আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ফলিস্তিনিকে আরো র্দীঘ পথ পাড়ি দতিে হবে

সময়ের কাজ সময়ে করতে পছন্দ করি গত ২৮ নভেম্বর ফিলিস্তিনের ইতিহাসে একটি স্মরনীয় দিন হিসেবে স্বীকৃত থাকবে। ঐদিন ফিলিস্তিন জাতিসংঘে ‘অসদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রে’র মর্যাদা লাভ করে। ১৯৩টি ভোটের মধ্যে ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দিয়েছে বর্তমান বিশ্বের উঠতি শক্তিধর চীন, ভারত এবং রাশিয়া সহ মোট ১৩৮টি দেশ, বিপক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং সফ্ট পাওয়ার কানাডা সহ মোট ৯টি দেশ, আর ভোট দানে বিরত ছিল যুক্তরাজ্য, জার্মানি সহ প্রায় ৪১টি দেশ। এটা ফিলিস্তিনের জন্য অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক বিজয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো দীর্ঘ ৬৫ বছর পর এই পাওয়াই কি সব? এই স্বীকৃতি কি ফিলিস্তিনীদের যাবতীয় অধিকার সংরক্ষন করতে পারবে? একথা সত্য যে, জাতিসংঘে অসদস্য পর্যবেক্ষকের স্বীকৃতি পাওয়ায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা একধাপ অগ্রগতি পেল।

এখন দাবি আদায়ের জন্য বহির্বিশ্বে তারা নানা ধরনের প্রভাব খাটাতে পারবে। এতদিন ফিলিস্তিন জাতিসংঘের ‘অসদস্য পর্যবেক্ষক সত্তা’র মর্যাদা ভোগ করত এবং এই প্রথম ‘সত্তা’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যা আগামি দিনে ফিলিস্তিনকে একটি ‘স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার বড় অগ্রগতি বলা যায়। যদিও পূর্ন সদস্য না হওয়া পর্যন্ত ফিলিস্তিনের কোন ভোটাধিকার থাকবে কিন্তু এর মাধ্যমে দেশটি জাতিসংঘের সহযোগী ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগদানের সুযোগ পাবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যোগদানের বিষয়টি হবে খুবই তাৎপর্যপূর্ন।

কারণ এর মাধ্যমে ফিলিস্তিন ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লংঘনের জন্য বিচার দাবী করতে পারবে। আমরা দেখেছি ২০০৮ সালের শেষ এবং ২০০৯ সালের শুরুতে ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনে যে নারকীয় হত্যাকা- ঘটানো হয় তার তদন্ত এবং বিচার দাবী করেও কোন ফল হয়নি কারণ এসময় ফিলিস্তিন এই সংস্থার সদস্য ছিল না। কিন্তু এখন আইসিসির সদস্য হলে ইসরাইলকে ২০০৯ সালের এবং সাম্প্রতি ১৩ নভেম্বর হামলার জন্য যুদ্ধাপরাধের দায়ে দায়ী করতে পারবে, ইসরাইলকে বিচারের কাঠগড়ায় দার করানোর সামর্থ অর্জন করবে। শুধু তাই নয়, পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অবৈধ বসতি নির্মানের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লংঘন। এখন এবিষয়টি নিয়ে মামলা করার সুযোগ তৈরি হবে।

যদিও ইসরাইল জোরপূর্বক এটাকে বৈধ বলে দাবী করে কিন্তু আন্তর্জাতিক আদালতে গেলে ফিলিস্তিন ন্যায় বিচার পাবে আশা করি। এছাড়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উপস্থিত হয়ে ফিলিস্তিন তার দাবীগুলো জোরালো ভাষায় উপস্থাপন করতে পারবে যা এতদিন ছিল না। জাতিসংঘ মহাসচিব একে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্টার একটা অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং অনেক বিশ্লেষকদের সাথে আমিও একমত যে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। তবে এই স্বীকৃতির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এতদিন জাতিসংঘসহ বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র এবং তার দোসর ইসরাইল যেরূপ দাদাগীরি করে আসছিল তাদের সেই কর্তৃত্ব খর্ব হয়েছে। তাদের পক্ষে রয়েছে মাত্র ৯টি রাষ্ট্র আর বাকি সবাই আজ ফিলিস্তিনিদের পক্ষে যদিও অনেকেই নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছে।

