আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

জামায়াতের জঙ্গিবাদের দলিল এবং শাহরিয়ার কবিরের প্রামাণ্যচিত্র - জোট সরকারের আমলনামা- ৭

আমি কিছুই না..... আবার অনেক কিছু । ‘ওয়াজিবুল কতল’- এর ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় মানুষ হত্যার রাজনীতি। এই রাজনীতি চলছে এখনো। চলবে হয়তো সামনের দিনগুলোতেও। অন্তত সরকার বা প্রশাসনের আচরণে সে রকমই মনে হয়।

এখন পর্যন্ত জঙ্গি নিয়ন্ত্রণে কোনো সরকারেরই কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। গণমাধ্যমে অনেকদিন প্রচার-প্রকাশের পর সরকার কিছু গ্রেপ্তারের নমুনা দেখায়। এরপর আর কোনো ধারাবাহিকতা থাকে না। চলে প্রশাসনের নির্লিপ্ততা, চলে জঙ্গিদের উন্মত্ততা। ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে ফতোয়া প্রচার করে ইসলামভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো।

প্রকাশ্যে তারা ওয়াজ বা বক্তৃতায় এসব ফতোয়া দেয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের ওয়াজগুলোতে রাষ্ট্রবিরোধী অনেক বক্তব্যও পাওয়া যায়। এসব সরকারের খুব একটা নজরে আসে না। ওয়াজ বলেই হয়তো সরকার এটাকে আমলে নেয় না। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওয়াজের মাধ্যমেই গড়ে উঠছে বিশাল নেটওয়ার্ক।

বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী তার বাকপটুতা দিয়ে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে টেনে আনছে ধর্মীয় রাজনীতির কাতারে। এই ধর্মীয় রাজনীতির দোহাই দিয়েই তৈরি হচ্ছে জঙ্গি, রক্তাক্ত হচ্ছে দেশের জনপদ, লেখা হচ্ছে খুন ও লোমহর্ষকতার ইতিহাস। এসব নিয়ে গণমাধ্যমে অসংখ্যবার সংবাদ হয়েছে, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হয়েছে। আদতে কোনো কার্যকর ফল হয়নি। কয়েকজন শীর্ষ জঙ্গির ফাঁসি ও কিছুদিন পর পর কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেই বিষয়টিতে যেন তুষ্ট থাকছে সরকার।

নির্বাচনের আগে জঙ্গি নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সরকার গঠনের পর এক বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। জঙ্গি নিধনে কার্যকারিতা দেখা যায়নি, দেখা যায়নি তেমন কোনো উদ্যোগ। আলোচনা হয়েছে বিস্তর। শীর্ষ জঙ্গি মুফতি হান্নানের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

সেই তথ্য ধরে অগ্রগতি হবার কথা ছিল অনেক, হয়নি কিছুই। জঙ্গিবাদ সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে গত জোট সরকারের সময়ে। জামায়াত জঙ্গিবাদকে মিডিয়ার সৃষ্টি বলে দাবি করলেও পরে জঙ্গিবাদের সঙ্গে জামায়াতেরই সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। জামায়াত জঙ্গিবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা করে, বিএনপি-জামায়াতকে পৃষ্ঠপোষকতা করে। এভাবেই এগিয়ে চলছে জঙ্গিবাদ।

মুফতি হান্নানের জবানবন্দি থেকে জানা যায় বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির এক কালো অধ্যায়ের কথা। ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা নিয়ে হাওয়া ভবনে মিটিংয়ের কথা, জড়িতদের কথা। এসব অস্বীকার করছে বিএনপি। বিভিন্ন প্রমাণাদি এখন বেরিয়ে আসছে, বিএনপির তাই অস্বীকারের উপায় নেই। শুধু জোটের রাজনীতি ধরে রাখার জন্যই বিএনপি জড়িয়ে যাচ্ছে জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে, জড়িয়ে যাচ্ছে জামায়াতের ফাঁদে।

গত নির্বাচনে বিএনপি এর সমুচিত জবাব পেয়েছে ভোটারদের কাছ থেকে। তাতে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি বিএনপির রাজনীতিতে। বরং বিএনপিতে প্রতিক্রিয়াশীলদের আধিপত্য বাড়ছে, বাড়ছে জামায়াতনির্ভরতা। এভাবে চলতে থাকলে বিএনপির রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনি ভেবে দেখা দরকার। জামায়াতী গ্রাস মুক্ত হতে না পারলে বিএনপির অস্তিত্ব নিয়েই সামনে হুমকি আসার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের সঙ্গে পুরোপুরিভাবে জড়িত জামায়াতে ইসলামী। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর। মূলত জামায়াতী জঙ্গিবাদের বিভিন্ন প্রামাণ্য দলিল নিয়েই নির্মিত হয়েছে ‘জিহাদের প্রতিকৃতি শাহরিয়ার কবিরের এই প্রামাণ্যচিত্রটির দৈর্ঘ্য মাত্র ৬০ মিনিট। মাত্র ৬০ মিনিটেই তথ্য-প্রমাণসহ জঙ্গিবাদের বিস্তৃত বিবরণ আছে এই প্রামাণ্যচিত্রে। তথ্য-প্রমাণের পাশাপাশি আছে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাক্ষাৎকার।

