আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কাকুম ন্যাশনাল পার্কে ক্যানোপি ওয়াক - দারুন এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা

সুখি হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় বিবেক হীন হওয়া। কাকুম ন্যাশনাল পার্ক ঘানার অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান। এটি একটি সংরক্ষিত রেইন ফরেস্ট। এর অবস্থান কেপকোস্ট থেকে ৩৩ কিলোমিটার উত্তরে এবং আক্রা থেকে ১৭০ কিলোমিটার দূরে। প্রায় সাড়ে তিনশত বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এ গভীর বনাঞ্চলটি।

এ বিশাল পার্কে আছে ৪০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রানি(হাতি, মহিষ,চিতাবাঘ, বঙ্গো, শুকর,বানর ইত্যাদি ), ২০০ প্রজাতির পাখি, ৪০০ প্রজাতির প্রজাপতি এবং বিপুল সংখ্যক সরীসৃপ ও উভচর প্রানি। কেপকোস্ট থেকে ট্যাক্সিতে করে এখানে আসতে আমাদের প্রায় আধা ঘণ্টার মত সময় লাগল। ঘানা দেশটি যে খুব এক্সপেন্সিভ সেটা আগেও একবার বলেছি কোন এক লেখায়। কাকুমে গাড়ি নিয়ে ঢুকতে একবার পয়সা দিতে হল। ভেতরে গিয়ে টিকেট তো কাটতেই হবে।

এখানে দরদাম করে বিশেষ সুবিধে করা গেলনা। কাউন্টারে এক কাঠ খোঠরা গোছের লোক বসা। নারী জাতির কেউ হলে আমার বিখ্যাত হাসি দিয়ে কিছুটা তরল করে দেওয়া যেত। কিন্তু এ রসকষহীন লোকটাকে কাবু করা অত সহজ কর্ম নয়। ছবি থেরাপি ও এখানে বিশেষ কাজ দেবে বলে মনে হয়না।

আমাদের এক সহকর্মী গাড়ি ভাড়া করতে গিয়ে ছবি থেরাপি দিয়ে বিশেষ সাফল্য পেয়েছেন। অর্থাৎ ভাড়া নিয়ে দর কষাকষির এক পর্যায়ে ড্রাইভারকে সাথে নিয়ে কয়েকটা ছবি তুলতেই ড্রাইভার ব্যাটা খুশীতে বিগলিত হয়ে কমিয়ে দিয়েছে ভাড়া! এই ছবি থেরাপি কেউ আবার আইভরিকোস্টে প্রয়োগ করতে যাবেন না যেন, বিপদ হতে পারে তাতে। আমি একবার কলার বার বি কিউ তৈরি রত এক মহিলার ছবি তোলার পর সামান্য একটু ঝামেলায় পড়েছিলাম। ছবি তোলার আগে মহিলার অনুমতি নিয়েছি। তারপরও কোথা থেকে এক লোক এসে বলল- ‘ তোমরা আমার বউয়ের ছবি তুললে কেন? এখন হয় এজন্য টাকা দিতে হবে, নইলে কলা পোড়া খেতে হবে’; এ তো দেখি মহা জ্বালা ! ধান্দাবাজীতে ভেবেছিলাম বাঙ্গালীরা ওস্তাদ ।

এখন দেখি আফ্রিকানরাও কম কিসে। পরে ওই ব্যাটাকে বললাম – দ্যাখ, তোর বউয়ের ছবি তুলিনি। তুলেছি কলা পোড়ার ছবি। এই বলে কলা পোড়ার একটা ছবি দেখিয়ে তবে রক্ষা পাই যন্ত্রণা থেকে। মনে মনে বললাম , যেই না তোর বউয়ের চেহারার ছিরি, তার জন্য আবার টাকা চাস! কাউন্টারের পাশেই আছে একটা জাদুঘর।

এক পলক জাদুঘরটা দেখে নিলাম। এখানে পুরনো কিছু প্রাণীর ছবি, রেপ্লিকা আর মমি আছে। অনেক গুলো ট্র্যাডিশনাল শো পিচ আর মুখোশ ও দেখতে পেলাম। জাদুঘরের ভেতরের কিছু ছবি দেখুন। টিকেট কেটে আমরা রওনা হলাম ক্যানোপি ওয়াকের উদ্দেশ্যে।

