আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

জাগছড়ার সেই দূর্ধর্ষ অভিযানের কাহিনী

সূয্যি মামা আজ কংস মামার মত আচরন করছে। প্রবল পুরুষালী বিক্রমে প্রান যায়। ভাদ্রের দুপুর মাথায় করে চলেছি। পথের পাশে চা বাগান। দূরে অন্ধকার আবছা জঙ্গল।

ঝিঁঝির বুনো মাদল আর পাখির কিচির মিচির। ঝকঝকে নীল আকাশে তুলোর মত সাদা মেঘ। বড় বেশী সুন্দর। সণ্যাসী হতে মন চায়। গুনগুন করে গান গাইছি।

একলা দু’জন। আমি আর দিলীপ। যাত্রার শুরুটা সকাল ৮টায়। উদ্দেশ্য জাগছড়া ঝর্ণা। অনেক আগেই শুনেছিলাম এটার কথা।

কিন্তু কিভাবে যেতে হয়, সেটাই জানতাম না। খোঁজ খবর করে আজ চলেছি। শ্রীমঙ্গল থেকে মৌলভীবাজার যাবার পথে চার পাঁচ কিমি দূরে জাগছড়া চা বাগান। সেই বাগানের “অনেক ভেতরে কোথাও” ঝর্ণার অবস্থান। বাগানের শ্রমিকদের জিজ্ঞেস করতেই এরা আঙুল ৪৫ ডিগ্রি তাক করে দিগন্ত দেখায়।

চার পাঁচ মাইল এদের কাছে “এই তো, কাছেই। ”এরাই যখন অনেক দূর বলল, বেশ খুশি হলাম। অনেকদিন পর একটা এডভেঞ্চার হতে চলেছে। কাঁধে ভারী ব্যাগ। সেটাতে রাজ্যের দরকারি জিনিসপত্র।

চাকু, দড়ি, টর্চ, লাইটার, খাবার, কাপড় কত কি! ওষুধের বাক্সে সম্ভবত শুধু ক্যান্সার আর এইডসের কোন ওষুধ নেই। পাহাড়ী ছড়া থেকে বোতলে জল ভরছি। ওয়াটার পিউরিফায়ার দিয়ে শুদ্ধ করার ফাঁকে জিরিয়ে নিচ্ছি। সেই সাথে ক্যামেরায় শাটাশাট শাটার পরছে। আবার হাঁটছি।

ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা বাজে। চা বাগান আগেই শেষ হয়ে গেছে। লাউয়া ছড়া জঙ্গলের শেষ প্রান্তও ফেলে এসেছি। সামনে জঙ্গল। আর মাঝে মাঝে ন্যাড়া টিলা।

তার ফাঁকে সেনা শৃংখল রাবার বাগান। সেখানে সন্দেহজনক কয়েকটি ছেলের রহস্যময় আনাগোনা। মনে হল রাবার চোর?”ওদের কাছে ঝর্ণা সম্পর্কে জানতে চাইলাম। য়ার বেশী দূরে নয়। অনুরোধ করতেই মানিক নামের একজন সঙ্গী হল।

পথের পাশে আমাদের সাথে চলেছে একটা পাহাড়ি ছড়া। বালুময় ঝিরি পথ ধরে হাঁটছি। গা ছুঁয়ে যাচ্ছে শাদা কাশ। এগুলো এতো শুভ্র! আবার রোদ পরে ঝিলিক দিচ্ছে। চোখ ঝলসে যায়।

শাদার মেলা শাদার খেলা। ঝর্ণার পাড় যেন ওয়াশিং পাউডারের বিলবোর্ড। বনরুইয়ের মত দেখতে কিছু একটা গর্তে ঢুকে গেল। মানিক জানাল এখানে প্রায়ই ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করা হয়। বন্য শুকর, সজারু, পাখি সহ অন্য বন্যদেরও অন্নের সহযোগী হতে হয়।

জন্তুগুলো ধরার কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান বিতরন করছিল। সবচেয়ে সহজ ছ্যাদা(শজারু) ধরা। একটা কলাগাছ ফেলে দিলেই হয়। কাঁটায় বিঁধে গেলে শজারু আর নড়তে পারে না। জন্তু রাঁধার রেসিপিও জেনে নিতে হচ্ছিল।

বনরুই খেতে তৈলাক্ত। শিয়ালের মাংসে যৌন ও বাত রোগ সারে। গুইসাপের মাংস খেলে শরীরে বল হয়। চামড়া চড়া দামে বিক্রি করা যায়। গন্ধগোকুলের তেল মালিশ করার প্রসেসও জানলাম।

