আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বদলায় না কিছু

লিখতে ভাল লাগে, লিখে আনন্দ পাই, তাই লিখি। নতুন কিছু তৈরির আনন্দ পাই। কল্পনার আনন্দ। বদলায় না কিছু মোহাম্মদ ইসহাক খান কন্সট্রাকশন সাইট। একটা ইমারত গড়ে তোলার কাজ চলছে।

অনেক শ্রমিক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করছে। কেউ ইট ভাঙছে, কেউ দেয়ালে সিমেন্ট লাগাচ্ছে, কেউ ছাদ ঢালাই করছে। একটা বাড়ি তৈরির কাজ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার কিছু নেই। কিন্তু এই বাড়িটার সামনে লোকজনের ভিড় জমে গেছে। এ ওর ওপর দিয়ে তার ওপর দিয়ে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছে।

এর কারণ আছে। কারণ হল, একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষ মাথায় গামছা পেঁচিয়ে ছেঁড়া গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে আর সব শ্রমিকের সাথে কাজ করছেন। পাবলিক মজা দেখে দাঁড়িয়ে গেছে, তাই এত ভিড়। অতি উৎসাহী কেউ কেউ জিজ্ঞেস করছে, বিষয় কী মিয়াভাই? আপনে ঐখানে কী করেন? এসব খবর দ্রুত ছড়ায়। শ্রমিকদের সাথে একজন অভিজাত মানুষ কাজ করছেন, তাও আবার বিদেশী।

কাজেই কোন একটা চ্যানেল থেকে একজন সাংবাদিক ক্যামেরা-ট্যামেরা নিয়ে চলে এলেন। কাজ থেকে একটু অবসর নিয়ে কথা বলা যাবে কীনা, তা ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করা হল। তিনি মালিকের অনুমতি নিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে এগিয়ে এলেন। কথা বলা যাবে। এতক্ষণ তিনি অন্য শ্রমিকদের মাথা থেকে নিজের মাথায় নিয়ে নিচ্ছিলেন সিমেন্টের মিক্সচার মেশানো কড়াই, ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিচ্ছিলেন বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে।

তাঁর হাতে-পায়ে লেগে আছে একরাশ কাদা, গায়ের রঙটা ময়লা হলে তাঁকে একজন সত্যিকারের শ্রমিক বলেই চালিয়ে দেয়া যেত। সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন তাঁর নাম-ধাম, বৃত্তান্ত। ক্রমে সব জানা গেল। ভদ্রলোকের নাম এল্ড্রিজ হফম্যান। তিনি আমেরিকায় থাকেন।

বয়স ৫৫। একজন ধনকুবের। নানা জিনিসের ব্যবসা আছে তাঁর। কিন্তু আপনি এখানে কাজ করছেন কেন? জিজ্ঞেস করলেন তরুণ সাংবাদিক মফিদুল ইসলাম। মিস্টার হফম্যান বললেন, আসলে আমি সারাজীবন প্রাচুর্য, অর্থবিত্তের মধ্যে কাটিয়েছি।

সবরকম আনন্দ উপভোগ করেছি। কিন্তু কিছুতেই আর মন লাগছিলো না। কেমন যেন সবকিছু "বোরিং" হয়ে গিয়েছিলো। তাই ভাবলাম, একবার দেখি তো, গরীব, খেটে খাওয়া মানুষগুলো কীভাবে জীবনযাপন করে? তারপর খোঁজখবর করে জানলাম, পৃথিবীর অন্যতম একটি দরিদ্র দেশ হল তোমাদের এই বাংলাদেশ নামের ছোট্ট দেশটি, যেখানে অবিশ্বাস্য কম জায়গায় অবিশ্বাস্যভাবে ষোল কোটি মানুষ ঠাসাঠাসি করে বাস করছে, বেশিরভাগ মানুষের বাস দারিদ্র্যসীমার নিচে। তাই আমি এখানে চলে এলাম।

পত্রপত্রিকা পড়ে কিংবা ইন্টারনেট ঘেঁটে তো অনেক কিছুই জানা যায়, কিন্তু আমি চেয়েছি প্র্যাক্টিক্যালি গরীব মানুষের জীবনের স্বাদ নিতে। কাজেই এখানে এসে বাড়ি তৈরির কাজে লেগে গেছি, পুরোদস্তুর শ্রমিকের মতো, হা হা হা। আপনার কেমন লাগছে এই কাজ? সবসময় আরামে থেকে এখন কষ্ট হচ্ছে না? লাগছে তো বটেই, কিন্তু আমি মেনে নিচ্ছি। কিছু পেতে গেলে তো কিছু হারাতেই হবে। তাছাড়া তোমাদের দেশের মানুষজন খুব ফ্রেন্ডলি, কাজেই কোন সমস্যা হচ্ছে না।

আপনার আর কী কী প্ল্যান আছে? বেশি কিছু না। আমি কিছুদিন থাকবো, শ্রমিকের কাজ করবো, রাস্তায় ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করবো, কয়েকদিন রিকশাও চালিয়ে দেখতে পারি। এসব মানুষের সাথে থাকবো, ওদের লাইফস্টাইল বোঝার চেষ্টা করবো। ছবি তুলে রাখছি, ফাঁকে ফাঁকে ভিডিও করছি। এসব কাজে আমার লোকজন সহায়তা করছে, ঐ যে দেখো একজন দাঁড়িয়ে আছে।