আছে সমাজ ও ধর্ম গবেষকদের বিশ্লেষণ। আছে জঙ্গিবাদের নমুনা... জঙ্গিদের বর্বরতা... আক্রান্তদের আহাজারি... স্বজনদের কান্না... প্রামাণ্যচিত্রটি ইতোমধ্যেই কয়েকটি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শিত হয়েছে। দেশেও দু’দফা প্রদর্শিত হয়েছে। আগামী মাসে টেলিভিশনে প্রদর্শিত হবে, তারপর ডিভিডি হয়ে আসবে বাজারে। সাপ্তাহিক তার পাঠকদের জন্য পুরো প্রামাণ্যচিত্রটির ধারা বিবরণী তৈরি করেছে।

এতে কোনো ধরনের পরিবর্তন না এনে একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। গ্রন্থনা করেছেন মহিউদ্দিন নিলয় ও আব্দুল্লাহ্ নূহ বাংলাদেশ। ২১ আগস্ট ২০০৪. দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভা শেষ হওয়ার মুহূর্তে আরম্ভ হলো সন্ত্রাসীদের গ্রেনেড-বোমা হামলা ও গুলিবর্ষণ। মুহূর্তের ভেতর টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়া আর আহতদের আর্তচিৎকারে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আকাশ আচ্ছন্ন হলো। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মীর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।

দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ আহত হলেন ৩ শতাধিক। শেখ হাসিনা ২১ আগস্ট আমাদের যে র‌্যালি ছিল তা ছিল শান্তির জন্য এবং গ্রেনেড হামলার বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে, আমরা যেখানে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে র‌্যালি করলাম সেই র‌্যালিটাকে আক্রমণ করা হলো গ্রেনেড দিয়ে। প্রায় ১ ডজন মতো গ্রেনেড ছোড়া হয়েছিল। আমরা এটা কল্পনাও করতে পারিনি।

আমি সেদিন একটু দেরিতে পৌঁছেছি। সকলের বক্তব্য প্রায় শেষ। তাদের একজন থাকতেই আমি রওনা হলাম, গিয়ে পৌঁছলাম এবং পৌঁছেই আমি বক্তব্য রাখতে শুরু করলাম। কিছু বোঝা বা বলার আগেই হঠাৎ আওয়াজ, গ্রেনেডের। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে সবাই তাড়াতাড়ি বসিয়ে দিল নিচে।

আমার সামনে একটা টেবিলও ছিল। বসে পড়লাম। একটার পর একটা গ্রেনেড হামলা হয়েই যাচ্ছিল। তখন ক্ষমতাসীন চারদলীয় জোট সরকার। এই গ্রেনেড-বোমা হামলার জন্য যথারীতি আওয়ামী লীগ ও ভারতকে দায়ী করলেও জঙ্গি মৌলবাদী সংগঠন হরকাতুল জিহাদের দাবি এই হামলা তারাই করেছে।

টিভি প্রতিবেদন গ্রেনেড হামলা করে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে প্রথম জবানবন্দি দেন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান। হরকাতুল জিহাদের গ্রেপ্তারকৃত নেতা মুফতি হান্নান বলেছেন কীভাবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শীর্ষ নেতা, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ, প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু হরকাতুল জিহাদ ও ফ্রিডম পার্টির সঙ্গে বসে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। মুফতি হান্নান : প্রথম মিটিং হয় ১৪ তারিখে, মিটিং ছিল হাওয়া ভবনে। সে হাওয়া ভবনে বিভিন্ন আলোচনা হয়। ওই হাওয়া ভবনের মিটিংয়ে শরিক ছিল তারেক জিয়া, আলী আহসান মুজাহিদ সাহেব, হারিছ চৌধুরী, আব্দুস সালাম পিন্টু সাহেব এবং হরকাতুল জিহাদের আমির, মাওলানা আব্দুস সালাম সাহেব, শেখ ফরিদ সাহেব এবং আল মারকাজুল ইসলামের নায়েবে আমির মুফতি আব্দুর রশিদ সাহেব।

সেখানে তারেক জিয়া সাহেব আলোচনা করেন যে, বর্তমান অবস্থায় দেশের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা এদেশে অরাজকতা সৃষ্টি করছে, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। এরপর আলী আহসান মুজাহিদ সাহেব বললেন যে, আপনার কথা সত্য। শুধু তাই নয়, তারা ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের কাজ করছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সাহেব বললেন যে, কথাগুলো সবই সত্য এবং পরিষ্কারভাবে আপনারা বলেন কি পদক্ষেপ নেয়া দরকার? তিনি বললেন যে, এখানে দুটা পদক্ষেপ।

হয়ত এদেশে যে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে তা আমাদের ব্যাপক রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা দরকার নচেৎ তাকে এদেশ থেকে চিরবিদায় করে দেয়া দরকার অর্থাৎ তাকে শেষ করে দেয়া দরকার। অবসরপ্রাপ্ত মেজর নূর, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি মেজর নূরও উপস্থিত ছিলেন। তাকে তিনি বললেন যে, আপনি কিছু বলেন। তখন মেজর নূর বললেন, আপনারা অবশ্যই রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করবেন এটা আমি জানি। আমি তো রাজনীতি করি না কিন্তু আমি জানি তার মোকাবেলা করতে হলে তিনটা পদক্ষেপ নিতে হবে।