আমার বেশ কস্ট হচ্ছে। নিজেদের ধংস করার উৎসবে মেতেছে এরা। তবু রাগ করতে পারি না। এদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা নেই। শিকার ও যৌনতা ছাড়া বিনোদনের উৎস নেই।

আজ আমাদের সঙ্গ দিচ্ছে, এটা হয়তো তার কাছে বিশাল কিছু। আমি ভাবছি। দীলিপ চুপচাপ। আমার কস্টে নির্বিকার। মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতি উপভোগ করছে।

বাঁ দিক থেকে ঝিরির একটা স্রোত নেমে এসেছে। ছোট দু তিনটা পাথর ডিঙিয়ে স্বচ্ছ জলের ধারা নামছে। একটা চালতা গাছের নিচে বসলাম। পাউরুটি দিয়ে নাস্তা সেরে নিচ্ছি। গোড়ালি রেখেছি ঝিরির জলে।

ছোট ছোট পোনা মাছ পা ঠোঁকরাচ্ছে। পায়ের তলায় আরামদায়ক সুড়সুড়ি। ম্যাসেজে তুলনা বিচারে পারসোনা ডাহা ফেল করবে। হিডেন ক্যমেরার আশংকাও নেই। ছবি তোলা হল বেশ।

আবার পথচলা শুরু করতে হবে। -মানিক, ঝর্ণা কদ্দূর? -এটাই সেই ঝর্ণা! বলে কি! একটা ছড়া তিন-চার হাত উপর থেকে নিচে নামছে, আর সে বলে এটাই ঝর্ণা! ফাইজলামি নাকি? নাহ! এটাই সেই আরাধ্য ঝর্ণা। আমার কান্না পাচ্ছে। এতো কস্ট জলে গেল। আমার পরিবারের সবাই একসাথে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করলে এরচে সুন্দর ধারা নামবে।

বাজি! দীলিপ যথারীতি নির্বিকার। ব্যাপারটাকে হমুমানের লাফিয়ে লঙ্কা যাবার ঘটনার সাথে তুলনা করল। মুখে মুখে ফেরে এই চড়াটাকেও নায়াগ্রা টাইপের কিছু বানিয়ে দেয়া হয়েছে। আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকেরা গপ্প দিতে ভালোবাসে। আমি তবু রাগে ফুঁসছি।

ঐ মুরগা লেখককে পেলে এখনি ছাতু বানাতাম। আমাদের হতাশায় মানিক কাঁচুমাচু। তার অভিব্যক্তিতে মনে হচ্ছে সেই আমাদের গলায় দড়ি বেঁধে নিয়ে এসেছিল। ইতস্ততভাবে বলল আরেকটা দর্শনীয় স্থানের কথা। দু মাইল দূরে একটা চড়ক গাছ আছে।

একটা গাঙের মাঝে ঠাঁয় দাঁড়ানো। কিন্তু অর্ধেক পাথর হয়ে গেছে। দেখলেই বুঝা যায়। দীলিপ এবার গদগদ। “ভগবানের সৃস্টির অনেক অজানা রহস্য আজো সমাধানের বাইরে।

দেখি না কি হয়!পূণ্য না হোক, পাপ তো হবে না...” সিদ্ধান্তে আসা হচ্ছে না। আমি ফিরে যেতে চাই। কিন্তু দীলিপ দেখবেই। এর মাঝে কোত্থেকে এক বুড়ির আবির্ভাব। কোঁচড়ে কিছু ফল।

মাথায় খড়কুটো। লোকালয়ে ফিরে যাচ্ছিল। পরিস্থিতি বুঝে আমাদের সাথে আলাপ জমাতে চাইল। “চড়ক গাছ” শুনেই বুড়ি চড়ক দেবের নামে লীলা সংকীর্তন শুরু করে দিল। “সেখানে এই হয়, সেই হয়, ভীষন গরম, যা চাও তাই পাবে” ইত্যাদি।

দীলিপের খুশি দেখে কে! এখন খোল করতাল হলেই হয়। আজ বুঝি স্বর্গের টিকিট বুকিং না দিয়ে ছাড়ছে ন। এরই মাঝে বুড়ি জানালো তার কস্টের কাহিনী। গাছটা যে গাঙে, সেই গাঙে একবার ওর বড় ছেলে মাছ ধরতে গিয়ে অনেক সোনা পেয়েছিল। সেটা ছিল চড়ক দেবের আশীর্বাদ।

কিন্তু শর্ত ছিল সোনা নিলে প্রাণ দিতে হবে! তাই ছেলেটি মারা যায়। বুড়ি কাঁদছে ছেলের জন্যে। আমি এতোক্ষণ কাঁদছিলাম আমাদের আহাম্মকির জন্যে। এখন সন্তান হারা বুড়ির চোখের জল ভেতরে বাষ্প তৈরি করছে। কান্না মানুষকে দুর্বল করে দেয়।

