আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

এরাও লেখক! (স্বীকার করুন বা না করুন)!

শফিক হাসান দলিল লেখক নাম তার দলিল উদ্দিন বা খলিল উদ্দিন যা-ই হোক না কেন, তিনিও তো লেখক। কিন্তু তার লেখক পরিচয় স্বীকারে আমরা কুণ্ঠিত! যদিও মুখে মুখে প্রায়ই বলে ফেলি, দলিল লেখক অমুক-তমুক। দলিল লেখকরা সাধারণ কোনো লেখক নন, ক্ল্যাসিক পর্যায়ের। উদাহরণ হিসেবে ধরি, যেসব লেখককে আমরা স্বীকৃতি দিই, যারা পত্রিকার পাতা বা টেলিভিশনে নাম কিংবা মুখ দেখানোর সুযোগ পান_ প্রকৃতপক্ষে লেখক হিসেবে তাদের ভিত তৈরি করে দেয় কে? অবশ্যই দলিল লেখক। কারণ যে বাড়িতে লেখকের বসবাস সে বাড়ির দলিল নিশ্চয়ই লেখক নিজে করেননি? তাহলে বলুন কে বড় লেখক? দেয়াল লেখক শিক্ষা অনুরাগী জাতি হিসেবে আমরা ফাঁকা জায়গা পেলেই লিখি।

সুযোগের সদ্ব্যবহার করি। আমরা যে ধীরে ধীরে উন্নতির শিখরে পেঁৗছাচ্ছি_ নেপথ্য কারণ এটিই। গুণধর লেখকরা আবিষ্কার করলেন, দেয়ালে লেখা অনেক সাশ্রয়ী এবং বিজ্ঞাপন খরচ ছাড়াই এ লেখা পেঁৗছে যাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে। সুতরাং তারা শুরু করলেন দেয়াল লিখন। তাদের অগ্রযাত্রায় ঈর্ষান্বিত হয়ে হয়ে নীচুমনারা দেয়ালে নোটিশ দিয়ে রাখে, 'দেয়ালে লিখবেন না/দেয়ালে লেখা দণ্ডনীয় অপরাধ।

' কিন্তু তাতে কী আর বিপ্লবী লেখকের কার্যক্রম থেমে থাকে! 'তোমার অধিকার আছে নোটিশ দেওয়ার আর আমার অধিকার আছে না মানার!' এ শ্রেণীর লেখকরা মূলত রাজনৈতিক ধারার। অমুক ভাইয়ের মুক্তি চাই কিংবা কুদ্দুস ভাইকে ভোট দিন অথবা মতিন ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র ধরনের লেখাই স্থান পায় বেশি! টাকার লেখক টাকা হাতে পেলেই সৃজনশীলতার চুলকানি অনুভব করেন না এমন মানুষ খুব কম! যাদের টাকা আছে তাদের সিংহ ভাগ মানুষের দ্বারাই শিল্প-সাহিত্য হয় না_ আসক্ত হয়ে পড়ে ভোগের নেশায়। ভোগপ্রিয় বান্দা দিয়ে আর যাই হোক, শিল্পের বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। আশার বিষয়, প্রথাটা ভাঙতে শুরু করেছে। এখন টাকাওয়ালা অনেকেই হাতে টাকা পেলেই টাকার ওপরই রেখে দিতে চেষ্টা করেন সৃজনপ্রতিভার স্বাক্ষর।

টাকার ওপরই লিখে দেন কবিতা কিংবা ধারাবাহিক উপন্যাস। মনের আকুলতা পরিস্টম্ফুট হয় টাকায়। 'কোনো সুন্দরী তরুণীর সঙ্গে প্রেম করতে চাই। এ নম্বরে ফোন কোরো' জাতীয় চিরকুট লেখার মাধ্যমে তারা পক্ষান্তরে প্রেমের বিচরণ ক্ষেত্রগুলো বাড়িয়ে চলেছেন। আবার কেউ কেউ কিছু না লিখে অর্থহীন আঁকিবুঁকির মাধ্যমে চিত্রকলার ইতিহাসের বাঁকবদলের সম্ভাবনা জানান দিচ্ছেন! নকলবাজ লেখক কারও যদি প্রতিভা থাকে তাহলে সে প্রতিভা ঠিকই আগে-পরে ছড়িয়ে পড়বে দিগন্ত থেকে দিগন্তে।

