আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কমলাপুরে রেলকর্মী খুন

দেশের প্রধান রেলস্টেশন কমলাপুরে এক রেলকর্মীকে হত্যার পর টিকিট বিক্রির ১৫ লাখ টাকা লুটে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। নিহত এই রেলকর্মীর নাম ইসরাফিল (৫৫)। গতকাল ভোরে স্টেশনের টিকিটঘরের সঙ্গে থাকা একটি ছোট্ট তালাবদ্ধ অস্থায়ী কাউন্টার থেকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় তার লাশ পুলিশ উদ্ধার করে। গত বছর তিনি রেলওয়ে থেকে অবসর নেন। কিন্তু পরে তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

তার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর থানার কাগনা গ্রামে। তার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, এ ঘটনার সঙ্গে রেলওয়ের কেউ জড়িত রয়েছেন। নইলে টিকিট বিক্রির টাকা কোথায় থাকে, তা দুর্বৃত্তদের জানার কথা নয়। এ ছাড়া ওই টিকিটঘরের কাউন্টারে প্রবেশ করতে হলে তিনটি কলাপসিবল গেটের তালা খুলতে হবে।

অন্যথায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে থাকা রেলকর্মী ইসরাফিল পর্যন্ত পৌঁছানো সহজ নয় বলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর জানিয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে গতকাল সকালে রেলস্টেশনে যান রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। তিনি এ সময় বলেন, ইসরাফিল রেলওয়ের মাস্টাররোলে নিয়োগ পাওয়া চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ছিলেন। অন্তর্কোন্দলের জেরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া পুলিশ, র্যাব ও সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছুটে যান ঘটনাস্থলে।

ঘটনা তদন্তে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলার জন্য সাময়িক বরখাস্ত করা হয় ১০ জন রেলকর্মীকে। এদের মধ্যে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন এএসআই, একজন হাবিলদার ও চারজন প্রহরী রয়েছেন। এছাড়া রেল পুলিশের একজন এএসআই ও তিনজন কনস্টেবল রয়েছেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাব এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করেছে।

ডিআইজি (রেল) সোহরাব হোসেন জানান, কমলাপুরে ইসরাফিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রেলওয়ের কিছু কর্মচারী জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, ঈদ ও পূজা ঘিরে এবার রেল টিকিটের চাহিদা অন্যবারের চেয়ে বেশি। কমলাপুরে আগাম টিকিট বিক্রি হচ্ছে কয়েকদিন ধরে। টিকিট কিনতে আসা শত শত মানুষের পদচারণায় রাতদিন মুখর থাকে স্টেশনের টিকিট ঘর এলাকা। এ ছাড়া পুলিশ, র্যাব ও রেলওয়ে পুলিশের সার্বক্ষণিক টহল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার কঠোর নজরদারি থাকে পুরো স্টেশনজুড়েই।

এমন নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে খুনসহ দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটায় হতবাক সংশ্লিষ্টরা। ঘটনার পর আতঙ্ক দেখা দিয়েছে রেলযাত্রীদের মধ্যেও। কমলাপুর রেলওয়ে থানার (জিআরপি) ওসি আবদুল মজিদ বলেন, ভোরে ইসরাফিলের লাশ কমলাপুর স্টেশনের মাঝের টিকিটঘরের একটি কাউন্টার থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, ইসরাফিল (শুক্রবার) টিকিট বিক্রি করে ওই কাউন্টারের সঙ্গে থাকা ছোট্ট একটি কামরায় ঘুমিয়েছিলেন। রাতের কোনো এক সময় দুর্বৃত্তরা ঢুকে তাকে বেঁধে শ্বাসরোধে হত্যার পর বাইরে থেকে কাউন্টারে তালা মেরে যায়।

ওসি আরও জানান, খুনের ঘটনায় গতকাল দুপুরে কমলাপুর রেলস্টেশনের মাস্টার সাখাওয়াত হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেছেন।

রেল মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল আলম বলেন, ওই রেলকর্মীর কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তার তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশ কাজ শুরু করেছে। নিহতের পরিবারকে ১ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন রেলমন্ত্রী। রেল মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা শরিফুল আলম জানান, এই ঘটনা তদন্তে ছয় সদস্যের দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

একটি তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শশীকুমার সিংহকে। অন্যটির প্রধান রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা বেলাল উদ্দিন। অপর আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে রেলওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে।

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর এসি নজমুল নেওয়াজ জানান, রেলওয়ের বুকিং কাউন্টারে তাদের কোনো ডিউটি নেই। বুকিং কাউন্টারের চাবি ওইখানে কর্মরতদের কাছেই থাকে।

ওটা একটি সংরক্ষিত এলাকা। বাইরের কোনো লোক ওখানে যেতে পারে না। অপর রেলকর্মী শাহিনুল আলম জানান, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে ইসরাফিল অফিসে আসেন। সাধারণত তারা কাজ শেষ করে প্রধান সহকারী (বুকিং) এয়ার আহমেদের কাছে টিকিট বিক্রির টাকা বুঝিয়ে দিয়ে চলে যান।

বিভাগীয় রেল ব্যবস্থাপক সরদার শাহাদাত আলী জানান, বুকিং মাস্টাররা সাধারণত রাত ১০টার দিকে আসেন এবং পরদিন সকাল ৮টার দিকে চলে যান।

পরবর্তীতে ২০টি কাউন্টারের টিকিট বিক্রির টাকা প্রতিনিধিরা তাদের কাছে জমা দেন। এরপর তারা রাতে টিকিট বিক্রির সব টাকা গুনে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়ে চলে যান।

রেলওয়ের স্টেশন ম্যানেজার খায়রুল বশীর জানান, বুকিং অফিসের ভেতরে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ থাকলেও রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রেলের চালকরা প্রবেশ করতে পারেন।

রেলওয়ের দ্বিতীয় তলায় বিরতি রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার বিবেকানন্দ মণ্ডল জানান, তারা প্রতিদিন রাত ১১টার দিকে কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেন। রেলওয়ের তৃতীয় তলায় নিকুঞ্জ আবাসিক হোটেলের ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম জানান, বিরতি রেস্টুরেন্ট বন্ধ করার পর তারাও কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঘটনাস্থলে যেতে হলে স্টেশন মাস্টার ও ম্যানেজার এবং পূর্ব ও পশ্চিম দিকের গেট দিয়ে প্রবেশ করে তিনটি কলাপসিবল গেট ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করা যায়। ওই রুমে তিনটি টেবিল ও চেয়ার থাকলেও কোনো কম্পিউটার নেই। সিন্দুক রয়েছে একটি। এ ছাড়া চারিদিকে স্টিলের আলমারিতে রেলের টিকিটসহ বিভিন্ন কাগজপত্র।

ইসরাফিলের মেয়ে তাসলিমা আক্তার ও তানিয়া আক্তার জানান, গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে তাদের বাবা গুলশান-১ এর নিকেতন ২ নম্বর রোডের ২৯ নম্বর বাড়ি থেকে বের হন।

এরপর গতকাল সকালে তারা গণমাধ্যমে হত্যার বিষয়টি জানতে পারেন। বাবা গত এক বছর আগে রেলওয়ে থেকে অবসর নেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অনুরোধে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে রেলওয়ের ক্লার্কের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাদের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর থানার কাগনা গ্রামে।

 

 



সোর্স: http://www.bd-pratidin.com/

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।