আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কনোকোফিলিপস এর সাথে চুক্তি নিয়ে ডেইলিস্টারের মিথ্যাচারের জবাবে

ডেইলি স্টার আবিস্কার করেছে বাংলাদেশ নাকি গ্যাসের ৮০% মালিকানা পাবে, কনোকোফিলিপস এর পক্ষে স্থলভাগে কিংবা সাগরে কোথাও এলএনজি প্ল্যান্ট বানিয়ে গ্যাস রপ্তানি করা লাভজনক হবে না ইত্যাদি। আর এই "আবিস্কার" প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে গত ২১ জুন “Govt share up to 80pc” শীর্ষক “সংবাদ”টিতে(Click This Link) অসংখ্য মিথ্যাচার করেছে ডেইলিস্টার যার মধ্যে প্রধান কয়েকটির জাবাব দেয়াটা ভীষণ জরুরী বলে মনে করছি। মালিকানা নিয়ে মিথ্যাচার: ডেইলিস্টার লিখেছে ৫৫% থেকে ৮০% গ্যাস নাকি বাংলাদেশের! কিন্তু প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের মালিকানা ৫৫% থেকে ৮০% হওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে তা কি সম্পূর্ণ গ্যাসের নাকি কেবল প্রফিট গ্যাস বা লাভের গ্যাসের? চুক্তি অনুযায়ি মোট উত্তোলিত বাজারজাত যোগ্য গ্যাসের ৫৫% কস্ট রিকভারি বা খরচের গ্যাস হিসেবে কোম্পানির মালিকানায় চলে যাওয়ার পর যে বাকি ৪৫% গ্যাস থাকবে সেই প্রফিট গ্যাসের ৫৫% থেকে ৮০% মালিকানা বাংলাদেশের বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এখন, প্রফিট গ্যাসের ৮০% মালিকানা বলতে কি সম্পূর্ণ গ্যাসের মালিকানা বোঝায়? ৪৫% প্রফিট গ্যাসের ৫৫% মানে হলো মোট গ্যাসের ২৪.৭৫% এবং ৮০% মানে হলো মোট গ্যাসের ৩৬%। তাহলে ডেইলস্টার কেমন করে দাবী করছে বাংলাদেশ মোট গ্যাসের ৮০% পাবে? এখানেই শেষ নয়, গোটা রিপোর্টের কোথাও বলা হয় নি যে, চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ কখনই মোট উত্তোলিত বাজারজাত যোগ্য গ্যাসের ২০% এর বেশি দাবী করতে পারবে না।

আর্টিক্যাল ১৫.৫.৪ এ তো স্পষ্ট বলা আছে : “Where Petrobangla has installed necessary facilities to transport and use gas to meet domestic requirements, Petrobangla shall be entitled at its option to retain in kind any Natural Gas produced up to Petrobangla's share of Profit Natural Gas, butin no event more than twenty percent (20%) of the total Marketable Natural Gas. তাহলে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের ভাগে লাভের গ্যাসের ৮০% পড়লেও, মোট গ্যাসের ২০% এর বেশি কখনই বাংলাদেশ দাবী করতে পারবে না। অবশ্য ঐ আর্টিক্যালে দয়া করে ১০ বছর শেষে ১১ বছরের মাথায় কনোকোফিলিপস এর যদি দয়া হয় তাহলে বাংলাদেশ কে ৩০% দিলেও দিতে পারে! At the request of Petrobangla, the limit of twenty percent (20%) stipulated herein will be increased to thirty percent (30%), at the beginning of the eleventh year following the start of deliveries for the purpose of LNG export.” রপ্তানি বিষয়ক মিথ্যাচার: ডেইলি স্টার এর তথাকথিত সংবাদে দাবী করা হয়েছে উত্তোলিত গ্যাস কোম্পানির জন্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে না কারণ এর জন্য ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার খরচ করে এলএনজি প্ল্যান্ট বানাতে হবে। এখন এই এলএনজি প্ল্যান্ট যদি স্থলভাগে বানাতে হয় তাহলে আবার ব্যায়বহুল ২৮০ কিমি পাইপ লাইন বানাতে হবে। আর সাগরে যেহেতু এই মুহুর্তে দুনিয়ায় কোন কমার্সিয়াল ভাসমান এলএনজি প্ল্যান্ট নাই তাই কনোকোফিলিপস এর জন্যও ভাসমান এলএনজি প্ল্যান্ট বানিয়ে বিদেশে এলএনজি আকারে গ্যাস রপ্তানির প্রশ্ন আসেনা। তাছাড়া লাভজনক এলএনজি প্ল্যান্ট বানাতে নাকি বছরে নূন্যতম ৫ থেকে ৭ মিলিয়ন টন এলএনজি উতপাদনের মতো গ্যাস আবিস্কার করতে হবে যা ২০ বছর ধরে চলবে।

