও হয়ে থাকে এখানে থাকলে নির্ঘাত হবে, কোন রক্ষা নেই। বাবাকে বললাম কেবিন নিতে, কিন্তু কয়েকজন আংকেলকে ফোন করেও কেবিন পাওয়া গেল না। প্রাইভেট হসপিটাল গুলোতে যোগাযোগ করা হল কিন্তু তারা ডেঙ্গু রোগী রাখতে রাজী না!! অগত্যা ওখানেই একটা বেডে গাঁটছড়া বাধলাম, যে হারে রোগী আসতেসে পরে এটাও পাওয়া যাবে না। সত্যি সত্যিই কিছুক্ষন পর দেখি একটা বেডও ফাকা নাই, মানুষজন বারান্দায় আস্তানা গাড়তেসে।

আবার টেস্ট করা হল, এবারে প্লেটলেট কাউন্ট আশি হাজার। আমি ভয়ে আধমরা, এভাবে মাইনাস হতে থাকলে তো আমি আর নাই। একটা স্যালাইন দিয়ে আমাকে আপাতত সাইজ করা হল। আমার দেখাশোনার দায়িত্ব নিলেন দু একজন নার্স (নারী-পুরুষ উভয়ই), এখানে আসার আগে আমার ধারনা ছিল নার্স মাত্রই মহিলা। কিছুক্ষন পর অল্পবয়স্ক কিছু ডাক্তারের ভীড় লক্ষ করা গেল ওয়ার্ডে।

এদের মধ্যে একটা গ্রুপ আমাকে ঘিরে জটলা পাকালো। তারা নানান প্রশ্নবানে আমাকে জর্জরিত করল। স্টেথোস্কোপ, প্রেশার মাপার যন্ত্র ইত্যাদি দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মনোযোগ সহকারে খাতায় টুকলিফাই করল। এতগুলো ডাক্তার আমাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে ভেবে আমি খুশী হলাম, কারন এদের মধ্যে কয়েকজন ডাক্তার আপুও ছিল। ওই বয়স থেকে আজ অবধি সাদা এপ্রন পরা সেবাপরায়না আপুদের দেখলে কেন যেন আমার মন ভাল হয়ে যায়।

একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এদের সবাইকে ডেকে সিরিয়াস ভঙ্গিতে লেকচার দিতে শুরু করলে আমার ভুল ভাঙ্গে। আরে এরা তো মেডিকেলের পোলাপান। আমাকে নিয়ে এতক্ষন প্রাক্টিকাল ক্লাস করসে!!! এদের এতসব প্রশ্নের উত্তর দিলে আমার রোগমুক্তি হবেনা, এখান থেকে ছাড়াও পাওয়া যাবে না। নাহ, আর এদেরকে চান্স দিব না। বিকেলের দিকে আমার দর্শনার্থী আসা শুরু হল।

মামা-চাচা, নানা-নানী থেকে শুরু করে ঢাকায় থাকে এমন প্রায় সব আত্মীয়-স্বজন আসলেন। এমনকি আমার কোচিং এর ম্যানেজার ও এলেন। তাকে বাবা দায়ী করলেন যে ওখান থেকেই আমি আক্রান্ত হইসি। তিনি আমতা আমতা করে আমার পড়াশুনার গুনগান করে প্রস্থান করলেন। আমার বেডের আশপাশে নানাবিধ ফল-ফ্রুটের আনাগোনা লক্ষ করা গেল।

যতদূর মনে পরে মেডিকেলের বিখ্যাত খানা আমি খাই নাই। আমার জন্য চাইনিজ স্যুপ আনা হইছিল। কিন্তু গলায় বেশ ব্যাথা থাকায় আর ডেঙ্গুর ভয়ে আমি কিছুই উপভোগ করতে পারিনি। (চলছে)

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।