আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ

ভালো। দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পরও নির্ভয়ে লিখে যাচ্ছেন। কলম চলছে অবিরাম। হিমশীতল মৃত্যু খুব কাছ থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, তাতে তিনি ভীত নন। মৃত্যুভয় তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

পাহাড়ের মতো শক্ত তার মনোবল। বরং ভয়কে জয় করে এগিয়ে যাচ্ছেন নতুন নতুন সৃষ্টিতে। প্রচণ্ড আÍপ্রত্যয়ী লেখক ছাড়া এমন সময়ে লেখা সম্ভব নয়। কেমোথেরাপির মতো যন্ত্রণাদায়ক সময়কে দৃঢ়চিত্তে মোকাবেলা করছেন। লেখক বলেন, লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থেকে কেমোথেরাপি নামক চিকিৎসার যন্ত্রণা ভোলার চেষ্টা করছি বিস্ময় শব্দটির সঙ্গে সবাই কম-বেশি পরিচিত।

কেউ বিস্মিত হন। কেউ বিস্ময়ের মধ্যে থাকেন আবার কেউ কেউ বিস্ময়কর কর্ম করেন। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বহুবার বিস্ময়ের জš§ দিয়ে পাঠককে বিস্মিত করেছেন। তার এ ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ক্যান্সার এমন একটি ব্যাধি যা শরীরের ভেতর এবং বাহিরকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দেয়।

আমার মনে হয় লেখকের জীবকোষে ক্যান্সার নামক যে জীবাণুু ছড়িয়ে আছে তার চেয়েও বেশি জীবাণু জš§ থেকে লালন করে আসছেন শরীর এবং মনে। কষ্টদায়ক এ জীবাণু তার লেখনীক্ষমতা বা আজš§ প্রতিভা। এ জীবাণুর কাছে ক্যান্সারের জীবাণু পরাজিত। সুতরাং আমৃত্যু লেখককে কেউ দমিয়ে রাখতে পারবে না। তার প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটবেই।

হুমায়ূন আহমেদ অসুস্থ হওয়ার পর নিউইয়র্কে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। এই সময় থেকে শুরু করে চিকিৎসাধীন অবস্থা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের ঘটনা, চিন্তা-চেতনা, অনুভূতি এবং অতীতের কিছু স্মৃতি ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে চমৎকার লেখনীর মাধ্যমে গ্রন্থবদ্ধ করেছেন। নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী একটি উদ্যোগ। ‘নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ’। পূর্ণেন্দু পত্রীর একটি কবিতার শিরোনাম ছিলÑ ‘ক্রেমলিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ’।

তার কবিতা থেকে ধার করা নাম। গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গায় লেখকের স্বভাবসুলভ আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। মৃত্যুকে জয় করার অদম্য শক্তি যে মনে ধারণ করেন সেটা বোঝা যায় রসিকতায়। একটা নমুনা না দিলেই নয়Ñ বিদায় জানানোর জন্য সবাই তার ফ্ল্যাটে উপস্থিত হয়েছেন, চেহারা করুণ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। এমন ভাব দেখে তিনি বললেন, ভালো খাবারের ব্যবস্থা আছে।

সবাই খেয়ে যাবেন। এটা আমার কুলখানির খাবার। নিজের কুলখানির খাবার নিজে উপস্থিত থেকে খাওয়ানো ভাগ্যের ব্যাপার। আমি ভাগ্যবান। যে কোন অবস্থায় যে কোন বিষয়ে রসিকতা করা তার অভ্যাস।

তাই অসুস্থ হয়েও ক্রমাগত রসিকতা করে যাচ্ছেন। রসিকতা কেউ সহজভাবে নিচ্ছেন না, তাতে কি তিনি যে স্বাধীনচেতা মানুষ। তাই তো ক্যামেরাম্যান মাহফুজুর রহমানকে বললেন, আপনার মৃত বাবার কাছে কোন খবর পৌঁছাতে হলে আমাকে দিতে পারেন। আমি পৌঁছে দেব। বিদেশে যারা থাকেন তারা উপলব্ধি করেন দেশের ব্যথা।