দেশে ফিরে গিয়ে এটা নিয়ে একটা তথ্যচিত্র করার ইচ্ছে আছে। দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রা সবার কাছে তুলে ধরবো। তাছাড়া নিজেকে একজন দরিদ্র মানুষ হিসেবে ডকুমেন্টারিতে দেখা যাবে, এটাও তো অনেক মজার ব্যাপার। আপনার বাংলাদেশ ভ্রমণ সফল, শুভ এবং আনন্দময় হোক। ধন্যবাদ।

মিস্টার হফম্যান পরিকল্পনামত সব কাজই করলেন। তিনি ইট ভাঙলেন, রিকশা চালালেন, চা বিক্রি করলেন, রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনের পার্শ্ববর্তী বস্তির এক কুটিরে ঘুমোলেন। এক রাতে জনৈক অর্বাচীন তস্কর কর্তৃক তাঁর ওয়ালেট চুরি হয়ে যাওয়া ছাড়া আর তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটলো না। তবে তিনি অত্যন্ত সজ্জন মানুষ, তিনি বলেছেন, গরীব মানুষ ওরা, চুরি তো করবেই। আমি গরীব হলে আমিও করতাম।

দেশে তাঁর এই ঝটিকা সফর অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। টিভিতে তাঁকে নিয়ে সবগুলো চ্যানেল নিউজ কাভার করলো, পত্রিকায় তাঁর ওপর সচিত্র ধারাবাহিক প্রতিবেদন ছাপা হল। অবশেষে তিনি একদিন তাঁর তোলা ছবি, ভিডিও আর ঈপ্সিত "দারিদ্র্যের স্বাদ" নিয়ে দেশে ফিরে গেলেন। আমেরিকান এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটের বিমানে, বিজনেস ক্লাসে। যাবার আগে তাঁকে বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টে এলেন অনেক মানুষ।

তাঁর এই কাজের জন্য সাধুবাদ জানালেন, আন্তরিক অভিনন্দন দিলেন। তিনি শুধু হাত নেড়ে বললেন, আমি দারিদ্র্যের স্বাদ পেতে এসেছিলাম, সেটা পেয়েছি। সত্যি বলতে কি, আমি এই "পভার্টি" খুব এনজয় করেছি। *** তথ্যচিত্র দাঁড় করাতে খুব বেশি দেরী হল না। কয়েকদিনের মধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ডকুমেন্টারির মাধ্যমে জানতে পারলো একজন আমেরিকান ধনকুবের হফম্যানের কথা, যিনি মনা, বগা, সলিম নামের শ্রমিকদের সাথে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে বিল্ডিং কন্সট্রাকশনের কাজ করছেন; রিকশাওয়ালা জসিম, রতন, হারুন মিয়া এদের সাথে ছোট্ট চায়ের স্টলে বসে কোণাভাঙা কাপ থেকে পিরিচে ঢেলে চা খাচ্ছেন।

সবাই এই ডকুমেন্টারির খুব প্রশংসা করলো। খুব ভালো একটা উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। তাঁর দারিদ্র্যের স্বাদ পাওয়া হল, আবার বাংলাদেশের গরীব মানুষগুলোর বৃত্তান্ত সবাইকে জানানোও হল। প্রাজ্ঞজনেরা ডকুমেন্টারি দেখে আহা-উঁহু করলেন। মিস্টার হফম্যান তাঁর বিলাসবহুল বাড়ির সুপরিসর ড্রইং রুমের দেয়ালজোড়া প্লাজমা টিভির দিকে তাকিয়ে আছেন।

পর্দায় দেখা যাচ্ছে লুঙ্গি পরিহিত, রিকশা চালনারত হফম্যানকে। তিনি ঢাকার আগারগাঁও এলাকায় রিকশা চালাচ্ছেন। তিনি ভাবছেন, সেই কয়েকদিন অনেক আনন্দের ছিল। সারাদিন ভূতের মতো খাটাখাটনি, সবার সাথে বসে শুধু ডাল দিয়ে "ভাত" নামের খাদ্যটি পেটপুরে খাওয়া, তারপর রাতে গামছা বিছিয়ে মড়ার মতো ঘুমানো। আহা, জীবন তো এটাই।

তিনি হাতে ধরা অত্যন্ত দামী পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিলেন। ঠিক সেই সময়ে রিকশাওয়ালা জসিম ছেলেমেয়েকে নিয়ে খেতে বসেছিল। সারাদিন রিকশা চালিয়ে তার আয় হয়েছে তিনশো বিশ টাকা। মালিকের জমা সত্তর টাকা বাদ দিলে থাকে আড়াইশো টাকা। টেনেটুনে এতেই তার চলে যায়।

মিস্টার হফম্যানের প্রতি সেকেন্ডের আয় পাঁচ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় চারশো টাকা। তিনি দু'দিনের জন্য দারিদ্র্যের স্বাদ পেতে অনেক কিছু করতে পারেন। এটা ধনী দেশের ধনী মানুষগুলোর বিলাসিতা। ধনী মানুষেরা যখন স্বাভাবিক বিলাসব্যসনে আর মজা পান না, পানসে মনে হয়, তখন জীবনে ক্ষণিকের জন্য বৈচিত্র্য আনতে তাঁরা নানা উপায় বের করেন। রতন আর হারুন মিয়া কিন্তু সারাজীবন রিকশা চালিয়েই যাবে; এবং মনা, বগা, সলিম- এরা ইট ভেঙেই দিন পার করবে।

মিস্টার এল্ড্রিজ হফম্যানের জায়গাও নির্দিষ্ট, জসিম আর সলিমের জায়গাও নির্দিষ্ট, তারা কখনো জায়গা অদলবদল করতে পারবে না। কিছুই বদলাবে না। কখনো না। কোনদিন না। (৫ ডিসেম্বর, ২০১২) ।


এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।