মানুষের কোন আচরণটাকে প্রেম বলে? প্রেম হয় কীভাবে? পৃথিবীতে প্রেম ঘটে যাওয়ার যত পদ্ধতি আছে এর মধ্যে “প্রথম দর্শনে প্রেম”-এর একটা আলাদা বিশেষত্ব আছে। এর অনেক ভিনদেশী সংস্করণও আছে। ইংরেজীতে ওটা Love at first sight, হিন্দিতে Peheli nazar mein...। খুঁজলে আরও অনেক পাওয়া যাবে। প্রেম সংঘটিত হওয়ার বিশ্বব্যাপি জনপ্রিয় এই পদ্ধতিটির ব্যাপারে অনেক প্রেম বিশারদ আবার ভিন্নমত পোষন করেন।
আমার একবার কয়েকজন প্রেম বিশারদের আলাপচারিতায় অংশ নেয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে একজন বলেছিলেন, ‘প্রথম দর্শনে প্রেম বলে একটা বিশেষ দর্শন আছে –এই দর্শনে আমার বিশ্বাস নেই। এখানে প্রেমের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। এখানে যা আছে তা জৈবিক। শুধু দেখে প্রেম হয় কি করে? এটা একটা জৈবিক তাড়না মাত্র।
প্রেম হয় আত্মায় আত্মায়, চোখে চোখে নয়। ’
কিছু প্রেম বিশারদ কথাটিকে সমর্থন করলেন। ‘প্রথম দর্শনে প্রেম’-এ বিশ্বাসী আমার নিজেরও কথাগুলো বেশ মনে ধরলো। কিন্তু আরেক প্রেম বিশারদ আবার বললেন আরেক কথা। তাঁর কথাও ফেলে দেয়া যায় না।
তিনি বলেছিলেন, ‘প্রেম হয় আত্মায় আত্মায়, চোখে চোখে নয় –আমি মনে করি না। চোখ তাকে না দেখলে আত্মা এই জীবনে তার সন্ধানই পাবে না। প্রেম তো পরের ব্যাপার। শুধু প্রেম কেন মানুষের জীবনই জৈবিক জীবন। এখানে জৈবিক তাড়নাকে অস্বীকার করা একধরনের ভাববাদী দর্শন, যার কোন মূল্য নেই –মূল্যহীন দর্শন।
’
হঠাৎ বৃষ্টি, জাপানিজ ওয়াইফ -বিনা দর্শনেও প্রেম সম্ভব কথাটাকে সমর্থন করে একজন আবার বেশ কয়েকটি উদাহরণও দিয়ে ফেললেন। প্রেম বিশারদদের সেই আলাপ চারিতায় সাহস করে আমিও কিছু কথা বলেছিলাম।
আমার মতে, প্রেমের সার্বজনীন স্বীকৃত কোন সংজ্ঞা নেই, এটা একেক জনের কাছে একেক রকম। এটা কারো কাছে প্লেটোনিক, কারো কাছে...। প্রেম ঘটানো যায় না, ঘটে যায়।
চোখে-চোখে, আত্মায়-আত্মায় –এটা নানা ভাবে ঘটতে পারে। আত্মায় আত্মায় প্রেম ঘটানো প্রেমওয়ালারা ‘আমাদের প্রেমটা তোমাদেরটার চেয়ে মহত্ত্বর’ এই বলে চোখে চোখে প্রেম ঘটানো ‘চোখওয়ালা প্রেমীদের’ মুড দেখাতেই পারে। কারণ চোখে চোখে প্রেমের ক্ষেত্রে একটু যৌনতার গন্ধ আছে, অন্যদিকে আত্মায় আত্মায় ঘটানো প্রেমগুলো প্ল্যাটনিক ইমেজে ভরপুর।
তবে আত্মায় আত্মায় প্রেম ঘটানো প্রেমওয়ালারা চোখে চোখে প্রেম ঘটানো প্রেমওয়ালাদের প্রেমটাকে কোনভাবে খাটো করতে পারে না। কে কী পদ্ধতিতে প্রেমে পরলো সেটার চেয়ে জরুরী কার “প্রেমটা”প্রেম সেটা বিবেচনা করা।
“প্রেমীর জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের ত্যাগ স্বীকার” শিরোনামের লিটমাস টেস্টে কারা উত্তীর্ণ হতে পারছে সেটা বিবেচনা করা।
খুব হাসি পাচ্ছে। “সিঙ্গল” রিলেশনশীপ স্ট্যাটাসটাওয়ালা এই আমি একেবারে পাকা প্রেম বিশেষজ্ঞের মত কথা বলছি।