ডেইলিস্টারের বক্তব্য হলো, বাংলাদেশের সমুদ্র ব্লকের পাশেই মায়ানমার ৭ টিসিএফ এবং ভারত ১৪ টিসিএফ গ্যাস পেলেও বাংলাদেশের জন্য নাকি এ পরিমাণ গ্যাস আবিস্কারের আশা করা “ফ্যানটাসি”!! প্রথমত, গ্যাস যদি স্থলভাগে আনতে হয়, তাহলে কোম্পানি এলএনজি প্ল্যান্ট বানাক আর না বানাক, পাইপ লাইন তাকে বানাতেই হবে। এলএনজি প্ল্যান্ট বানানো না বানানোর যুক্তির সাথে পাইপ লাইনের প্রসঙ্গ তখনই আসে যখন গ্যাস স্থলভাগে না আনার বিকল্প কোম্পানির থাকে। এরকমই একটি বিকল্প হলো ভাসমান এলএনজি প্ল্যান্ট বা ফ্লোটিং এলএনজি প্ল্যান্ট। স্থলভাগে এলএনজি প্ল্যান্ট না বানানোর পিছনে যদি ব্যায় বহুল পাইপ লাইনের অযুহাত দেয়া হয় তাহলে তো বোঝা শক্ত নয় উত্তোলিত গ্যাস বাংলাদেশের স্থলভাগে আনার কোন পরিকল্পনা কনোকোফিলিপস এর নাই বরং সাগরের বুকে ভাসমান এলএনজি প্ল্যান্ট বানিয়েই সে গ্যাস বিদেশে রপ্তানি করবে। দ্বিতীয়ত, ভাসমান এলএনজি প্লান্টের টেকনোলজি একেবারেই নতুন কোন সন্দেহ নাই কিন্তু এই মুহুর্তে কমার্সিয়ালি চালু নয় বলে কখনই হবে না তাতো নয়।

কনোকোফিলিপস এর ওয়েবসাইটেই আছে কোম্পানিটি অষ্ট্রেুয়িলার তিমুর সাগরে “গ্রেটার সানরাইজ” নামের একটি এলএনজি প্রজেক্টের কাজ করছে যেখানে তার মালিকানা ৩০%। Click This Link ডেইলি স্টার ফ্লোটিং এলএনজি প্ল্যান্ট কে অবাস্তব বললেও কোনোকোফিলিপস কিংবা কনোকোফিলিপস এর পার্টনার রা সেটাকে লাভজনক মনে করছে বলেই বছরে মাত্র ৪ মিলিয়ন টন(৪ এমটিপিএ বা মিলিয়ন টন পার এনাম) এলএনজি উতপাদনকেই লাভজনক মনে করছে “গ্রেটার সানরাইজ” এ কনোকোফিলিপস এর অপর পার্টনার উডসাইড: “ a 4 million ton a year FLNG processing facilities would maximize revenues from the project.” Click This Link তৃতীয়ত, এলএনজি প্ল্যান্ট লাভজনক হতে হলে বছরে নূন্যতম ৫ থেকে ৭ মিলিয়ন টন উতপাদনের মতো প্রয়োজনীয় গ্যাস থাকতে হবে এ কথার কোন ভিত্তি নেই। একেবারেই ভূয়া এই তথ্য। ছোট এবং বড় উভয় ধরনের এলএনজি প্ল্যান্টই লাভজনক ভাবে চলছে দুনিয়ায়: ছোট এলএনজি প্ল্যান্টের ক্ষমতা বছরে ০.৩ থেকে ৩ মিলিয়ন টন এবং বড় প্ল্যন্টের ক্ষমতা ৩ মিলিয়ন টনের বেশি। দুনিয়ায় এই মূহুর্তে বছরে ২ মিলিয়ন টন(২ এমটিপিএ) ক্ষমতার প্ল্যান্ট আছে ৫০ টিরও বেশি।

At this moment, there are more than fifty small to medium scale LNG plants in operation and projects with capacities less than 2 MTPA. Most of them are located in China and Australia. Other liquefaction units are being built or planned in Indonesia, Papua New Guinea, Iran, USA, Norway, Peru and Brazil. Click This Link চতুর্থত, বাংলাদেশের সমুদ্র সীমার পাশেই ভারত ও মায়ানমার দুটি ব্লক থেকে ৭ থেকে ১৪ টিসিএফ গ্যাস পেলেও বাংলাদেশ এই পরিমাণ গ্যাস আশা করা কেন ফ্যান্টাসি হবে তার কোন ব্যাখ্যা ডেইলিস্টার দেয়নি। আরেকটা বিষয় হলো, ৭ টিসিএফ গ্যাস না পেলেও লাভজনক এলএনজি প্ল্যান্ট চলে যার অসংখ্য উদাহরণ আছে। খোদ কনোকোফিলিপস এরই এরকম একটি এলএনজি প্ল্যান্ট হলো অষ্ট্রেলিয়ার উপকুল থেকে ৫০০ কিমি দুরে তিমুর সাগরের ৩.৪ টিসিএফ গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উপকুলে গ্যাস এনে তরল এলএনজি বানানোর প্ল্যান্ট যেখান থেকে বছরে ৩ মিলিয়ন টন এলএনজি উতপাদিত হয়। Click This Link এলএনজি হিসেবে রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের হিসাব: এলএনজি করার জন্য গ্যাস কে চাপ এবং নিম্ন তাপে ৬০০ ভাগের এক ভাগে সংকুচিত করা হয়। হিসেব করে দেখা যায়, ১ মেট্রিক টন এলএনজি = ৪৬.৭ হাজার ঘনফুট বা ৪৬.৭*১০০০ ঘনফূট গ্যাস সুতরাং ১ মিলিয়ন মেট্রিকটন এলএনজি = ৪৬.৭*১০০০*১০০০০০০ ঘনফুট গ্যাস = ৪৬.৭ মিলিয়ন*১০০০ ঘনফুট গ্যাস বা ৪৬.৭ বিসিএফ গ্যাস (১ বিসিএফ=১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস) অর্থাত বছরে ১ মিলিয়ন টন এলএনজি উতপাদনের জন্য বছরে ৪৬.৭ বিসিএফ গ্যাস পাওয়া যায় এরকম একটি গ্যাস ক্ষেত্র পাওয়াই যথেষ্ট।

