আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

হাইব্রিডমুক্ত হতে পারেনি আওয়ামী লীগ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার নতুন মেয়াদে যাত্রা শুরু করলেও 'হাইব্রিড'মুক্ত হতে পারেনি তার নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক কাঠামোতে 'হাইব্রিড' জটিলতা নিয়ে কর্মীরা বিভ্রান্ত। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভায় চমক দেখিয়ে শেখ হাসিনা প্রায় সব মহলে প্রশংসিত হলেও হাইব্রিডদের প্রভাবে সরকার ও দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের ধারণা ছিল এবার মন্ত্রিসভা যেভাবে প্রশংসিত হয়েছে একইভাবে দলও 'হাইব্রিড'মুক্ত হবে। দলের কেন্দ্র থেকে শুরু করে সর্বত্র ঠাঁই পাবেন একমাত্র ত্যাগী ও মাঠের নেতারা।

বাস্তবে তা পুরোপুরি হয়নি। এমনকি দশক পেরিয়ে, যুগ পেরিয়ে জেলায় জেলায় অদক্ষ নেতাদের দায়িত্বে বহাল থাকার নেপথ্যেও কেন্দ্রের হাইব্রিড নেতারা বলে মনে করছেন তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা। খোদ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনাও কাজে লাগাতে পারছেন না কেন্দ্রে পদ দখলকারী কর্মী ও জনবিচ্ছিন্ন এসব হাইব্রিড নেতা। এমন অভিযোগ শোনা যায় তৃণমূল নেতাদের মুখে মুখে। আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের একাধিক নেতার অভিযোগ, উপজেলা নির্বাচনে দলের অপ্রত্যাশিত ভরাডুবির অন্যতম কারণ হাইব্রিড নেতাদের সাংগঠনিক ব্যর্থতা।

দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী দমনে ব্যর্থ হয়েছেন কেন্দ্র থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। নির্বাচনে দল সমর্থিত একজন প্রার্থী চূড়ান্ত করতে কেন্দ্রের সব সাংগঠনিক সম্পাদকের পাশাপাশি বেশকয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিভাগীয় পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদকের দু-একজন সামান্য সফলতা দেখালেও বিদ্রোহী প্রার্থী দমনে ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী। দুই দফায় অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের অপ্রত্যাশিত ভরাডুবির মূল কারণও ছিল বিদ্রোহী প্রার্থী দমনে দলীয় নেতাদের সীমাহীন ব্যর্থতা। সরকার নিয়ন্ত্রিত একাধিক গোয়েন্দা রিপোর্টের পাশাপাশি দলের তৃণমূল নেতারাও ক্ষোভের সঙ্গে এমনই অভিযোগ করেছেন।

সারা দেশে যখন বিদ্রোহী প্রার্থী দমনে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা ব্যর্থ তখন সবচেয়ে লজ্জার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে রংপুরের পীরগঞ্জ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পীরগঞ্জের নির্বাচনী এলাকায় উপজেলা নির্বাচনে সামান্য ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয়ের নেপথ্যেও ছিল বিদ্রোহী প্রার্থী। দলের হাইব্রিড নেতাদের সাংগঠনিক ব্যর্থতা ও উপজেলা নির্বাচনে দলের করুণ চিত্র দেখে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের শঙ্কা, এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। সূত্রমতে, দ্বিতীয় মেয়াদে দলকে ক্ষমতায় এনে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে শেখ হাসিনা অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিলেও দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত না হলে ভবিষ্যতের পথচলা সহজ নাও হতে পারে। সূত্রমতে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসায় সরকার ও দলে এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী ও হাউব্রিড ব্যক্তি আবারও কৌশলে নিজেদের জায়গা মজবুত করছে।

সরকার গঠনের আগ মুহূর্তে দলের চরম ক্রান্তিকালে এই সুবিধাভোগী অংশ গা-ঢাকা দিলেও সরকার গঠনের পর থেকেই আবারও নানাভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছে। প্রভাবশালী মন্ত্রী ও দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অনেকটা ছায়ার মতোই ঘিরে রাখছেন তারা। সচিবালয়ে মন্ত্রীর দফতর থেকে শুরু করে মিন্টো রোডের মন্ত্রীদের বাসভবন ও দলের শীর্ষনেতাদের বাসায়ও হাইব্রিড-খ্যাত সুবিধাবাদীদের প্রভাব। দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা হাইব্রিডদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকলেও কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত আবারও হাইব্রিডদের অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি হতাশ করছে কর্মীদের। সূত্রমতে, দলে হাইব্রিড হিসেবে সমালোচিত ও চিহ্নিত মহলই মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজেও নানাভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে- যা সরকার ও দলের জন্য সুখকর নয়।

জেলায় জেলায় দলের অভ্যন্তরে হাইব্রিডদের নিয়ে তুমুল সমালোচনার পাশাপাশি প্রকাশ্য বিরোধিতাও শুরু হয়েছে তৃণমূল আওয়ামী লীগে। দীর্ঘ অভিজ্ঞ সিনিয়র নেতারা যেখানে বঞ্চিত কোনো কোনো এলাকায় হঠাৎ আবিভর্ূত নতুন মুখ, হাইব্রিডরাই সেখানে অবস্থান করছে নিজেদের। এ ধরনের পরিস্থিতিকে মেনে নিতে পারছে না সারা দেশের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। সুনামগঞ্জে গত সোমবার প্রতিবাদ মিছিল করেছে বঞ্চিত আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। সুনামগঞ্জের মাটিতে ঠাঁই হবে না হাইব্রিড নেতাদের এমন স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে মিছিলে।

দেশের অনেক স্থানেই হাইব্রিডকে ঘিরে যন্ত্রণার বেদনা মাঠের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দলে হাইব্রিড নেতাদের কারণেই সারা দেশে সাংগঠনিকের নাজুক অবস্থা। এ অবস্থায় উত্তরণ হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দল ও মন্ত্রিসভায় হাইব্রিড প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটা থাকবেই। নতুনদের সুযোগ করে দেওয়া হলে বলা হবে হাইব্রিড।

আর নতুনদের জায়গা না দিলে আবার বলা হবে পুরনোরাই থাকছে। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে বলেন, বাংলাদেশের সার্বিক যে অবস্থা, অতীতে যা দেখেছি, বর্তমানে যা দেখছি, ভবিষ্যতে সম্ভাবী তার জন্য চাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ মোকাবিলার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। না হলে বিপদ রয়েছে। দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যত শক্তি, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে তার সবগুলোকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।

এ জন্য দেশের বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে হবে। তারা যদি নিজেরাই শক্তিশালী হতে না পারে তাহলে ওই একটি বিশাল অসাম্প্রদায়িক চেতনার শক্তিকে নেতৃত্ব দিতে পারবে না। এ জন্য নিজেদের শক্তিশালী করাই এখন চ্যালেঞ্জ।

 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.