আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মুভিরিভিউ: কমল হাসানের 'বিতর্কিত' বিশ্বরূপ

Shams ছবি : বিশ্বরূপকাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা : কমল হাসান অভিনয়ে : কমল হাসান, রাহুল বসু, পূজা কুমার, আন্দ্রিয়া জেরেমায়া, শেখর কাপুর, নাসের, জয়দীপ আহলাওয়াত। অভিনয় আর চিত্রনাট্য দুরন্ত। সিনেম্যাটোগ্রাফি টক্কর দেয় হলিউডের সঙ্গে। শুধু অনুভব আর উপভোগের জন্যই ‘বিশ্বরূপম’ গোড়ার কথা প্রতি পদে কাহিনির মোড় ঘোরানো স্পাই থ্রিলার? নাকি, সেলুলয়েডের মোড়কে ধর্মীয় আবেগে আঘাত হানার ‘স্টেটমেন্ট’? নিজের বাড়ি-গাড়ি -সম্পত্তি বাঁধা রেখে ৯৫ কোটি টাকা দিয়ে ‘বিশ্বরূপম ’ বানিয়েছেন তিনি। সেই কমল হাসান বলছেন, ‘জঙ্গিদের কোনও ধর্ম হয় না।

তারা মানুষের শত্রু। এ বার কি জঙ্গিদেরও সজ্জন বলে দেখাব? এত বিতর্ক কেন? ভারতীয় মুসলিমদের তো ভালো বলেই দেখানো হয়েছে। ' অযথা বিতর্কের হট্টরোল তোলা ‘বিশ্বরূপম’-এর স্টেটমেন্ট এটাই! এ ছবিকে যদি ইসলামবিদ্বেষী বলা হয়, তা হলে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য, ২৬/১১ -র মূল চক্রী হাফিদ মহম্মদ সইদকে সন্ত্রাসবাদী বলাও কি ইসলামের বিরোধিতা? আল্লা, নবি মহম্মদ আর পবিত্র কোরানকে কলঙ্কিত করে জিহাদের নামে আমির আজমল কাসভ নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করলে সাতখুন মাফ, আর সেটা সিনেমায় দেখালেই অপরাধ? সন্দেহ নেই, ‘বিশ্বরূপম ’-এ একটা স্টেটমেন্ট আছে। বেশ জোরালো ভাবেই। কিন্ত্ত তা ধর্মীয় নয়, বরং মানবিক স্তরে খুব সন্তর্পণে উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন হাসান।

ভারতীয় চলচ্চিত্রে ৫২ বছর কাটিয়ে ফেলা অভিনেতা -পরিচালকের বার্তা, আমরা পক্ষ নিই বা না নিই, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই আসলে এক বিশ্বজনীন বাস্তবতা। সে জন্যই এই ডকু-ড্রামার শেষে তিনি রেওয়াজ -মাফিক প্যানপ্যানে পরিণতির পথে হাঁটেননি। শুরুর দিকে কিছু মশালা -মুহূর্ত বাদ দিলে অনুগত থাকার চেষ্টা করেছেন বাস্তবের প্রতি। কাহিনি কী বলে কত্থকের শিক্ষক বিশ্বনাথনের (কমল ) চেয়ে তাঁর স্ত্রী, পেশায় নিউক্লিয়ার অঙ্কোলজিস্ট নিরূপমা (পূজা ) বয়সে অনেক ছোট। নিরূপমা তাঁর বস দীপকের প্রতি আকৃষ্ট।

স্বামীকে ডিভোর্স দিতে নিরূপমা ডিটেকটিভ লাগান, বিশ্বনাথনের কোনও বিবাহ -বহির্ভূত সম্পর্ক আছে কি না জানতে। ডিটেকটিভ জানতে পারেন, বিশ্বনাথন আসলে মুসলিম, নাম ওয়াসিম কাশ্মীরি। বিশ্বনাথন -নিরূপমাকে বন্দি করে জঙ্গিরা। জানা যায়, সন্ত্রাসবাদী নেতা ওমরের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক কাশ্মীরির। ওমরের দলবল যখন নিউ ইয়র্কে সিজিয়াম বোমা বিস্ফোরণের ছক কষছে, তখন প্রশ্নের মুখে কাশ্মীরির পরিচিতি।

তিনি কি কত্থক শিক্ষক, না জঙ্গি? নাকি, ‘র ’-এর গুন্তচর? কোথায় প্লাস কমল হাসানের সিনেমা মানেই কিছু না কিছু স্পেশ্যাল। ‘বিশ্বরূপম ’-এর বাড়তি আকর্ষণ কোথায়? চুম্বকে বলতে হলে, প্রতি মুহূর্তে! ‘মেকিং ’-এ অনবদ্য। প্রতি পদে মোচড় দেওয়া চিত্রনাট্য যদি এডওয়ার্ড লে ক্যারে বা ফ্রেডেরিক ফোরসিথের বেস্টসেলিং গুন্তচর -উপন্যাসের সঙ্গে পাঙ্গা নেয়, তা হলে সিনেম্যাটোগ্র্যাফি টক্কর দেয় সটান হলিউডের সঙ্গে। সন্ত্রাসবাদী নেতা হিসেবে রাহুল বোস আপনাকে বিশ্বাস করিয়ে ছাড়বেন, তিনি সত্যিই আমেরিকার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করছেন। কাশ্মীরির ‘আঙ্কল ’-এর ভূমিকায় ক্যামিও রোলে জাত চিনিয়েছেন শেখর কাপুর।