কিন্তু আজীবন সিঙ্গল রয়ে যাওয়া এই আমারও একটা প্রেমের গল্প আছে। সেই গল্পটি আমি সবাইকে বলতে পারবো, সবাইকে।
আমার সেই সত্য -পবিত্র প্রেমের গল্পটি আজ এই ভালোবাসার দিনে বলা যেতে পারে। আমার ওই গল্পটি “প্রেমের কোন বয়েস নেই” এই চিরন্তন সত্যটাকে আবার প্রতিষ্ঠিত করবে।
যখন প্রাইমারীতে পড়তাম তখন আমার গ্রামে, আমার আশেপাশের কোন গ্রামে -কোন স্কুল ছিল না। হাতিশা সরকারী বিদ্যালয় নামের সবচেয়ে কাছের স্কুলটিও ছিল আমার বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে।
প্রাইমারীতে পড়ার সময়ের অনেক কথা আমার মনে পড়ে।
যেমনঃ রবিবারের দিন স্কুলে যেতে ইচ্ছে করতো না। কারণ সাড়ে ন’টায় ডিডি ন্যাশন্যাল “শ্রীকৃষ্ণা” দেখাতো। ছোট্ট কৃষ্ণ অবলীলায় বড় বড় অসুর মারছে –এই দৃশ্যগুলো ছেড়ে রবিবারের দিন আমায় স্কুলে যেতে হত বাবার রক্তচক্ষুর ভয়ে।
প্রাইমারীতে পড়ার সময়ে আমার প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষাকাল। বৃষ্টির দিনে স্কুলে যেতে হত না।
রক্তচক্ষুর ভয়ে যেতে হলেও কিছুদূর গিয়ে মাঠের জমাটবাধা পানিতে আলতো করে বসে প্যান্ট ভিজিয়ে গায়ে একটু কাঁদা মেখে বাড়িতে এসে মাকে বলা যেত – মা, পা পিছলে পড়ে গেছি তাই স্কুলে আর গেলাম না। সুরঞ্জন-আমি, আমার মনে হয় না আমরা কোন রবিবার এই কাজ করা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছি। আমার ছোটবেলার দস্যিপনা ছিল একেবারে প্রবাদ প্রতিম। ‘বান্দেরামীটাকে’ আমি একেবারে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেসময় আমাকে দেখে কেউ কেউ বলত “লেজটা থাকলে এটাকে একেবারে বানর বলা যেত।
” আবার কেউ বলতো, “এটা লেজওয়ালা বানর-ই ছিল, বান্দেরামী করার সময় দুর্ঘটনা বশত লেজটা হারিয়ে ফেলেছে। ” কিন্তু কেউ জানে না, এর আগে আমি কাউকে বলিও নি যে, দস্যিপনায় গ্রাম অতিষ্ট করা ওই লেজকাটা বানরটির মনে এক ছোট্ট শান্ত ডানাকাটা পরী আলাদা করে জায়গা করে নিয়েছিল। তখন আমি ক্লাস থ্রি কি ফোর-এ পড়ি। সে ছিল আমার ক্লাসমেট। আমার খুব ভালো মনে আছে; ক্লাস চলাকালীন সময়ও আমি তাকে দেখতাম, স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার সময়ও দেখতাম।
দেখতে পেলেই দেখতাম, খুব দেখতাম। কেন দেখতাম? আরও তো মেয়ে ছিল, তাদের বাদ দিয়ে শুধু তাকেই কেন? সেই সময় যৌনতার ‘যৌ’টাও তো বুঝতাম না/উপলব্দি করতে পারতাম না, তার মধ্যেও তো যৌবনের কিচ্ছু ছিল না, তবুও কেন দেখতাম? একসময় প্রাইমারী স্কুলের পাঠ চুকিয়ে গেল। আমরা আলাদা হয়ে গেলাম (আমি তার থেকে আলাদা হয়ে গেলাম)। আমি ভর্তি হলাম রামচন্দ্রপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে, সে ভর্তি হল কাহারোল পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ে। এরপর নানা জায়গায় মাঝে মধ্যে তার সাথে আমার দেখা হত কিন্তু কেউ কাউকে কথা বলতাম না।