এমনতর প্রতিভার উদাহরণ নকলবাজ শিক্ষার্থীরা। সারাবছর তারা পড়াশোনা করবে না, বালিকার বাড়ির সামনে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দাঁড়িয়ে থাকা, খেলাধুলার নতুন তারকা তৈরিতে নিজেকে ব্যাপৃত রাখাসহ কত যে কাজ তাদের! এত কাজ করতে গিয়ে কী আর পড়াশোনাটা ঠিকভাবে হয়? পরীক্ষার আগের রাতে মনে হয়, 'আরে, আগামীকাল তো পরীক্ষা! আমি এখন কী লিখুম' ধরনের ভাবনার উদয় হয়। ভাবনা থেকে তারা শুরু করে অপারেশন। কখনও বইকে সিজারিয়ান করার মাধ্যমে ফালা ফালা করা, কখনও প্রয়োজনীয় লেখাটা টুকে নেওয়া_ এভাবেই কেটে যায় 'পরীক্ষার আগের রাত'। সতীর্থ এবং নিজের কালেকশনগুলোর সাহায্য পরীক্ষার খাতায় কলম ঝড় তোলে।

তারাও লেখক। কপি রাইটার বলা হোক বা টুকলিফাইং রাইটারই বলা হোক! টয়লেট লেখক অসমর্থিত একটি সূত্র বলে, আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে তার বেশির ভাগ আইডিয়া পাওয়া গেছে টয়লেটে বসেই! টয়লেট হচ্ছে সেই জায়গা যেখানে সৃজনশীলতা খোলতাই হয়। নজিরও যত্রতত্র চোখে পড়ছে। বিশেষ করে পাবলিক টয়লেটে। প্রাকৃতিক কর্ম সারতে গিয়ে সৃজনশীল মানুষ মেতে ওঠে সৃষ্টির উন্মাদনায়।

এ সৃষ্টি উন্মত্ততায় নিজের ভেতরের প্রতিভার যে ঠেলাঠেলি তা বাইরে চলে আসে। দেয়ালে আঁকিবুঁকির মাধ্যমে তারা নিজেদের চিত্রশিল্পী হিসেবে যেমন প্রতিষ্ঠা করেন তেমনি কবিতা রচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে টয়লেট-কাব্য নামে যে আরেকটি ফর্ম দাঁড়িয়ে যাবে সে সম্ভাবনার দিকেও ইঙ্গিত করেন। এছাড়া উন্মুক্ত গদ্য, সুনিবিড় প্রাণময় কথকতা তো আছেই! পত্র লেখক না, এ পত্র লেখক সংবাদপত্রের পত্র লেখক নন। আক্ষরিক অর্থেই পত্র লেখক_ কাগজ-কলমে চিঠি লেখা যাকে বলে! তা প্রেমপত্র হোক, চাকরির আবেদনপত্রই হোক! সমাজে এমন মানুষও কম নেই যারা লেখাপড়া না জানা হেতু চিঠি লিখতে পারে না, লিখতে হলে আঙুল কেটে কলম বানাতে হয়! এমন মানুষের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন এ পত্র লেখকরা। এলাকার মানুষের প্রবাসী স্বামী কিংবা দূর শহরে বসবাসরত পরিজনের কাছে চিঠি লেখানোর সময় ডাক পান তারা।

আশঙ্কার কথা হচ্ছে, বর্তমানে মোবাইল ফোনের প্রাদুর্ভাবে এমন লেখকদের ঐতিহ্য, কর্মধারা হুমকির সম্মুখীন। এর অবসান হওয়া জরুরি। প্রয়োজনে সরকারিভাবে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক! হুমকিপত্র লেখক 'অমুক জিনিস ফেরত চাইলে তমুক জায়গায় টাকা নিয়ে হাজির থাকবি, নইলে...'_ এভাবেই পত্র লেখে এমন মানুষের সংখ্যা কম হলেও এ দেশে আছে। তারা বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে চাঁদা ধার্য করে দেয়, পত্রপ্রাপককে সেই চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। দুর্মুখেরা তাদের সন্ত্রাসী লেখক কিংবা চাঁদাবাজ লেখক হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে।