একটা হলো, তার বাড়িতে আক্রমণ করতে হবে, অথবা তার আসা-যাওয়ার পথে তাকে আক্রমণ করে মেরে ফেলতে হবে নচেৎ তার কোনো মিটিংয়ে আক্রমণ করে তাকে শেষ করতে হবে। টিভি প্রতিবেদন মুফতি হান্নান জানিয়েছেন ২০ আগস্ট সকাল ১১টায় পিন্টু তার ভাই তাজউদ্দিন, হরকাতুল জিহাদ নেতা আবু তাহের জান্দাল ও কাজলের উপস্থিতিতে ১৫টি গ্রেনেড দেন শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য। আপনাদের এই অপারেশন ব্যর্থ হলো এটা কখন জানতে পারলেন আপনারা? মুফতি হান্নান : আমরা তখন অফিসে ছিলাম। অপারেশন হওয়ার পর ওরা মোবাইল করে জানায় যে, এ ধরনের অবস্থা হয়েছে এবং এ কারণেই হয়েছে। কোনো ডিসিপ্লিন ছিল না এবং স্টেজ কখন কোথায় হবে এ ব্যাপারে জানা ছিল না।

হঠাৎ করে স্টেজ হয় এবং মানুষজনের খুব ভিড়ের কারণে এরা পশ্চিম দিকে এবং দক্ষিণ দিকে অবস্থান করে এবং অন্যরা, জামায়াতে ইসলামীর যারা লোকজন ছিল তারা প্রায় ১৫ জন। তারা কে কোথায় অবস্থান নিয়েছে, কেউ কাউকে খুঁজে না পাওয়াতে। হঠাৎ করে ওরা বলল যে, দক্ষিণ দিক থেকে একটা গ্রেনেড আসে। আসার পরই মানুষ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপরে যারা গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে তারা ওপরের দিকে নিক্ষেপ করেছে এবং ওপরেই গ্রেনেডগুলো ফেটেছে।

ওরা বলেছে প্রায় ২০ থেকে ৩০টা গ্রেনেড ওপরে ফেটেছে এবং বিভিন্ন জায়গায় ফেটেছে। ফলে মানুষ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ওই সময় ওরা গুলি করেছে। ওরা বলল যে, রাইফেলের গুলি আসছে কিন্তু শেখ হাসিনার কোনো সমস্যা হয়নি। এবং ওরা ফিরে আসছে।

তখনই আমরা যাই। শেখ হাসিনা আমার ওপর অনেক বারই আক্রমণ হয়েছে। যে কারণে আমাদের সরকার থাকতে আমাদের নিরাপত্তার বিষয়ে একটা আইন করেছিল। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পরই সে আইনটা প্রত্যাহার করে নেয়। এবং প্রত্যাহার করে নেয়ার পর পরই কিন্তু এ আক্রমণটা হয়।

এর সঙ্গে যে তদানীন্তন জোট সরকারের একটা মদদ ছিল তা কিন্তু পুলিশ বা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা সবার আচার-আচরণ থেকে সেটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তাদের একটা যোগসাজশ নিশ্চয় ছিল। বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশে অভ্যুদয় ঘটেছে শতাধিক জঙ্গি-মৌলবাদী সংগঠনের। হরকাতুল জিহাদসহ এসব সংগঠনের লক্ষ্য সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামী হুকুমত ও কোরআনের আইন কায়েম করা। (প্রথম পর্ব জিহাদের ডাক, জিহাদ কি ও কেন? বইয়ের প্রচ্ছদ) কারা এই হরকাতুল জিহাদ? বাংলাদেশে আমরা তাদের শেকড় অনুসন্ধান করেছি। হাসান রফিক হরকাতুল জিহাদের প্রাক্তন কর্মী হরকাতুল জিহাদ যেদিন প্রতিষ্ঠিত হয় সেদিন ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল।

জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত মিটিংয়ে বলা হয়েছিল হরকাতুল জিহাদ এমন একটা প্ল্যাটফরম যেখানে বাংলাদেশের যত মুজাহিদ আছে, আফগান ফেরত যত সশস্ত্র যোদ্ধা আছে তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটা প্ল্যাটফরম। তাছাড়া সমগ্র বিশ্বে যারা জিহাদভিত্তিক কাজ করে যেমন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম, আল আলামী, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ইসলামী হরকাতুল জিহাদ, আল কায়েদা এবং আল উখওয়ানুল ইসলাম মিসর। সবার মাধ্যমে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ইসলামী শাসন করার ইচ্ছা ছিল হরকাতুল জিহাদের। আমি ১৯৯১ সালে গিয়েছিলাম আফগানিস্তানে এবং ১৯৯২ সালে ফিরে আসি। প্রথমে পটিয়া মাদ্রাসায় ট্রেনিং করেছিলাম।

বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ নিয়েছি, অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিয়েছি আরাকান পাহাড়েÑ প্রায় ৬ মাস। পাহাড়ে কীভাবে উঠব, কীভাবে নামব। শরীরের মধ্যে প্রায় ৬/৭টা ইট দিয়েছে। হাত উঁচু করে তাতে অস্ত্র ধরে পানির মধ্যে সাঁতার কেটেছি। মুফতি হান্নান ৮৭ সালের শেষ দিকে আমি পাকিস্তান যাই।