নীরবতার চ্ছেদ হল ২০০৩-এ এসে, এস.এস.সি পরিক্ষার প্রথমদিন। আমাদের এস.এস.সি পরিক্ষার আসন বিন্যাসটা ছিল দেখার মত। আমাদের বয়েজ স্কুলের বয়েজদের বসানো হয়েছিল গার্লস স্কুলের গার্লসদের সাথে মিক্সড করে। প্রতি ব্রেঞ্চে এক ছেলে এক মেয়ে। যেন একেকটা জুটি।
আমার সাথেও একটা মেয়ে বসেছিল। আমার সীটটা পরেছিল একেবারে সামনে, দরজার কাছে। নিজের আসনটি একেবারে সামনে দেখে ওই মেয়ে বলে উঠেছিল, ‘হে আল্লাহ এত সামনে দিলে কেন!?’ কিন্তু অবাক কান্ড! ওই মেয়েই আবার পরে আমার সাথে হিন্দু ধর্ম শিক্ষা পরিক্ষা দিয়েছিল!!! সাথের সঙ্গিনীটিসহ আমার পেছনের দু’জন “একটু হেল্প করিও” বলে আমার কাছে নানাভাবে কাকুতি মিনতি শুরু করলো। কিন্তু আমার মেজাজটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেল, পরস্পর পরস্পরকে হেল্প করবো এরম ডিল যাদের সাথে করেছিলাম সেই চন্দন, ফিরোজ, আনারুলরা আমার থেকে অনেক দূরে। মন খারাপ করে দশটা বাজার অপেক্ষায় বসে আছি।
এমন সময় আমার পাশের সীট থেকে একটা মেয়ে বলে উঠলো, ‘এই, প্রদীপ না কে?’ আমি মেয়েটির দিকে তাকালাম। মেয়েটা হাসতে হাসতে বলল, ‘কী খবর ভালো আছিস’? আমি উত্তর না দিয়ে ক’সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। থুতনীতে খুব ছোট একটি কাটা দাগ, আরে এ তো সে!! আমার গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো। নিজেকে সংবরণ করে আমি বললাম, আরে *! কেমন আছিস? কতদিন পর!!! এরপর সে ডিউটিরত স্যারদের ‘চুপ করো, সাইল্যান্ট’ প্রভৃতি সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে ফিস ফিস করে আমার সাথে নানা কথা শুরু করে দিল। খুব অনুরোধ করলো part-c টাতে যেন তাকে একটু হেল্প করি।
পরীক্ষা শুরু হল, ইংরেজী প্রথম। আমি তাকে ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু এতদিন পর তাকে দেখে আমার খোলস বন্দি ‘বাল্যপ্রেম’ আবার জাগ্রত হল। তা না হলে আমি বার বার তার দিকে তাকাবো কেন? সে তখন সুইট সিক্সটিন, অনিন্দ্য রূপসী একটা মেয়ে। যেন জ্বলছিল! গোটা রুমে তার সমকক্ষ আর কেউ নেই।
ওই রুমে অপর্নাও ছিল, গার্লস স্কুলের’ই মেয়ে। আমাদের সাথে ছত্র মোহন স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তো। সুপান্থ, আনারুল, সফিকুল, চন্দন –অপর্ণাকে দেখে আমাদের সবার বুকটা হু হু করে উঠতো কিন্তু সেও তার কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছিলো। আর আমি তখন স্বপ্নদোষ, অন্যান্য দোষ এবং নকল মুক্ত পরিবেশে পরিক্ষা দিতে হবে এই চিন্তায় শুকিয়ে কাঠ হওয়া বিদ্গুটে চেহারার এক উস্কসুস্ক কিশোর। পরিক্ষা চলাকালিন সময়ে আমি বারবার তার দিকে দিকে তাকাচ্ছিলাম।
সেও ওর না জানা উত্তরগুলো ফিসফিস করে আমার কাছে জানতে চাচ্ছিল। হঠাৎ এমন একটা কান্ড ঘটলো যেটা মনে করে এখন এ মুহুর্তেও আমার খুব হাসি পাচ্ছে। আমি তার দিকে তাকাচ্ছিলাম, লিখছিলাম। হঠাৎ আমার প্রশ্নপত্রটি আমার টেবিল থেকে নিচে পড়ে গেল। সেও ওটা দেখতে পেল।