আর বছরে ৩ মিলিয়ন টন এলএনজি উতপাদনের জন্য বছরে ৪৬.৭*৩= ১৪০ বিসিএফ গ্যাস প্রয়োজন। সুতরাং, কোন একটি গ্যাস ক্ষেত্রে ১ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া গেলে বছরে ৩ মিলিয়ন টন এলএনজি উতপাদন করা যাবে ১০০০/১৪০ = ৭ বছরেও বেশি সময় ধরে। আর ৩ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া গেলে বছরে ৩ মিলিয়ন টন এলএনজি উতপাদন করা যাবে ২১ বছর ধরে। বাংলাদেশের যে সাগর বক্ষের গ্যাস ব্লকের পাশের ব্লক থেকেই মায়ানমার ৭ টিসিএফ এর বেশি গ্যাস পেয়েছে সেই গ্যাস ব্লক থেকে কনোকোফিলিপস ৩ টিসিএফ এরও কম গ্যাস পাবে এরকম সম্ভাবনা দেখলে কনোকোফিলিপস সাগরের গ্যাস ব্লক ইজারা চুক্তি করতো এরকমটা হওয়ার কোন কারণ নেই। আরেকটু হিসাব করা যাক।

ধরা যাক ৭ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া গিয়েছে। তাহলে ৭.৫% হারে তুললে গ্যাস তুলতে পারবে বছরে ০.৫২৫ টিসিএফ বা ৫২৫ বিসিএফ । তাহলে দৈনিক উত্তোলন করতে পারবে ৫২৫/৩৬৫ = ১.৪৩৮ বিসিএফ। আবার বাংলাদেশে বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতি ৫০০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট। বছরে ৭% চাহিদা বৃদ্ধি ধরলে ৫ বছর পর যখন গ্যাস আবিস্কৃত ও উত্তোলিত হবে তখন গ্যাসের চাহিদা হবে দৈনিক ৭৫০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট বা ০.৭৫ বিলিয়ন কিউবিক ফুট।

এখন কনোকোফিলিপস যদি ৭ টিসিএফ এর গ্যাস ক্ষেত্র থেকে দৈনিক ১.৪৩৮ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস তুলতে শুরু করে তখন বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ব্যাবহার করতে পারবে ০.৭৫ বিলিয়ন কিউবিক ফুট যার পরও বাকি থাকবে ১.৪৩৮-০.৭৫= ০.৬৮৮ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস। বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্র যখন এই গ্যাস ব্যাবহার করতে পারবে না তখন কি হবে? চুক্তি অনুসারে পেট্রোবাংলা তখন এই গ্যাস রপ্তানির অনুমতি দিতে বাধ্য হবে। প্রশ্ন হলো, দৈনিক ০.৬৮৮ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস থেকে এলএনজি উতপাদন কি লাভজনক হবে? চলুন দেখা যাক: বছরে ১ মিলিয়ন মেট্রিকটন গ্যাস উতপাদন করতে বছরে প্রয়োজন হয় ৪৬.৭ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস বা দৈনিক ৪৬.৭/৩৬৫= ০.১২৮ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস। সুতরাং ০.৬৮৮ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস দৈনিক ব্যাবহার করে বছরে ০.৬৮৮/০.১২৮= ৫.৩৭৫ মিলিয়ন মেট্রিকটন এলএনজি উতপাদন করতে পারবে কনোকোফিলিপস যা যথেষ্ট লাভজনক। তাহলে ডেইলিস্টার কোন যুক্তিতে বলছে, বাংলাদেশের সম্ভবনাময় গ্যাস ক্ষেত্র( যার একটি গ্যাস ক্ষেত্র থেকেই কনোকোফিলিপস এর ডারউইন এলএনজি প্লান্টের দ্বিগুনেরও বেশি গ্যাস পাওয়ার সম্ভবনা আছে এবং যে গ্যাস ক্ষেত্রর দুরত্ব উপকুল থেকে ডারউইন এর দুরুত্বের মাত্র অর্ধেক) থেকে কনোকোফিলিপস এলএনজি প্ল্যান্ট বানানো লাভজনক মনে করবে না!!! ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.