পাকিস্তানের করাচিতে জামিয়া ইউসুফ নিউ টাউন মাদ্রাসায় মুফতি অর্থাৎ ডিগ্রি পড়ার জন্য আমি যাই। ভর্তি হওয়ার পর আমি যখন তৃতীয় বছরে অর্থাৎ ১৯৮৯ সালের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে হামলা করে। আমাদের বাংলাদেশি মাওলানা আব্দুর রহমান শহীদ (রঃ) এবং আরো অনেক পাকিস্তানি ওলামায়ে একরাম, মুজাহিদরা নিউ টাউন মাদ্রাসায় আসে। ওখানে বক্তৃতা হয়, জিহাদী আলোচনা হয়। ওই আলোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা আফগানিস্তানে যাই।

আফগানিস্তানের খোস্ত শহরে ইয়াবাহ্ ট্রেনিং সেন্টারে প্রথম প্রশিক্ষণ নিই। মুফতি ওবায়দুল্লাহ কর্মী, লস্কর-ই তৈয়বা হরকাতুল জিহাদুল ইসলামী আলামী পাকিস্তানÑ এটা হলো সংগঠনের নাম। ওই সংগঠনের মাধ্যমে নুরুল কবির আমাকে এখান থেকে বলে যে, আপনি লাহোরে চলে যান। লাহোরে হরকাতুল জিহাদের অফিস আছে মুজাহিদদের। একটা চিঠি আমার হাতে দিয়ে বললেন, এই চিঠিটা আপনি দেখাবেন।

এরপর আপনার আর চিন্তা করা লাগবে না। তারাই সব নিয়ে যাবে। লাহোরে গেলাম। সেখানে যাবার পর ওরা আবার আমাকে তাদের লোক দিয়ে পেশোয়ারে পাঠিয়ে দিল। পেশোয়ারে মুজাহিদীনদের অফিস আছে।

ওখানে যাবার পর ওরা আবার চেক করে। ভারতীয় মানুষ হলে আবার বেশি চেক করে, কারণ ভারতের সঙ্গে ওদের একটু শত্রুতা আছে। তারপর আমাকে যখন দেখল যে, ভালো তখন আমাকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। গাড়িতে করে নিয়ে গেল খোস্ত শহরে। সেখানে গিয়ে ট্রেনিং নিয়েছি।

প্রায় এক মাস। ওই এক মাসে আজ এক রকম অস্ত্র, কাল আরেক রকম অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। হাসান রফিক : বাংলাদেশ হরকাতুল জিহাদ জেলাভিত্তিক, থানাভিত্তিক যারা কমান্ডার ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ওরা একদিন আমাদের মাদ্রাসায় এলো ছাত্রদের হরকাতুল জিহাদের দাওয়াত দেয়ার জন্য। তারা যখন বলল যে, হরকাতুল জিহাদ এমন একটি প্ল্যাটফরমের নাম যাদের সঙ্গে থাকলে খুব সহজভাবে বেহেস্তে যাওয়া যায়। আমরা এখানে শুধু জিহাদের কাজ করব।

আমরা দেশে ইসলাম কায়েম করব। ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করব। প্রতিবেশী বার্মা থেকে আরাকানের মুসলিম যুবকেরা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসেছে জিহাদের প্রশিক্ষণের জন্য। মোহাম্মদ শাকিল জিহাদি প্রাক্তন কর্মী, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) ২০০০ সালে এসে সাডিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছি, ওখানেই ট্রেনিং নিয়েছি। এক বছর পর হাটহাজারী মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছি।

তিন বছর পর লিবিয়ায় যাই লেখাপড়া করার জন্য। ওখানে দু’বছর লেখাপড়া করার পর বাংলাদেশে চলে আসি। হাসান রফিক আমাদের ব্যাচে ছিল প্রায় ৩০০ জন। যেগুলো ছাত্র শিবিরের ছিল, হরকাতুল জিহাদে ছিল, রোহিঙ্গা অর্থাৎ আরএসও ছিল, আইটিএম বা ইতহাদাতুল মুসলিম ছিল। সে সময় তো ওখানে জোরেশোরে জামায়াতে ইসলাম এবং হরকাতুল জিহাদ, আরএসওÑ সবাই মিলে আরাকানে ইসলাম কায়েম করার জন্য জিহাদের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল।

মুফতি হান্নান হরকাতুল জিহাদে থেকে আফগানিস্তানে জিহাদ করেছি এবং চেচনিয়ার ভেতরে অনেক সাথী ছিল এবং ফিলিস্তিনে গিয়েছি। আর কাশ্মীরে গিয়েছে আমাদের মাওলানা মঞ্জুর হাসান। উনি ওখানে শহীদ হয়েছেন এবং বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের অনেকে কাশ্মীরে যাতায়াত করেছে। বাংলাদেশের মোট কতজন আপনারা আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন? মুফতি ওবায়দুল্লাহ (কর্মী লস্কর-ই তৈয়বা) : পাঁচ হাজারের ওপর গিয়েছে। প্রশিক্ষণ কে দিয়েছে? উত্তরদাতার ছায়া : ওখানে আরএসও, তারপর আইটিএমের মাধ্যমে ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতারা, জামায়াতের নেতারা আমাদের প্রশিক্ষণ দিত।

মুফতি ওবায়দুল্লাহ : আমার অধীনে ৪-৫ হাজার জন প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এভাবে সারা বাংলাদেশে লাখের ওপরে ট্রেনিংপ্রাপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম স্থান হলো চট্টগ্রাম এবং দ্বিতীয় স্থান সিলেট। হাসান রফিক প্রথমে আমরা জিহাদের যে বাস্তব পাঠ নিই সেটা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, যিনি জামায়াতের একজন এমপি, তার ওয়াজ থেকে। দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজ ‘ইসলাম হচ্ছে একটি বিপ্লবী মতবাদ।

একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। আর এই জীবন ব্যবস্থাকে যারা দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সেই রেভুলিউশনারি পার্টির নাম হচ্ছে ইসলাম। ’ হাসান রফিক দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী একেবারে আমাদের অন্তরের ভেতরে গেঁথে দেন। একটা হচ্ছে নিজে পাঠ করা আর আরেকটা হচ্ছে অন্যে বলার পর সেটা দিলের ভেতর ঢুকে যাওয়া। যেটা আমাদের দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজ শুনে আমাদের হৃদয়ে রেখাপাত করত যে জিনিসটা।

দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মাহফিলে যাওয়াটা একটা বাধ্যতামূলক পাঠ। দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজ ‘আমি আল্লাহ্র দিন কায়েম করতে চাই। এই আন্দোলনকে পরিচালিত করতে গিয়ে যদি সশস্ত্র হামলার মোকাবেলা করতে হয় তাহলে সশস্ত্রভাবেই মোকাবেলা করাটাই হচ্ছে জিহাদের চূড়ান্ত রূপ। ইমানকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে পৃথিবীর বুকে। সেজন্য সংগ্রাম করতে হবে।

সে সংগ্রাম যত প্রকারেরই হোক সব জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। ’ সাইফুল্লাহ প্রাক্তন কর্মী, ইসলামী ছাত্রশিবির আমরা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজ শুনতে যেতাম। ওনার ওয়াজ আমাদের খুব ভালো লাগত। উত্তরদাতার ছায়া : সাঈদী সাহেব জিহাদ সম্পর্কে যা বলতেন তা আমার ভালো লাগত। সাইফুল্লাহ প্রাক্তন কর্মী, ইসলামী ছাত্রশিবির দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী এবং জামায়াতের অন্যান্য নেতা আমাদেরকে সব সময় বলতেন যে, তোমরা মাদ্রাসায় যাও, জিহাদে যাও।

কিন্তু তার ছেলেমেয়েরা কখনো মাদ্রাসায়ও যায়নি, জিহাদেও যায়নি। দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজ মোনাফেক তো সহজেই চেনা যায় না। কয় যে হুজুর এই যে বার বার জিহাদ, এই মারামারি, এই ঠেঙ্গাঠেঙ্গি এগুলো আছে নাকি ইসলামের মধ্যে? কোথায় আছে যে মারামারি করা লাগবে, মিছিল করা লাগবে, ধর্মঘট করা লাগবে? এ ধরনের জিহাদে অংশ নিতে হবে। এগুলো কি? এগুলি বাদ দিয়ে শান্তভাবে যদি করা যায়। অল্প অল্প, ছোট ছোট দোয়া শিক্ষা দেন, যাতে করে সহজে বেহেস্তে চলে যাওয়া যায়।

আমি বলছি ভাই, রসুলুল্লাহ্ আমাদেরকে এ রকম শেখান নাই যে, এ রকমের চোরাগলি বেহেস্তে যাওয়ার জন্য আবিষ্কার করে দেব, ছোট্ট একটা দোয়া পড়বেন আর আপনারা বেহেস্তের বারান্দায় গিয়েই কলা খাওয়া শুরু করলেন! এত সহজে বিষয়টা আসবে না। বিষয়টা খুবই কঠিন। ’ একটি আরবি পত্রিকায় দেখা যায় পর্দায় এবং কথা শোনা যায় এখানে যে একটি পত্রিকা দেখা যাচ্ছে এর নাম হলো ‘জরবে মোমিন’। এ পত্রিকাটা আন্তর্জাতিক হরকাতুল জিহাদ ইসলাম অর্থাৎ পাকিস্তান থেকে এই পত্রিকা প্রতি সপ্তাহে বের হয়। সারা বিশ্বে যারা হরকাতুল জিহাদ করে তাদের জন্য একটা মুখপত্র হিসেবে এটা ব্যবহার করা হয়।

আমাদের বাংলাদেশেও যারা হরকাতুল জিহাদ করে তাদের হাতেও চলে আসে। ’ হরকাতুল জিহাদসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ জঙ্গি, মৌলবাদী সংগঠন ইসলামের নামে নরহত্যায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে সৌদি ওহাবীবাদের অনুসারী মওলানা মওদুদী ও তার দল জামায়াতে ইসলামীর অন্যান্য নেতার বই পড়ে, কিংবা ওয়াজ শুনে। কি আছে এসব জিহাদী বইয়ে? সাইফুল্লাহ (ওয়াকাতিলুফি ছাবিলিল্লাহিল্লাদি ওকাতিলুনাকুম ওয়ালা তায়াবাদু ইন্নালাহা আলা লিমুন ) কতল কর আল্লাহ্র রাহে তাদের বিরুদ্ধে, যারা লড়াই করে তোমাদের বিরুদ্ধে। অবশ্য কারো প্রতি বাড়াবাড়ি কর না। তাদেরকে হত্যা কর, যেখানে পাও সেখানেই।

তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না তারা করজোড়ে জিজিয়া প্রদান না করে। আরাকানের শাকিল জিহাদীকে না পেলে আমরা জানতাম না যে, লিবিয়ায় এখনো বিভিন্ন দেশের জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেয়। উত্তরদাতার ছায়া : লিবিয়াতে এক বছর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। সেখানে প্রশিক্ষণ চলাকালীন অবস্থায় আমার হাঁটু ভেঙে যায়। এরপর বাংলাদেশে চলে আসি।