জেগে ওঠে দেশপ্রেম। তাই হুমায়ূন আহমেদ আমেরিকায় অবস্থানকালীন লেখনীতেও দেশপ্রেমের কথা প্রকাশ পেয়েছে সরলভাবে। এক সন্ধ্যায় ছেলে নিষাদকে নিয়ে বসে আছেন। হঠাৎ ছেলে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, বাবা দেখ, বাংলাদেশের চাঁদটা এখানে চলে এসেছে। আকাশে কত বড় চাঁদ।

তাকিয়ে দেখেন, মেপল গাছের ফাঁকে নিউইর্য়ক নগরীতে সম্পূর্ণ বেমানান এক চাঁদ নির্লজ্জের মতো উঠে বসে আছে। তার তো থাকার কথা বাঁশবাগানের মাথায়। এমন উক্তিতে প্রকাশ পায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা আমাদের দেশ। গ্রামে পূর্ণিমার চাঁদ এমনভাবে ফুটে ওঠে যেন জোছনায় অবগাহন করে প্রকৃতি। গাছের ফাঁকে ফাঁকে ফোঁটা ফোঁটা জোছনা ঝরে পড়ে।

কি উপলব্ধি। কি ভাবনা। ‘নিউইর্য়কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ’ মূলত তার নিউইয়র্কের কিছু ঘটনা এবং দেশ ছাড়ার আগের বিভিন্ন কথা। লেখার মধ্যে স্বভাবসুলভ রম্য বজায় রেখেছেন। পড়লে ঘটনা জানার পাশাপাশি আনন্দ পাবেন এটা নিশ্চিত।

জগৎসংসারে বহুবার ঘাতপ্রতিঘাতের মুখোমুখি হয়েছেন। কখনও যুদ্ধের কারণে, কখনও পড়াশোনার জন্য, কখনও সামাজিক রীতিনীতির জন্য এমন সব ঘটনার বিন্যাস করেছেন ‘সংসার’ শিরোনামে লেখাটিতে। অতীতের রেশ ধরে বর্তমানের কথা বলেছেন। বর্তমানে নিউইয়র্কে সংসার পেতেছেন। আগামীতেও পাতবেন অকপটে স্বীকার করেছেন।

চমৎকার তার উপস্থাপনা। সহজ-সরল অভিব্যক্তি। ক্যান্সার ধরা পড়ার পর চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই অর্থ সংগ্রহ করতে কী কী উপায় অবলম্বন করতে হয়েছে, কেমনভাবে অর্থ সংগ্রহ হল, খুব আন্তরিকভাবে উপস্থাপন করেছেন ‘নো ফ্রি ল্যান্ড’ লেখাটিতে। চিকিৎসা মানে যে সেবা সেটা বোঝা যায় ‘কেয়ারগিভার’ পড়লে।

উন্নত দেশে চিকিৎসাব্যবস্থার কিছু চিত্র খোলাখুলিভাবে বলেছেন। এতে আমাদের দেশের চিকিৎসক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাই উপলব্ধি করতে পারবেন সেবা বা চিকিৎসা কী? অসাধারণ একটি লেখা। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে স্টিভ জবসের মারা যাওয়া এবং মানুষের চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ নিয়ে লিখেছেন। ‘আইনস্টাইন, আপ সাইড ডাউন’ এই গদ্যে বিজ্ঞানীদের কিছু থিওরি ব্যবহার করা হয়েছে। ক্যান্সার সম্পর্কে ভালো একটা তথ্য তুলে ধরেছেন।