এ হুমকিপত্রের আরও সুন্দর একটা নাম আছে_ 'চরমপত্র'। চরমপত্র যিনি বা যারা পান তাদের অবস্থা যে চরমে ওঠে তা বলাই বাহুল্য। প্রত্যাশামতো কাজ না হলে যে কোনো (অ)কাজ খুব সহজেই করে ফেলতে পারে তারা। সুযোগ পেলে সরকার-পুলিশকেও নিজেদের শৌর্যবীর্যের পরিচয় দেখিয়ে দিতে পারঙ্গম তারা! ফেসবুক লেখক ভালো-মন্দ যাই হোক, ফেসবুককে যতই মানুষ ইতি ও নেতিবাচক অভিধায় অভিষিক্ত করুক_ এটি সত্য ফেসবুক লেখক তৈরি করে চলেছে! ফেসবুকের কল্যাণে অনেকেই আজকাল লেখক ভাব নিয়ে চলে। কথায় কথায় বলে বেড়ায়, 'আমি তো লিখি।

' কোথায় প্রশ্ন করা হলে উত্তর আসে 'ফেসবুক'-এ। ফেসবুকের ওয়াল বাংলার নব্য লেখকদের জন্য উদার জমিন। নিপীড়ক সম্পাদকের হাত এ পর্যন্ত পেঁৗছে না বলেই রক্ষা। ফেসবুকের যেখানটাতে লিখতে হয় তার নাম ওয়াল তথা দেয়াল। তাই বলে এ দেয়ালে রাজনৈতিক লেখা সবাই লেখে না, কেউ কেউ লেখে! চিকা মারা লেখক চিকা মারা লেখককে এক অর্থে গণ্ডিবন্ধ লেখক হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়।

তাদের যত লেখনী তা মোটামুটি সীমার মধ্যে। কোনো টিন বা পাতের ওপর যে 'কর্তিত' লেখা থাকে, রঙের ব্যবহারে সেটিই ফুটে ওঠে দেয়ালে। এখানে লেখকের মনে তাৎক্ষণিক কোনো ভাব উদয় হলে সে ভাবকে উগরে দেওয়া, প্রশমিত করা তথা ভাব প্রকাশের ব্যবস্থা নেই! যা বলার একবার বলেই ব্লক করে দেওয়া হয়েছে যা চিকা মারা লেখকদের জন্য প্রতিবন্ধক এবং অনুচিত কাজ। শিল্পীর তুলি কেড়ে নেওয়া সংবেদনশীল মানুষের কাজ নয়। আশার কথা, এ অবস্থা থেকে চিকা মারা লেখকরা সমাধান খুঁজে বের করার তালে আছেন।

মুদি দোকানি লেখক হোলসেল মুদি দোকানের ম্যানেজার সারাদিন যত লেখা লেখেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকও এত লেখা লেখেন না। নগদ-বাকির হিসাব, মেমো তৈরি_ কত লেখা যে লিখতে হয়। কিন্তু তিনি লেখক হিসেবে পরিচিত নন কারও কাছে। চাল, ডাল, আটা, লবণ, তেল, নুনের যে হিসাব তিনি রাখেন এটি খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তার হাত দিয়েই অনায়াসে বেরিয়ে আসে 'কালজয়ী' সব কবিতা।

যেমন_ 'দুধ চিনি চা পাতা/স্কেল কলম খাতা/চাল ডাল নুন/সুপারি জর্দা চুন...!' শ্রুতি লেখক দেশে এমন লেখকও আছেন যিনি বয়সজনিত কারণে কিংবা আলস্য হেতু নিজে লেখেন না, শুধু বলে যান_ লিখে দেয় আরেকজন। পরে সেই লেখা ছাপা হয় যিনি বলেছেন তার নামেই। কী তাজ্জব ব্যাপার! লিখেছেন একজন, ছাপা হয়েছে আরেকজনের নামে! যার নামে ছাপা হয়েছে তিনি লেখেননি, বলেছেন শুধু। আর যিনি লিখেছেন তার কোনো খোঁজই নেই! কেউ কেউ বদান্যতা দেখিয়ে লেখার শেষে হেলাফেলায় শ্রুতি লেখকের নামটি দিয়ে থাকেন। এটি কী হওয়া উচিত! বরং হওয়া উচিত লেখার শিরোনামের নিচে শ্রুতি লেখকের নাম, ফুটনোটে কথকের নাম! চেক বই লেখক কেবল বই লিখলে লেখক আর চেক বইতে লিখলে লেখক নন_ এটি পৃথিবীর কোথাও লেখা নেই, বলাও নেই! সুতরাং যারা সব সময় চেক বই নিয়ে থাকেন, বিভিন্ন ক্লায়েন্ট থেকে শুরু করে অফিসের কর্মীদের বেতন দেওয়াসহ নানা কাজে চেক বইকেই করে ফেলেছেন জীবনের অনিবার্য অংশ তাদের অবশ্যই লেখকের সম্মান দেওয়া উচিত এ জন্যই যে, এতে গুণীজনের গুণ স্বীকার করার মানসিকতা তৈরি হবে।