আরাকানে জিহাদ করতে গিয়ে নিহত হয়েছে হরকাতুল জিহাদের মীর আহম্মদ। তার পিতার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমরা গিয়েছিলাম চট্টগ্রামের হাটহাজারীর এক দুর্গম গ্রামে। আহমেদ হোসেন হুজির ‘শহীদ’ মীর আহম্মদের বাবা আমার ছেলে মীর আহম্মদ তালীমুদ্দীন মাদ্রাসায় পড়ত। (আল-জামিয়াতুল ফোরকানিয়া তা’লীমুদ্দীন) মাদ্রাসায় গিয়ে আমি ওদেরকে জিজ্ঞাসা করি, আপনাদের কাছে আমার ছেলের কোন খোঁজখবর আছে কি না? তখন ওরা আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছে যে আপনি শহীদের আব্বা। আপনার ছেলে শহীদ হয়েছে।

কোথায়? বলে, আরাকানে, বার্মায়। যাওয়ার পথে মাইন বিস্ফোরিত হয়ে সে শহীদ হয়েছে। তারা তিনজন শহীদ হয়েছে। একজন ঢাকার কাজী কাওসার, আরেকজন সিলেটেরÑ আমি তার নাম ভুলে গেছি। ১৯৯৬ সালের আগেই মাসিক দাওয়াত নামে মুফতি জয়নাল ইসলাম একটা পত্রিকা বের করেছিল।

লাদেনের সঙ্গে কি কি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল তা ছবিসহ এ পত্রিকায় বের হয়েছে। মুফতি জয়নাল কোথায় জিহাদ করেছে? মীর আহম্মদের বাবা : সে কিসের জিহাদ করেছে? সে শুধু মাদ্রাসার ছেলেদের নিয়ে জিহাদে পাঠিয়ে দিত। তার ছেলেকে করাচি পড়াচ্ছে। মানুষের ছেলেদের বয়ান করে, কুরআন হাদিস দিয়ে বয়ান করে, আতঙ্কিত করে জিহাদে পাঠিয়েছে। আপনি কি খুশি যে, আপনার ছেলে আরাকানে গিয়ে শহীদ হয়েছে? মীর আহম্মদের বাবা : খুশি কি আর অখুশি কি? সে শহীদ হয়ে গেছে।

আমার তো আর বলার কিছু নেই। কাকে বলব? আল্লাহকে বলছি। আপনি কি চেয়েছিলেন যে, আপনার ছেলে এভাবে শহীদ হোক? মীর আহম্মদের বাবা : না। আমি আমার ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়তে দিয়েছি। সে শহীদ হবেÑ আমার কি ভালো লাগছে? মনটা কি ভালো আছে? মীর আহম্মদ শহীদ হবার পর তালীমুদ্দিন মাদ্রাসা থেকে শুধু এই সনদটি দেয়া হয়েছে তার পিতা আহম্মদ হোসেনকে।

মীর আহম্মদের বাবা : আর কিছুই দেয়নি। না, টাকা পয়সা, অর্থ সাহায্যÑ কিছুই করেনি। দেখতেও আসেনি। মুফতি ইজহার দেখতেও আসেনি। আমি অনেক আলেমকে বলেছিÑ কিয়ামতের ময়দানে, হাশরের ময়দানে মুফতি ইজহারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেব আল্লাহর দরবারে।

তখন বহু আলেম আমার ওপর রেগে যায়। কেন তুমি অভিযোগ দেবে? আমাদের হযরত ওমর (রাঃ) জিহাদে লোক পাঠিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ মারা গেছেÑ শহীদ হয়েছে। ওদের বাড়িতে আটার বস্তা মাথায় নিয়ে হযরত ওমর রুটি বানিয়ে খাইয়েছেন। কিন্তু মুফতি ইজহার আমাকে দেখতেও আসেনি।

আমার বিবিকেও দেখতে আসেনি। আমরা কোন অবস্থায় আছি। স্যার আপনার গবেষণায় জঙ্গি মৌলবাদীদের সঙ্গে জামায়াতের কি সম্পর্ক প্রমাণ হয়েছে? ড. আবুল বারকাত (অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) : গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে প্রায় তিন হাজারের ওপর জঙ্গি বিভিন্নভাবে গ্রেপ্তার হয়েছে। এবং যেসব জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়েছিল তাদের শতকরা ৯০ ভাগ ছাত্র অবস্থায়, যদি ছাত্র হয়ে থাকে অথবা গ্রেপ্তারকৃত অবস্থায় হয় জামায়াতের রাজনীতি অথবা জামায়াতের রাজনীতির যে ছাত্র সংগঠন তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল। হাসান রফিক আগে ছাত্রশিবিরের একটা স্লোগান ছিল জিহাদ, জিহাদ, জিহাদ চাই, জিহাদ করে বাঁচতে চাই।