ক্যান্সারে মৃত ৯৯ ভাগ রোগী হল মহিলা, ১ ভাগ পুরুষ। মহিলাদের প্রায় সবাই মারা যায় ব্রেস্ট ক্যান্সারে। স্তন শব্দটি যুক্ত থাকার কারণে সবাই খুব লজ্জাবোধ করেন। তাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। রোগের কাছে লজ্জার কিছু নেই।

রোগ লুকানই লজ্জা। পুরনো স্মৃতির কথা নতুন করে বলা। নেত্রকোনার একটি দোকানে বড় সাইজের মিষ্টি পাওয়া যায় নাম ‘বালিশ’। এমন বিদঘুটে নাম শুনে লেখক মিষ্টি খাননি। দোকানির অনুরোধে মিষ্টির নাম রাখেন ‘বালকপছন্দ’।

‘বালিশ’ প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করতে করতে চলে আসেন নিজের বর্তমান প্রসঙ্গে। কেমোথারাপির কারণে তার চুল পড়ে যাচ্ছে। এতে স্ত্রী উদ্বিগ্ন! ঘুম থেকে ওঠার পর দ্রুত বালিশ নিয়ে বাথরুমে চলে যান, যাতে লেখক দেখতে না পারেন চুলের কী অবস্থা। এমন একটি বিষয় নিয়ে লিখেছেন ‘বালিশ’। প্রধানমন্ত্রী আমেরিকায় অসুস্থ লেখককে দেখতে গিয়েছিলেন।

এ বিষয়কে উপজীব্য করে লিখেছেন ‘তিনি এসেছিলেন’ গদ্যটি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথোপকথন এবং আর্থিক সহযোগিতার কথা সবই লিখেছেন সুবিন্যস্তভাবে। ৩৭ বছরের পুরনো অভ্যাস একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ত্যাগ করেছেন। এ ঘটনা এবং ত্যাগ করার আগে তার সঙ্গে যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল, এই নিয়ে লিখেছেন ‘বন্ধু বিদায়’ লেখাটি। পরম এই বন্ধুর নাম ‘সিগারেট’।

ডঙগঅঘ, ডঙজক, ডঅঞঐঊজ এই তিনটি শব্দকে নিয়ে লিখেছেন ‘তিন ডাবলিউ’। ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও চরিত্রগত মিলের কথা নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। ভিন্ন ধাঁচের একটি লেখা। প্রসঙ্গক্রমে তিনি মেয়ের বর্ণনা সাবলীলভাবে টেনে এনেছেন। ভিন্ন স্বাদের ভিন্ন মেজাজে লেখা।

অবশ্যই ভালো লাগবে। জাপানিরা অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের তৃতীয় শক্তি, অথচ তাদের মধ্যে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য কোন ভালোবাসা নেই। অথচ দারিদ্র্যপীড়িত দেশ হয়েও আমাদের সমাজে এখনও সন্তানরা বাবা-মাকে ভালোবাসে। রচনাটিতে জাপানিদের সঙ্গে বাংলাদেশী মানুষের সমাজের তুলনামূলক একটি চিত্র এঁকেছেন। দেখিয়েছেন ভক্তিশ্রদ্ধার বিষয়টি।

‘উবাস্তে ইয়ামা’ চমৎকার একটি লেখা। পাঠকদের হƒদয় ছুঁয়ে যাবে। মায়ের আবদার রক্ষা করতে গিয়ে নিজ খরচায় আধুনিক একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন লেখক। নির্মাণ কাজ শেষ করার পর দেখেন সঞ্চিত টাকা শেষ। চিন্তায় পড়ে গেলেন কীভাবে বিদ্যালয়টি চালু করবেন।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ছোটাছুটি করলেন, কোন লাভ হল না। হতাশ হয়ে পড়লেন। তার এমন ভাব দেখে লেখকের মা বললেন, ‘তোকে দিয়ে স্কুল বানানোর সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। দান গ্রহণ করতেও যোগ্যতা লাগে। তোর দানের সে যোগ্যতা নেই।

