আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আমরা কোনদিনও উন্নতি করবনা (গরীব দেশের গরীব মানুষের কথা)

প্রথমেই বলে নেই, আমি আশাবাদী-নৈরাশ্যবাদী কিছুই না। আমি শুধু ইতিহাস ও বাস্তবতা নিয়ে কথা বলতে এসেছি। “আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে”-(১৩:১১) আমাদের জাতির উন্নতি করতে হলে, এখনকার অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে, আমাদের নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। মানে, আমাদের নিজেদেরকেই এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের মাঝ থেকেই বেরিয়ে আসতে হবে জাতির পরিবর্তনকারী সেইসব মানুষকে, যারা একটি অসম্ভবকে সম্ভব সাধন করবেন।

প্রতিযোগিতামুলক বিশ্বে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এই, এইখানেইতো যত গন্ডগোল! এইরকম সোনার ছেলে পাব কোথায়। “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে”। সোনার ছেলে আমাদের দেশে না পেলেও বেশিদুর যেতে হয় না। গান্ধীজি কি কষ্টটাই না করেছিলেন।

কিসের জন্য? ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবার জন্য নয়, তাতো আমরা জানিই। নিজের হাতে বোনা কাপড় পরে থাকতেন, কেন? যিনি যানেননা, বা নিজ ইচ্ছায় এর উত্তর খুঁজে নেবার মত কষ্ট করতে রাজি নন, তিনি আমাদের সোনার ছেলে নন। গান্ধীজি কতবার জেলে গিয়েছিলেন, কতবার পুলিশের মার খেয়েছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় তাকে ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল, আমাদের মাঝে কজন নীতিগত কারণে এই কষ্ট মেনে নিতে রাজি আছেন? গান্ধীজি ভারতের নোটে নিজের চেহারা ছাপাবার জন্য এই কষ্ট করেননি, তবে কেন উনি পরিবার থেকে দূরে জেলে যাবার ঝুকি নিবেন? আর জেল খানা খুব কষ্টের জায়গা। আমার এক বন্ধুর পুলিশের এক লাঠির বাড়ি খাইয়াই জ্বর আসছিল। গান্ধীজিতো আমাদের মত সাধারণ পরিবারের সাধারণ মানুষ।

ব্যারিষ্টারি পাশ করে উচ্চ-মধ্যবিত্ত জীবন-যাপন না করে কেন উনি ভারতের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য এত কষ্ট করলেন? (এখানে ভারত এর সাথে সাথে আমরাও উনার কাছে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শাষকদের থেকে স্বাধীন হবার জন্য উনার কাছে ঋণী) কালো ছোটলোকের বাচ্চা নেলসন ম্যান্ডেলা তার নিজের ও দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ২৩ বছর জেলে ছিলেন। শুনতে খারাপ শোনায়? কালোরাতো সেখানে নীচু জাত হিসাবেই ছিল। আমাদের মাঝে অনেক জ্ঞানী-গুণি অধ্যাপক ডক্টরেট ডিগ্রীধারী থাকলেও তাদের দেখি চারপাশের ইতিহাসে দূর্বল। ম্যান্ডেলাকে কি কষ্ট করতে হয়েছিল, তার পরিবারকে কি কষ্ট করতে হয়েছিল, তা এখানে লিখে শেষ করা যাবেনা। আমাদের মাঝে কোথায় এমন মানুষ? কোথায় উইনি ম্যান্ডেলার মত স্ত্রী? বউয়ের দাবড়ানি খাইলে এমনেই সমাজ বদলানোর ভুত চলে যাবে।

সাধারণ মানুষগুলো যখন অসাধারণ কাজ করে, তখন তাদের জন্য অপেক্ষা করে করুণ মৃত্যু। উইলিয়াম ওয়ালেস এর মৃত্যু ব্রেভ-হার্ট মুভিতে দেখতে পাবেন। সাধারণ কৃষকের মেয়ে জোয়ান অব আর্ক কে জীবন্ত আগুনে পুরিয়ে মারা হয়েছিল। দাস বিদ্রোহের নেতা স্পার্টাকাসকে জীবন্ত ক্রুশবিদ্ধ করে তিলে তিলে মারা হয়েছিল। শহীদ আলতাফ মাহমুদের উপর অত্যাচারের কথা শুনলে চোখে পানি চলে আসে।