আমি হরকাতুল জিহাদ করেছি ঠিকই, আজও পর্যন্ত ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আমার খুব একটা ভালো সম্পর্ক। সে সময় আমি ছাত্রশিবিরও করতাম, হরকাতুল জিহাদও করতাম। হরকাতুল জিহাদ থেকে জাগো মুজাহিদ পড়ে আমরা জিহাদের উৎসাহ নিতাম আর শিবিরের বইতে তো জিহাদের কথা আছেই। ড. আবুল বারকাত : যারা ধরা পড়েছে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে যে, গত নির্বাচনের সময় তারা কার জন্য কাজ করেছে? সেখানে স্পষ্টভাবে তাদের প্রথম চয়েস ছিল জামায়াতের সরাসরি প্রার্থী যদি থেকে থাকে সেটা অথবা জামায়াতের সঙ্গে যে চারদলীয় জোট, সে জোটের পক্ষে তারা কাজ করবে। কীভাবে সাহায্য করত তারা? মুফতি ওবায়দুল্লাহ : টাকা দিয়ে, সাহস দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করত তারা।

কোন নেতা আসত? মুফতি ওবায়দুল্লাহ্ : আমি শাহজাহান চৌধুরীকে (জামায়াতের এমপি) দেখেছি। কোথায়? মুফতি ওবায়দুল্লাহ্ : মাদ্রাসায়। কি কারণে গিয়েছিল? মুফতি ওবায়দুল্লাহ্ : প্রশিক্ষণ দেখতে এসেছিল। প্রশিক্ষণের সময় আলাপ-আলোচনা করত, বাংলাদেশে যেভাবে নাস্তিক, মুরতাদ, ইহুদী নাসারারা যেভাবে জাল বুনছে, সেই জাল থেকে যেন আমরা পরিত্রাণ পাই। সে জন্য আমরা ছাত্রদের গড়ে তুলি।

টাকার মাধ্যমে, অস্ত্রের মাধ্যমে। কারণ হযরত মুহম্মদ (সাঃ) বলেছেন, ইসলাম টিকিয়ে রাখার জন্য যদি নাচ দেশে দিয়ে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিতে হয় তোমরা চীনে গিয়ে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিয়ে আস। মানে ইসলামের স্বার্থে। হাসান রফিক জামায়াতে ইসলাম, হরকাতুল জিহাদ আরএসও ওদের যে কি সম্পর্ক তা যদি আমি মৌখিকভাবে বলি তবে তা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু আমার প্রমাণ আছে আরএসও-র একটা মুখপত্র আরবিতে বের হয়।

আরেকটা বাংলা। আরবিটার নাম হলো ‘আল তাদাম’। ১৯৯১ সালে ও আল তাদাম পত্রিকায় সচিত্র প্রতিবেদনে বের হয়েছে যে, জামায়াতের চৌদ্দগ্রামের এমপি ড. আব্দুল্লাহ্ মোঃ তাহের, তিনি ১৯৮৭ থেকে ৮৯ পর্যন্ত ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিল। আরেকজন- আমীরুল ইসলাম বকুল ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। এরা দু’জন সেখানে ভারি অস্ত্রই কেবল নয়, একে ফোরটি সেভেনসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র যা চিহ্নিত করতেও অনেকের হিমশিম খেতে হবে এবং আইআইএফএসও অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফেডারেশন অব স্টুডেন্ট।

যেটা সারা বিশ্বে যারা ইসলামিক রাজনীতি করে এবং জিহাদভিত্তিক কাজ করে এটা তাদের একটা আন্তর্জাতিক সংস্থা। এ সংস্থার মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামের ছাত্রশিবিরের আব্দুল্লাহ্ মোঃ তাহের ঠিক করতে হবে কি অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, কি অস্ত্র আনতে হবে সবকিছু তত্ত্বাবধান হতো। মাওলানা মিছবাহুর রহমান চৌধুরী চেয়ারম্যান, ইসলামী ঐক্যজোট ১৯৭৭ সালে শিবির বিভক্ত হওয়ার পর আলবদর বাহিনীর সদস্য মীর কাশেম আলীকে কান্ট্রি ডিরেক্টর করে দেয়া হলো। এই যে ফান্ডটা এসেছে, সবটুকুই শুধুমাত্র জামায়াতের দলীয় ফান্ড হিসেবে পরিচিত হয়েছে, আর কোনো খাতেই ব্যবহার হয়নি। ড. আবুল বারকাত : এটা একটা ত্রিভুজ।

এই ত্রিভুজের মাথায় রয়েছে হেডকোয়ার্টার। প্রকাশ্য একটি সংগঠন যা এখন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আর অন্য দুই ভুজের মধ্যে এক বাহুতে আছে ওই উগ্র ধর্মীয় ১২৫টা জঙ্গি গ্রুপ। এবং এই জঙ্গি গ্রুপের আর্থিক যে লেনদেন সেই লেনদেনের জন্য ইসলামী ব্যাংককে কিন্তু একবার এবং বাংলাদেশের একটি ব্যাংকই এ পর্যন্ত মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে শাস্তি পেয়েছিল। যদিও শাস্তি তেমন কিছু নয়, এক লাখ টাকা জরিমানা মাত্র।

কিন্তু সেটা হয়েছিল জঙ্গিদের সঙ্গে সংযোগ থাকার কারণেই। জঙ্গিরা যখন চারদলীয় জোটের আমলে ধরা পড়ে তখন তাদেরকে ছাড়ানোর জন্য জামায়াতের দুইজন মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী এবং মুজাহিদ হেন কাজ নাই যা তারা করেনি। এবং ছাড়াতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে তখনই শুধুমাত্র বলেছে যে, এদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ২০০৪ সালের ১ এপ্রিলে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্রের যে বিশাল চোরাচালান ধরা পড়েছে তার সঙ্গে চারদলীয় জোট সরকারের নেতৃবৃন্দসহ বাংলাদেশের দুটি গোয়েন্দা সংস্থা এবং পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই যুক্ত ছিল বলে জানিয়েছেন এই মামলার গ্রেফতারকৃত বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ড. আবুল বারকাত : চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র যে জেটিতে ভিড়ল এই জেটিটা কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় ছিল।