চেক বই অর্থাৎ চেকে সই দেওয়ার মতো মহতী কাজে যারা নিজেদের ব্যাপৃত রাখেন তারা অবশ্যই সম্মানিত লেখক। তাদের নাম উচ্চারণ করার আগে নামের ওপর অন্তত এক হাজারটি চন্দ্রবিন্দু দেওয়া দরকার! এসএমএস লেখক এসএমএসের ইলাবোরেশন হয় শর্ট মেসেজ সার্ভিস। বাংলায় ক্ষুদ্র চিঠি। এখন ক্ষুদ্র চিঠির স্বর্ণযুগ। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীরা প্রায় কারণে-অকারণে একে অন্যকে মেসেজ পাঠাচ্ছেন।

আদান-প্রদানে সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে দেশের পত্রসাহিত্য। বুদ্ধদেব গুহ যেভাবে লিখে ফেলেছিলেন 'সবিনয় নিবেদন' সে ধারা ফলো করলে খুব সহজেই একটি এসএমএস পত্রসমগ্র বই আকারে প্রকাশ করা যায়। সমস্যা হচ্ছে, দেশে এসএমএস লেখকগোষ্ঠী নামে পৃথক কোনো সংস্থা নেই। থাকলে এসএমএস সংগ্রহ এবং প্রকাশনার সব কাজ ত্বরান্বিত হতো। যানবাহনের লেখক আমাদের দেশে বাস, টেম্পোসহ বহুবিধ যানবাহনে সুন্দর কিছু কথা লেখা থাকে।

ব্যবহারে বংশের পরিচয়, রাজনৈতিক আলাপ নিষেধ, ১০০ থেকে এক হাজার টাকার নোটের ভাংতি নেই, আগে নামতে দিন, অপরিচিত লোকের কাছ থেকে কিছু খাবেন না_ কত কী! এসব পথসাহিত্য একদিকে যেমন বোধের উন্মোচন ঘটাতে সহায়ক, অন্যদিকে তেমনি আদব-লেহাজ শেখার চলমান স্কুলও। বাস-টেম্পোচালক, কন্ডাক্টররা যে জ্ঞান বিনামূল্যে দিয়ে যাচ্ছেন, এই দানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি স্বীকৃতিও দেওয়া মনুষ্য-উচিত। সামাজিক বৈষম্যমূলক অবস্থানগত কারণে তারা সরাসরি শিক্ষা দিতে পারেন না, তাতে কী! লিখে তো ঠিকই শিক্ষা দেওয়ার কাজটি করে চলেছেন নীরবে-নিভৃতে! টু-লেট লেখক টু-লেট লেখকরাই খুব বেশি সক্রিয়। সঙ্গত কারণেই তাদের কদরও বেশি। বিশেষ করে ঢাকা শহরের দেয়ালে দেয়ালে হাতে লেখা বা কম্পোজ করার ঘোষণাপত্র টানিয়ে তারা গৃহহীন মানুষকে পথ দেখাচ্ছেন।

এটি ছোটভাবে দেখার অবকাশ মোটেও নেই। কারণ একজন লেখক জাতিকে পথ দেখাবেন, দেশের গৃহহীন মানুষকে পথ দেখাবেন_ এটিই তো স্বাভাবিক। সেই কাজটা টু-লেট লেখকরা করে দিচ্ছেন। কিন্তু মানুষ এতই অকৃতজ্ঞ, পছন্দের বাসাটি পেয়ে গেলে তড়াক করে উঠে পড়ে, কখনোই সেই যোগসূত্র স্থাপনকারী টু-লেট লেখকের এতটুকু খোঁজ নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করে না। কেন এ স্বার্থপরতা! টু-লেট লেখকরাই যে সত্যিকার অর্থে জাতির সঠিক পথনির্দেশকারী লেখক_ তা যতদিন পর্যন্ত মানুষ এটি মেনে না নেবে ততদিন এ দেশের আবাসন সমস্যার সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয়! ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.