সিদ্ধান্তে এলাম। চড়ক গাছ দেখেই যাব। আবার পথচলা ও মানিকের বকর বকর। এবার বিষয় বস্তু “চড়ক গাছ ও ভগবানের অসীম ক্ষমতা। ” মানিক মুসলিম।

কিন্তু চা বাগানের হিন্দু শ্রমিকদের সাথে থেকে আচারে কিছুটা হিন্দু হয়ে গেছে। ভাব নিয়ে “ভগবান” বলার সময় চোখ সামান্য মুঁদে আসে। সাথে আবার দু’হাত জোড় হয়ে যায়। চোখের পাতায় কয়েক টন ভক্তি। এই গাছের ইতিহাস বলছে।

কোন এক চড়ক পুজোর পর চড়ক গাছ ভেসে ভেসে বড় গাঙে চলে যাচ্ছিল। প্রতিবারই যায়। আবার পুজোর আগে নিজে নিজে উজানে উঠে আসে। মন্দিরের পুকুরে ভেসে উঠে। এবারও যাচ্ছিল।

মাঝপথে চোরা কারবারির হাতে পড়ল। সেই কাঠ চোর কুড়াল দিয়ে কোপ দিতেই চড়ক গাছ দাঁড়িয়ে যায়। এরপর থেকে নাকি এখানেই আছে। গাছগুলো টিয়া পাখির আখড়া। অনেকগুলো আবার পথে উপর বসে আছে।

আমাদের দেখে নড়ে না। ভাব এমন যে, আমাদেরই পথ ছেড়ে দিতে হবে। হলদে কুটুম পাখিও দেখছি অনেক আছে। এদিকে সূর্য হেলে পড়ার পথে। পা চালিয়ে এলাম গাঙের পাড়ে।

কিন্তু গাঙ কোথায়? এ যে ড্রেন!আমি তো আমি, সাত আট বছরের বাচ্চাও অনায়াসে এ নালা লাফ দিয়ে পেরিয়ে যাবে। সুপার হিরো হনুম্যান হবার দরকার নেই। আমার গোড়ালিও ডুবে না। আর এখানেই মাছ ধরেছিল বুড়ির ছেলে! এখানে ব্যাঙও মনে হয় থাকে না। আর চড়ক বাবার কথা কি বলব!এনাকে দেখা আমার চুল আর মেজাজ চড়ক গাছ।

বালির মধ্যে ফুটবলের চেয়ে বড় একটা কালো পাথর। এর ফুট দুই দূরে আধলা ইটের মত দেখতে এক টুকরো কাঠ। দু ফুট বাই দু ফুট। ইনি সেই অর্ধ পাথর চড়ক বাবা! রাগ উঠলে আমি গান বা কবিতা নিয়ে ভাবি। এখন ছন্দের মিল খুঁজতে গিয়ে চড়কের সাথে “নরক” আর “মড়ক” মাথায় আসছে।

সুর্য হেলান দিয়েছে। ফিরছি। পা তো চলে না। মানিকের শরীরে গাঁজার গন্ধ খুঁজি। ভোলানাথের শিষ্য না হলে এমন গুল দেয়া অসম্ভব।

ভৈরবের চ্যালাও হতে পারে। তাহলে ভাং প্রেমিক হওয়া অসম্ভব নয়। এদিকে ভাং টাং পাওয়া যায় কি না জিজ্ঞেস করতে তার মুখ কনে দেখা আলোয় ভরে গেল। এতোক্ষন উপোস ছিল। এখন গিয়ে মনে হয় খাবে।

চা বাগানের কাছেই ওর কুঁড়ে। সে বিদায় নিল। অন্ধকার হয়ে এসেছে। শিয়ালেরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। অনেক দূরে ইলেক্ট্রিক লাইট জ্বলছে।

খাইছড়া চা বাগানের কোয়ার্টার। ক্লান্ত দু’জন হাঁটছি। দীলিপ কাঁধে হাত রাখে। -সারাদিনে একটাও বানর দেখলাম না। -নিজেকেই দ্যাখ।

সারাদিনে অনেক বাঁদর নাচ নেচেছি। দীলিপ হাসে। -আজ অনেক কিছুই দেখলাম। সবচেয়ে বড় লাভ হল পর্বত কিভাবে মূষিক প্রসব করে, আজ দেখে নিলাম। দুজনেই হেসে উঠি।

সারাদিনের ক্লান্তি মিলিয়ে যায়। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.