আমাদের সমাজে কজনের আছে সেই সাহস? কষ্টকর মৃত্যুর ঝুকি নিয়ে সাধারণ মানুষকে উদ্ধারে ঝাপিয়ে পড়বে, নাকি বউ-পোলাপান নিয়ে মধ্যবিত্ত জীবন-যাপন করে যাবে? হায়, আমি মৃত্যুর কথা বললাম, আপনারাও সাথে সাথে মাথা নাড়লেন। “উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই, ওরে ভয় নাই – নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই”। এমনিতেও অসাধারণ কিছু করা বাংগালীর কম্ম নয়। আপনি চিন্তা করুন, ধরুন, বিমানের আবিষ্কার হয়নি, মানুষ উড়তে পারেনা। আপনি আবাহনী মাঠে বড় ঘুড়ি নিয়া সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করেন, বড় ঘুড়ি নিয়ে দোতলা-তিনতলার ছাদ থেকে লাফ দেন, আকাশে উড়তে চান।

আপনারে পাগল বইলা বাইন্ধা রাখা বেশি দূরে না। পাশের বাড়ির মহিলা আইসা আপনার মায়েরে বলবে, আপনার ছেলে পাগল নাকি? কয়দিন পর পোলার বিয়ে দিবেন, এইসব করতে দেন কেন? পড়ালেখা-চাকরীতে মন দেয় না কেন? কেউ মেয়ে বিয়ে দেবেনা আপনার কাছে। আর আগেই বিয়ে করলে বউ ছেচা দিবে। বাংগালি মধ্যবিত্তের জন্য এইসব না। দেশের সবচেয়ে ভাল ছাত্রগুলোকে খুব কাছে থেকে দেখেছি।

এরা পরিশ্রমী, মেধাবী। তাই, এরা নিজের সুখের জীবনের ব্যবস্থাটা খুব সহজেই করে নিতে পারে। বন্ধুদের অনেকেরইতো বাচ্চা হচ্ছে। তাদের মাঝে কজন পারবে, নেহেরুর মত বছরের পর বছর জেলে বসে আদরের ফুটফুটে মেয়েটাকে চিঠি লিখতে? (আমি পারবনা। ) বন্ধুদের মাঝে এখনো যারা বিয়ে করেনি, তারা কোন মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অবিবাহিত বলে মনে হয়না।

আর বেশিরভাগেরই নিজেদের সাবজেক্টে যত জ্ঞান, ততই সমাজ ও ইতিহাস সম্পর্কে অন্ধকারে। নটরডেমে আমার পাশের সীটে বসা, বুয়েটে আমার একই ক্লাসের অসম্ভব মেধাবী ছেলেটা যখন বলে বসে, ব্রিটিশরা এদেশে না এলে আমরা আফ্রিকার মত অন্ধকারে থেকে যেতাম, তখন অধিক শোকে পাথর হয়ে যেতে হয়। আমাদের প্রাচীণ সভ্যতা সম্পর্কে কিছু না জানলেও কমন সেন্সেতো আশা উচিত, পৃথিবীর সব প্রাচীণ সভ্যতা ব-দ্বীপ বা নদী অববাহিকায় হয়। স্কুল ও বুয়েটে একই ক্লাসে পড়া ছেলেটা যখন বলে তার জীবনের লক্ষ্যই হচ্ছে বিদেশে যাওয়া, এজন্যই ভালো করে পড়ালেখা করা, তখন বোকা হয়ে যেতে হয়। এজন্যই হয়ত বিজ্ঞান ও ধর্ম শিক্ষায় বড়-বড় পন্ডিতদের সমাজের উন্নতিতে এত কম ভূমিকা।

অনেকে আমাদের উন্নতির উদাহরণ হিসাবে কিছু ব্যক্তিগত অর্জন বা এনজিও-এন্টারপ্রেনারদের উদাহরণ দেন। পরিচিত ব্যবসায়ীদের যেই নৈতিকতা দেখেছি, তাতে বড় কিছু আশা করিনা। সাধারণ মানুষগুলো খালি ধরা খায়। তাদের অসাধারণ কিছু করার যোগ্যতাও নাই, সাহসও নাই, নতুন দিনের স্বপ্নও নাই। তাই বলি, আমরা কোনদিনও উন্নতি করবনা।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.