বলল, ‘এই ধর ধর’। কিন্তু বাতাসে ওটি তিন তলা থেকে একেবারে নিচে পড়ে গেল। ওই দৃশ্য দেখে সে যেন খুব মজা পেল, ছলছলিয়ে হেসে উঠলো। আমি এক ডিউটিরত স্যারকে ঘটনাটি খুলে বললাম, এবং আশা করলাম তিনি আমাকে আরেকটি প্রশ্নপত্র দেবেন। কিন্তু তিনি আমায় মেজাজ দেখিয়ে বললেন, ‘যা... নিচে গিয়ে খুঁজে নিয়ে আয়।
’ আতঙ্কে তখন আমার গলা শুকিয়ে কাঠ! আমি একদৌড়ে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে নিচের দিকে ছুটলাম। নিচে নেমে দেখলাম নিচতলার সিঁড়িতে আমার প্রশ্নপত্রটি পড়ে আছে। আতংক নিয়ে এবং ওটা হাতে নিয়ে আবার উপরের দিকে ছুটলাম। আমার আতংক হয়েছিল প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে আমি বাইরে এ অবস্থায় যদি কোন টিএনও –ম্যাজিট্রেটের সামনে পরি (যারা পরিক্ষার্থীদের কাছে যমদূত) তখন কী হবে? যদিও সৌভাগ্য বসত পরি নি। আমি রুমে ফিরে এলাম।
ও আমায় দেখে আবার ছলছলিয়ে হেসে উঠলো। তার সেই হাসি! “আমার ছেলে ম্যাট্রিক পাস করবে” –বাবা মা যদি এরম স্বপ্ন না দেখতো আমি প্রতি পরিক্ষায় আমার প্রশ্নপত্র ফু’দিয়ে নিচে ফেলে দিতাম, ডিউটিরত স্যারদের কাছে আরেকটি না চেয়ে/দিলেও না নিয়ে, যমদূত টিএনও –ম্যাজিট্রেটদের তোয়াক্কা না করে প্রশ্নপত্রের খোঁজে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে নিচের দিকে ছুটতাম, ফিরে এসে তার ওই হাসি দেখতে পাবো এই আশায়। পরীক্ষা শেষে বাইরে এসে আমি চন্দন –আনারুলদের কার কী ভুল হল কে কী ভুল করলাম এসব নিয়ে আলোচনা করছি। দেখলাম সে একটি ছেলের সাথে আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমি তাকে চিনি, যতিশ না যতেন কী যেন নাম।
আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র- খুব হ্যান্ডসাম। ছেলেটি তার বোর্ড, কলমের বাক্স হাতে নিয়ে হাঁটছে। ছেলেটির সাথে তার আচরণ খুব মাখামাখি ধরনের। পরিক্ষার পর রেজাল্ড বেরুনোর আগেই এক সুত্রে জানলাম, যতিশ/যতেন-এর সাথে তার বিয়ে হয়ে গেছে। পরিক্ষা শেষ হওয়ার পর ‘ঘরকুনো’ এই আমি এরপর আর তার দেখা পাই নি।
কোথায় আছে, কেমন আছে, কী করছে কিচ্ছু জানি না। কখনো জানার চেষ্টাও করি নি। এত বছর পর এখন আমাকে দেখে সে হয়তো চিনতেই পারবে না।
সে নিশ্চয় খুব ভালো আছে। এখন হয়তো সে আট- ন’বছর বয়েসি একটা বাচ্চার মা।
স্বামী সংসার নিয়ে নিশ্চই সে খুব ভালো আছে। স্বামী –সংসার নিয়ে সে খুব সুখে থাকুক ভগবানের কছে তার জন্য আমার কেন প্রার্থনা করতে ইচ্ছে করছে? জীবনে কোন বিপদে সে যদি আমার কাছে হেল্প চায় আমি প্রাণপণ চেষ্টা করবো তার পাশে দাঁড়ানোর -প্রচন্ড স্বার্থপর এই আমার কেন এরম মনে হচ্ছে?
কেন? কেন?? কেন???।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।