শিল্পমন্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বা জানা ছাড়া অস্ত্র চট্টগ্রামের জেটিতে ভিড়তে পারে এটা হতে পারে না। আর তখন শিল্পমন্ত্রী হলেন জামায়াতে ইসলামের মতিউর রহমান নিজামী। মুফতি হান্নান : এরা হচ্ছে মাফিয়া চক্র। যারা স্মাগলিং করত তারা ভারতে উলফাদের এবং কাশ্মীরীদের মাল দেয়। এখানে যারা সরকার ছিল তাদের সঙ্গে একটা চুক্তির মাধ্যমে এবং বিভিন্ন জায়গায়- আর্মি, বিডিআর, নৌবাহিনীকে টাকা পয়সা দিয়ে এগুলো নেয়া হতো।

কিন্তু হঠাৎ করে কিছু মাল চলে গেছে এবং কিছু মাল গ্রেপ্তার হয়েছে। এই মালগুলো দেশের ভেতর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে জামায়াতের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আপনার গবেষণায় কি পেয়েছেন? ড. আবুল বারকাত : জামায়াত ইসলাম ধর্মকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতাটা দখল করতে চায় এবং এটা নতুন কোনো পরিকল্পনা না। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা ধর্মের যে বিষয়াদি আছে তার সঙ্গে বাস্তব জীবনÑ এ দুটোকে এক জায়গায় করে শক্তিশালী অর্থনীতিভিত্তিক একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া তারা চালু করতে চেয়েছে। যেটার সমান্তরাল কোনো প্রক্রিয়া বাংলাদেশে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেই।

মাওলানা মিছবাহুর রহমান চৌধুরী এখন বাংলাদেশে তাদের নিজস্ব অনেক সোর্স আছে। কিন্তু প্রথম তারা টাকাটা আনে তিনটা কথা বলে। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব তাদেরকে বেশি টাকা দিয়েছে। সৌদি আরব সরকারের যিনি ধর্ম (?) ছিলেন, আব্দুল ওহাব তার লেখা-লেখনি আর মওলানা মওদুদীর লেখালেখনি খুব কাছাকাছি। উনার এই লেখালেখির সুবাদে সৌদি সরকার জামায়াতের সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক রাখতে চাইত।

এই সুযোগটায় বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এমন একটা প্রচার তারা করলেন যে, আমাদের দেশে একটা মসজিদও আর অবশিষ্ট নেই। তখন সৌদি দূতাবাসও এখানে ছিল না। যে মসজিদগুলো সব মুক্তিযোদ্ধারা ভেঙে দিয়েছে। এখানে যে মক্তবগুলো ছিল যেখানে কোরআন পড়ানো হতো, মাদ্রাসাগুলো ছিল যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া হতো- সব তালাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। সব আলেম ওলামাকে জেলে নিয়ে দেয়া হয়েছে।

সৌদি আরবের ধর্মের আবেগটাকে তারা কাজে লাগিয়ে প্রথম ‘মসজিদ নির্মাণ করতে হবে, সংস্কার করতে হবে, মাদ্রাসাগুলোকে খুলতে হবে, কোরআন শরীফ মানুষকে পুনর্বণ্টন করতে হবে’ এগুলো বলে একটা টাকার উৎস তারা তৈরি করে। ড. আবুল বারকাত ওই একটা সেক্টরে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন গত ৩৫ বছর ধরে এবং মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ রকম যে, এই সেক্টরগুলো যে তারা চালান, এখানে কিন্তু কর্পোরেট যে ব্যবস্থাপনা সেটা, খুব বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনাটা আছে। কিন্তু পরিচালিত হয় একটা মতাদর্শ থেকে। যারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছেন তাদের প্রায় সবাই প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে ওই রাজনীতির সঙ্গে আছেন বা অতীতে ছিলেন। দ্বিতীয় যেটা দেখা যায় সেটা হল যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আমার হিসেবে বর্তমানে বছরে ১৫শ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়।

এই টাকার শতকরা ২০ শতাংশ অর্থাৎ তিন শ কোটি টাকা তারা তাদের ফুল টাইমার বা রাজনীতিতে পূর্ণকালীন সদস্য পোষার জন্য ব্যবহার করেন। মাওলানা মিছবাহুর রহমান চৌধুরী : ইসলামী ব্যাংকসহ জামায়াতের হাজার কোটি টাকার ওপর ইনকামের সোর্স। আমরা যে প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম বলব তার সম্পর্ক নাই এটা তো একটু দুর্বল মনে হয়। আমি যদি বলি ওগুলো জামায়াতের প্রজেক্ট নয় জামায়াত ক্ষমা চাইতে বলতে পারে তবে আমি হাত জোড় করে তাদের কাছে ক্ষমা চাব। এই প্রজেক্টগুলো জামায়াতে ইসলামীর।

এর একটা বড় অংশ জামায়াতের ওই যে নেতারা আলবদর বাহিনীতে ছিলেন। সরাসরি অধ্।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ১২ বার

এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.