আমাদের দলে আরও দুজন অস্ট্রিয়ান মহিলা টুরিস্ট ভিড়ে গেল। একজন গাইড আমাদের নিয়ে চললেন বনের ভেতরে ক্যানোপি ওয়াকের জন্য। একটু পর টের পেলাম আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঁচু পাহাড়ে উঠছি। এক সহকর্মী বললেন, এভাবে পয়সা খরচ করে কষ্ট করে পাহাড়ে চড়ার কোন মানে হয়? কিন্তু কিছুদূর উঠার পর দেখলাম এক দল পর্যটক নেমে আসছেনীচে। তাদের মধ্যে একজন বয়োবৃদ্ধকে দেখা গেল লাঠি ভর দিয়ে হাঁটছে।

বয়স কম হলেও ষাট - সত্তর হবে। সাথে একজন এটেন্ডেন্ট নিয়ে এসেছে সে। এই বুড়ো বয়সে ব্যাটার কেন যে শখ হল পাহাড়ে চড়তে আল্লাহ মালুম। যা হোক, ওকে দেখে আমাদের পাহাড় বেয়ে উঠার কষ্ট এক মুহূর্তে দূরীভূত হয়ে গেল। তাকে জিজ্ঞেস করলাম- চাচা মিয়া, কেমন লাগল ট্যুর? বুড়াটা বেশ উচ্ছ্বাসের সাথে বলে কিনা – ওয়াও, জাস্ট এমেজিং! বুঝলাম শরীরের বয়স বেশি হলেও ব্যাটার মনের বয়স বড় জোর উনিশ কুড়ি হবে! ঘন অরণ্যের পাহাড় পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ক্যানোপি ওয়াকের স্টার্ট পয়েন্টে।

মোটা রশির জাল দিয়ে তৈরি ক্যানোপি ওয়াকের রাস্তা। বনের উঁচু গাছ গুলোর মধ্যে কাঠের মাচা তৈরি করে সে মাচা গুলোকে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে নেট দিয়ে। নেটের উপর কাঠের তক্তা ফেলে তৈরি করা হয়েছে সরু রাস্তা। এ রাস্তা পার হয়ে আমাদের যেতে হবে এক গাছ থেকে আরেক গাছে। সে এক বিরাট থ্রিলিং।

নীচের বন জঙ্গলের জন্য যদিও উচ্চতা বোঝা যাচ্ছিলোনা, গাইডের ভাষ্য অনুযায়ী আমরা মাটি থেকে ৪০ মিটার উচ্চতায় ঝুলন্ত নেটের উপর দিয়ে হাঁটছি। ভয়ে আমি নিচের দিকে তাকাচ্ছিলাম না। মনে মনে নিজেকে অভয় দিলাম- ভয় পাওয়া চলবে না। তাহলে ব্যালেন্স এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। অবশ্য দুই পাশে মোটা রশির বেড় দেওয়া আছে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসাবে।

ভয়ে কেউ লাফ না দিলে বা রশি ছিড়ে পড়ে না গেলে বিপদের তেমন কোন স্কোপ নেই। এক হাতে রশি ধরে অন্য হাতে ক্যামেরা নিয়ে কিছু ছবি তুললাম। একে একে ৭ টা রশির ব্রিজ পার হয়ে ৩৫০ মিটারের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মনে হল ইহকালীন পুলসিরাত অতিক্রম করে এলাম। গাইড বলেছিল ক্যানোপি ওয়াকের সময় দেখা যাবে পাখি আর প্রজাপতি। কিন্তু কোনটার দেখা পেলাম না।

ভয়ের কারণে ওসব আমাদের চোখ এড়িয়ে গেছে কিনা ঠিক বোঝা গেল না। যাই হোক নিরাপদে ক্যানপি ওয়াক শেষ করতে পেরে আমার মুখে তখন এভারেস্ট বিজয়ের হাসি। এবার আমাদের পাহাড় বেয়ে নেমে যাওয়ার পালা। কিন্তু আমাদের সাথে আসা বিদেশী মেয়ে দুটির খায়েশ তখনো মেটেনি। তারা পাহাড়ের নীচে গিয়ে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটবে।

আমরা তাদের জানিয়ে দিলাম গুডবাই। কারণ আমাদের যেতে হবে পরবর্তী ভেনু কুমীরের খামার পরিদর্শনে।  ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।