পাঁচটি ভেটো শাক্তির দুটি শক্তিই আজ ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এটাকে ফিলিস্তিনের বড় কূটনৈতিক বিজয় এবং ইসরাইলের চরম পরাজয় বলা যেতে পারে। নভেম্বরে গাজা হামলার পর ইসরাইল-ফিলিস্তিন অস্ত্র বিরতি চুক্তি এবং জাতিসংঘের স্বীকৃতির পর ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। সূতরাং ফিলিস্তিনবাসীর জন্য এটা অবশ্যই আনন্দের বিষয় কিন্তুও তাদের এই বিজয় কতদিন স্থায়ী হবে তা বলা যায় না। কারণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে ফিলিস্তিনকে আরো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

তার সামনে আছে আরো অনেক বড় বড় বাধা, যেগুলো মোকাবেলা করাই এখন তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অসদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা পেয়েছে সত্যি কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে তাকে নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত হতে হবে। কিন্তু সেটা কি আদৌ সম্ভব? অসদস্য পর্যবেক্ষকের মর্যাদা দিতেই যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ঘোর বিরোধীতা করে সেখানে কিভাবে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করবে! কারণ একজন ভেটো শক্তি ভেটো প্রদান করলেই নিরাপত্তা পরিষদে কোন সিদ্ধান্ত পাস হয় না ফলে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বপ্ন হয়ত স্বপ্নই থেকে যাবে কখনও তা বাস্তবায়ন হবে না, যদি না যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত হয়। আর যুক্তরাষ্ট্র তার মূল্যবোধ কখনোই ইচ্ছাকৃতভাবে জাগাবে না কারণ এর সাথে তার রাজনৈতিক এবং জাতিয় স্বার্থ জড়িত। ওবামা যখন মায়ানমার সফর করেন তখন তিনি সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর চলমান নির্যাতন বন্ধের জোড় দাবী করেন।

অথচ ফিলিস্তিন মুসলমানদের জন্য তা করছেন না। কিন্তু কেন? ১৯৪৭ সালে যখন এই ইসরাইলকে প্রতিষ্ঠিত করা হয় তখন থেকে আজ অবধি কয়েকবার আর ইসরাইল যুদ্ধ হয়েছে এবং ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যকে একটি ত্রাসের রাজত্বে পরিনত করেছে, নষ্ট করেছে বিশ্ব শান্তি। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের ক্যান্সার খ্যাত এই দেশটির সকল অপকর্মের নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নীতি নৈতিকতার তারা কোন তোয়াক্কা করেনি। এর একটাই কারন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ।

তবে এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীন কিছু রাজনৈতিক সংকটকেও দায়ী করা যায়। ২০০৮ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর কায়রো ঘোষণায় ওবামা মধ্যপ্রাচ্য সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের কথা বলেছিলেন। আমরা মনে করি তার আগ্রহ ছিল কিন্তু তিনি তা করতে পারেননি! দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি জয়ী হলেও নি¤œ কক্ষে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্টতা রয়ে গেছে। ফলে তিনি চাইলেই দেশের অভ্যন্তরী কিংবা পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে তাদের উপেক্ষা করে কোন নীতি গ্রহন করতে পারেন না। কেননা রিপাবলিকানরা বা মিট রমনি হলেন ইসরাইলের গোড়া সমর্থক।

মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী সকল আর্থিক বিষয়ের উপর ঐড়ঁংব ড়ভ জবঢ়ৎবংবহঃধঃরাবং-এর নিয়ন্ত্রন থাকে। এছাড় বহুজাতিক কোম্পানি এবং ইহুদি লবির কারনে ইসরাইলের ব্যাপারে ওবামা তার নীতি পরিবর্তন করতে পারেনি। আর কতদিনে যুক্তরাষ্ট্র এই নীতি থেকে বেড়িয়ে আসতে পারবে তাও বলা মুশকিল। জাতিসংঘ স্বীকৃতির ঠিক পর দিনই প্রতিশোধ হিসেবে ইসরাইল পশ্চিম তীর এলাকায় নতুন করে ৩,০০০ বসতি নির্মানের ঘোষনা দিয়েছে যা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক শান্তির বদলে উত্তেজনাকে বৃদ্ধি করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এমনকি ইসরাইল বিভিন্ন ট্যাক্স কর্তন এবং আমদানী-রপ্তানী শুল্ক বন্ধেরও হুমকি প্রদান করেছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ আরো বন্ধুর হতে পারে। যদি না সকল শক্তি একত্রিত ভাবে ইসরাইলের এরূপ ঔধত্যপূর্ন আচরনকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে। আমরা দেখি আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর যে কোন সিদ্ধান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য বিদ্যমান থাকে। কারণ এই সংগঠনগুলোর অধিকাংশ বাজেটই আসে তার কাছ থেকে। ফলে এই ধরনের সংগঠন গুলোতে যখনই ফিলিস্তিন সদস্যপদ দাবী করবে তখনই মার্কিন বিরোধীতার কারণে তা হয়ত আর সম্ভব হবে না।

উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে অসদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা প্রদান করায় যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে জাতিসংঘে তার বাজেটের এক পঞ্চমাংশ কমিয়ে দিয়েছে। সূতরাং আইসিসি বা অন্যান্য সংগঠনে স্থান তৈরি করাও ফিলিস্তিনের জন্য বড় চ্যালেঞ্চ হতে পারে। তবে জাতিসংঘের এই স্বীকৃতির প্রাপ্তি এবং প্রতিবন্ধকতা যাই থাক না কেন, আশার কথা হলো এটা ফিলিস্তিনের জন্য একটা বড় অর্জন তা অকপটেই বলা যায়। ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৮১ নং প্রস্তাবের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসিত ফিলিস্তিন ভেঙ্গে ইহুদিবাদী ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তার ঠিক ৬৫ বছর পর একই দিনে এমন স্বীকৃতিকে ফিলিস্তিনীদের জন্য ‘রেড লেটার ডে’ বলা যায়।

বিশ্বের অধিকাংশ শক্তি আজ ফিলিস্তিনীদের পক্ষে। এমনকি মার্কিন মিত্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সও আজ ফিলিস্তিনীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা আজ ইসরাইলের বসতি নির্মানের তীব্র নিন্দা করে প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তলব করেছে। ফিলিস্তিনের পাশে আছে রাশিয়া ও চীন। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে স্বৈরশাসকদের পতন হয়েছে, সেখানে আজ গণতন্ত্রের পতাকা উড়ছে।

ফলে তাদের মাঝে নতুন একধরনে ঐক্য গড়ে উঠেছে যা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবী জোরালো করার আরো একটা প্লাস পয়েন্ট। তাই ফিলিস্তিনের এই বিজয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য আধিপত্য অনেকাংশে খর্ব হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখন যুক্তরাষ্ট্রের মানবিকতাবোধ কবে উদয় হবে, বারাক ওবামা মায়ানমার সফরকালে রোহিঙ্গাদের জন্য যেভাবে জোর গলায় তাদের দাবীর কথা বলেছেন, তেমনভাবে ফিলিস্তিন মুসলমানদের পক্ষে কবে কথা বলবেন তা বলা যায় না? তবে মনে হয় বিশ্ব যেভাবে একত্রিত হচ্ছে তাতে খুব শীঘ্রই বিশ্বব্যাপী মার্কি আধিপত্য খর্ব হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার দোসররা ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে কত দ্রুত এই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সা¤্রাজ্যবাদীরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসে সেদিকে লক্ষ্য থাকবে বিশ্বের সকল শান্তিকামী মানুষের। জাহেদুল ইসলাম শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.