বাহবা আর্ট ডিরেকশন আর আবহ সঙ্গীতকে। আর বাকিটা? শুধুই কমল, কমল ও কমল …কত্থক-শিক্ষক বিশ্বনাথন হিসেবে, জিহাদি ওয়াসিম কাশ্মীরি হিসেবে, ‘র ’-এর গুন্তচর হিসেবে - কী অভিনয়ে, কী নির্দেশনায়। সঙ্গে বাড়তি পাওনা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই, ভারতীয় গুন্তচর সংস্থা ‘র ’ আর জেহাদিদের নেটওয়ার্ক নিয়ে দুরন্ত রিসার্চ। কোথায় মাইনাস চিত্রনাট্য কোথাও কোথাও একটু ঢিমে। এ ব্যাপারে এডিটর আরও একটু মন দিলে ভালো বই মন্দ হত না।

হাসান ঘরানার এক্সপেরিমেন্টেশনের আর একটি নমুনা, কোনও গান ব্যবহার না করা। ফলে কিছু দর্শকের কাছে ছবিটা একঘেয়ে ঠেকতে পারে। আর অ্যাকশন সিকোয়েন্সের সংখ্যা আর দৈর্ঘ্য দু’টোই আরও একটু বেশি থাকলে ভালো হত, যা হাসান সম্ভবত কম রেখেছেন সচেতন ভাবেই, বাস্তবানুগ হওয়ার খাতিরে। বি -তর্কবাগীশ বিতর্ক? কোত্থাও নেই। কোথায় ইসলাম -বিরোধিতা? মুসলিম মাত্রেই জঙ্গি, এ রকম সরলীকরণের নামগন্ধ নেই।

ওমর আর ওয়াসিম দু’জনেই তো মুসলিম। দু’জনেরই জীবনে সংগ্রাম আছে, শুধু দৃষ্টিভঙ্গিটা পুরোপুরি উল্টো। এবং সেখানেও ভালো -মন্দের ভ্যালু জাজমেন্ট নেই। বরং আছে আফগানিস্তানের ঊষর জমিনে আল -কায়দা জঙ্গিদের মননে একচিলতে ধূসর খণ্ড খোঁজার চেষ্টা। ‘বিশ্বরূপম ’ দেখায়, মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে যে সন্ত্রাসবাদীরা, তাদের আবেগ নেই, বহুপ্রচলিত এই ধারণাটা ঠিক নয়।

শুধু তাদের বিশ্বাস আর অনুশীলনের ধরনটা আলাদা, মাত্রাটা ভিন্ন। আর একটা কথা। এ ছবির কোথাও ভারতের খণ্ডিত, বহুধা -বিভক্ত জাতীয়তাবোধে আঘাত করার উপাদান নেই। যদি আলগোছে কারও বিরোধিতা থাকে, তা আমেরিকার। কেন দেখবেন যাঁরা সিনেমায় শুধু মারকাটারি অ্যাকশনের খোঁজে, এ ছবি তাঁদের জন্য নয়।

আর যাঁরা ফিল্মের মধ্যে নিত্যনতুন ক্রিয়েটিভিটি-র সন্ধানে থাকেন, তাঁদের জন্য ‘বিশ্বরূপম ’ মাস্ট। দিনের শেষে ট্যাগ লাইনটা হল : সৃজনশীলতায় অনুরক্ত আর হলিউডের ভক্ত ---এ ছবি মিস্ করা শক্ত! শেষের কথা সম্প্রতি কোয়েন্তিন তারান্তিনো ফাঁস করেছেন, ‘কিল বিল ’-এর মতো কাল্ট ফিল্মে যে অ্যানিমেশন আনা যেতে পারে, তা প্রথম আমার মাথায় ঢুকিয়েছিল কমল হাসানের ‘আলাবন্ধন ’। ’ কমলের প্রতিক্রিয়া, ‘আমি যখন বারো বছর আগে কাজটা করেছিলাম, তখন অনেকের কাছেই সেটা আজব ঠেকেছিল। এখন তারান্তিনোর মতো অসাধারণ পরিচালক যখন সেই সিকোয়েন্সের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন, তখন মনে হয়, সমালোচকরাও আমার প্রচেষ্টাকে দয়ার চোখে দেখবেন। ’এই মন্তব্যে যন্ত্রণা যথেষ্ট।

নিন্দুকরা কীসে সদয় হন, বলা শক্ত। নস্ত্রাদামুসও ভবিষ্যদ্বাণী ফলতে শুরু করার আগে মান পাননি। চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক কি আশায় বুক বেঁধে থাকা কমল হাসানের ভবিষ্যদ্বাণী সফল করবেন? মূল লেখা: সৌভিক ঘোষ  ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।