’ মায়ের বিরূপ মন্তব্যে লেখক বলেছিলেন, ‘আমি হচ্ছি কচ্ছপ, কচ্ছপের কামড় থেকে বাঁচার একটাই উপায় তার গলা কেটে ফেলা। স্কুল আমি একলাই চালাব। ’ এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে লিখেছেন ‘কচ্ছপ কাহিনী’। শুক্রবার মুসলমানদের জন্য পবিত্র একটি দিন। খ্রিস্টানদের জন্য রোববার, ইহুদিদের শনিবার।

শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র দিন বলেই কি আমেরিকানরা কালো শুক্রবার পালন করেন। এ বিষয় নিয়ে লিখেছেন ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’। এই দিনে অর্ধেক দামে যে কোন পণ্য কেনা যায়। রাত ১০টার পর জিনিসপত্র বিক্রির এ মহোৎসব শুরু হয়। এই গদ্যে কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেছেন নাটকীয়ভাবে।

ভেনভার তুষারপাত দেখতে যাওয়ার আগে একটি গান লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ। বসেছিলেন ভূতের গল্প লেখার জন্য অথচ লিখলেন গান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে লিখেছেন ‘কলোরাডো! রকি মাউনটেন হাই’। রচনাটিতে বাড়তি পাওনা হিসেবে পরিপূর্ণ একটি গান পাওয়া যাবে। ক্যান্সার রিসার্চের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন।

অর্থ সংগ্রহের জন্য ২৩ বছর বয়সী ক্যান্সারে আক্রান্ত টেরি ফক্স অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। তার রেখে যাওয়া অর্থ পরবর্তীতে ক্যান্সার রিসার্চের কাজে ব্যবহƒত হয়। টেরি ফক্সের এমন মহৎ কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে লেখক স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন, বাংলাদেশেও উন্নতমানের একটি ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশের সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসা পাবেন। বিদেশী ডাক্তারের প্রতি যে মোহ কাজ করে তা কাটানোর কথাও উল্লেখ করেন।

ক্যান্সার হাসপাতালে অনেক বাঙালি ডাক্তার আছেন যারা যোগ্যতার বলে কাজ করে যাচ্ছেন। পরিবেশ পেলে দেশের হয়ে কাজ করতে তারা আগ্রহী। এমন ভাবনা থেকে লিখেছেন ‘সুপার হিরো’। মহান লেখকরা যে অন্যের লেখা অনুকরণ করেন কিংবা সুযোগ পেলে ধারও করেন, তার কিছু ব্যাখ্যামূলক নমুনা তুলে ধরেছেন ‘পাঠক! বাড়ি আছ’ লেখায়। গ্রন্থের শেষভাগে তিনটি গল্প জুড়ে দেয়া হয়েছে।

একজন ক্যান্সার রোগীকে নিয়ে লিখেছেন ‘রুম নাম্বার ২১৭’। লেখক যাতায়াতের সময় লক্ষ্য করেন বিভিন্ন সাইনবোর্ডে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসার বিজ্ঞাপন দেয়া আছে। ১০০ ভাগ গ্যারান্টিসহ চিকিৎসা করানো হয়। এমন একটি বিজ্ঞাপন দেখে লেখক এবং তার ম্যানেজার শরণাপন্ন হন ডাক্তারের। নতুন এই ডাক্তারের বিচিত্র কাণ্ডকারখানা নিয়ে লিখেছেন গল্প ‘বাতেনি চিকিৎসক আবদুস সোবহান’।

আমরা অপেক্ষায় আছি লেখক সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মাঝে ফিরবেন সগর্বে, সমহিমায়। বোধকরি ভুল বলা হবে না। আমরা মহান এই লেখকের অপেক্ষায় থাকলামঃ নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ । । হুমায়ুন আহমেদ ।

। অন্য প্রকাশ । । প্রচ্ছদ : মাসুম রহমান । ।

মূল্য : ২০০.০০ টাকা।  ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.